ব্যানারে নেতার নাম না দেওয়ার জের বিএনপির দু’পক্ষে সংঘর্ষ, আহত ১০
Published: 26th, February 2025 GMT
বরগুনার বেতাগীতে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যানারে সাবেক বিএনপি নেতার নাম না দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
গতকাল মঙ্গলবার রাতে বেতাগী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বেতাগী পৌরশহরে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
সংঘর্ষে গুরুতর আহতরা হলেন– উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো.
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বেতাগী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বেতাগী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির মল্লিক। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গভর্নিং বডির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বশির গাজী। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলাকালে উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শাহজাহান কবিরের ছেলে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক শোয়েব কবির অনুষ্ঠানে এসে উপস্থিত হন। তিনি অনুষ্ঠানের ব্যানারে তাঁর বাবার নাম দেখতে না পেয়ে ক্ষিপ্ত হন। খবর পেয়ে শাহজাহান কবির তার লোকজন নিয়ে কলেজে প্রবেশ করে কলেজের বিভিন্ন কক্ষ ভাঙচুর করতে থাকেন। এক পর্যায়ে হুমায়ুন মল্লিকের নাকে ঘুষি দেন শাহজাহান কবির। এ খবর বাইরে ছড়িয়ে পড়লে হুমায়ুন মল্লিকের নেতাকর্মীরাও ঘটনাস্থলে জড়ো হতে শুরু করেন। এ সময় দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও কয়েক দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জামাল খান অভিযোগ করেন, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক শোয়েব কবির তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে যুবদলের নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিতভাবে হামলা করেছে।
এ বিষয়ে বেতাগী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. শাহিন বলেন, কলেজের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে শাহজাহান কবিরকে দাওয়াত কার্ড দিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে বর্তমানে কোনো দলীয় পদ না থাকায় অনুষ্ঠানের ব্যানারে তাঁর নাম রাখা হয়নি। এ কারণে তিনি ও তাঁর ছেলে শোয়েব কবির লোকজন নিয়ে কলেজে হামলা ও ভাঙচুর চালায়।
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. হুমায়ুন কবির মল্লিক বলেন, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহজাহান কবির ও তার ছেলে শোয়েব লোকজনের হামলায় তিনিসহ দলের কয়েকজন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। বিষয়টি দলের হাইকমান্ডকে জানানো হয়েছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে বেতাগী উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শাহজাহান কবির বলেন, ওই অনুষ্ঠানে তাঁর বড় ছেলের সঙ্গে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হুমায়ূন কবিরের লোকদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাঁর ছেলের মাথায় আঘাত করা হয়। এরপর উভয়পক্ষের পোলাপানের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বেতাগী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, এ ঘটনায় থানায় কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পৌর শহরে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: ব এনপ স ঘর ষ বরগ ন অন ষ ঠ ন র ন ত কর স ঘর ষ ত কর ম কল জ র উপজ ল
এছাড়াও পড়ুন:
একাকী মায়ের সন্তান বাক্প্রতিবন্ধী সেলিম আন্দোলনে হারালেন চোখ
‘ছেলেটা (সেলিম) যে কত কিছু খাইতে চাইত! কিনতে পারতাম না। মাংস পছন্দ করত। মাসে, দুই মাসে পারলে একবার মাংস কিইন্যা খাওয়াইছি। ছেলেটার চোখ নষ্ট হইয়া গেছে দেইখ্যা মনে এত কষ্ট লাগে যে খালি পুরান কথা মনে পড়ে। ছেলেটা জন্ম থ্যাইকাই কষ্ট করতেছে।’ কথাগুলো বলছিলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় এক চোখে গুলি লাগা সেলিমের মা সেলিনা খাতুন।
