এটিএম আজহারুলের মামলায় তাজুল ইসলামের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন
Published: 27th, February 2025 GMT
বাংলাদেশের আইন অঙ্গনে একটি ‘অভূতপূর্ব’ ঘটনা ঘটছে। ঘটনাটি ঘটছে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া জামায়াতে ইসলামীর নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামের করা রিভিউ আবেদনের শুনানিকে কেন্দ্র করে। জামায়াতের পক্ষ থেকে আজহারুলের মুক্তির দাবির মধ্যে এ ঘটনা নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি করেছে।
২৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো.
মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আজহারুলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা চলাকালে তাঁর পক্ষের আইনজীবী ছিলেন তাজুল ইসলাম। গত ৫ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার তাজুল ইসলামকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয়। এর ফলে আজহারুলের বিরুদ্ধে মামলায় তাজুল ইসলামের সংশ্লিষ্টতা ‘স্বার্থের সংঘাত’ (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) তৈরি করেছে কি না এবং তিনি পেশাগত আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন কি না—এমন প্রশ্ন তুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের একাধিক আইনজীবী।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি মামলায় একজন আইনজীবী কখনো পক্ষ পরিবর্তন করতে পারেন না। অর্থাৎ কখনো বিবাদীর পক্ষে থাকলে আবার পরে বিবাদীর বিপক্ষে যেতে পারেন না। রাষ্ট্রপক্ষ বা কোনো ট্রাইব্যুনালের আইনজীবীর ক্ষেত্রেও এটা একইভাবে প্রযোজ্য।’
শাহদীন মালিক আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলো খুবই স্পর্শকাতর। তাই এ মামলায় আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন ছিল। আজহারুলের মামলার ক্ষেত্রে কোনো আইনজীবী পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচারবিধি লঙ্ঘন করেছেন কি না, তা বার কাউন্সিলের যাচাই-বাছাই করে দেখা উচিত।’
‘অভিভাবক সংস্থা’ হিসেবে আইনজীবীদের পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচারের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচার বিধিমালার দ্বিতীয় অধ্যায়ের (মক্কেলের প্রতি আচরণ) ২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বর্তমান মক্কেল কিংবা পুরাতন মক্কেলের মামলা পরিচালনাকালে একজন আইনজীবী যদি মামলা-সংক্রান্ত কোনো গোপনীয় তথ্যাদি সম্বন্ধে অবগত হইয়া থাকেন, তবে উক্ত আইনজীবী উক্ত তথ্য নির্ভর কোনো মামলায় উক্ত মক্কেলের বিপক্ষে আইনজীবী হিসেবে নিয়োজিত হইতে পারিবেন না।...’
একই অধ্যায়ের ৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘একজন আইনজীবী পরস্পরবিরোধী কোনো ব্যাপারে কোনো মক্কেলের প্রতিনিধিত্ব করিতে পারিবেন না।’
মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আজহারুলকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি আপিল করেন আজহারুল। এই আপিলের ওপর শুনানি শেষে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আজহারুলের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর আপিল বিভাগ রায় দেন।লক্ষণীয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলোর বাদী হিসেবে থাকেন চিফ প্রসিকিউটর। এ কারণে আজহারুলের রিভিউ শুনানিতে তাজুল ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণ না করলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে তিনি এখন এই মামলার বাদী। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের যে মামলাগুলোতে তিনি বিবাদীপক্ষের আইনজীবী ছিলেন, চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি হয়ে গেছেন বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী।
আজহারুলের মামলায় তাজুল ইসলামের সংশ্লিষ্টতা একটি ‘অভূতপূর্ব’ পরিস্থিতি তৈরি করেছে এবং তা বার কাউন্সিলের পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচারবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি প্রথম আলোকে
বলেন, যে বা যাঁরা আগে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের পক্ষের আইনজীবী ছিলেন, তাঁদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় বিষয়টি নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাঁদের এই নিয়োগ নৈতিকভাবে সঠিক হবে কি না কিংবা ‘স্বার্থের সংঘাত’ তৈরি করবে কি না, অন্তর্বর্তী সরকারের আগেই তা বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর এ টি এম আজহারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এ রায় নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করায় তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আদালত অবমাননার অভিযোগ করা হয়েছিল। তবে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে তিনি সেই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন। (প্রথম আলো, ৫ মে ২০১৫)
তাজুল ইসলাম জামায়াতঘনিষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ট্রাইব্যুনালে যেসব জামায়াত নেতার বিচার হয়েছিল, তাঁদের অনেকের আইনজীবী হিসেবে তিনি কাজ করেছেন। ২০১৯ সালে জামায়াতের ‘সংস্কারপন্থীরা’ জন-আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ নামে নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন। এক বছর পর ২০২০ সালে এবি (আমার বাংলাদেশ) পার্টি গঠনের ঘোষণা দেন তাঁরা। তাজুল ইসলাম ছিলেন এই দলের যুগ্ম আহ্বায়ক। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেন।
