ছাত্র রাজনীতিকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতেই হবে
Published: 27th, February 2025 GMT
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর আমাদের শিক্ষাঙ্গন বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি থাকা উচিত কিনা, সে বিষয়ে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে।
নব্বই-পরবর্তী সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজিনির্ভর লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির খারাপ অভিজ্ঞতার কারণে, বিশেষ করে গত ১৬ বছরের আওয়ামী শাসনামলে দলটির ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের নজিরবিহীন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বুদ্ধিজীবীরা জোরালো মতামত দিচ্ছেন।
অন্যদিকে সচেতন নাগরিক বা জনসমাজ ও ছাত্রসমাজের একটি বড় অংশ শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতির পক্ষে কথা বলছেন। তারা যুক্তি হিসেবে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সদ্য ঘটে যাওয়া চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রছাত্রীদের অপরিসীম অবদান তুলে ধরছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আদর্শবাদী ছাত্র রাজনীতির ধারা চালু রাখা প্রয়োজন আছে বলে তারা মনে করছেন। আদর্শবাদী ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে। সেই রাজনীতি দলীয় জাতীয় রাজনীতির অঙ্গসংগঠন হিসেবে থাকতে পারবে না। সাম্প্রতিক সময়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্র সংস্কার এবং রাষ্ট্র ক্ষমতা-কাঠামোতে জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করার তাগিদ ও প্রাসঙ্গিকতা আরও বেশি করে প্রতিভাত হচ্ছে।
আমরা চাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি হবে ছাত্র সংসদ বা স্টুডেন্ট ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে। প্রধানত ছাত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং অভাব-অভিযোগের নিরিখে। এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ‘নিয়মিত ও বৈধ’ ছাত্রছাত্রী তাদের অধিকার ও স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিভিন্ন নামে সংগঠন গড়ে তুলবে এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে, যাতে করে তাদের সঙ্গে কোনোভাবেই জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো লেজুড়বৃত্তি না থাকে। ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সংঘাতমুক্ত হতে হবে। নির্বাচনে যাতে কোনোভাবেই অস্বচ্ছ প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ না থাকে এবং দলীয় রাজনৈতিক পেশি শক্তি বা সন্ত্রাসের দাপট নির্বাচনের সুস্থ পরিবেশ ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ম্লান করতে না পারে সেদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে খেয়াল রাখতে হবে। নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা থেকে শুরু করে ফল ঘোষণা পর্যন্ত পুরো নির্বাচনী পরিবেশ স্বচ্ছ, নির্ঝঞ্ঝাট, সৌহার্দ্য ও শান্তিপূর্ণ রাখতে হবে, যাতে সব পক্ষ ভোটের ফল মেনে নেয় এবং পরাজিত পক্ষ বিজয়ী পক্ষকে অভিনন্দন জানায়। এভাবে একটি আদর্শ ‘ছাত্র সংসদ নির্বাচন’ জাতীয় নির্বাচনের আগে মডেল হয়ে উঠতে পারে।
দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি নিয়ে বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের এবং জনমানুষের অভিজ্ঞতা একেবারেই সুখকর নয়। সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন সময়ে ছাত্ররা ন্যায্য অধিকার আদায়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে, মানুষের পক্ষে তাদের কণ্ঠ উঁচু করেছে, নিজের জীবন দিতে অগ্রগামী হয়েছে। তবে ছাত্র রাজনীতি বলতে মূলত যা বোঝায়, সেটি এ দেশের শিক্ষাঙ্গনে অনুপস্থিত। এটি আসলে শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চর্চা হওয়া রাজনৈতিক পথপরিক্রমা, রাজনৈতিক কর্মশালা, রাজনৈতিক পাঠচক্র বা কার্যক্রমের সমষ্টি। আমরা জনমানুষের মধ্যে ছাত্র রাজনীতির বিষয়ে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা দেখতে পাই। টেন্ডারবাজি, গেস্টরুম বা গণরুম, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মারধর, ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতির ব্যানারে দখলদারিত্ব– এসব বিষয় ছাত্র রাজনীতির একটি বীভৎস রূপ হিসেবে দেশের মানুষের সামনে হাজির হয়েছে।
যখন ছাত্র রাজনীতির প্রসঙ্গ আসে তখন আমরা বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের দেখা পাই– ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্রশিবির ইত্যাদি। এ রকম বেশ কিছু ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দেখেছি– যে সরকার যখন ক্ষমতায় থাকে, তাদের ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে একাধিপত্য তৈরির সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। আমরা এটিও দেখেছি, প্রায় ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রলীগ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেস্টরুম কালচার, জোরপূর্বক বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রোগ্রামে নিয়ে যাওয়া; কোনো নেতার বিরুদ্ধে কেউ বিরূপ মন্তব্য করলে এমনকি ফেসবুক পোস্টের জন্যও অনেককে বিপদে বা শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছে। এই ধারার অশুভ রাজনীতি আমরা নব্বইয়ের পর থেকে দেখছি।
