শেয়ারবাজারকে রাজনৈতিকভাবে শোষণ করা হয়েছে: আমীর খসরু
Published: 26th, February 2025 GMT
‘অতীতে বাংলাদেশের কোনো সরকারই শেয়ারবাজারকে অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে ধারণ (ওউন) করেনি। এ কারণে শেয়ারবাজার সব সরকারের আমলে কমবেশি অবহেলিত ছিল। আর আওয়ামী লীগ সরকার শেয়ারবাজারকে রাজনৈতিকভাবে শোষণ করেছে। আগামী দিনে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে আমরা শেয়ারবাজারকে “ওউন” করব। এটিকে অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তির অবস্থানে নিয়ে আসা হবে।’
শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্রোকারেজ হাউস মালিকদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় কথাগুলো বলেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আজ বুধবার রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসই টাওয়ার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় তিনি প্রধান অতিথি ছিলেন।
আমীর খসরু মাহমুদ বলেন, দেশের স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানগুলো গত ১৫–১৬ বছরে রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা রাজনীতিকরণের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন না করে উল্টো রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেনি। আবার মাত্রাত্রিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে অবিশ্বাস্য রকমের দুর্নীতির বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। তাই আগামী দিনে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এলে এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শিথিল করা হবে।
ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলামের সঞ্চালনা ও সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ আলোচনায় সম্মানিত অতিথি ছিলেন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। প্যানেল আলোচক ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক ব্যাংক সুপারভাইজার সাবিদ সিদ্দিকী, ইংরেজি দৈনিক বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড–এর সম্পাদক ইনাম আহমেদ, অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইআরএফের সভাপতি দৌলত আকতার, পুঁজিবাজারবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন সিএমজেএফের সভাপতি গোলাম সামদানী।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা জহির উদ্দিন স্বপন, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ, ডিএসইর সাবেক পরিচালক আহমেদ রশিদ লালী প্রমুখ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন। আলোচনার শুরুতে শেয়ারবাজারের গত ১৫ বছরের পরিস্থিতি ও সমস্যা সমাধানে করণীয় বিষয়ে পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনা দেন ডিবিএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো.
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আমীর খসরু মাহমুদ বলেন, পুঁজিবাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ ওয়াচডগের। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংস্থাটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে একাকার হয়ে যাওয়ায় তারা ওয়াচডগ হিসেবে তাদের ভূমিকা পালন করেনি। একই অবস্থা ছিল ব্যাংক খাতেও। এ জন্য অর্থনীতির এই দুই খাতে বড় ধরনের লুটপাট ও কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। সর্বক্ষেত্রে যেভাবে ওভার রেগুলেশন বা মাত্রাতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, সেখান থেকে অর্থনীতিকে টেনে তুলতে হলে ডিরেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শিথিল করতে হবে। তা না হলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে না।
বর্তমান পুঁজিবাজারসহ সব ক্ষেত্রে বিনিয়োগের জন্য বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিক সরকারের অপেক্ষায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ছাড়া বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আস্থা পাবেন না। তাই যত তাড়াতাড়ি নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হবে, বিনিয়োগকারীদের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ ততই সুবিধাজনক হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শেয়ারবাজার লুটপাটকারীদের বিচার নিশ্চিত করারও দাবি জানান বিএনপির শীর্ষস্থানীয় এই নেতা। তিনি বলেন, যারা বাজারে কারসাজি করেছে, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অর্থ লুটপাট করেছে, তাদের বিচার করতেই হবে। তাদের বিচারের মাধ্যমেই শেয়ারবাজারে নতুন দিনের সূচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্রোকারেজ হাউস মালিকদেরও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, পুঁজিবাজারের সুশাসন এখন প্রশ্নবিদ্ধ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির গত দুই কমিশন নিয়ে নানা কথা শোনা যায়। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও শোনা যায়, যা দুঃখজনক। প্রশ্নবিদ্ধ নানা কোম্পানিকে তারা বাজারে এনেছে। অনেক ক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জের মতামতকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সেসব কোম্পানি এখন বাজারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে বাজার অংশীজনদের সঙ্গে যে দূরত্ব থাকার কথা, তা গত কমিশনের সময় হারিয়ে গেছে। বিদেশে রোড শোর নামে পিকনিক করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিষ্ঠান একে অপরের বন্ধু হয়ে গেছে।
ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী আরও বলেন, অর্থনীতিতে গতি না ফিরলে শেয়ারবাজারেও গতি আসবে না। নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার না আসা পর্যন্ত বেসরকারি খাত বিনিয়োগ করবে না। আর বেসরকারি বিনিয়োগ না বাড়লে পুঁজিবাজারও সমৃদ্ধ হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক কর্মকর্তা সাবিদ সিদ্দিকী বলেন, পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের আস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর আস্থার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় তথ্যের সত্যতা। কোম্পানিগুলো যে তথ্য দেয় তা যদি যথাযথ না হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চিড় ধরে। আর তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে হলে কোম্পানির নিরীক্ষকদের আরও বেশি তদারকি ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এ ছাড়া শেয়ারবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে অনিয়ম, দুর্নীতিসহ যেসব ‘মোরাল হেজার্ড’ আছে, সেগুলো দূর করতে হবে।
অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের মতো ছোট একটা বাজারে এত বেশি তদন্ত ও তদন্ত কমিটি হয়, যা বিশ্বের আর কোনো দেশে হয় না। গত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মাধ্যমে যে ‘অলিগার্ক’ শ্রেণিগোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল, তার উদাহরণ শেয়ারবাজারও। এই বাজারে বিনিয়োগের নানা গল্প তৈরি করে শেয়ারের দাম বাড়ানো ও কমানোর মতো ঘটনা ঘটেছে। আর এটি সম্ভব হয়েছে কোম্পানিগুলোতে আত্মীয়স্বজনদের স্বতন্ত্র পরিচালক করে রাখায়।
বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড সম্পাদক ইনাম আহমেদ বলেন, শেয়ারবাজারকে রাজনীতিকরণের বাইরে রাখতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে বাজারের স্বচ্ছতা। আর বাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে মিডিয়াকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, গত ১৫ বছরে স্টক এক্সচেঞ্জ পরিচালনায় স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের নামে রাজনীতিকরণ করা হয়েছে। ডিমিউচুয়ালাইজেশনের (মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা আলাদা করা) নামে রিমিউচুয়ালাইজড হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের পছন্দের লোকদের পরিচালক পদে বসিয়েছে। ফলে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির বদলে আরও দুর্বল হয়েছে।
উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: স বতন ত র প র জন ত ক ব ন শ চ ত কর সরক র র ব যবস থ ক আহম দ ব এসইস ন ত কর র সময় ব এনপ
এছাড়াও পড়ুন:
খান ব্রাদার্সের শেয়ার কারসাজি, এবাদুল চক্রকে ৮৬ লাখ অর্থদণ্ড
পুঁজিবাজারে বস্ত্র খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের শেয়ার কারসাজির অভিযোগে ৮ ব্যক্তি ও ৩ প্রতিষ্ঠানকে মোট ৮৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ কারসাজিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বিকন ফার্মারসিউটিক্যালস পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এম) মোহাম্মদ এবাদুল করিমসহ তার সহযোগিরা।
২০২৩ সালের ৫ মার্চ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত এবং একই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে মোহাম্মদ এবাদুল করিমসহ তার সহযোগিরা খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্টিজের শেয়ারের দাম বাড়ায়। বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত সাপেক্ষে কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় এনেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
শেয়ার কারসাজিতে সহযোগীদের মধ্যে রয়েছেন-এবাদুল করিমের দুই সন্তান, তার তিন প্রতিষ্ঠান এবং চার ব্যক্তি বিনিয়োগকারী। একে অপরের সঙ্গে যোগসাজস করে কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকার মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছেন।
আরো পড়ুন:
পুঁজিবাজারে সূচকের বড় উত্থান, বেড়েছে লেনদেন
সিএসইতে যোগ দিলেন জামাল ইউসুফ
সম্প্রতি বিএসইসির খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসইসির একাধিক কর্মকর্তা এ তথ্য রাইজিংবিডি ডটকমকে নিশ্চিত করেছেন।
পুঁজিবাজারে কয়েক বছর ধরে গুঞ্জন ছিল-খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার নিয়ে কারসাজি চলছে। কোম্পানির ব্যবসা ও আর্থিক অবস্থার উন্নতির কারণে নয়, বরং কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারের দাম বাড়ানো হয়েছে। অবশেষে তদন্ত সাপেক্ষে কোম্পানির শেয়ার কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে বলে বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে।
বিগত সরকারের আমলে আইন লঙ্ঘন করা শেয়ার কারসাজির বিরুদ্ধে তেমন কোনো কঠোর ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুনর্গঠিত বিএসইসির খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন যেকোনো ধরনের কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে ১২ নভেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত সময়ে বস্ত্র খাতের কোম্পানি খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্টিজের শেয়ারের দাম কারসাজি করে বাড়ানোর দায়ে সাত ব্যক্তি ও তিন প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদ এবাদুল করিমকে ৭ লাখ টাকা, তার মেয়ে রিসানা করিমকে ৮ লাখ টাকা, তার প্রতিষ্ঠান বিকন ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডকে ৬ লাখ টাকা, বিকন ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড ইমপ্লোয়িজ সিপিএফকে ৭ লাখ টাকা, বিকন মেডিকেয়ারকে ৭ লাখ টাকা, ব্যক্তি বিনিয়োগকারী মো. সোহেল আলমকে ৬ লাখ টাকা, আক্তার হোসেনকে ১ লাখ টাকা, মো. মিজানুর রহমানকে ৫ লাখ টাকা, মো. নাসির উদ্দিন আকন্দকে ১ লাখ টাকা এবং আজাদ হোসেন পাটোয়ারীকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সে হিসেবে আলোচ্য সময়ে শেয়ার কারসাজির জন্য মোট ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এদিকে, ৫ মার্চ ২০২৩ থেকে ১৩ জুলাই ২০২৩ পর্যন্ত সময়ে কোম্পানির শেয়ারের দাম কারসাজি করে বাড়ানোর দায়ে তিন ব্যক্তি ও তিন প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদ এবাদুল করিমকে ৬ লাখ টাকা, তার মেয়ে রিসানা করিমকে ৬ লাখ টাকা, তার ছেলে উলফাত করিমকে ৬ লাখ টাকা, তার প্রতিষ্ঠান বিকন ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডকে ৬ লাখ টাকা, বিকন ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড ইমপ্লোয়িজ সিপিএফকে ৬ লাখ টাকা এবং বিকন মেডিকেয়ারকে ৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সে হিসেবে আলোচ্য সময়ে শেয়ার কারসাজির জন্য মোট ৩৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
কারসাজিতে জড়িতদের পরিচিতি
বিকন ফার্মারসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ এবাদুল করিম। তিনি বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। তিনি ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ব্রাক্ষণবাড়িয়া-৫ আসনে নির্বাচিত হন। ওরিয়ন গ্রুপের কোম্পানিগুলোর পর্ষদে তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এবাদুল করিমের ছেলে উলফাত করিম। তিনি কোম্পানির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর তার মেয়ে রিসানা করিম। তিনি কোম্পানির ম্যানেজমেন্টে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এর আগে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি ওরিয়ন ইনফিউশন লিমিটেডের শেয়ার কারসাজি করার দায়ে মোহাম্মদ এবাদুল করিমকে বড় অংকের জরিমানা করা হয়। একইসঙ্গে বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান ও তার স্ত্রী নুরুন নাহার, তার মেয়ে ও তার নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বড় অংকের জরিমানা করা হয়।
বিএসইসির তদন্ত কার্যক্রম
২০২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে মোহাম্মদ এবাদুল করিমসহ সাত ব্যক্তি ও তিন প্রতিষ্ঠান যোগসাজশ করে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্টিজের শেয়ার লেনদেন করে। কারসাজিকারীরা কোম্পানির শেয়ার যোগসাজস করে দাম বাড়ায়। আলোচ্য সময়ের মধ্যে কোম্পানির শেয়ারের দাম ২০.৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২ টাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তবে ওই মাসে কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে সর্বোচ্চ ৭২ টাকায় অবস্থান নেয়। ফলে আলোচ্য সময়ে কোম্পানির শেয়ারের দাম ৫১.৭০ টাকা বা ২৫৪.৬৮ শতাংশ বাড়ে।
এছাড়া ২০২৩ সালের ৫ মার্চ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত সময়ে মোহাম্মদ এবাদুল করিমসহ তিন ব্যক্তি ও তিন প্রতিষ্ঠান যোগসাজশ করে একই কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ায়। আলোচ্য সময়ের মধ্যে কোম্পানির শেয়ারের দাম ১০.২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৯.৩০ টাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তবে ওই মাসে কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে সর্বোচ্চ ৩৮.৯০ টাকায় অবস্থান নেয়। ফলে আলোচ্য সময়ে কোম্পানির শেয়ারের দাম ২৮.৭০ টাকা বা ২৮১.৩৭ শতাংশ বাড়ে।
বিএসইসির সিদ্ধান্ত
৫ মার্চ ২০২৩ থেকে ১৩ জুলাই ২০২৩ পর্যন্ত এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে ১২ নভেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত সময়ে পুঁজিবাজারে বস্ত্র খাতে তালিকাভুক্ত খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্টিজ লিমিটেডের শেয়ার কারসাজি করে সিকিউরিটির অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এর সেকশন ১৭(ই)(২) ও ১৭(ই)(২)(৫) লঙ্ঘন এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শেয়ার অর্জন করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শেয়ার অর্জন, অধিগ্রহণ ও কর্তৃত্ব গ্রহণ) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৪(১) লঙ্ঘনের দায়ে বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ এবাদুল করিম, তার দুই সন্তান, তার তিন প্রতিষ্ঠান এবং চার ব্যক্তিকে জরিমানা করা হয়েছে।
এছাড়া উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শেয়ার অর্জন করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শেয়ার অর্জন, অধিগ্রহণ ও কর্তৃত্ব গ্রহণ) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৪(১) লঙ্ঘনের দায়ে মো. নাসির উদ্দিন আকন্দ ও আজাদ হোসেন পাটোয়ারীকে সতর্ক করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ২০১৪ সালে। ‘বি’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। সে হিসাবে কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ৯ কোটি ৮০ লাখ ৮ হাজার। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ৩৭.৪৭ শতাংশ, প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ২.৯৩ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৫৯.৬০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার সর্বশেষ ১৫৭.১০ টাকায় লেনদেন হয়েছে।
ঢাকা/এনটি/এসবি