অধ্যাপক, যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

‘সংবাদপত্রের ভাষা’ পরিভাষাটি খুবই প্রায়োগিক ও প্রাত্যহিক। এটি প্রায়োগিক কারণ এটি একটি দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত লিখিত ভাষাকে নির্দেশ করে। একইসঙ্গে এটি অবশ্যই প্রাত্যহিক। কেননা এই লিখিত রূপটি বিপুল আয়তনে প্রতিদিন মানুষের সামনে এসে হাজির হয় যা থেকে মানুষ দেশ-জাতি-রাষ্ট্র-সমাজ ও বিশ্বের রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতি-ব্যবসা-বাণিজ্য-রোগবালাই ইত্যাদি সম্পর্কে সংবাদ লাভ করে। 


সংবাদপত্রের ভাষা যেহেতু মানুষের মৌখিক রূপ নির্দেশ করে না, বরং তার লিখিত ভাষাচর্চার একটি অংশ, সেহেতু এটি শুধু অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়। সে হিসেবে বলা যায়, দেশের বিপুলসংখ্যক নিরক্ষর মানুষের জন্য এই লিখিত ভাষারূপ কোনো অর্থই বহন করে না।


পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষার যত প্রাত্যহিক লিখিত রূপ আছে, তার মধ্যে সংবাদপত্রের ভাষার আকৃতি ও আওতা সর্ববৃহৎ। এটি বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ক্ষেত্রেও সত্যি। কারণ বাংলাদেশে মূলত বাংলা ভাষায় এবং কদাচিৎ অন্য আরও দু’একটি ক্ষুদ্র জনজাতির ভাষায় যেসব পত্রিকা, সাময়িকী প্রকাশিত হয়ে থাকে, তা সমগ্র বাংলাভাষার অন্য লিখিত রূপের তুলনায় শুধু আকৃতিতেই ব্যাপক না, বরং বিষয়চর্চার দিক থেকেও এটি বিশাল। কেননা একটি সংবাদপত্রে জাতির সামষ্টিক জীবনে ব্যবহৃত বহুবিধ বিষয়েরই সংবাদ পরিবেশিত হয়। 


সংবাদপত্র আপামর সবশ্রেণির শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ স্বল্পশিক্ষিত কেরানি থেকে শুরু করে পণ্ডিত ও গবেষক অধ্যাপক সকল শ্রেণির মানুষই প্রতিদিনই সংবাদপত্র পাঠ করেন। ফলে সংবাদপত্রের ভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এর ভাষারূপ হতে হয় সহজ, সরল এবং সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য, যাতে সবাই সংবাদপত্র পাঠ করে প্রয়োজনীয় অর্থ ও তথ্যটি উদ্ধার করতে পারেন। বিষয়টির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একটি সংবাদপত্রকে সবসময় ভাষার সাম্প্রতিক রূপটিকে নির্বাচন করতে হয়। 

উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে গত দুই দশক ধরে সবগুলো জাতীয় দৈনিক চলিত বাংলাতেই সংবাদ প্রকাশ করে। তবে দুই দশক আগে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিক ইত্তেফাক সাধু রীতিকে অবলম্বন করলেও মানুষের আধুনিক রুচি এবং এর সহজ ভাবপ্রকাশ নিশ্চিত করা ও আধুনিকতার সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য সাধুরূপকে বাদ দিয়ে চলিত রূপে ফিরে এসেছে।


একটি দেশে জাতীয় ভাষা বা প্রধান ভাষার দুটি রূপ থাকে, যথা- প্রমিত রূপ বা মান রূপ এবং এর আঞ্চলিক রূপ বা উপভাষা। সংবাদপত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর ভাষারূপকে অবশ্যই প্রমিত রূপ বা মান রূপ হতে হয়। কারণ সংবাদপত্রের উদ্দিষ্ট পাঠক হচ্ছে দেশের সর্ব অঞ্চলের শিক্ষিত পাঠক শ্রেণি। 

