ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রধানতম লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিজমের বিনাশ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। একনায়তান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এবং ভিন্নমত দমনপীড়নকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বন্দুকের সামনে বুক পেতে দেওয়া ছাত্রছাত্রীদের সমর্থনে ফুঁসে উঠেছিল বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনসাধারণ।
নিজেদের অপরাজেয় মনে করা শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে মুক্ত অনুভব নিয়ে রাজপথে নেমে পড়া মানুষের আনন্দ আর উল্লাস জানিয়ে দেয়, কতটা শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান হয়েছে সেদিন।
কিন্তু বাংলাদেশের ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! এই মুক্তির আনন্দ বিষাদে পরিণত হয় নব্য ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। এরা মাইকে ঘোষণা দিয়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বাড়িঘর লুটপাট করে ও জ্বালিয়ে দেয়। হিজড়া পল্লির সবকিছু লুট ও ভস্মীভূত করে। দরিদ্র, উপায়হীন যৌনকর্মীদের ওপর আক্রমণ করতে থাকে। অনেক মাজার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। এই সব কিছু জায়েজ করার জন্য সামনে টেনে আনে ধর্মকে।
অনুমান ছিল, এসব থেমে যাবে। কারণ নিষ্পেষিত মানুষের ক্ষোভ নানাভাবে প্রকাশিত হয়। এই সহিংসতা খুব অস্বাভাবিক নয় হয়তো। দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। কিন্তু ধর্মের নামে সন্ত্রাসের সমর্থক বাংলাদেশি কমই দেখা যায়। ধারণা ছিল, শত শত শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আর কেউ এখানে আগের মতো মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না। অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা শক্ত হাতেই প্রতিষ্ঠা করবে। বহুত্ববাদই হবে এই রাষ্ট্রের মূলমন্ত্র। অর্থাৎ এখানে বহু মত-পথ, দল-গোষ্ঠীর মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত এবং ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণু হবে। মতপ্রকাশের কারণে কাউকে সন্ত্রস্ত বোধ করতে হবে না; গ্রেপ্তার হতে হবে না। অথচ ফ্যাসিস্ট শাসনের পতনের ছয় মাস পরও ফ্যাসিজম তার অস্তিত্ব জানান দিয়ে চলেছে। জনসাধারণের মুখাবয়বে ভীতি ও উদ্বেগের চিত্র স্পষ্ট ও ক্রমবর্ধমান। যখন জাতি অপেক্ষা করছে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার এবং একটি দুর্নীতিমুক্ত, বহুত্ববাদী বাংলাদেশের জন্য, তখন একটি মহল ‘তৌহিদি জনতা’র পরিচয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে।
এদের রোষের শিকার কেবল মাজারপন্থি, নারী ও জেন্ডার বৈচিত্র্যের মানুষই নয়; এরা মূলত আক্রমণ করতে শুরু করেছে এ দেশের ঐতিহ্যবাহী, আত্মপরিচয় প্রকাশক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর। সম্প্রতি মধুপুর উপজেলায় একটি গোষ্ঠীর চাপে বন্ধ করতে হয়েছে লালন উৎসব। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে বসন্ত ও ভালোবাসা দিবসে ফুল বিক্রি করায় তারা ভাঙচুর করেছে ফুলের দোকান। ভয় ও ত্রাসে গোপালপুর উপজেলায় বন্ধ হয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী ঘুড়ি উৎসব। এর আগে দিনাজপুর ও জয়পুরহাটে নারীদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করতে আক্রমণ চালানো হয়েছে খেলার মাঠে। অথচ সাম্প্রতিক ক্রীড়াঙ্গনে নারী ফুটবল দলই দেশের জন্য গৌরব ছিনিয়ে এনেছে।
এসব ঘটনা মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। ফলে নানা অজুহাতে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা সংঘবদ্ধ জনতার সন্ত্রাস আশকারা পেয়েছে। ইতোমধ্যে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডের শড়াতলা ইউনিয়নে গ্রামজুড়ে নোটিশ দিয়ে বাদ্যযন্ত্র এবং ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ মানুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল! এ নির্দেশ অমান্য করলে শাস্তির হুমকিও দেওয়া হয়েছে। একই এলাকার দৌলতপুর ইউনিয়নের ফতেহপুর গ্রামেও গান-বাজনার ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। সেখানে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ঐতিহ্যবাহী সংগীতচর্চা কেন্দ্রের কার্যক্রম।
