গতকাল মঙ্গলবার রাতে ঘটে গণপিটুনির দুটি ঘটনা। একটি রাজধানীর উত্তরায়, অন্যটি রাজধানী লাগোয়া গাজীপুরের টঙ্গীতে। দুটি ঘটনাতেই ‘ছিনতাইকারী’ সন্দেহে তিন ব্যক্তিকে স্থানীয় লোকজন দলবদ্ধ হয়ে পেটানো শুরু করেন।

উত্তরায় ছিনতাইকারী সন্দেহে দুই ব্যক্তিকে পিটিয়ে আহত করার পর পায়ে দড়ি বেঁধে পদচারী–সেতুর সঙ্গে তাঁদের উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই দুই ব্যক্তিকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করেছে। এই ব্যক্তিরা হলেন মো.

নাজিম (৪০) ও মো. বকুল (৩০)।

রাত ১০টার দিকে উত্তরা হাউসবিল্ডিং এলাকার বিএনএস সেন্টারের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

উত্তরার ঘটনায় কারও প্রাণ যায়নি। কিন্তু টঙ্গীতে ছিনতাইকারী সন্দেহে পিটুনিতে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে টঙ্গীর স্টেশন রোড এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে এ ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে নিহত ওই যুবকের নাম-ঠিকানা জানাতে পারেনি পুলিশ।

দুটি ঘটনাই বীভৎস। আর এসব ঘটনা বা পিটুনির ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েও দেওয়া হয়। উত্তরার ভিডিওতে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন এক ব্যক্তিকে ওপরে তুলছেন। তাঁর পায়ে দড়ি বাঁধা। তাঁকে পদচারী–সেতুর লোহার খুঁটির সঙ্গে উল্টো করে বাঁধছিলেন হলুদ রঙের টি-শার্ট পরা এক যুবক। আরও কয়েকজন ওই ব্যক্তিকে ওপরে তুলছিলেন।

এই নির্বিচার গণপিটুনি এবং তাতে হত্যা বাড়ছেই। একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে দেখা গেছে, গত বছরের আগস্ট থেকে বিগত ছয় মাসে এ ধরনের গণপিটুনির ঘটনা ও নিহত মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়েছে।

মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, গণপিটুনি বেড়ে যাওয়ার ঘটনা আইনশৃঙ্খলার অবনতির চিত্রকেই তুলে ধরে। দিনের পর দিন এসব ঘটনা বাড়লেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করছেন এসব ব্যক্তি।

দক্ষিণ এশিয়ার মানবাধিকারকর্মীদের সংগঠন সাউথ এশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটসের (সাহার) বাংলাদেশ ব্যুরো সদস্য সাঈদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, গণপিটুনি বেড়ে যাওয়ার ঘটনা আইন প্রয়োগ ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার চিত্র তুলে ধরে। কয়েক বছর ধরেই এ আস্থাহীনতা বেড়েছে। তবে আস্থাহীনতার কথা বলে কোনো গণপিটুনিকেই সমর্থন করা যায় না।

সাঈদ আহমেদ বলেন, আস্থাহীনতা থাকলেও তা যথাযথ আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে ঠিক করা যায়, কিন্তু তা করা হয়নি। এর দায় সরকারের।

কত মৃত্যু

মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের (২০২৪) আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত গণপিটুনিতে ১২১ জন নিহত হয়েছেন।

আরেক মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে গণপিটুনিতে সর্বোচ্চ নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে গত বছর। ২০২৪ সালে গণপিটুনিতে নিহত হন ১৪৬ জন, যা আগের বছরের প্রায় তিন গুণ। ২০২৩ সালে নিহত হয়েছিলেন ৫১ জন।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, গত ৫ আগস্টের পর ‘মব ভায়োলেন্স’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতার পরিমাণ বেড়ে গেছে। সরকার তা বন্ধ করতে তেমন পদক্ষেপ নেয়নি। কখনো কখনো কাউকে জোর করে কোনো পদ থেকে নামিয়ে দেওয়াসহ নানাভাবে ‘মবের’ সাহায্য নেওয়া হয়েছে। এ কারণেই বেড়েছে এসব মবকেন্দ্রিক সহিংসতা বা গণপিটুনি।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোও গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে উদ্বিগ্ন। গণপিটুনির মতো এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে তিনটি কারণ আছে বলে মনে করেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মো. সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, প্রথমত, এটি ঘটছে পরিকল্পিত উসকানির কারণে। সরকারের সহযোগী বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় কিছু ব্যক্তি এতে ইন্ধন জোগাচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা একটা বড় কারণ। হয়তো ইচ্ছা করেই এ বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। সর্বোপরি সরকারের উদাসীনতা ও কোনো পদক্ষেপ নিতে অনীহার কারণেই বেড়ে যাচ্ছে গণপিটুনির প্রবণতা।

