শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশু সামিয়া আক্তার এখন নরসিংদীর ভেলানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। অথচ পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুটি অন্য শিশুদের সঙ্গে বাড়ির বাইরে খেলাধুলা ও চলাফেরা করতে পারত না। শিশুটির দাদি রহিমা বেগম বললেন, এক শিক্ষকের নজরে আসার পর তিনি সামিয়াকে বাড়িতে থেরাপি দিয়ে ও পড়াশোনা করিয়ে বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রস্তুত করেন। এখন সামিয়া একাই বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতে পারে। একীভূত শিক্ষার সুফলের বড় একটি উদাহরণ সামিয়া। গতকাল বুধবার সাইটসেভার্স ও প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে দাদির সঙ্গে এসেছিল সামিয়া।

‘প্রতিবন্ধী শিশুদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তি: সম্ভাবনা, বাস্তবতা ও করণীয়’ শিরোনামের গোলটেবিল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে। বৈঠকে বক্তারা বলেন, পরিবার ও সমাজের উদাসীনতা এবং মূলধারায় একীভূত শিক্ষার সুযোগ না পাওয়ার কারণে অনেক প্রতিবন্ধী শিশু শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে। একীভূত শিক্ষায় সব ধরনের প্রতিবন্ধী শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করতে অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা, শিক্ষা কার্যক্রমে সহায়ক উপকরণ ও যন্ত্রের অভাব, শিক্ষক প্রশিক্ষণের দুর্বলতা মোকাবিলা করতে হবে এবং সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। তাঁরা প্রতিবন্ধিতা নিয়ে কাজ করার জন্য সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং কে কোন দায়িত্ব পালন করবে, তার জন্য নির্দেশিকা তৈরির ওপর জোর দেন।

বৈঠকে বলা হয়, দেশে প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা ৫ লাখ ২৪ হাজার ২৮৮। এর মধ্যে মেয়েশিশু ২ লাখ ৭ হাজার ৮৫৮। গত বছর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্‌-প্রাথমিক শাখায় ২৫ হাজার ৫৬৪ প্রতিবন্ধী শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ছেলেশিশু ১৪ হাজার ৪৫৯ জন এবং ১১ হাজার ১০৫ জন মেয়েশিশু।

জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (পরিকল্পনা, উন্নয়ন) ফজলে ছিদ্দীক মো.

ইয়াহিয়া বলেন, ‘একীভূত শিক্ষাব্যবস্থার জন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে দাতব্য ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে অধিকারভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে।’ তিনি জানান, সারা দেশে ফাউন্ডেশন ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সহায়তা কেন্দ্র পরিচালনা করছে। সব উপজেলায় সেবাকেন্দ্র স্থাপন ও ১০ হাজার জনবল নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে ফাউন্ডেশন।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (পিইডিপি-৪) মো. ফরহাদ আলম বলেন, পিইডিপি–৪–এ ১ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে ৯৮ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষিত শিক্ষকেরা যেন প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতি সহনশীলতা দেখান, সেই প্রত্যাশা রয়েছে। অনেক স্কুল প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের নিতে চায় না। এসব বিষয়ে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করতে হবে। আসন্ন পিইডিপি–৫–এ শিশুদের শারীরিক–মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও কল্যাণের বিষয়গুলো আরও জোরদার করা হবে বলে তিনি জানান।

উপাত্ত সংগ্রহের ওপর জোর দিয়ে ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনের সামাজিক উন্নয়ন উপদেষ্টা তাহেরা জাবিন বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেসব প্রতিবন্ধী শিশু পড়ছে না, তাদের কতজন শিক্ষা নিচ্ছে, কতজন শিক্ষার বাইরে রয়েছে—সে উপাত্ত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এ বছর জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠেয় বৈশ্বিক প্রতিবন্ধিতা সম্মেলনে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অঙ্গীকার কী হবে তা নিয়ে করণীয় ঠিক করা প্রয়োজন।

সাইটসেভার্সের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃতা রেজিনা রোজারিও বলেন, প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়হীনতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যতটুকু সম্পদ রয়েছে, তার মধ্য থেকে অগ্রাধিকার ঠিক করে কাজ করা দরকার। ২০১৮ ও ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক প্রতিবন্ধিতা সম্মেলনে যথাক্রমে ৮টি ও ১১টি অঙ্গীকার করেছিল বাংলাদেশ। সেই অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তা জানা দরকার। প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষাদানে শিক্ষকদের মধ্যে যেন সক্ষমতা গড়ে ওঠে, সে লক্ষ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