এ ক্ষেত্রে একটি সংবাদপত্র যদি কোনো অঞ্চলের মানুষের আবেগ বা সংবেদনকে গুরুত্ব দিয়ে সে অঞ্চলের আঞ্চলিক রূপকে গ্রহণ করে, তাহলে দেশের অন্য অঞ্চলের মানুষেরা এ থেকে কোনো অর্থ উদ্ধার করতে পারবে না, বা সংবাদপত্রটির কোনো মাহাত্ম্য বা আভিজাত্যও থাকে না। সে কারণে বাংলা ভাষার প্রমিত রূপেই বাংলাদেশের সকল জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকাগুলো প্রকাশিত হয়ে থাকে। একই কারণে পৃথিবীর কোনো দেশেই ভাষার মান রূপকে বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট আঞ্চলিক রূপ বা উপভাষায় কোনো সংবাদপত্র প্রকাশের নজির নেই।


এবারে আশা যাক বাংলা সংবাদপত্রের ভাষার বানানরীতির প্রসঙ্গে। আগেই বলা হয়েছে, সংবাদপত্রের ভাষা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ভাষাটির সবচেয়ে বৃহৎ আকৃতির লিখিত রূপ যেটি প্রতিদিন দেশের সর্বাধিক পাঠককে আকৃষ্ট করে থাকে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, সংবাদপত্রের ভাষায় ব্যবহৃত বানানরীতিটি হতে হবে সহজবোধ্য, সাম্প্রতিক রূপের এবং সর্বজনীনও বটে। প্রথমত, এর বানানরূপ হবে সহজবোধ্য এবং সাম্প্রতিক রূপের যাতে সবশ্রেণির পাঠক তাদের নিয়মিত ও সহজ বানানরূপটি দেখে তা থেকে অনায়াসে অর্থ উদ্ধার করতে পারেন। এছাড়া এর বানানরীতি হবে সর্বজনীন। অর্থাৎ দেশের প্রধান ভাষা সংস্থা দ্বারা স্থিরকৃত রূপকেই অবলম্বন করে থাকে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, এদেশের সব জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকেই বাংলা একাডেমি প্রণীত বানাননীতি অনুসরণ করা উচিত। এতে বাংলা বানানের ঐক্য যেমন থাকে, তেমনি এই রূপটিই একসময় স্থিরকৃত হয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে কোন কোন জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা বাংলা একাডেমি প্রণীত বানাননীতি বাদ দিয়ে নিজস্ব প্রণীত বানাননীতি অনুসরণ করে। আপাতদৃষ্টে এতে কোনো দোষের নয়। কিন্তু গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যায়, এর ফলে বেশ কিছু বাংলা বানানের বিকল্পরূপ দাঁড়িয়ে যায়। এর ফলে পাঠকের দৃষ্টিতে তা যেমন অর্থ উদ্ধারে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তেমনি ঠিক কোন রূপটি প্রকৃত মান বানান হিসেবে স্বীকৃতি পাবে তা নিয়ে পাঠকের এক ধরনের ঝামেলা তৈরি হয়। এই বিষয়টিকে বলা হয়, পাঠকের বোধগত ঝামেলা। এই ধরনের বানানঘটিত বোধগত ঝামেলা যত বেশি ঘটতে থাকবে, ততই বাংলা ভাষার বানানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে থাকবে। সেই বিষয়টি বিবেচনা করে বাংলাদেশের সকল জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকেরই বাংলা একাডেমি প্রণীত সর্বজনীন রূপটি অনুসরণ করা উচিত।


সংবাদপত্র প্রকৃত অর্থেই তথ্যের আধার। কারণ সংবাদপত্র দেশ-জাতি-রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজ-সংস্কৃতি ইত্যাদি সম্পর্কে এত তথ্যে ভরপুর থাকে যে, পাঠককে একটি সংবাদপত্র পড়ে সেসব তথ্য বিষয়ে অবহিত হয়ে সহজেই এর অর্থ উদ্ধার করতে চায়। সেইসঙ্গে পাঠক একটি বিষয়ে নিশ্চিত হতে চায় যে, যেন সংশ্লিষ্ট সংবাদটিতে প্রকৃত তথ্যই খুঁজে পাওয়া যায়। অর্থাৎ কোনো ধরনের অতিরঞ্জিত বা মনোকল্পিত বিষয় নয়, বরং একটি বিষয়ে প্রকৃত অর্থেই যা ঘটেছে, পাঠক ঠিক সেই তথ্যটিই পেতে চায়। সে কারণে সংবাদপত্রের ভাষা ও বয়ানকে হতে হয় যথাসম্ভব বস্তুনিষ্ঠ। 