ছাত্র রাজনীতির সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ আমরা দেখেছি বুয়েটে আবরার ফাহাদ হত্যার মধ্য দিয়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলো। যখন জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান চলছিল, তখনও শিক্ষার্থীরা ৯ দফায় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি জানিয়েছিল। আসলে শিক্ষার্থীরা ছাত্র রাজনীতির নামে ক্যাম্পাসে যেসব অপকর্ম এবং অপরাধ হয়ে আসছে, তার বিরোধিতা করেছে; এবং যেহেতু সেসব অপকর্ম রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না, তাই তারা ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের আলাপ জোরালো করেছে। প্রসঙ্গত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশাসনের নির্লিপ্ত ভূমিকা অত্যন্ত হতাশাজনক। যদি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে, তাহলে ছাত্র রাজনীতির নামে এসব অপকর্ম সম্ভব হবে না।
আমার বিশ্বাস শিক্ষার্থীরা কারও অধীনস্থ থাকতে চায় না এবং কোনোভাবেই নিজেদের রাজনৈতিক দাসত্বের মধ্যে আটকে রাখতে চায় না। নিজেদের স্বাধীন এবং মুক্তভাবে চলতে পারার আকাঙ্ক্ষা থেকে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের আলাপ উঠেছে। ছাত্র রাজনীতি যখন বুয়েটে বন্ধ করা হলো, তারপর আমরা দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেছে। বুয়েটের শিক্ষার্থীরা সাধারণত প্রতিবাদী ভূমিকায় একটু দেরিতে উপস্থিত হয়েছে। তাদের কাছে হয়তো মনে হতো, যে কোনো ধরনের প্রতিবাদী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করাই ছাত্র রাজনীতি হিসেবে বিবেচিত হবে। এ কারণে তাদের শিক্ষাজীবনে ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
আমরা নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ে দেখেছি, ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল যেসব ছাত্র সংগঠন আছে, তারা নিজেরা জোটবদ্ধ হয়ে দলীয় ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করত এবং শিক্ষার্থীরা তাদের ডাকে সাড়া দিত। তখন ছাত্র আন্দোলনগুলো সেভাবে পরিচালিত হতো। ২০১৮ সাল থেকে আমরা ভিন্নতা দেখতে পাচ্ছি; সুনির্দিষ্ট কোনো ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন সংঘটিত হয়নি। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার যে অভ্যুত্থান দেখেছি, সেখানে ছাত্র সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ আমরা দেখেছি, কিন্তু নেতৃত্বের প্রশ্নে এককভাবে বা দলীয় ব্যানারে ছাত্র সংগঠনগুলোকে আমরা আসতে দেখিনি।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ছাত্রছাত্রীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করতে চায়। দলীয় রাজনৈতিক পরিচয়ে না থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে চায় এবং দলীয় ব্যানারের বাইরে এসে সংগঠিত হতে চায়। এ প্রবণতাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই।
গণঅভ্যুত্থানের পর এসব বিষয় বিদ্যমান ছাত্র সংগঠনগুলোকে আমলে নিতে হবে এবং তাদের খুঁজে বের করতে হবে কীভাবে তারা শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করবে। যেহেতু ৩৪ বছর ধরে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোকে দেখে অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীরা একটি অনাস্থার জায়গায় চলে এসেছে, সেই আস্থা ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য প্রতিটি সংগঠনকে কথায় এবং কাজে প্রমাণ দিতে হবে– তারা আসলেই কোনো রাজনৈতিক দলের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ করছে না। তারা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার, গবেষণা, দেশীয় স্বার্থের বিষয়ে সোচ্চার ভূমিকা রাখবে। কোনোভাবেই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে তারা যুক্ত করবে না। যদি এসবের ব্যত্যয় ঘটে, সে ক্ষেত্রে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সম্প্রতি কুয়েটে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক সহিংসতা আবার নতুন করে আমাদের দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। তারপরও আমরা মনে করি, দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিতভাবে প্রতিবছর ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিকে সুস্থ, ইতিবাচক ও গঠনমূলক ধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
শেখ নাহিদ নিয়াজী: সহযোগী অধ্যাপক; ইংরেজি বিভাগ; স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
nahidneazy@yahoo.