ইউনিসেফের শিশুবিশেষজ্ঞ লায়লা ফারহানা আপনান বানু বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষায় যাওয়ার ক্ষেত্রে মানসিকতা ও সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। যথাযথ উপাত্ত না থাকলে কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া কঠিন। মৃদু মাত্রার প্রতিবন্ধিতা যাদের রয়েছে, তারা মূলধারার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে সব ধরনের প্রতিবন্ধিতাকে মূলধারায় আনার সক্ষমতা নেই। কোন শিশু শিক্ষার্থীর কী ধরনের প্রতিবন্ধিতা রয়েছে, তা শনাক্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার—শুধু শিক্ষকের ওপর নির্ভর করলে হবে না।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষা কর্মকর্তা (তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ) মো. শরীফ উল ইসলাম বলেন, প্রতিটি শিশুর ইউনিক আইডি (একক পরিচয়পত্র) দেওয়ার কাজ শেষ হলে প্রতিবন্ধী শিশুদের কারা পড়াশোনা করছে, কারা পড়াশোনার বাইরে রয়ে গেছে, তা নির্ণয় করা সম্ভব হবে। শারীরিক, বাক্‌, শ্রবণ, অন্যান্যসহ মোট ১২ ধরনের প্রতিবন্ধিতার শ্রেণিবিভাগ করা থাকলেও ৭টির বেশি শনাক্ত হচ্ছে না স্কুলে। বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি বা এপিএসসি ফরম পূরণের সময় শিক্ষকেরা প্রতিবন্ধিতার ধরন বুঝতে না পেরে অনেক সময় অন্যান্য শ্রেণিবিভাগভুক্ত করে ফেলেন শিশুকে।

অনুষ্ঠানে সাইটসেভার্সের কারিগরি বিশেষজ্ঞ (একীভূত শিক্ষা) এওয়ানা মার্জিয়া মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন এডিডি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ কর্মসূচি দলের প্রধান (প্রোগ্রাম টিম লিড) গোলাম ফারুক হামিম, উইনরক ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক রনক চন্দ্র মোহন্ত, সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের (সিডিডি) জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী মো. জাহাঙ্গীর আলম, নরসিংদী জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মাসুদুল হাসান তাপস, নরসিংদীর ফারুক আজিজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জয়শ্রী সাহা, রাইটস অ্যান্ড এমপাওয়ারমেন্টের প্রেসিডেন্ট মো. মোতাহার হোসেন এবং সাইটসেভার্সের ব্যবস্থাপক মৃণাল কান্তি দাস।

গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: এক ভ ত শ ক ষ স ইটস ভ র স ব যবস থ র জন য অন ষ ঠ সরক র

এছাড়াও পড়ুন:

গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ ও ‘মব’

ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রধানতম লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিজমের বিনাশ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। একনায়তান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এবং ভিন্নমত দমনপীড়নকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বন্দুকের সামনে বুক পেতে দেওয়া ছাত্রছাত্রীদের সমর্থনে ফুঁসে উঠেছিল বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনসাধারণ।

নিজেদের অপরাজেয় মনে করা শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে মুক্ত অনুভব নিয়ে রাজপথে নেমে পড়া মানুষের আনন্দ আর উল্লাস জানিয়ে দেয়, কতটা শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান হয়েছে সেদিন। 

কিন্তু বাংলাদেশের ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! এই মুক্তির আনন্দ বিষাদে পরিণত হয় নব্য ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। এরা মাইকে ঘোষণা দিয়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বাড়িঘর লুটপাট করে ও জ্বালিয়ে দেয়। হিজড়া পল্লির সবকিছু লুট ও ভস্মীভূত করে। দরিদ্র, উপায়হীন যৌনকর্মীদের ওপর আক্রমণ করতে থাকে। অনেক মাজার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। এই সব কিছু জায়েজ করার জন্য সামনে টেনে আনে ধর্মকে। 

অনুমান ছিল, এসব থেমে যাবে। কারণ নিষ্পেষিত মানুষের ক্ষোভ নানাভাবে প্রকাশিত হয়। এই সহিংসতা খুব অস্বাভাবিক নয় হয়তো। দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। কিন্তু ধর্মের নামে সন্ত্রাসের সমর্থক বাংলাদেশি কমই দেখা যায়। ধারণা ছিল, শত শত শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আর কেউ এখানে আগের মতো মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না। অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা শক্ত হাতেই প্রতিষ্ঠা করবে। বহুত্ববাদই হবে এই রাষ্ট্রের মূলমন্ত্র। অর্থাৎ এখানে বহু মত-পথ, দল-গোষ্ঠীর মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত এবং ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণু হবে। মতপ্রকাশের কারণে কাউকে সন্ত্রস্ত বোধ করতে হবে না; গ্রেপ্তার হতে হবে না। অথচ ফ্যাসিস্ট শাসনের পতনের ছয় মাস পরও ফ্যাসিজম তার অস্তিত্ব জানান দিয়ে চলেছে। জনসাধারণের মুখাবয়বে ভীতি ও উদ্বেগের চিত্র স্পষ্ট ও ক্রমবর্ধমান। যখন জাতি অপেক্ষা করছে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার এবং একটি দুর্নীতিমুক্ত, বহুত্ববাদী বাংলাদেশের জন্য, তখন একটি মহল ‘তৌহিদি জনতা’র পরিচয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে। 