মূলত ভাষারূপের মধ্যেই একটি সংবাদপত্রের বস্তুনিষ্ঠতার প্রাণভোমরা লুকায়িত থাকে। কিন্তু এর বিপরীতে কিছু সংবাদপত্র দেখা যায়, মূলত মালিকের অশুভ উদ্দেশ্য বা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ভাবাদর্শ প্রচার করতে গিয়ে সংবাদপত্রের ঘটনাপ্রবাহকে তুলে ধরতে গিয়ে প্রায়শই উদ্দেশ্যমূলক শব্দ, পরিভাষা বা বাক্য সংযুক্ত করা হয়। এটিকে আমরা ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রকাশরূপ বলতে পারি। এ ধরনের ব্যক্তিনিষ্ঠ ভাষাসমৃদ্ধ সংবাদটি পড়ে মনে হয়, যেন পত্রিকাটি কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলের ডিকোর্সকে প্রচার করছে। এভাবে ব্যক্তিনিষ্ঠ ভাষাযুক্ত সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে বর্তমানে বাংলাদেশের কিছু জাতীয় দৈনিক এবং ইউটিউব চ্যানেল মানুষকে বিভিন্ন অপতথ্য প্রদানের মাধ্যমে হলুদ সাংবাদিকতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। 

সম্প্রতি আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের ফলে অতথ্য ও অপতথ্যযুক্ত শিরোনামযুক্ত সংবাদ এতই বেড়ে গিয়েছে যে, মানুষ এতে রীতিমত আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।


সংবাদপত্রে সাংবাদিক বা রিপোর্টার যখন কোন বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন করেন বা প্রতিবেদন তুলে ধরেন, তখন এতে দুটি অংশ পরিলক্ষিত হয়। একটি হচ্ছে সংবাদটির শিরোনাম, এবং অন্যটি এর বর্ণনাংশ। এই পর্যায়ে প্রথমেই সংবাদের শিরোনামের দিকে আলোকপাত করা যেতে পারে। একটি সংবাদের শিরোনাম কি রকম হওয়া উচিত? এ বিষয়ে সবাই অনায়াসে বলেন যে, সংবাদের শিরোনামটি হওয়া উচিত যথাসম্ভব সহজ, স্পষ্ট এবং আকর্ষণীয়। ‘সহজ ও স্পষ্ট’ বলতে শিরোনামটি এমন শব্দ বা পরিভাষা ব্যবহার করতে হবে, যাতে পাঠক সহজেই অর্থ উদ্ধার করতে পারে। সহজ ও স্পষ্ট করার জন্য যথাসম্ভব ক্রিয়াপদ বর্জন করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ২৫শে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে প্রকাশিত দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতার মূল শিরোনামটি উল্লেখ করা যেতে পারে- ‘অপরাধীরা বেপরোয়া, আতঙ্কে মানুষ’। এই শিরোনামটি পড়ে বাঙালি পাঠকমাত্রই বুঝতে পারবেন যে, দেশে বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং মানুষ আতঙ্কে আছে। এই সংবাদের প্রতিবেদক শিরোনামটি লিখতে গিয়ে যৌক্তিকভাবেই দুটি ক্রিয়াপদ, যথা- ‘হয়ে উঠেছে’ এবং ‘আছে’ বাদ দিয়েছেন। এর ফলে নিশ্চয়ই বাংলাভাষী কোন পাঠকেরই এর অর্থ উদ্ধারে অসুবিধায় পড়তে হয় না। 


এবারে আসা যাক, একটি শিরোনাম কীভাবে পাঠকের কাছে ‘আকর্ষণীয়’ হয়ে ওঠে। এই শর্ত পূরণ করতে গিয়ে প্রতিবেদক সংশ্লিষ্ট শিরোনামটি কি সরল বাক্যে লিখবেন, নাকি তাকে একটি রূপক বাক্যে পরিণত করবেন? এর উত্তরে বলা যায়, সংবাদপত্রের শিরোনামকে পাঠকের কাছে অধিকতর আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য একে সরলভাবে না লিখে বরং রূপকে পরিণত করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১২ সালের ২৪শে এপ্রিল দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদেও শিরোনাম ছিল, ‘অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে সিলেট’। এটি নিঃসন্দেহে একটি রূপক বাক্য, অতি সরল শিরোনাম নয়। যদি প্রতিবেদক এর শিরোনাম হিসেবে ‘সিলেটে আগুন জ্বলছে’ জাতীয় সরল বাক্য দিয়ে শিরোনামটি লিখতেন, তাহলে নিশ্চয়ই তা পাঠকের কাছে খুব আকর্ষণীয় মনে হতো না। 


অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, সংবাদের শিরোনাম হিসেবে রূপক বাক্য লেখার জন্য সংবাদকর্মীকে কি ভাষা প্রশিক্ষণ নিতে হবে। অবশ্যই না। কারণ আধুনিককালের ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন যে, ভাষা মাত্রই রূপকের সমষ্টি। শুধু কবি-সাহিত্যিকেরাই নয়, বরং সাধারণ মানুষও তাদের দৈনন্দিন ভাষিক প্রকাশে অসংখ্য রূপক বাক্য তৈরি করে থাকেন। এর সাথে সুর মিলিয়ে আমি বলতে পারি যে, দৈনিক আমার দেশের সংশ্লিষ্ট সংবাদকর্মী নিশ্চয়ই ওপরের শিরোনামটি লিখতে গিয়ে বিশেষ কোন ভাষা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেননি। বরং তিনি তার সহজাত ভাষিক প্রকাশের অংশ হিসেবেই এই ধরনের একটি আকর্ষণীয় রূপকধর্মী বাক্য তৈরি করেছেন।


শিরোনামের পর সংবাদের পরবর্তী অংশ হচ্ছে বর্ণনাংশটি। এই অংশেই মূলত পাঠক সংবাদের প্রকৃত তথ্যটি পেয়ে থাকেন। সে বিবেচনায় বর্ণনাংশের ভাষাও অবধারিতভাবে হতে হবে সরল, স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ। ভাষার প্রগলভতা প্রকাশের চেয়ে সংবাদকর্মী সত্যিকার উদ্দেশ্য হচ্ছে, পাঠককে সংবাদের ভেতরগত মেসেজটি পৌঁছে দেওয়া। এ ছাড়া কখনও কখনও সংবাদকর্মী বা প্রতিবেদক কোনো বড় প্রতিবেদনের বর্ণনাংশে, সংবাদপত্রের ভাষায় যাকে ‘ভিউজ’ বলা হয়, উদ্দেশ্যমূলকভাবে নিজস্ব ভাবাদর্শ প্রচারে মেতে ওঠেন। ফলে পাঠক সংবাদটির বস্তুনিষ্ঠ অর্থ উদ্ধারের পরিবর্তে সংবাদপত্রের মালিকের রাজনৈতিক আদর্শের বয়ান পাঠ করেন। এ কারণে সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং পাঠক সহজেই সংবাদপত্র সংশ্লিষ্ট সকলের রাজনৈতিক আদর্শ বা ভাবাদর্শ সম্পর্কে জেনে যায়। পরিণতিতে অচিরেই পত্রিকাটি পাঠকের কাছে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মুখপত্র রূপে পরিচিত হয় এবং জনপ্রিয়তায় ধ্বস নামে।
    
           
 

ঢাকা/ফারুক/টিপু 

.

উৎস: Risingbd

কীওয়ার্ড: চ কর চ কর

এছাড়াও পড়ুন:

শত কোটি ভারতীয়ের পছন্দসই পণ্য কেনার অর্থের অভাব: প্রতিবেদন

১৪০ কোটি জনসংখ্যার ভারত বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশের তকমা পেলেও তাদের প্রায় ১০০ কোটি মানুষেরই পছন্দসই পণ্য কেনা বা সেবা গ্রহণের মতো পর্যাপ্ত অর্থের অভাব রয়েছে, যা বৈশ্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

উদ্যোগ মূলধন নিয়ে কাজ করা ‘ব্লুম ভেঞ্চার’ ভারতে সমীক্ষার ভিত্তিতে ‘ইন্ডাস ভ্যালি অ্যানুয়াল রিপোর্ট ২০২৫’ নামে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে ২৩ ফেব্রুয়ারি। ২০১১ সালে মুম্বাইয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে।

বিবিসি লিখেছে, প্রতিবেদন অনুযায়ী ভারতের ভোক্তা শ্রেণির আকার কার্যকরভাবে বলতে গেলে স্টার্ট-আপ বা ব্যবসার মালিকদের জন্য মেক্সিকোর মতো অর্থাৎ মাত্র ১৩ থেকে ১৪ কোটি মানুষের বাজার। যেখানে ৩০ কোটি মানুষ ‘উদীয়মান’ বা ‘আকাঙ্ক্ষী’ ভোক্তা। তবে তারা ইচ্ছা অনুযায়ী খরচ করতে পারেন না; তারা কেবল তাদের মানি ব্যাগ থেকে টাকা বের করা শুরু করেছেন; তা ছাড়া ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম লেনদেন সহজ করায় তারা কিছু খরচে ঝুঁকেছেন।