আজহারুলের মামলার ঘটনাক্রমমুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আজহারুলকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি আপিল করেন আজহারুল। এই আপিলের ওপর শুনানি শেষে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আজহারুলের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর আপিল বিভাগ রায় দেন।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর তা পুনর্বিবেচনা চেয়ে ২০২০ সালের ১৯ জুলাই আপিল বিভাগে আবেদন করেন তিনি। ২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারি আপিল বিভাগ রিভিউ শুনানির জন্য ২০ ফেব্রুয়ারি দিন রাখেন। তবে তাঁর রিভিউ আবেদনের শুনানি শুরু হয় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি। আজহারুল বর্তমানে কারাগারে আছেন।
আজহারুলের মুক্তির দাবি ও ‘আদালত অবমাননা’আজহারুলের মুক্তির দাবিতে ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে তাঁর দল জামায়াত। একই দাবিতে ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সামনে ‘গণ-অবস্থান’ কর্মসূচি দেয় জামায়াত। এদিকে আজহারুলের মুক্তির দাবিতে সেদিন স্বেচ্ছায় গ্রেপ্তার হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন দলটির আমির শফিকুর রহমান। তবে ২৪ ফেব্রুয়ারি দুটি কর্মসূচিই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন একটি বিষয়ে এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মো. আবদুল মতিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আদালতের রায় নিয়ে কারও অসন্তোষ থাকলে সেটারও আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। রিভিউ খারিজ হলে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চেয়ে আবেদন করা যায়। কিন্তু সে পথে না গিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া আদালতের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যা আদালত অবমাননার শামিল।’
● মনজুরুল ইসলামপ্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: আজহ র ল র ম ক ত র দ ব ত জ ল ইসল ম র ম নবত ব র ধ ন আজহ র ল প রথম আল ন আইনজ ব র আইনজ ব
এছাড়াও পড়ুন:
আওয়ামী লীগ-সমর্থিত হারুনুর রশিদ আবার সভাপতি, সম্পাদক বিএনপির শাতিল মাহমুদ
কুষ্টিয়া জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে (২০২৫-২০২৬) আওয়ামী লীগ–সমর্থিত প্রার্থী হারুনুর রশিদ আবার সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক।
এ ছাড়া সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন বিএনপি–সমর্থিত প্রার্থী এস এম শাতিল মাহমুদ। তিনি কুমারখালী উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক।
গতকাল বুধবার রাতে ভোট গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান কে এম আবদুর রউফ। কমিশনের সদস্য ছিলেন মোস্তফা সামসুজ্জামান ও আল মুজাহিদ হোসেন।
আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৭টি পদের মধ্যে আওয়ামী লীগ–সমর্থিত ৯ জন, বিএনপি–সমর্থিত ৩ জন, বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ দুজন, জামায়াত–সমর্থিত দুজন, জাতীয় পার্টি–সমর্থিত একজন নির্বাচিত হয়েছেন।
আইনজীবী সমিতির নির্বাচন ঘিরে গত সোমবার আদালত চত্বরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ওই দিন দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ৪০–৫০ জন আদালত চত্বরে নির্বাচনী পাঁচটি ক্যাম্পে হামলা ও ভাঙচুর করেন। তখন এক শিক্ষানবিশ আইনজীবী মুঠোফোন দিয়ে ওই দৃশ্য ধারণ করছিলেন। তখন তাঁর মাথায় আঘাত করা হয়। এ নিয়ে আদালতপাড়ায় আলোচনা–সমালোচনা হয়।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, গতকাল বুধবার সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে বিরতিহীনভাবে ভোট গ্রহণ চলে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত। এবারের নির্বাচনে ১৭টি পদের জন্য ৪৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এ নির্বাচনে কুষ্টিয়া জেলা আইনজীবী সমিতির ৪৬০ জন ভোটারের মধ্যে ৪৩০ জন ভোটার তাঁদের ভোট দেন।
সভাপতি পদে হারুনুর রশিদ ১৪৭ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সোহেল খালিদ মো. সাঈদ ১০৮ ভোট পেয়েছেন। বিএনপির একাংশের সমর্থিত প্রার্থী মাহাতাব উদ্দিন পেয়েছেন ৭৭ ভোট। জামায়াতপন্থী আইনজীবী আজিজুর রহমান পেয়েছেন ৩৯ ভোট। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মনোনীত প্রার্থী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য গোলাম মোহাম্মদ পেয়েছেন ৩৬ ভোট। আরেক সভাপতি প্রার্থী জাসদ–সমর্থিত তানজিলুর রহমান পেয়েছেন ১৬ ভোট।
সাধারণ সম্পাদক পদে আইনজীবী এস এম শাতিল মাহমুদ ১৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ–সমর্থিত খ ম আরিফুল ইসলাম ১৬৭ ভোট পেয়েছেন।
এ ছাড়া সিনিয়র সহসভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন ফারুক আজম মৃধা, সহসভাপতি পদে মাহমুদুল হক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে নাজমুন নাহার, কোষাধ্যক্ষ পদে আবুল হাশিম, গ্রন্থাগার সম্পাদক পদে সুলতানা বেগম, সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে মকলেচুর রহমান ও দপ্তর সম্পাদক পদে ওয়ালীউল বারী।
এ ছাড়া সিনিয়র সদস্য পদে মারুফ বিল্লাহ, আশুতোষ কুমার পাল, আয়েশা সিদ্দিকা, হাফিজুর রহমান এবং জুনিয়র সদস্য পদে মুহাইমিনুর রহমান, সাইফুর রহমান, সাইফুল ইসলাম ও রবিউল ইসলাম নির্বাচিত হয়েছেন।