অবশেষে যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী সেই ছয় শতাধিক বন্দির মুক্তি দিয়েছে ইসরায়েল। তবে ৪৬  ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তি স্থগিত রেখেছে ইসরায়েল। বৃহস্পতিবার গাজা থেকে চার জিম্মির মরদেহ ফেরত পাঠানোর পর ইসরায়েল তাদের কারাগারে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বন্দির মধ্য থেকে তাদের মুক্তি দেয়। মুক্ত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে গাজার ২৪ শিশুও রয়েছে। এর মাধ্যমে পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি সঠিক পথে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইসরায়েলের নানা পদক্ষেপে বারবার যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে গত শনিবার হামাস জিম্মি মুক্ত করলেও চুক্তির শর্ত ভেঙে বন্দিমুক্তি আটকে দেয় ইসরায়েল। এতে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর শঙ্কা সৃষ্টি হয়।
 
দ্য গার্ডিয়ান অনলাইন জানায়, দক্ষিণ গাজা থেকে জিম্মিদের মরদেহ রেড ক্রসের কাছে হস্তান্তর করা হয়। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকালে চার মরদেহের তিনটির শনাক্ত নিশ্চিত করে ইসরায়েল। এর পরই বন্দিদের নিয়ে ইসরায়েলের বাস পশ্চিম তীরের রামাল্লা ও গাজার খান ইউনিসে পৌঁছায়। ফিলিস্তিনের প্রিজনার্স ইনফরমেশন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সকাল পর্যন্ত সপ্তম দফায় ৬৪২ ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্ত করেছে ইসরায়েল। এদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা ৪৬ জন। 

ইসরায়েলের কারাগার থেকে মুক্ত বন্দিদের মধ্যে সবাই গাজা অথবা পশ্চিম তীরে নিজ নিজ বাড়ি ফিরতে পারছেন না। তাদের মধ্যে ৯৭ জনকে মিসরে নির্বাসনে পাঠানো হচ্ছে। অন্য কোনো দেশ গ্রহণের আগে তাদের সেখানেই থাকতে হবে। ৪৫৬ বন্দি গাজায় ফিরেছেন; ৩৭ জন গেছেন অধিকৃত পশ্চিম তীরে; পাঁচজন অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে।

গত শনিবার এ বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল ইসরায়েলের। ওই দিন ছয় জীবিত জিম্মিকে মুক্ত করে হামাস। উৎফুল্ল এক জিম্মি জনসমক্ষে হামাস সদস্যের কপালে চুমু খান, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। কিন্তু যুদ্ধবিরতির চুক্তি লঙ্ঘন করে ছয় শতাধিক বন্দির মুক্তি আটকে দেয় ইসরায়েল। 

চলমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে যুদ্ধবিরতি সামনে এগিয়ে যাক। এ নিয়ে শিগগিরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত স্টিভেন উইটকফ মধ্যপ্রাচ্য সফর করতে পারেন।

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, এবার যারা কারামুক্ত হয়েছেন, তাদের ওপর ইসরায়েলের নির্যাতন ও হেনস্তার বিষয়টি স্পষ্ট। যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী প্রথম দফায় বন্দি মুক্তির সর্বশেষ ধাপ ছিল এটি। মুক্ত বন্দিদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের ইউরোপিয়ান হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। 

সদ্য ইসরায়েলের কারাগার থেকে মুক্ত গাজা সিটির বাসিন্দা আলা আল বায়ারি বলেন, তিনি দেখেছেন ইসরায়েলের কারাগারে থাকাকালে কীভাবে নির্যাতন, মারধর, হেনস্তা ও যা ইচ্ছা তা-ই করা হচ্ছে। প্রথমবারের মতো তিনি তাঁর এক বছর বয়সের মেয়ের সাক্ষাৎ পাচ্ছেন। 

আলা বলেন, ‘তারা নগ্ন করে আমাদের ওপর পানি ছুড়ে মারত; তার পর বিদ্যুৎ দিয়ে নির্যাতন চালাত।’ আরেক ফিলিস্তিনি রামাল্লার ইয়াহিয়া শ্রিদা ইসরায়েলের কারাগারকে নরকের সঙ্গে তুলনা করেন।
 
মুক্তি দিলেও পুনরায় আটকের শঙ্কা রয়ে গেছে। এর আগে ইসরায়েল অনেক বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার পর আবার আটক করে। পশ্চিম তীরের বিরজেইত ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক বাসিল ফারাজ জানান, ইসরায়েলের কারাগারে দীর্ঘ সময় ধরে থাকা ৪৭ বন্দির মধ্যে নাইল বারগৌতি হচ্ছেন এমন একজন, যাকে বন্দি বিনিময়ে মুক্ত করা হলেও পরে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বারগৌতি ৪৫ বছর বন্দিদশায় কাটিয়েছেন। 

যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় হামলা
যুদ্ধবিরতি চললেও গাজায় বিচ্ছিন্ন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বা আইডিএফ। এতে বৃহস্পতিবার এক দিনে আরও ১৭ জন নিহত হন। আহত হয়েছেন ১৯ জন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৮ হাজার ৩৬৫ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন ১ লাখ ১১ হাজার ৭৮০ জন।

.

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: ইসর য় ল বন দ ইসর য় ল র ক র গ র বন দ র ম ক ত ম ক ত কর বন দ দ র ক বন দ

এছাড়াও পড়ুন:

গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ শেষ, দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে সংশয়

ফিলিস্তিনের গাজায় প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে আগামীকাল শনিবার। তবে ইসরায়েলের অনাগ্রহে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের বিষয়ে এখন পর্যন্ত তেমন অগ্রগতি হয়নি। অবশ্য যুদ্ধবিরতি ও বন্দিবিনিময় চুক্তি অনুযায়ী দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি নিয়ে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত লড়াই বন্ধ থাকার কথা।

এদিকে প্রায় ৬০০ ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দিয়েছে ইসরায়েল। গত বুধবার দিবাগত রাত থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়। এসব বন্দীকে গত শনিবার মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হামাস অনুষ্ঠান করে ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি দেওয়ায় শেষ মুহূর্তে তাঁদের মুক্তি আটকে দিয়েছিল ইসরায়েল। বুধবার রাতে আরও চার ইসরায়েলি জিম্মির মরদেহ হস্তান্তর করেছে হামাস। এই ধাপেও ইসরায়েল ২৬ ফিলিস্তিনির মুক্তি দিতে গড়িমসি করছে বলে গাজার কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে।

চুক্তি অনুযায়ী গত ১৯ জানুয়ারি থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর এবং বন্দিবিনিময় শুরু হয়। যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের ৪২ দিনে ৩৮ ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছে হামাস। বিনিময়ে প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দিয়েছে ইসরায়েল।

প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতি শেষ হতে যাচ্ছে আগামীকাল শনিবার। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতি শুরুর ১৬তম দিন থেকে দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু সে অনুযায়ী আলোচনা শুরু হয়নি। অবশ্য চুক্তি অনুযায়ী দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি নিয়ে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতি চলতে থাকবে।

দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি নিয়ে সমঝোতা হলে বাকি ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি দেওয়ার কথা। এখনো ৫৯ জন ইসরায়েলি গাজায় বন্দী রয়েছেন, যাঁদের অর্ধেকের বেশি বেঁচে নেই বলে মনে করা হচ্ছে। ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি এবং মিসর-গাজা সীমান্তসহ সব এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়ার কথা।

যুদ্ধে ফিরতে চায় ইসরায়েল

হামাস জানিয়েছে, দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা শুরু করতে তারা প্রস্তুত। তবে দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতির চেয়ে প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে জিম্মিদের মুক্ত করতে চান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গাজায় আবার যুদ্ধ শুরু করতে সরকারের মিত্রদের থেকে তাঁর ওপর চাপ রয়েছে।

গতকাল নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার বৈঠক আহ্বান করেন নেতানিয়াহু। একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, ওই বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ইসরায়েলি প্রতিনিধিদল দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখবে কি না এবং তাদের কোন বিষয়ে আলোচনার ক্ষমতা কতটুকু দেওয়া হবে।

পরে প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরায়েলি আলোচকদের যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করতে আজ (বৃহস্পতিবার) মিসরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু।

গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার না করে প্রথম ধাপের মেয়াদ বাড়িয়ে বাকি জিম্মিদের মুক্ত করার ওপর জোর দিচ্ছেন নেতানিয়াহু। সংশ্লিষ্ট ইসরায়েলি একটি সূত্র সিএনএনকে বলেছে, প্রথম ধাপের মেয়াদ ‘যত দূর সম্ভব বাড়িয়ে’ এই লক্ষ্য অর্জন করতে চান তিনি।

দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি নিয়ে সমঝোতা হলে গাজা ও মিসর সীমান্তবর্তী ‘ফিলাডেলফি করিডর’ থেকে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়ার কথা। গত বছরের মে মাসে এই করিডরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল ইসরায়েল। দেশটির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কান-কে জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন বলেছেন, ফিলাডেলফি করিডর ছাড়বেন না ইসরায়েলি সেনারা।

এদিকে ইসরায়েল আবারও গাজায় যুদ্ধ শুরুর পরিকল্পনা করছে বলে অভিযোগ করেছেন হামাসের পলিটব্যুরো সদস্য বাসেম নাইম। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করতে রাজি হয়নি ইসরায়েল।

সম্পর্কিত নিবন্ধ