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: ছ ত র র জন ত ছ ত র স গঠনগ ল ছ ত র র জন ত র গণঅভ য ত থ ন ছ ত র স গঠন র জন ত ক প র র জন ত ক য় র জন ত
এছাড়াও পড়ুন:
গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ ও ‘মব’
ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রধানতম লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিজমের বিনাশ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। একনায়তান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এবং ভিন্নমত দমনপীড়নকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বন্দুকের সামনে বুক পেতে দেওয়া ছাত্রছাত্রীদের সমর্থনে ফুঁসে উঠেছিল বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনসাধারণ।
নিজেদের অপরাজেয় মনে করা শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে মুক্ত অনুভব নিয়ে রাজপথে নেমে পড়া মানুষের আনন্দ আর উল্লাস জানিয়ে দেয়, কতটা শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান হয়েছে সেদিন।
কিন্তু বাংলাদেশের ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! এই মুক্তির আনন্দ বিষাদে পরিণত হয় নব্য ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। এরা মাইকে ঘোষণা দিয়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বাড়িঘর লুটপাট করে ও জ্বালিয়ে দেয়। হিজড়া পল্লির সবকিছু লুট ও ভস্মীভূত করে। দরিদ্র, উপায়হীন যৌনকর্মীদের ওপর আক্রমণ করতে থাকে। অনেক মাজার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। এই সব কিছু জায়েজ করার জন্য সামনে টেনে আনে ধর্মকে।
অনুমান ছিল, এসব থেমে যাবে। কারণ নিষ্পেষিত মানুষের ক্ষোভ নানাভাবে প্রকাশিত হয়। এই সহিংসতা খুব অস্বাভাবিক নয় হয়তো। দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। কিন্তু ধর্মের নামে সন্ত্রাসের সমর্থক বাংলাদেশি কমই দেখা যায়। ধারণা ছিল, শত শত শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আর কেউ এখানে আগের মতো মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না। অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা শক্ত হাতেই প্রতিষ্ঠা করবে। বহুত্ববাদই হবে এই রাষ্ট্রের মূলমন্ত্র। অর্থাৎ এখানে বহু মত-পথ, দল-গোষ্ঠীর মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত এবং ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণু হবে। মতপ্রকাশের কারণে কাউকে সন্ত্রস্ত বোধ করতে হবে না; গ্রেপ্তার হতে হবে না। অথচ ফ্যাসিস্ট শাসনের পতনের ছয় মাস পরও ফ্যাসিজম তার অস্তিত্ব জানান দিয়ে চলেছে। জনসাধারণের মুখাবয়বে ভীতি ও উদ্বেগের চিত্র স্পষ্ট ও ক্রমবর্ধমান। যখন জাতি অপেক্ষা করছে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার এবং একটি দুর্নীতিমুক্ত, বহুত্ববাদী বাংলাদেশের জন্য, তখন একটি মহল ‘তৌহিদি জনতা’র পরিচয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে।
এদের রোষের শিকার কেবল মাজারপন্থি, নারী ও জেন্ডার বৈচিত্র্যের মানুষই নয়; এরা মূলত আক্রমণ করতে শুরু করেছে এ দেশের ঐতিহ্যবাহী, আত্মপরিচয় প্রকাশক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর। সম্প্রতি মধুপুর উপজেলায় একটি গোষ্ঠীর চাপে বন্ধ করতে হয়েছে লালন উৎসব। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে বসন্ত ও ভালোবাসা দিবসে ফুল বিক্রি করায় তারা ভাঙচুর করেছে ফুলের দোকান। ভয় ও ত্রাসে গোপালপুর উপজেলায় বন্ধ হয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী ঘুড়ি উৎসব। এর আগে দিনাজপুর ও জয়পুরহাটে নারীদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করতে আক্রমণ চালানো হয়েছে খেলার মাঠে। অথচ সাম্প্রতিক ক্রীড়াঙ্গনে নারী ফুটবল দলই দেশের জন্য গৌরব ছিনিয়ে এনেছে।