ইন্ডাস ভ্যালি অ্যানুয়াল প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ভারতে ভোক্তা শ্রেণি যতটা ‘গভীর হচ্ছে’ ততটা ‘প্রসারিত’ হচ্ছে না। এর অর্থ হলো ভারতের ধনী জনসংখ্যা সত্যিই সংখ্যায় বাড়ছে না; যদিও যারা ইতোমধ্যে ধনী, তারা আরো ধনী হচ্ছে।

এসব বিষয় ভারতের ভোক্তা বাজারকে একটি স্বতন্ত্র রূপ দিচ্ছে, বিশেষ করে ‘উচ্চস্তরের ভোক্তাদের জন্য পণ্য’ ধারণাকে ত্বরান্বিত করছে; যেখানে ব্র্যান্ডগুলো সর্বজনীন বাজারের বদলে ধনীদের জন্য ব্যয়বহুল, আরো উন্নত পণ্যের প্রবাহ দ্বিগুণ করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

ভারতে এই প্রবণতা স্পষ্ট বোঝা যায় সর্বাধুনিক সুবিধার প্রাসাদোপম বাড়ি ও প্রিমিয়াম কোয়ালিটির মোবাইল ফোন বিক্রির পরিসংখ্যান থেকে। এমন কী উচ্চমানের মধ্যে সর্বনিম্ন দরের পণ্য ও সেবা বিক্রির প্রতিযোগিতাতেও এই লড়াই দেখা যায়। সাশ্রয়ী মূল্যের মাঝারি মানের বাড়িগুলোর বাজার এখন এই খাতে ভারতের সামগ্রিক বাজারের মাত্র ১৮ শতাংশ, মাত্র পাঁচ বছর আগেও যা ছিল ৪০ শতাংশ।

ব্র্যান্ডেড পণ্যও ভারতের বাজারের একটি বড় অংশ দখল করছে। চলমান অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা বলছে, কোল্ডপ্লে এবং এড শিরানের মতো আন্তর্জাতিক শিল্পীদের কনসার্টের উচ্চমূল্যের টিকিটও মুড়িমুড়কির মতো বিক্রি হচ্ছে সেদেশে।

প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক সজিথ পাই বিবিসিকে বলেছেন, “যেসব কোম্পানি পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে, তারা উন্নতি করেছে। যারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বাজারের দিকে খুব বেশি মনোযোগী অথবা তাদের এমন একটি মিশ্র পণ্য রয়েছে, যা উচ্চস্তরের শেষ ধাপের জনগণের দিকে মনোযোগী নয়; তারা মার্কেট শেয়ার হারিয়েছে।”

প্রতিবেদনে উঠে আসা ফলাফলে দীর্ঘদিনের একটি দৃষ্টিভঙ্গি আরো শক্তিশালী হয়েছে যে, ভারতের কোভিড-১৯ মহামারি-পরবর্তী পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টা ইংরেজি অক্ষর ‘কে’ আকৃতি ধারণ করেছে; যেখানে ধনী আরো ধনী হয়েছে এবং দরিদ্রদের ক্রয় ক্ষমতা কমে গেছে।

বিবিসি লিখেছে, আসলে ভারতে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত প্রবণতা, যা মহামারির আগেই বোঝা গিয়েছিল। ভারত ক্রমেই অসম আয়ের দেশ হয়ে উঠছে।  শীর্ষ ১০ শতাংশ ভারতীয়ের আয় এখন দেশটির মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশের সমান; যা ১৯৯০ সালে ছিল ৩৪ শতাংশ। প্রান্তি জনগোষ্ঠীর আয় মোট জনসংখ্যার আয়ের ২২ দশমিক ২ থেকে নেমে ১৫ শতাংশে ঠেকেছে।

ভোক্তার ক্রম ক্ষমতার এই মন্দাভাব শুধু ক্রয়ক্ষমতা ধ্বংসেরই চিত্র নয়; আর্থিক সঞ্চয় এবং ক্রমবর্ধমান ঋণ নিয়ে দুশ্চিন্তার গভীরতাও বৃদ্ধি করেছে।

