ক্ষমতা গ্রহণের আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, এক দিনের জন্য হলেও তিনি ‘ডিক্টেটর’ হতে চান। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি ইতিমধ্যে এক মাস কাটিয়েছেন। এক দিন নয়, এই এক মাসের প্রতিটি দিন তিনি যে ব্যবহার করেছেন, তাকে ‘একনায়কীয়’ না বলে উপায় নেই।

‘মার্কিন সরকারের সব প্রতিষ্ঠান এখন ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার মানুষ কোনো কারণ ছাড়াই চাকরি হারাচ্ছেন। আমলাতন্ত্র হ্রাস ও অপচয় বন্ধের কথা বলা হলেও বাস্তবে তিনি নিরঙ্কুশ ক্ষমতা হাতের মুঠোয় এনে ফেডারেল গণপ্রশাসনকে যথাসম্ভব দুর্বল করে ফেলছেন।’

দ্য আটলান্টিক পত্রিকার নিয়মিত লেখক টম নিকলস ট্রাম্পের প্রথম মাসের কর্মকাণ্ডের সারসংক্ষেপ এভাবে করেছেন। অন্য অনেকের মূল্যায়ন আরও কঠোর। যেমন অ্যারিজোনার অ্যাটর্নি জেনারেল ক্রিস মেইস বলেছেন, ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগী ইলন মাস্ক যা করছেন তা এককথায় ‘ক্যু’।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের প্রথম কাজ ছিল গত চার বছর নানা অপরাধের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে যাঁরা তদন্ত করেছেন, এমন ফেডারেল তদন্তকারী ও আইনজীবীদের পদচ্যুত করা। তাঁর চোখে অনুগত নন, সেনাবাহিনীর এমন একাধিক কমান্ডারকেও তিনি সরিয়ে দিয়েছেন। এ ছাড়া ছাঁটাই তালিকায় রয়েছেন ফেডারেল সরকারের হাজার হাজার কর্মচারী।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় গত বছরের ৫ নভেম্বর। গত ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ট্রাম্প।

ক্ষমতা লাভের পর ট্রাম্প কী করবেন, তার নীলনকশা নির্বাচনের আগেই আঁকা ছিল। এখন কেবল ধাপে ধাপে তার বাস্তবায়ন চলছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের প্রথম কাজ ছিল গত চার বছর নানা অপরাধের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে যাঁরা তদন্ত করেছেন, এমন ফেডারেল তদন্তকারী ও আইনজীবীদের পদচ্যুত করা। তাঁর চোখে অনুগত নন, সেনাবাহিনীর এমন একাধিক কমান্ডারকেও তিনি সরিয়ে দিয়েছেন। এ ছাড়া ছাঁটাই তালিকায় রয়েছেন ফেডারেল সরকারের হাজার হাজার কর্মচারী।

নির্বাচনের আগে ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই অভিযোগ করেছিলেন, বাইডেন প্রশাসন বিচার বিভাগ (ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস) ও কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাকে (এফবিআই) নিজের প্রয়োজনে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করেছে। ট্রাম্পের ভাষায়, এটি ছিল প্রশাসনের ‘উইপনাইজেশন’ বা অস্ত্রায়ন। ক্ষমতায় বসে ট্রাম্প এখন ঠিক সে কাজটিই করছেন। এই দুই বিভাগের প্রধান হিসেবে এমন দুজনকে তিনি নিয়োগ দিয়েছেন, যাঁদের একমাত্র যোগ্যতা ট্রাম্পের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য, আইনের প্রতি নয়।

‘সীমাহীন নির্বাহী ক্ষমতা’

যুক্তরাষ্ট্রের সরকার নির্বাহী, সংসদ ও বিচার বিভাগ—এ তিনটি অংশের ভেতর সম-অধিকারের ভিত্তিতে গঠিত। ট্রাম্প এই বিভক্তি মানতে চাইছেন না। তাঁর বক্তব্য, বাকি দুই বিভাগের তুলনায় নির্বাহী বিভাগ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দাবি, মার্কিন শাসনতন্ত্রের ২ নম্বর ধারায় নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে তাঁকে ‘যা খুশি করার’ অধিকার দিয়েছে। ‘সীমাহীন নির্বাহী ক্ষমতার’ এ ধারণাটি ট্রাম্প পেয়েছেন তথাকথিত ‘ইউনিটারি এক্সিকিউটিভ থিওরি’ থেকে, যার পক্ষে রক্ষণশীল পণ্ডিতরা অনেক আগে থেকে ওকালতি করে আসছেন। এসব পণ্ডিতের দাবি, প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়, এমন কোনো হস্তক্ষেপের অধিকার কংগ্রেস বা বিচার বিভাগের নেই।