এদের রোষের শিকার কেবল মাজারপন্থি, নারী ও জেন্ডার বৈচিত্র্যের মানুষই নয়; এরা মূলত আক্রমণ করতে শুরু করেছে এ দেশের ঐতিহ্যবাহী, আত্মপরিচয় প্রকাশক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর। সম্প্রতি মধুপুর উপজেলায় একটি গোষ্ঠীর চাপে বন্ধ করতে হয়েছে লালন উৎসব। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে বসন্ত ও ভালোবাসা দিবসে ফুল বিক্রি করায় তারা ভাঙচুর করেছে ফুলের দোকান। ভয় ও ত্রাসে গোপালপুর উপজেলায় বন্ধ হয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী ঘুড়ি উৎসব। এর আগে দিনাজপুর ও জয়পুরহাটে নারীদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করতে আক্রমণ চালানো হয়েছে খেলার মাঠে। অথচ সাম্প্রতিক ক্রীড়াঙ্গনে নারী ফুটবল দলই দেশের জন্য গৌরব ছিনিয়ে এনেছে। 

এসব ঘটনা মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। ফলে নানা অজুহাতে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা সংঘবদ্ধ জনতার সন্ত্রাস আশকারা পেয়েছে। ইতোমধ্যে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডের শড়াতলা ইউনিয়নে গ্রামজুড়ে নোটিশ দিয়ে বাদ্যযন্ত্র এবং ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ মানুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল! এ নির্দেশ অমান্য করলে শাস্তির হুমকিও দেওয়া হয়েছে। একই এলাকার দৌলতপুর ইউনিয়নের ফতেহপুর গ্রামেও গান-বাজনার ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। সেখানে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ঐতিহ্যবাহী সংগীতচর্চা কেন্দ্রের কার্যক্রম। 

নারীদের স্বাধীন ও নিরাপদ চলাফেরায় বাধা দেওয়ার মতো মব সন্ত্রাসের ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটতে দেখা যাচ্ছে। এমনকি স্কুলের সামনে চায়ের দোকানে নারীদের কাছে চা বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করার ঘটনাও ঘটছে। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, বহুত্ববাদের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অন্তর্বর্তী সরকার এবং জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত নায়ক যে ছাত্রসমাজ, তারা সবকিছু দেখেশুনে নীরব ভূমিকা পালন করছে। 

এ রকম আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর উত্থান নতুন– তা বলা যাবে না। ফ্যাসিবাদী শাসক শেখ হাসিনার প্রশ্রয়েই এরা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এ ধরনের গোষ্ঠীগত আধিপত্যবাদ গণতন্ত্রের জন্য সুবিশাল হুমকি; বহুত্ববাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। বেশ কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, দেশের গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া পর্যন্ত এই ‘মব’ প্রভাবিত। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পেছনের দিনগুলো মনে রাখতে হবে আমাদের। এ দেশের মানুষ সহনশীল। শান্তিকামী মানুষ প্রথমে মেনে নেয়, পর্যবেক্ষণ করে। তারপর কিন্তু ঠিকই রুখে দাঁড়ায় অন্যায় ও অপতৎপরতার বিরুদ্ধে। দেশবাসী আর এমন সংঘাতময় পরিস্থিতি কামনা করে না। 

বর্তমান পরিস্থিতি শুধুই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকট নয়; দেশকে অধিকতর রাজনৈতিক সংকটের দিকেও নিয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে; বিশেষত ভারতীয় প্রোপাগান্ডা মেশিনগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। বহুত্ববাদের পথে এগোতে চাওয়া বাংলাদেশকে পথচ্যুত করার গভীর ফাঁদ হিসেবেই দেখতে হবে এসব আধিপত্যবাদী তৎপরতাকে। বৃহত্তর সমাজে বহুত্ববাদী ভাবনার সুরক্ষা দিতে না পারলে প্রকৃত মুক্তি আসবে না। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাদেরও সক্রিয় হতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, গভীর পঠন-পাঠন থেকে ছাত্র আন্দোলনের নেতারা নিশ্চয় উপলব্ধি করেন, এ অঞ্চলে ধর্মকে ব্যবহার করে অপরাজনীতি যতটা করা হয়েছে, ধর্ম ততটা প্রয়োগ করা হয়নি দুর্নীতিমুক্ত, বাজার সিন্ডিকেটমুক্ত, মুনাফাখোরমুক্ত, বৈষম্যমুক্ত সাম্য ও শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠায়। এ দেশে আজও রমজান মাস আসে বাজারের দুশ্চিন্তা নিয়ে। কারও পাতের ইফতার উপচে পড়ে, কেউ ক্ষুধা নিবারণে পর্যাপ্ত ইফতার পায় না। 

ধর্মের গভীর মানবিক অনুভবের চেয়ে ধর্মের বাহ্যিক অনুভূতিকে ইস্যু বানানোর বিপদ নিশ্চয় সবাই উপলব্ধি করেন। নতুন প্রজন্ম যারা প্রাণ দিয়ে, রক্ত দিয়ে, বিকলাঙ্গতা মেনে নিয়ে ফ্যাসিস্টের পতন ঘটিয়েছে, তারাই বাংলাদেশকে এমন ভয়ানক বিভাজনের পথ থেকে সরিয়ে গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ ও ঐক্যের পথে পরিচালিত করবে।

নূরুননবী শান্ত: গল্পকার, ফোকলোর গবেষক

সম্পর্কিত নিবন্ধ