সেলিনা খাতুন ও সেলিম মিয়ার (১৮) সঙ্গে ১৭ মার্চ জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে কথা হয়। ওই সময় সেলিমের ফলোআপ চিকিৎসার জন্য তাঁকে নিয়ে হাসপাতালে ছিলেন সেলিনা।
সেলিনা খাতুন প্রথম আলোকে জানান, গত বছরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ১৮ জুলাই গাজীপুরে তাঁর ছেলে গুলিবিদ্ধ (ছররা গুলি) হন। ডান চোখে দুটি গুলি লেগেছিল, এর মধ্যে একটি বের করতে পেরেছেন চিকিৎসকেরা। সেলিমের ডান চোখে আলো ফিরে আসবে না, জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ডান চোখে প্রস্থেটিক আই (কৃত্রিম চোখ) স্থাপন করা হবে।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে অল্প সময় কথা বলে সেলিনা খাতুন ছেলের চোখের পরীক্ষার প্রতিবেদন আনার জন্য আরেক হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে পরে কথা হয়েছিল ২৮ মার্চ মুঠোফোনে। তবে সেদিন (১৭ মার্চ) ইশারায় সেলিম জানিয়েছিলেন, ডান চোখে তিনি কিছু দেখেন না। চোখে অনেক যন্ত্রণা হয়। তাঁর শরীরেও লেগেছিল ছররা গুলি।
হাসপাতালে নিজ শয্যায় বসে এই প্রতিবেদককে এক্স–রে, সিটি স্ক্যান বের করে দেখাচ্ছিলেন সেলিম। ওই ওয়ার্ডে গণ-অভ্যুত্থানে চোখে আঘাত পাওয়া আরও কয়েকজন রোগী ছিলেন। তাঁরা জানান, কথা বলতে না পারলেও সেলিম ওর গুলিবিদ্ধ হওয়া, অসুস্থতা, চিকিৎসার বিষয়গুলো সব বোঝাতে পারেন।
সেলিম কীভাবে গুলিবিদ্ধ হলেন, জানতে চাইলে তাঁর মা সেলিনা খাতুন (৩৩) বলেন, তাঁদের বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলায়। ১৫ বছর বয়সে জন্ম নেয় তাঁর প্রথম সন্তান সেলিম। তাঁর স্বামী তাইজুল ইসলাম রিকশাচালক ছিলেন। সেলিমের বয়স যখন আড়াই বছর, তখন তাইজুল ইসলাম তাঁদের ছেড়ে চলে যান। এরপর তিনি দিশাহারা হয়ে পড়েন। তাঁর মা–বাবাও খুব গরিব। পরে সংসার চালানোর জন্য গাজীপুরে চলে আসেন তিনি। রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেলিম গ্রামে অন্য শিশুদের সঙ্গে ব্র্যাক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। শিক্ষক তাঁকে আলাদাভাবে পড়া বোঝাতেন।
সেলিনা খাতুন আরও জানান, সংসারে অভাব থাকায় ও বাক্প্রতিবন্ধী হওয়ায় সেলিমকে বেশি পড়াশোনা করাতে পারেননি। আড়াই বছর আগে সেলিমকে তিনি তাঁর সঙ্গে কাজ করার ব্যবস্থা করেন। ১৮ জুলাই তিনি কাজে গেলেও সেলিম বাসায় ছিলেন। বেলা আড়াইটার সময় গাজীপুরের চৌরাস্তায় আন্দোলন চলাকালে সেলিম গুলিবিদ্ধ হন। তাঁর ডান চোখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছররা গুলি লাগে। ওই সময় পুলিশের ভয়ে তাঁরা হাসপাতালে নিতেও দেরি করেন। রাত ৮টার দিকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। আগস্টের প্রথম দিকে সেলিমকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নিয়ে আসেন। ওই দিন চিকিৎসকেরা জরুরি ভিত্তিতে সেলিমের ডান চোখে অস্ত্রোপচার করেন। এরপর ৬ ফেব্রুয়ারি ও ১০ মার্চ ওই চোখে আরও দুটি অস্ত্রোপচার করা হয়।
সেলিমের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক খায়ের আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ছররা গুলি সেলিমের ডান চোখ ভেদ করে গেছে। এ অবস্থায় যতবার অস্ত্রোপচার হবে, ততবার চোখের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেলিমের ডান চোখে দৃষ্টি নেই। লন্ডনের মুনফিল্ডস আই হাসপাতালের চিকিৎসকেরাও সেলিমকে দেখে গেছেন। এখন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চোখের ভেতর পরিষ্কার করে প্রস্থেটিক আই (কৃত্রিম চোখ) স্থাপন করা হবে।
চিকিৎসকেরা কৃত্রিম চোখ স্থাপনে অস্ত্রোপচারের কোনো সময় দিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে সেলিনা খাতুন বলেন, গত বৃহস্পতিবার তিনি গাজীপুরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় দুর্ঘটনার শিকার হন, পা ভেঙে গেছে। এ কারণে সেলিম বৃহস্পতিবার হাসপাতাল ছেড়ে বাসায় চলে এসেছেন। চিকিৎসকেরা বলেছেন, ঈদের পর তিনি যখন যেতে পারবেন, তখনই সেলিমের চোখে অস্ত্রোপচার করা হবে।