দুই সপ্তাহ আগে কোনো কারণ ছাড়াই দেড় ডজন বিভাগীয় নিরীক্ষকের নিয়োগ বাতিল ছিল সেই রকম একটি সিদ্ধান্ত। সরকারের বিভিন্ন বিভাগের কার্যাবলি পর্যালোচনার জন্য সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এসব ইন্সপেক্টর জেনারেল মার্কিন শাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। একইভাবে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই ট্রাম্প তাঁর সদ্য প্রতিষ্ঠিত সরকারি দক্ষতা বৃদ্ধি বিভাগের মাধ্যমে ফেডারেল সরকারের হাজার হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করেছেন। জরুরি পরিষেবা প্রদানকারী যেসব সংস্থা ট্রাম্প ও ইলন মাস্কের কোপানলে পড়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে বিমান উড্ডয়ন নিয়ন্ত্রক, রাজস্ব বিভাগ, জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, মেডিকেয়ার ও মেডিকেইড প্রশাসন এবং শিক্ষা দপ্তর। এমনকি সরকারি ডাক বিভাগ, পার্ক বিভাগ ও মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসাও এই তালিকার বাইরে নয়।

সুপ্রিম কোর্টও যদি আপত্তি করেন, তিনি ‘জাতীয় স্বার্থের’ যুক্তি দেখিয়ে সে সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করতে পারেন। নেপোলিয়নের যে উদ্ধৃতি ট্রাম্প ব্যবহার করেন, তার নিচে তিনি বড় অক্ষরে লিখেছিলেন, লং লিভ দ্য কিং। অনুমান করি, নেপোলিয়ন নন, ট্রাম্প নিজেকে ‘কিং’ ঘোষণা করে তাঁর দীর্ঘ জীবনের কথাই বলেছিলেন।

ট্রাম্পের আরেকটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ফেডারেল কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ অর্থ বাতিল করা হয়েছে। কংগ্রেস কর্তৃক বরাদ্দ করা এই অর্থ বাতিলের অধিকার ট্রাম্পের নেই। তাতে কী, তিনি বলছেন, ব্যয় সংকোচন ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য একদিকে কর্মী ছাঁটাই, অন্যদিকে অর্থ বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। সমালোচকেরা বলছেন, ট্রাম্পের এজেন্ডার বাইরের এমন কর্মসূচি ও তাঁর প্রতি যথেষ্ট অনুগত নন, এমন কর্মচারীদের ঝেটিয়ে বিদায় করাই তাঁর আসল লক্ষ্য। ইলন মাস্ক দাবি করেছিলেন, বিভিন্ন কর্মসূচি বাতিল ও কর্মী ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে তিনি কম করে হলেও ৫৫ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পেরেছেন। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা মাস্কের প্রতিটি দাবি পরখ করার পর জানিয়েছে, যে অর্থ সাশ্রয় হয়েছে তার পরিমাণ ৫৫ বিলিয়ন ডলার নয়, ‘শূন্য’ ডলার।

অনেকে বলছেন, আইনের শাসনের প্রতি ট্রাম্পের উপেক্ষা এতটাই স্পষ্ট যে তিনি হয়তো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশও অমান্য করবেন। টিকটক নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের একটি সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে তিনি সে প্রমাণ ইতিমধ্যে রেখেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প যদি খোলামেলাভাবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মানতে অস্বীকার করেন, তাহলে কী হবে? কয়েক দিন আগে তিনি সম্রাট নেপোলিয়নকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, দেশের স্বার্থে কোনো কাজই বেআইনি নয়। অন্য কথায়, তাঁর গৃহীত যেকোনো সিদ্ধান্তকেই ট্রাম্প ‘দেশের স্বার্থ’ বলে সাফাই গাইতে পারেন। সুপ্রিম কোর্টও যদি আপত্তি করেন, তিনি ‘জাতীয় স্বার্থের’ যুক্তি দেখিয়ে সে সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করতে পারেন। নেপোলিয়নের যে উদ্ধৃতি ট্রাম্প ব্যবহার করেন, তার নিচে তিনি বড় অক্ষরে লিখেছিলেন, লং লিভ দ্য কিং। অনুমান করি, নেপোলিয়ন নন, ট্রাম্প নিজেকে ‘কিং’ ঘোষণা করে তাঁর দীর্ঘ জীবনের কথাই বলেছিলেন।