এসব ঘটনা মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। ফলে নানা অজুহাতে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা সংঘবদ্ধ জনতার সন্ত্রাস আশকারা পেয়েছে। ইতোমধ্যে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডের শড়াতলা ইউনিয়নে গ্রামজুড়ে নোটিশ দিয়ে বাদ্যযন্ত্র এবং ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ মানুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল! এ নির্দেশ অমান্য করলে শাস্তির হুমকিও দেওয়া হয়েছে। একই এলাকার দৌলতপুর ইউনিয়নের ফতেহপুর গ্রামেও গান-বাজনার ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। সেখানে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ঐতিহ্যবাহী সংগীতচর্চা কেন্দ্রের কার্যক্রম।
নারীদের স্বাধীন ও নিরাপদ চলাফেরায় বাধা দেওয়ার মতো মব সন্ত্রাসের ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটতে দেখা যাচ্ছে। এমনকি স্কুলের সামনে চায়ের দোকানে নারীদের কাছে চা বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করার ঘটনাও ঘটছে। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, বহুত্ববাদের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অন্তর্বর্তী সরকার এবং জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত নায়ক যে ছাত্রসমাজ, তারা সবকিছু দেখেশুনে নীরব ভূমিকা পালন করছে।
এ রকম আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর উত্থান নতুন– তা বলা যাবে না। ফ্যাসিবাদী শাসক শেখ হাসিনার প্রশ্রয়েই এরা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এ ধরনের গোষ্ঠীগত আধিপত্যবাদ গণতন্ত্রের জন্য সুবিশাল হুমকি; বহুত্ববাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। বেশ কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, দেশের গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া পর্যন্ত এই ‘মব’ প্রভাবিত। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পেছনের দিনগুলো মনে রাখতে হবে আমাদের। এ দেশের মানুষ সহনশীল। শান্তিকামী মানুষ প্রথমে মেনে নেয়, পর্যবেক্ষণ করে। তারপর কিন্তু ঠিকই রুখে দাঁড়ায় অন্যায় ও অপতৎপরতার বিরুদ্ধে। দেশবাসী আর এমন সংঘাতময় পরিস্থিতি কামনা করে না।
বর্তমান পরিস্থিতি শুধুই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকট নয়; দেশকে অধিকতর রাজনৈতিক সংকটের দিকেও নিয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে; বিশেষত ভারতীয় প্রোপাগান্ডা মেশিনগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। বহুত্ববাদের পথে এগোতে চাওয়া বাংলাদেশকে পথচ্যুত করার গভীর ফাঁদ হিসেবেই দেখতে হবে এসব আধিপত্যবাদী তৎপরতাকে। বৃহত্তর সমাজে বহুত্ববাদী ভাবনার সুরক্ষা দিতে না পারলে প্রকৃত মুক্তি আসবে না। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাদেরও সক্রিয় হতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, গভীর পঠন-পাঠন থেকে ছাত্র আন্দোলনের নেতারা নিশ্চয় উপলব্ধি করেন, এ অঞ্চলে ধর্মকে ব্যবহার করে অপরাজনীতি যতটা করা হয়েছে, ধর্ম ততটা প্রয়োগ করা হয়নি দুর্নীতিমুক্ত, বাজার সিন্ডিকেটমুক্ত, মুনাফাখোরমুক্ত, বৈষম্যমুক্ত সাম্য ও শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠায়। এ দেশে আজও রমজান মাস আসে বাজারের দুশ্চিন্তা নিয়ে। কারও পাতের ইফতার উপচে পড়ে, কেউ ক্ষুধা নিবারণে পর্যাপ্ত ইফতার পায় না।
ধর্মের গভীর মানবিক অনুভবের চেয়ে ধর্মের বাহ্যিক অনুভূতিকে ইস্যু বানানোর বিপদ নিশ্চয় সবাই উপলব্ধি করেন। নতুন প্রজন্ম যারা প্রাণ দিয়ে, রক্ত দিয়ে, বিকলাঙ্গতা মেনে নিয়ে ফ্যাসিস্টের পতন ঘটিয়েছে, তারাই বাংলাদেশকে এমন ভয়ানক বিভাজনের পথ থেকে সরিয়ে গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ ও ঐক্যের পথে পরিচালিত করবে।
নূরুননবী শান্ত: গল্পকার, ফোকলোর গবেষক