জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শহীদ ৮৮১ জনের মধ্যে মাত্র ৩০০ শহীদের স্বজনেরা মামলা করেছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। যে ৫৮১ জন মামলা করেননি, তাঁদের স্বজনেরা জানিয়েছেন, অজানা ভয় ও হুমকির কারণে তাঁরা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে এমএসএফ। গত বছরের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত ঘটনার বিষয়ে ‘হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনস ইন জুলাই–আগস্ট ২০২৪ স্টাডি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন জানায়, গত বছরের ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন। দাবি আদায়ে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ সমাবেশসহ শান্তিপূর্ণ নানা কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলনকারীদের দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ–সংগঠনের সদস্যদের নির্মম ও বর্বরোচিত আচরণ ছড়িয়ে পড়ে। রংপুরে আবু সাঈদ এবং ঢাকায় মুগ্ধ নিহত হওয়ার ঘটনায় দ্রুতই সরকারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন জোরালো হয়। আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান।

গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সহিংসতা ও পুলিশি হামলায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রকৃতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিহত, আহত, নির্যাতন, হুমকি, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাট, সনাতন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা, নিখোঁজ, মন্দির ও মাজারে আক্রমণের শিকার হন ১১ হাজার ৩৪৮ জন। সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে নিহত হয়েছেন ৮৮১ জন, আহত ৭ হাজার ৮৭৩, হুমকির শিকার ৯৩৩ জন, নির্যাতনের শিকার ৭৩১ জন এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫৪ জন। যদিও কয়েকজন পরে ফিরে আসেন।

গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৮৮১ জন নিহতের মধ্যে দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৫৬৮ জন, বিভিন্ন পেশাজীবী (পোশাকশ্রমিক, দিনমজুর, বিভিন্ন যানবাহনের চালক, দোকান ও রেস্তোরাঁর কর্মী ও যানবাহনের মেকানিকস) পেশার ১৬৪ জন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী (রাস্তার বিক্রেতা) ৮৫ জন, বেসরকারি চাকরিজীবী ২৩ জন, কৃষক ৯ জন, শিক্ষক ৬ জন, ডাক্তার ৫ জন, সাংবাদিক ও ফ্রিল্যান্সার ১০ জন, ব্যাংকার ৪ জন, আইনজীবী ৩ জন, প্রবাসী ২ জন, সরকারি চাকরিজীবী ১ জন ও ফটোগ্রাফার আছেন ১ জন।

নিহত ৫৬৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০৬ জন মাদ্রাসার, ১৩৬ জন প্রাথমিক ও উচ্চবিদ্যালয়ের, ২৬৫ জন কলেজের ও ৬১ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের। তাঁদের সবাই গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে অথবা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বলে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে বনশ্রীতে শহীদ নাজমুলের মা নাজমা আক্তার, আজিমপুর এলাকার শহীদ খালিদ হাসান সাইফুল্লার বাবা খাইরুল হাসান এবং চানখাঁরপুলে গুলিবিদ্ধ আহত রকিবুল হাসান সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য দেন। বক্তব্যে তাঁরা সুষ্ঠু বিচার না পাওয়ার আতঙ্কের মধ্যে দিনযাপন করার কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে সব ঘটনার বিচার দাবি করেন।

৫ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সহিংসতার ঘটনাগুলোও তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন। গবেষণা প্রতিবেদনে এই সময়কার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, এই সময়ে ৮৭৬টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে অগ্নিসংযোগ ৩৩৩টি, ভাঙচুর ও লুটপাট ৩০০টি, সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি আক্রমণ ২২৩টি এবং মন্দির ও মাজারে আক্রমণের ঘটনা রয়েছে ২০টি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী সালমা আলী বলেন, গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা রাষ্ট্র ও আগামী প্রজন্মকে উৎসাহিত করবে। জুলাই-আগস্টের ঘটনায় নারীদের ভূমিকা কোনোভাবেই খাটো করে দেখা যাবে না। যথাযথভাবে ভুক্তভোগীদের জন্য ‘সাপোর্ট সার্ভিসের’ ব্যবস্থা করতে হবে। পুলিশকে পুনর্বিন্যাস করে নারীবান্ধব করতে হবে।

প্রতিবেদনে প্রাপ্ত তথ্যের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন গবেষণা প্রকল্পের সমন্বয়ক নূরুননবী শান্ত। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রধান নির্বাহী আইনজীবী মো.