নারীদের স্বাধীন ও নিরাপদ চলাফেরায় বাধা দেওয়ার মতো মব সন্ত্রাসের ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটতে দেখা যাচ্ছে। এমনকি স্কুলের সামনে চায়ের দোকানে নারীদের কাছে চা বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করার ঘটনাও ঘটছে। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, বহুত্ববাদের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অন্তর্বর্তী সরকার এবং জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত নায়ক যে ছাত্রসমাজ, তারা সবকিছু দেখেশুনে নীরব ভূমিকা পালন করছে।
এ রকম আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর উত্থান নতুন– তা বলা যাবে না। ফ্যাসিবাদী শাসক শেখ হাসিনার প্রশ্রয়েই এরা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এ ধরনের গোষ্ঠীগত আধিপত্যবাদ গণতন্ত্রের জন্য সুবিশাল হুমকি; বহুত্ববাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। বেশ কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, দেশের গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া পর্যন্ত এই ‘মব’ প্রভাবিত। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পেছনের দিনগুলো মনে রাখতে হবে আমাদের। এ দেশের মানুষ সহনশীল। শান্তিকামী মানুষ প্রথমে মেনে নেয়, পর্যবেক্ষণ করে। তারপর কিন্তু ঠিকই রুখে দাঁড়ায় অন্যায় ও অপতৎপরতার বিরুদ্ধে। দেশবাসী আর এমন সংঘাতময় পরিস্থিতি কামনা করে না।
বর্তমান পরিস্থিতি শুধুই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকট নয়; দেশকে অধিকতর রাজনৈতিক সংকটের দিকেও নিয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে; বিশেষত ভারতীয় প্রোপাগান্ডা মেশিনগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। বহুত্ববাদের পথে এগোতে চাওয়া বাংলাদেশকে পথচ্যুত করার গভীর ফাঁদ হিসেবেই দেখতে হবে এসব আধিপত্যবাদী তৎপরতাকে। বৃহত্তর সমাজে বহুত্ববাদী ভাবনার সুরক্ষা দিতে না পারলে প্রকৃত মুক্তি আসবে না। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাদেরও সক্রিয় হতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, গভীর পঠন-পাঠন থেকে ছাত্র আন্দোলনের নেতারা নিশ্চয় উপলব্ধি করেন, এ অঞ্চলে ধর্মকে ব্যবহার করে অপরাজনীতি যতটা করা হয়েছে, ধর্ম ততটা প্রয়োগ করা হয়নি দুর্নীতিমুক্ত, বাজার সিন্ডিকেটমুক্ত, মুনাফাখোরমুক্ত, বৈষম্যমুক্ত সাম্য ও শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠায়। এ দেশে আজও রমজান মাস আসে বাজারের দুশ্চিন্তা নিয়ে। কারও পাতের ইফতার উপচে পড়ে, কেউ ক্ষুধা নিবারণে পর্যাপ্ত ইফতার পায় না।
ধর্মের গভীর মানবিক অনুভবের চেয়ে ধর্মের বাহ্যিক অনুভূতিকে ইস্যু বানানোর বিপদ নিশ্চয় সবাই উপলব্ধি করেন। নতুন প্রজন্ম যারা প্রাণ দিয়ে, রক্ত দিয়ে, বিকলাঙ্গতা মেনে নিয়ে ফ্যাসিস্টের পতন ঘটিয়েছে, তারাই বাংলাদেশকে এমন ভয়ানক বিভাজনের পথ থেকে সরিয়ে গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ ও ঐক্যের পথে পরিচালিত করবে।
নূরুননবী শান্ত: গল্পকার, ফোকলোর গবেষক
.উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: ন র ননব শ ন ত গণঅভ য ত থ ন গণতন ত র পর স থ ত র জন য র ওপর সরক র
এছাড়াও পড়ুন:
আন্দোলনের স্মৃতিময় বই
ছাত্র-জনতার মিলিত অভ্যুত্থান দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটিয়ে মানুষের সামনে এনে দিয়েছে নতুন করে দেশ গড়ার অপূর্ব সুযোগ। ফলে গত বছরের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত এই গণঅভ্যুত্থান প্রভাব ফেলে শিল্প সংস্কৃতি সাহিত্য– সব ক্ষেত্রে। এবারের অমর একুশে বইমেলাতেও তাই জুলাই আন্দোলন নিয়ে প্রকাশ হয়েছে বিভিন্ন ধরনের বই। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এসব বইয়ের মূল ক্রেতা তরুণরা। তবে মধ্যবয়স্করাও নিচ্ছেন অজানা বিষয়গুলো আরও ভালোভাবে জানতে।
এবারের বইমেলার মূল প্রতিপাদ্য ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ’।
তাই মেলার উভয় প্রাঙ্গণজুড়ে কালো ও লালের ছড়াছড়ি। গতকাল মেলার ২৪তম দিনে স্বাভাবিক ভিড় দেখা যায়। তবে এ দিনও আশানুরূপ বিক্রি না হওয়ায় খানিকটা হতাশ প্রকাশকরা। গতকাল অনেক তরুণ-তরুণীকে জুলাই অভ্যুত্থানের বই সংগ্রহ করতে দেখা যায়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জারিন তাবাসসুম বলেন, মেলার শেষের দিনগুলোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। জুলাই অভ্যুত্থানের ওপর কী কী বই আসবে, সেগুলো দেখে কিনব।
জানা গেছে, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্টলে গতকাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত জুলাই অভ্যুত্থানের ১৩০টি বই সংগৃহীত রয়েছে। পাশাপাশি ওই স্টলে আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত সুভেনিয়রও বিক্রি হচ্ছে।
জ্ঞানকোষ থেকে এবার এসেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ওপর তিনটি বই। এসব বই থ্রিলার ও উপন্যাসের পাশাপাশি বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে বলে জানান স্টলের বিক্রয়কর্মী জাহিদ। বই তিনটি হলো মাসকাওয়াথ আহসানের ‘স্যাটারিক ভার্সেস ফ্যাসিবাদবিরোধী রম্য’, আশীফ এন্তাজ রবির ‘ট্রেন টু ঢাকা’ ও সিরাজুল ইসলাম এফসিএর ‘নতুন দিগন্তে জেগেছে ভোর’। অন্যদিকে প্রথমা প্রকাশনের স্টলে দেখা গেল জুলাই অভ্যুত্থানের ওপর ছয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে। আইন ও বিচারবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের ‘শেখ হাসিনার পতনকাল’ বইটি কিনতে দেখা গেছে পাঠকদের। অনন্যা থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্রোহের গ্রাফিতি’। জি এম রাজীব হোসেনের বইটির প্রতি আগ্রহ দেখা গেছে পাঠকদের মধ্যে। জুলাইয়ের দিনগুলো নিয়ে আফসার ব্রাদার্স থেকে এসেছে সাহাদত হোসেন খানের ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান’, ড. ফারুক হোসেনের ‘৩৬ জুলাই : ছাত্র-জনতার বিজয় ফ্যাসিবাদের পতন’।
আদর্শের প্যাভিলিয়নে ২৫টি শীর্ষ দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠা নিয়ে আহম্মদ ফয়েজের বই ‘সংবাদপত্রে জুলাই অভ্যুত্থান’ পাওয়া যাচ্ছে। ঐতিহ্য প্রকাশ করেছে ড. আহমদ আরমান সিদ্দিকীর লেখা ২০২৪ সালের ২০ জুলাই থেকে ৯ আগস্টের দিনপঞ্জি ‘৩৬ জুলাই ২০২৪’, মুসা আল হাফিজের কলাম সংকলন ‘অভ্যুত্থানের চিন্তাশিখা’, মঈন শেখের গল্পের বই ‘জুলাইয়ের অশেষ পাখিরা’সহ আরও কিছু বই। এ ছাড়া বাতিঘর এনেছে মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন সম্পাদিত ‘জুলাইর গল্প’।
এদিকে গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছে ৯৮টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হাওলাদার প্রকাশনী থেকে আরিফ মঈনুদ্দীনের ‘নির্বাচিত গল্প’, মাছরাঙা প্রকাশন থেকে সাইয়্যেদ শাহ্ নূরে আরিফের ‘এক নীল সমুদ্রের ভালোবাসা’, নবরাগ প্রকাশনী থেকে মোস্তাক আহমাদের মনসুর হাল্লাজের ‘আত্মবিলীন রহস্য’, অনিন্দ্য প্রকাশ থেকে ড. মুকিদ চৌধুরীর ‘চম্পাবতী’, একুশে বাংলা প্রকাশন থেকে মোস্তাফিজুর রহমান ‘আজব একটা’।
এ দিন বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘জন-আকাক্ষার নাট্যকলা-যাত্রা : ঐতিহ্যের পরম্পরায় জাতীয়তাবাদী শিল্পরীতি এবং অমলেন্দু বিশ্বাস’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। মিলনকান্তি দের সভাপতিত্বে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাইদুর রহমান লিপন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন শাহমান মৈশান। লেখক বলছি মঞ্চে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন শাহীন রেজা, এজাজ ইউসুফী ও শোভা চৌধুরী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন কবি ফাতিমা তামান্না, টোকন ঠাকুর ও রশিদ কামাল। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী আহমেদ শাকিল হাসমী, ইকবাল হোসেন, শাহ আল চৌধুরী মিন্টুসহ অনেকেই। আজ বিকেল ৪টায় মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘জুলাই অভ্যুত্থান : গ্রাফিতি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।