সমর্থন কমছে

যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা উদ্বিগ্ন, তাদের জন্য একটি সুখবর রয়েছে। এই এক মাসেই ভোটারদের সঙ্গে ট্রাম্পের ‘মধুচন্দ্রিমা’ শেষ হওয়ার পথে। তিনি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বলেছিলেন রাতারাতি দ্রব্যমূল্য কমবে, গৃহায়ণ সমস্যার অবসান হবে। বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। নতুন আমদানি শুল্ক আরোপের পর দ্রব্যমূল্য আরও বাড়বে, তা প্রায় নিশ্চিত। এসব কারণে ট্রাম্পের অনুসৃত নীতিতে ভোক্তাদের মধ্যে আস্থা কমেছে। রয়টার্সের জরিপ অনুসারে, এই চার সপ্তাহেই তাঁর প্রতি মোটাদাগে সমর্থন ৫১ শতাংশ থেকে কমে ৪১ শতাংশে এসে ঠেকেছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তাঁর নেতৃত্বে সন্তুষ্ট মানুষের পরিমাণ আরও কম, মাত্র ৩৯ শতাংশ।

দুই বছর পরে মধ্যবর্তী নির্বাচন। তাতেই বোঝা যাবে এই ধস কতটা সত্য, কতটা ডেমোক্র্যাটদের কল্পনার ফানুস।

.

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: ট র ম প র প রথম ব যবহ র কর বল ছ ল ন সরক র র কর ছ ন র কর ম র জন য ক ষমত তদন ত

এছাড়াও পড়ুন:

সোসিয়েদাদ দর্শকদের ‘অসহিষ্ণুতার’ ম্যাচের পার্থক্য গড়লেন এনদ্রিক 

রিয়াল সোসিয়েদাদ দর্শকদের ‘অসহিষ্ণু আচরণ’ এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, রেফারি বাধ্য হলেন খেলা থামাতে। স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় ভেসে উঠল একটি বার্তা, “বর্ণবাদী, জাতিগত–বিদ্বেষী ও অসহিষ্ণু স্লোগান দেওয়া যাবে না। দলকে সমর্থন দিন, প্রতিপক্ষকে সম্মান করুন।” স্বাগতিক দর্শকরা মূলত প্রতিপক্ষ রিয়াল মাদ্রিদের তরুণ ডিফেন্ডার রাউল আসেনসিওকে উদ্দেশ্য করে স্লোগান তুলেছিল, “আসেনসিও মরো”। এই হট্টগোলের মাঝেই অবশ্য বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫) দিবাগত রাতে কোপা দেল রে’র সেমিফাইনালের প্রথম লেগে সোসিয়েদাদকে ১-০ ব্যবধানে পরাজিত করেছে রিয়াল।

রিয়ালের ২২ বছর বয়সী ডিফেন্ডার আসেনসিওর বিরুদ্ধে দর্শকদের ক্ষেপে উঠে মূলত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা ভিডিও শেয়ার দেওয়ায়। রিয়ালের বয়সভিত্তিক দলের দুজন খেলোয়াড় কিছুদিন আগে অপ্রাপ্তবয়স্ক এক মেয়ের আপত্তিকর ভিডিও করেছিলেন। সেটাই নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন আসেনসিও। সেই অভিযোগে আসেনসিওর বিরুদ্ধে মামলা এবং তদন্তও চলছে।

আরো পড়ুন:

দুই গোলে এগিয়ে থেকেও বার্সার ড্র

দিস ইজ নট ফুটবল, দিস ইজ লা লিগা! 

এদিকে সোসিয়েদাদের ঘরের মাঠ রিয়াল অ্যারেনায়, ম্যাচের ১৯ মিনিটে প্রতি–আক্রমণ থেকে মাদ্রিদের হয়ে গোল করেন ১৮ বছর বয়সী স্ট্রাইকার এনদ্রিক। জুড বেলিংহ্যামের দুর্দান্ত দূরপাল্লার পাস উরু দিয়ে থামিয়ে দার্শনীয় ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়ান রিয়ালের উঠতি তারকা। এই ব্রাজিলিয়ান তারকার একমাত্র গোলটাই প্রথম লেগের পার্থক্য গড়ে দেয় দুদলের মাঝে। এনদ্রিক এই নিয়ে কোপা দেল রে’তে টানা তৃতীয় ম্যাচে গোল করলেন। ম্যাচ শেষে তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন রিয়াল বস কার্লো আনচেলত্তি।

তারকায় ঠাসা রিয়ালের আক্রমণভাগের কারণে লা লিগায় ও চ্যাম্পিয়নস লিগে খুব একটা সুযোগ হয় না এনদ্রিকের। সে কারণে তাকে কোপা দেল রের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হয়। সংবাদ সম্মেলনে রিয়াল কোচ আনচেলত্তি বলেন, “সে দুর্দান্ত ও নান্দনিক। যখনই সুযোগ পেয়েছে, নিজের অসাধারণ দিকগুলো সে মেলে ধরেছে। তার নিশানা দারুণ, খুবই গতিময় সে। বল পায়ে অবশ্য এখনও অনেক উন্নতি করার জায়গা আছে। তবে তার ড্রিবলিং, দৌড়, পায়ে যে শট আছে, ওহ, দুর্দান্ত।”

ঢাকা/নাভিদ

সম্পর্কিত নিবন্ধ