সাইদুর রহমান।

মো. সাইদুর রহমান বলেন, আগের যেকোনো গণ–অভ্যুত্থান থেকে এবারের ঘটনা সম্পূর্ণ আলাদা। শহীদ ৮৮১ জনের মধ্যে মাত্র ৩০০ জনের স্বজনেরা মামলা করেছেন। স্বজনেরা জানিয়েছেন, আগের অসংগতি এবং সমস্যাগুলো এখনো বিরাজমান রয়েছে।

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: র স বজন র র ঘটন আগস ট

এছাড়াও পড়ুন:

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দায়ের পিটিশন খারিজ

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিশেষ করে হিন্দুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবিতে দায়ের করা একটি জনস্বার্থ পিটিশনের শুনানি ভারতের আদালতে করা যাবে না বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। গত মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট এমন নির্দেশনা দেন।

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না ও বিচারপতি সঞ্জয় কুমারের বেঞ্চের পরামর্শে পিটিশনটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। প্রধান বিচারপতি বলেছেন, এটা প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়, ফলে তা কোনোভাবেই ভারতের শীর্ষ আদালতের বিচার্য হতে পারে না।

প্রধান বিচারপতি খান্না বলেন, ‘এটি কোনোভাবেই আমাদের বিষয় নয়। আপনাদের কি মনে হয়, সরকার এই বিষয়ে অবহিত নয়? এই বিষয়ে এই আদালত কী করতে পারেন?’

পিটিশনটি করেছিলেন ভারতে ইসকন মন্দির স্টিয়ারিং কমিটির উপসভাপতি এবং পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় ‘ভগবান জগন্নাথ রথযাত্রা কমিটি’র প্রধান রাজেশ ঢানডা। পিটিশনের আবেদনকারীদের পক্ষে প্রধান আইনজীবী ছিলেন ভারতের সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মুকুল রোহাতগি।

পিটিশনে অভিযোগ তোলা হয়েছিল, বাংলাদেশে হিন্দুসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নির্যাতন ও হামলার শিকার হচ্ছেন। পিটিশনে আবেদন জানানো হয়, ভারত সরকার যেন বাংলাদেশে তাদের দূতাবাসের মাধ্যমে এর প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয় এবং বাংলাদেশ সরকারকে সেটা করার জন্য চাপ দেয়। এই মর্মে আদালতের নির্দেশ চেয়েছিলেন আবেদনকারী। বিষয়টি নিয়ে আদালতে কোনো রকম প্রক্রিয়া চালানোর সম্ভাবনাই নেই বলে জানিয়ে দেন ভারতের সর্বোচ্চ আদালত।

প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না আরও বলেন, ‘এটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয়...আমরা কীভাবে তা নিয়ে মন্তব্য করব? প্রতিবেশী একটি দেশের নিজস্ব বিষয় নিয়ে আমাদের আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারেন না।’

সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চের মনোভাব জানার পর আবেদনকারীর আইনজীবী পিটিশনটি প্রত্যাহার করে নেন। তবে তিনি জানান, তাঁর মক্কেল বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকারের দ্বারস্থ হতে পারেন।

পিটিশনে নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন, ২০১৯-এর অধীনে ‘কাট-অফ ডেট’ বাড়ানোরও দাবি করা হয়েছে, যাতে সাম্প্রতিক সহিংসতার কারণে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা হিন্দুরা ভারতীয় নাগরিকত্ব পেতে আবেদন করতে পারেন। বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে হিন্দু সংখ্যালঘুদের সাহায্য ও সহায়তা দিতে বিদেশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়ার আরজিও জানানো হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি আরজি হয়ে যাওয়ার কারণে আপাতত ভারতের আদালতে এ নিয়ে আর কোনো মামলা করা যাবে না।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • হাসিনার গাড়িবহরে হামলা: খালাস পেলেন বিএনপি নেতা হাবিব
  • হাইকোর্টের রায়ে খালাস পেলেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুল
  • উচ্চ আদালতে খালাস পেলেন বিএনপি নেতা হাবিব, সাতক্ষীরায় আনন্দমিছিল
  • জুলাই আন্দোলনে নিহতদের ৮৭ শতাংশই গুলিতে: এমএসএফ
  • জুলাই আন্দোলনে নিহতদের ৮৭ শতাংশ গুলিতে: এমএসএফ
  • জুলাই আন্দোলনে গুলিতে নিহত ৮৭ শতাংশ মানুষ: এমএসএফ
  • জুলাই আন্দোলনে গুলিতে নিহত ৮৭ শতাংশ মানুষ: জরিপ
  • বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দায়ের পিটিশন খারিজ
  • কামরাঙ্গীরচরে ৫৫ শতাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার