আশির দশকের শুরুর দিকে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে নাসরীন জাহানের আবির্ভাব।  ‘উড়ুক্কু’ উপন্যাসের মাধ্যমে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এই উপন্যাসের জন্য নাসরীন জাহান অর্জন করেন ‘ফিলিপ্‌স সাহিত্য পুরস্কার’। এছাড়া বাংলা সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য লাভ করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ ‘পালকের চিহ্নগুলো’। জীবন, মৃত্যু, অমরত্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন রাইজিংবিডির সঙ্গে। সাক্ষাৎকার গ্রহণে স্বরলিপি।

রাইজিংবিডি: আপনার নতুন গ্রন্থ ‘পালকের চিহ্নগুলো, আত্মজীবনীমূলক এই গ্রন্থের নাম এমন কাব্যিক হওয়ার কারণ কী?

নাসরীন জাহান: আমি যখন নাম খুঁজছিলাম তখন আশরাফ (কবি আশরাফ আহমদ) হঠাৎ করে বললো বইয়ের নাম ‘পালকের চিহ্নগুলো’ রাখো। তুমিতো বুঝতেই পারছো ‘পালকের চিহ্নগুলো’ কেমন অনুভব দেয়—পাখি উড়ে যায় ছায়া পড়ে থাকে এরকম আরকি। 

আরো পড়ুন:

বইমেলায় ধ্রুব নীলের ‘অতৃপ্ত’

সাহিত্যে নারীর উপস্থাপন বরাবরই প্রান্তিক: ফাল্গুনী তানিয়া

রাইজিংবিডি: কি আছে ‘পালকের চিহ্নগুলো’তে?
নাসরীন জাহান:
ব্যক্তি, লেখক, মানুষ সবতো একাকার। লেখক কখনও পীড়িত, কখনও যন্ত্রণাকাতর একজন মানুষের অবয়ব। পালকের চিহ্নগুলো আমার জীবনের অনাবৃত সত্যের অক্ষরযাত্রা। এতে আছে শৈশবের ক্ষত, প্রেমের উন্মাদনা, দাম্পত্যের ঢেউ, আর আছে মৃত্যুর সাথে বোঝাপড়া। সবকিছু এসেছে অবলীলায়। পাঠকের কাছে কিছু পর্ব রোমাঞ্চকর ও শ্বাসরুদ্ধকরও মনে হতে পারে। বইটির প্রকাশক বলেছেন, ‘পালকের চিহ্নগুলোর প্রত্যেকটি বাক্য ভানহীন।’ এতো রূঢ়, যন্ত্রণাকাতর বিষয়গুলো এতো অনায়াসে আসছে যে সহসা মনে হয় না এটা আসলেই কত যন্ত্রণাকাতর।

রাইজিংবিডি: আমরা মূল সাক্ষাৎকার শুরু করার আগে ‘স্টাডি রুম’ নিয়ে কথা বলছিলাম। আপনি কি স্টাডি রুমে লেখেন?
নাসরীন জাহান:
আমি তখন সিক্স, সেভেনে পড়ি। তখন আমি আর আমার বান্ধবী পারভীন সুলতানা এবং ছোটবেলার বান্ধবী রুবি আমরা একসঙ্গে সব জায়গায় যেতাম। রুবির আপন মামা রাহাত খান। তার অর্থ রাহাত খান আমারও মামা। দেখতাম মামা ওদের বাড়িতে আসার পরে বাড়ির পরিবেশ একেবারে পাল্টে যেত। মামা স্টাডি রুমে ঢুকে গেলে- বাবারে বাবা চারপাশের সবাই বলতো ‘চুপ’। রাহাত খানকে দেখে মনে হতো আমিও বড় লেখক হবো। মামার মতো আমারও স্টাডি রুম থাকবে। আমি যখন লিখতে বসবো তখন বাড়ির সবাই খুব সতর্ক থাকবে। বাড়ির বড়োরা ছোটদের বলবে, ‘চুপ’ উনি কিন্তু লেখালিখি করছেন। এক কথায় রাহাত খানকে দেখে মনে হতো, আমরতো এই রকম হতেই হবে। লিখছি আর লিখছি যখন বিয়ে হলো তখন অনেক কিছু বদলে গেলো। আমি বাড়ির বড় বউ। আমার ছোট আরও আট দেবর-ননদ। এদিকে আশরাফ আমার আট বছরের বড়। বয়সের হিসেবে আমার দেবর ননদরা আমার চেয়ে বড়-বড়। কিন্তু আমারতো বড় ভাবির দায়িত্বই পালন করতে হয়েছে। ভাবিতো ভাবিই, কেউতো আর বলে নাই তুমি বয়সে ছোট, তোমার কিছু করতে হবে না। আমাদের বাড়িরতে আত্মীয় স্বজন আসলে আমিই দেখতাম। বাবা যেহেতু বোহিমিয়ান ছিলেন, মা আমার ওপর খুব নির্ভরশীল ছিলেন। সব আত্মীয় স্বজন আমাদের বাসায় সবাই বেড়াতে আসতে পছন্দ করতো। আত্মীয় স্বজন আসলে সারাদিন কাজ করে রাত জেগে জেগে লিখতাম। চোখে ঘুম চলে আসতো। ঘুম তাড়ানোর জন্য নানা কিছু করতাম। রাতে লিখতাম কারণ রাতে শব্দ কম হতো। ধীরে ধীরে অভ্যাস পরিবর্তন করলাম। যখন ফ্রি হতাম তখনই লিখতে বসে যেতাম। বিয়ের পরে পড়াশোনা করেছি, চাকরি করেছি। কিন্তু ‘ফুলটাইম জব’টা আমার করা হয়নি।  ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় বিয়ে হয়েছে এরপর এমএ পর্যন্ত পড়লাম। লেখালিখি চলতে থাকলো। কিন্তু স্টাডি রুমের স্বপ্ন আমার গেলো না। স্টাডি রুম হওয়ার আগেই আমি ‘উডুক্কু’ লিখে ফেলেছি, চার-পাঁচটি পুরস্কার পেয়ে গেছি। বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেযে যাওয়ার পরে বর্তমান বাড়িতে আমার একটি স্টাডি রুম হলো।  স্টাডি রুমে ঢুকলেই মনে হয় ‘দুরু এইটা এতো ছোট কেন, এটা এমন কেন?’ – এই রকম সব কিছু। দমবদ্ধ হয়ে আসতো আর মনে হতো এমন বদ্ধ ঘরে বসে মানুষ আবার লিখতে পারে নাকি। পরে ওয়াল ভেঙে ফেলেছি। ততদিনে স্টাডি রুমের বাইরে লেখালিখির অভ্যাস তৈরি হয়ে গেছে। পরে আর ওই বদ্ধরুমে বসে লিখতে পারি নাই। 

রাইজিংবিডি: জীবনকে আপনি এখন কীভাবে দেখেন?
নাসরীন জাহান
: মৃত্যুটাইতো সব। জীবন তো একটা ক্ষণমুহূর্ত মাত্র। জীবন আসলেই একটা মুহূর্ত মাত্র। বাকিটা অনন্ত অন্ধকার। ফলে, তুমি যখন হাঁটতে থাকবে শেষে গিয়ে তোমাকে অন্ধকারেই দাঁড়াতে হবে। অর্থাৎ মৃত্যুর কাছে দাঁড়াতে হবে। আমি যতই কাব্যিক করে বলি না কেন যে মৃত্যু সুন্দর, বা মৃত্যুকে যতোই জৌলুসময় রূপ দেই না কেন, কিন্তু মৃত্যুর মতো দিগন্তব্যাপী হাহাকার আর কিছুতে নেই। আমার এই যে বাড়িটা, ঘরটা, এই যে আমার ছায়াটা, এগুলোর কাছে আর কোনোদিন ফেরা হবে না। একশো শতাব্দী, দুইশো শতাব্দী, কোটি শতাব্দী চলে যাবে, ফেরা হবে না! এই যে বিশাল একটা না ফেরা—এই সত্যকেই আমরা ‘অনায়াস’ ভেবে যে আমরা  জীবন যাপন করে যাই, হেসে খেলে যাই সেইটাইতো বিষ্ময়কর। মানুষের মনোবল অনেক প্রবল না হলে কীভাবে এই সত্য সামলে এতো হাসি খুশি থাকে! আমার মনে হয় যে যারা সৃষ্টিশীল তাদের মধ্যে নিরন্তর এই হাহাকার তাড়না হিসেবে কাজ করে। তাদের মনে হয়, কিছু না কিছু রেখে যাই। মানুষের কেবলই মনে হতে থাকে, যদি কেউ আমাকে মনে রাখে। একজন লেখকের মনে হতে থাকে, যদি কেউ আমার লেখা পড়ে আমাকে মনে রাখে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই তাড়না আছে। তারা ছেলে সন্তান চায়। মনে করে যে, ছেলে হলে বংশের পরিচয় থাকবে, বংশের বাতি থাকবে। অথচ মরে গেলে কিন্তু এই জীবনের সঙ্গে তার আর কোনো লেনদেন নাই।

রাইজিংবিডি: ‘অমরত্ব’ নিয়ে আপনার ভাবনা কী? ‘অমরত্বের’ প্রত্যাশা আছে কিনা?
নাসরীন জাহান:
আমি একেবারেই অমরত্ব চাই না। তবে একটা সময় প্রত্যাশাটা ছিল। যখন লেখালিখি শুরু করি বা লিখি—লিখেই যাচ্ছি, লিখেই যাচ্ছি; তখন ইচ্ছে ছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে কষ্ট পেয়ে পেয়ে মারা গেছেন আমিও ওই রকম কষ্ট পেয়ে-পেয়ে মারা যাবো। একশো বছর পরেও যেমন তাদের নাম নেওয়া হচ্ছে, তাদের লেখা বই পড়া হচ্ছে; আমারও এমন নাম নেওয়া হবে, মানুষ আমার লেখা পড়বে। ওই ধারায় নিজেকে ধাবিত করার প্রচুর চেষ্টা করে গিয়েছি। কিন্তু এখন মনে হয় ‘অমরত্বের’ প্রত্যাশা করার কোনো দরকার ছিল না। বরং লিখে পপুলার হয়ে, আনন্দ উপভোগ করে চলে যেতে পারলে খারাপ হয় না। বয়স বাড়ছে, মৃত্যু কাছেবর্তী হচ্ছে; অমরত্ব দিয়ে কি করবো আমি! 

রাইজিংবিডি: ‘কবর’, ‘এফিটাফ’ এসব নিয়ে কী ভাবনা?
নাসরীন জাহান:
ওহ্, আজকে এই কথাটা বলি—আমি চাই না যে আমার জন্য সংরক্ষিত কোনো কবর থাকুক। সংরক্ষিত কবর, এফিটাফ এগুলো আমার জন্য কোনো দরকার নেই। আমি চাই যেকোনো সাধারণ করবস্থানে আমার কবর হবে। আমার কবরের ওপর যেন আরও অনেক কবর তৈরি হয়। অন্যের জায়গা কেন আমি দখল করে রাখবো?

ঢাকা/লিপি

.

উৎস: Risingbd

কীওয়ার্ড: চ কর চ কর র জন য

এছাড়াও পড়ুন:

মৃত্যুর মতো দিগন্তব্যাপী হাহাকার আর কিছুতে নেই: নাসরীন জাহান

আশির দশকের শুরুর দিকে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে নাসরীন জাহানের আবির্ভাব।  ‘উড়ুক্কু’ উপন্যাসের মাধ্যমে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এই উপন্যাসের জন্য নাসরীন জাহান অর্জন করেন ‘ফিলিপ্‌স সাহিত্য পুরস্কার’। এছাড়া বাংলা সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য লাভ করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ ‘পালকের চিহ্নগুলো’। জীবন, মৃত্যু, অমরত্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন রাইজিংবিডির সঙ্গে। সাক্ষাৎকার গ্রহণে স্বরলিপি।

রাইজিংবিডি: আপনার নতুন গ্রন্থ ‘পালকের চিহ্নগুলো, আত্মজীবনীমূলক এই গ্রন্থের নাম এমন কাব্যিক হওয়ার কারণ কী?

নাসরীন জাহান: আমি যখন নাম খুঁজছিলাম তখন আশরাফ (কবি আশরাফ আহমদ) হঠাৎ করে বললো বইয়ের নাম ‘পালকের চিহ্নগুলো’ রাখো। তুমিতো বুঝতেই পারছো ‘পালকের চিহ্নগুলো’ কেমন অনুভব দেয়—পাখি উড়ে যায় ছায়া পড়ে থাকে এরকম আরকি। 

আরো পড়ুন:

বইমেলায় ধ্রুব নীলের ‘অতৃপ্ত’

সাহিত্যে নারীর উপস্থাপন বরাবরই প্রান্তিক: ফাল্গুনী তানিয়া

রাইজিংবিডি: কি আছে ‘পালকের চিহ্নগুলো’তে?
নাসরীন জাহান:
ব্যক্তি, লেখক, মানুষ সবতো একাকার। লেখক কখনও পীড়িত, কখনও যন্ত্রণাকাতর একজন মানুষের অবয়ব। পালকের চিহ্নগুলো আমার জীবনের অনাবৃত সত্যের অক্ষরযাত্রা। এতে আছে শৈশবের ক্ষত, প্রেমের উন্মাদনা, দাম্পত্যের ঢেউ, আর আছে মৃত্যুর সাথে বোঝাপড়া। সবকিছু এসেছে অবলীলায়। পাঠকের কাছে কিছু পর্ব রোমাঞ্চকর ও শ্বাসরুদ্ধকরও মনে হতে পারে। বইটির প্রকাশক বলেছেন, ‘পালকের চিহ্নগুলোর প্রত্যেকটি বাক্য ভানহীন।’ এতো রূঢ়, যন্ত্রণাকাতর বিষয়গুলো এতো অনায়াসে আসছে যে সহসা মনে হয় না এটা আসলেই কত যন্ত্রণাকাতর।

রাইজিংবিডি: আমরা মূল সাক্ষাৎকার শুরু করার আগে ‘স্টাডি রুম’ নিয়ে কথা বলছিলাম। আপনি কি স্টাডি রুমে লেখেন?
নাসরীন জাহান:
আমি তখন সিক্স, সেভেনে পড়ি। তখন আমি আর আমার বান্ধবী পারভীন সুলতানা এবং ছোটবেলার বান্ধবী রুবি আমরা একসঙ্গে সব জায়গায় যেতাম। রুবির আপন মামা রাহাত খান। তার অর্থ রাহাত খান আমারও মামা। দেখতাম মামা ওদের বাড়িতে আসার পরে বাড়ির পরিবেশ একেবারে পাল্টে যেত। মামা স্টাডি রুমে ঢুকে গেলে- বাবারে বাবা চারপাশের সবাই বলতো ‘চুপ’। রাহাত খানকে দেখে মনে হতো আমিও বড় লেখক হবো। মামার মতো আমারও স্টাডি রুম থাকবে। আমি যখন লিখতে বসবো তখন বাড়ির সবাই খুব সতর্ক থাকবে। বাড়ির বড়োরা ছোটদের বলবে, ‘চুপ’ উনি কিন্তু লেখালিখি করছেন। এক কথায় রাহাত খানকে দেখে মনে হতো, আমরতো এই রকম হতেই হবে। লিখছি আর লিখছি যখন বিয়ে হলো তখন অনেক কিছু বদলে গেলো। আমি বাড়ির বড় বউ। আমার ছোট আরও আট দেবর-ননদ। এদিকে আশরাফ আমার আট বছরের বড়। বয়সের হিসেবে আমার দেবর ননদরা আমার চেয়ে বড়-বড়। কিন্তু আমারতো বড় ভাবির দায়িত্বই পালন করতে হয়েছে। ভাবিতো ভাবিই, কেউতো আর বলে নাই তুমি বয়সে ছোট, তোমার কিছু করতে হবে না। আমাদের বাড়িরতে আত্মীয় স্বজন আসলে আমিই দেখতাম। বাবা যেহেতু বোহিমিয়ান ছিলেন, মা আমার ওপর খুব নির্ভরশীল ছিলেন। সব আত্মীয় স্বজন আমাদের বাসায় সবাই বেড়াতে আসতে পছন্দ করতো। আত্মীয় স্বজন আসলে সারাদিন কাজ করে রাত জেগে জেগে লিখতাম। চোখে ঘুম চলে আসতো। ঘুম তাড়ানোর জন্য নানা কিছু করতাম। রাতে লিখতাম কারণ রাতে শব্দ কম হতো। ধীরে ধীরে অভ্যাস পরিবর্তন করলাম। যখন ফ্রি হতাম তখনই লিখতে বসে যেতাম। বিয়ের পরে পড়াশোনা করেছি, চাকরি করেছি। কিন্তু ‘ফুলটাইম জব’টা আমার করা হয়নি।  ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় বিয়ে হয়েছে এরপর এমএ পর্যন্ত পড়লাম। লেখালিখি চলতে থাকলো। কিন্তু স্টাডি রুমের স্বপ্ন আমার গেলো না। স্টাডি রুম হওয়ার আগেই আমি ‘উডুক্কু’ লিখে ফেলেছি, চার-পাঁচটি পুরস্কার পেয়ে গেছি। বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেযে যাওয়ার পরে বর্তমান বাড়িতে আমার একটি স্টাডি রুম হলো।  স্টাডি রুমে ঢুকলেই মনে হয় ‘দুরু এইটা এতো ছোট কেন, এটা এমন কেন?’ – এই রকম সব কিছু। দমবদ্ধ হয়ে আসতো আর মনে হতো এমন বদ্ধ ঘরে বসে মানুষ আবার লিখতে পারে নাকি। পরে ওয়াল ভেঙে ফেলেছি। ততদিনে স্টাডি রুমের বাইরে লেখালিখির অভ্যাস তৈরি হয়ে গেছে। পরে আর ওই বদ্ধরুমে বসে লিখতে পারি নাই। 

রাইজিংবিডি: জীবনকে আপনি এখন কীভাবে দেখেন?
নাসরীন জাহান
: মৃত্যুটাইতো সব। জীবন তো একটা ক্ষণমুহূর্ত মাত্র। জীবন আসলেই একটা মুহূর্ত মাত্র। বাকিটা অনন্ত অন্ধকার। ফলে, তুমি যখন হাঁটতে থাকবে শেষে গিয়ে তোমাকে অন্ধকারেই দাঁড়াতে হবে। অর্থাৎ মৃত্যুর কাছে দাঁড়াতে হবে। আমি যতই কাব্যিক করে বলি না কেন যে মৃত্যু সুন্দর, বা মৃত্যুকে যতোই জৌলুসময় রূপ দেই না কেন, কিন্তু মৃত্যুর মতো দিগন্তব্যাপী হাহাকার আর কিছুতে নেই। আমার এই যে বাড়িটা, ঘরটা, এই যে আমার ছায়াটা, এগুলোর কাছে আর কোনোদিন ফেরা হবে না। একশো শতাব্দী, দুইশো শতাব্দী, কোটি শতাব্দী চলে যাবে, ফেরা হবে না! এই যে বিশাল একটা না ফেরা—এই সত্যকেই আমরা ‘অনায়াস’ ভেবে যে আমরা  জীবন যাপন করে যাই, হেসে খেলে যাই সেইটাইতো বিষ্ময়কর। মানুষের মনোবল অনেক প্রবল না হলে কীভাবে এই সত্য সামলে এতো হাসি খুশি থাকে! আমার মনে হয় যে যারা সৃষ্টিশীল তাদের মধ্যে নিরন্তর এই হাহাকার তাড়না হিসেবে কাজ করে। তাদের মনে হয়, কিছু না কিছু রেখে যাই। মানুষের কেবলই মনে হতে থাকে, যদি কেউ আমাকে মনে রাখে। একজন লেখকের মনে হতে থাকে, যদি কেউ আমার লেখা পড়ে আমাকে মনে রাখে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই তাড়না আছে। তারা ছেলে সন্তান চায়। মনে করে যে, ছেলে হলে বংশের পরিচয় থাকবে, বংশের বাতি থাকবে। অথচ মরে গেলে কিন্তু এই জীবনের সঙ্গে তার আর কোনো লেনদেন নাই।

রাইজিংবিডি: ‘অমরত্ব’ নিয়ে আপনার ভাবনা কী? ‘অমরত্বের’ প্রত্যাশা আছে কিনা?
নাসরীন জাহান:
আমি একেবারেই অমরত্ব চাই না। তবে একটা সময় প্রত্যাশাটা ছিল। যখন লেখালিখি শুরু করি বা লিখি—লিখেই যাচ্ছি, লিখেই যাচ্ছি; তখন ইচ্ছে ছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে কষ্ট পেয়ে পেয়ে মারা গেছেন আমিও ওই রকম কষ্ট পেয়ে-পেয়ে মারা যাবো। একশো বছর পরেও যেমন তাদের নাম নেওয়া হচ্ছে, তাদের লেখা বই পড়া হচ্ছে; আমারও এমন নাম নেওয়া হবে, মানুষ আমার লেখা পড়বে। ওই ধারায় নিজেকে ধাবিত করার প্রচুর চেষ্টা করে গিয়েছি। কিন্তু এখন মনে হয় ‘অমরত্বের’ প্রত্যাশা করার কোনো দরকার ছিল না। বরং লিখে পপুলার হয়ে, আনন্দ উপভোগ করে চলে যেতে পারলে খারাপ হয় না। বয়স বাড়ছে, মৃত্যু কাছেবর্তী হচ্ছে; অমরত্ব দিয়ে কি করবো আমি! 

রাইজিংবিডি: ‘কবর’, ‘এফিটাফ’ এসব নিয়ে কী ভাবনা?
নাসরীন জাহান:
ওহ্, আজকে এই কথাটা বলি—আমি চাই না যে আমার জন্য সংরক্ষিত কোনো কবর থাকুক। সংরক্ষিত কবর, এফিটাফ এগুলো আমার জন্য কোনো দরকার নেই। আমি চাই যেকোনো সাধারণ করবস্থানে আমার কবর হবে। আমার কবরের ওপর যেন আরও অনেক কবর তৈরি হয়। অন্যের জায়গা কেন আমি দখল করে রাখবো?

ঢাকা/লিপি

সম্পর্কিত নিবন্ধ