সজিথ পাই বলেন, ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সহজে অনিরাপদ ঋণের ওপর কড়াকাড়ি আরোপ করেছে এবং কোভিড মহামারির পরে বাজারে অর্থের চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে। এ ধরনের ঋণ বা ধার বন্ধ করায় ভারতের উদীয়মান ও আকাঙ্ক্ষী ভোক্তারার ক্রম ক্ষমতা কমিয়েছে বা তাতে প্রভাব ফেলেছে।

“স্বল্পসময়ের মধ্যে দুটি জিনিস ব্যয়ের সামর্থ বাড়াতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে। রেকর্ড ফসল উৎপাদনের সঙ্গে গ্রামীণ চাহিদা বাড়ানো এবং সম্প্রতি ঘোষিত নতুন বাজেটে ১২ বিলিয়ন কর রেয়াত দেওয়া। এর ফল ‘নাটকীয়’ না হলেও ভারতের জিডিপি বাড়াতে পারে, যা হবে মূলত খরচ করার মাধ্যমে; অন্তত অর্ধেক নাগরিকের ক্ষেত্রে তা অর্জন করা যেতে পারে।

নাগরিকের জীবনমান উন্নয়ন নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান মার্সেলাস ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজার্স জানুয়ারি মাসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে বলা হয়, ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যাদের ভোক্তা চাহিদার প্রধান ইঞ্জিন বলা হয়, দীর্ঘদিন তাদের মজুরি প্রায় একই থেকে গেছে।

"ভারতের কর-প্রদানকারী জনসংখ্যার মধ্যে ৫০ শতাংশ মধ্যবিত্ত, আদতে যাদের আয় গত এক দশকে স্থবির হয়ে রয়েছে। থমকে থাকা এমন আয়কে প্রকৃত অর্থে অর্ধেক আয় বোঝায়। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির  সঙ্গে সামঞ্জস্য করলে প্রকৃত আয় বাড়ে না।”

মার্সেলাস ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, "আয় নিয়ে এমন নাজুক অবস্থা মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ের ঘটি ধ্বংস করে ফেলেছে। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক বারবার বলেছে যে, ভারতীয় পরিবারগুলোর নিরেট সঞ্চয় ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। এসব তথ্য-উপাত্ত থেকে বোঝা যায়, ভারতের মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত পণ্য ও সেবা সামনের বছরগুলোতে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে পারে।”

“মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের শহরের চাকরিতে আসা কঠিন হয়ে উঠছে। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন দাপ্তরিক, সাচিবিক ও অন্যান্য রুটিন কাজকর্ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্রুত করে ফেলতে সক্ষম,” বলা হয়েছে মার্সেলাসের প্রতিবেদনে।

"ভারতে উৎপাদন কারখানায় কাজ করা সুপারভাইজারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।”

ভারত সরকারের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সমীক্ষাও এসব উদ্বেগকে চিহ্নিত করেছে। তাতে বলা হয়েছে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে শ্রম বাস্তুচ্যুতি ভারতের মতো প্রধানত পরিষেবা-ভিত্তিক অর্থনীতির জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয়, যেখানে আইটি কর্মীবাহিনীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অপেক্ষাকৃত কম সেবা ও মূল্য উৎপাদনে যুক্ত। এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা।

সমীক্ষায় আরো বলা হয়েছে, "ভারত একটি ভোগ-ভিত্তিক অর্থনীতির দেশ। এইভাবে তার কর্মশক্তির বিচ্যুতি ঘটলে তা ভোক্তার ক্রম-ক্ষমতার পতন ঘটাবে। ফলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে বাধ্য। যদি সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি আবির্ভূত হয় এবং অনুমানগুলো বাস্তব হতে থাকে; তাহলে তাতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিপথ স্লথ করে দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।”

অন্যান্য ব্যবসায়ীসহ বিশেষ করে উদ্যোক্তাদের ভারতে ব্যবসার পরিবেশ, চলতি ধরন ও প্রবণতা, ব্যবসার ভবিষ্যৎ গতিপথ সম্পর্কে গবেষণাবিভিত্তিক দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকে ব্লুম ভেঞ্চার।  

 

 

 

 

ঢাকা/রাসেল 

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • শত কোটি ভারতীয়ের পছন্দসই পণ্য কেনার অর্থের অভাব: প্রতিবেদন