গণপিটুনি আইনের দৃষ্টিতে ‘হত্যা’

উত্তরা ও টঙ্গীতে ছিনতাইকারী সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনার সঙ্গে অপরাধ বেড়ে যাওয়া এবং মানুষের অতিষ্ঠ হয়ে পড়ার যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। পুলিশের তথ্য বলছে, ছয় মাসে ডাকাতি ও দস্যুতার (ছিনতাই) ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৪৫টি, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি।

ডাকাতি ও দস্যুতা সাম্প্রতিক মাসগুলোয় আরও বেড়েছে। দেশে গত জানুয়ারিতে ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৪২টি, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৯টি বেশি (৬৯ শতাংশ)। ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় গত ডিসেম্বরে মামলা হয়েছে ২৩০টি, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৫টি (৭০ শতাংশ) বেশি।

অপরাধ–বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধের শিকার হওয়ার আতঙ্ক থেকে মানুষ আইন হাতে তুলে নিতে পারে। সেটা ঠেকাতে অপরাধ দমাতে হবে। আবার যাঁরা আইন হাতে তুলে নেন, তাঁদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

গণপিটুনি আইনের দৃষ্টিতে ‘হত্যা’ এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা হত্যাকারী হিসেবেই চিহ্নিত হন, এমনটাই মত দেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক। তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক পরিবেশ, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, প্রশাসনে অস্থিতিশীলতা ও ভীতি এবং আমলাতন্ত্রকে পরিচালনায় অদক্ষতাই গণপিটুনি বেড়ে যাওয়ার কারণ।

শাহদীন মালিক বলছিলেন, ‘গণপিটুনি এখন বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু একে নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো প্রচেষ্টা সরকারিভাবে দেখছি না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের চাকরি ও বদলি নিয়ে তটস্থ। আমলাতন্ত্র পরিচালনাও যথাযথ নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলছি না যে প্রশাসনের যেসব অপরাধী আছে, তাদের বিচার করা যাবে না। কিন্তু প্রশাসনিক শৃঙ্খলার এমন দুরাবস্থা থাকলে ভালো কিছু করা সম্ভব নয়।’

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: গণপ ট ন ত গণপ ট ন র গত বছর র সরক র র ব যবস থ ঘটন য় অপর ধ

এছাড়াও পড়ুন:

ছেলেটি গায়ের টি-শার্ট খুলে অটোগ্রাফ দিতে বললো: ফারুক

নন্দিত অভিনেতা ফারুক আহমেদ। জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি লেখালেখিও করছেন এই অভিনেতা।

এবারের বই মেলা উপলক্ষে প্রকাশ হয়েছে তাঁর লেখা গল্পগ্রন্থ ‘আমার না বলা কথা’। একুশের বইমেলায় প্রায়ই যান এই অভিনেতা। কখনও কখনও ভক্তের মনও রক্ষা করতে হয় তাকে।

গতকাল বইমেলায় অটোগ্রাফের জন্য এক ভক্ত তাঁর গায়ের টি-শার্ট খুলে দেন। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়েছেন এই অভিনেতা।

ফেসবুকে একটি রিলস প্রকাশ করেছেন ফারুক আহমেদ লিখেছেন, ‘ছেলেটি আমার অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য বইমেলায় তাঁর গায়ের টি-শার্ট খুলে তাতে অটোগ্রাফ দিতে বলে। হায়রে! পাগল ভক্ত!”

‘আমার না বলা কথা’ শিরোনামের বইটি প্রকাশ করেছে কিংবদন্তি পাবলিকেশন। ফারুক আহমেদ বর্তমানে ব্যস্ত ঈদ নাটকের অভিনয় নিয়ে।

এছাড়াও নুহাশ হুমায়ূনের নির্দেশনায় নতুন পাঁচটি বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করেছেন তিনি। এই বিজ্ঞাপনে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন স্বাধীন খসরু ও ডা. এজাজুর রহমান।
 

সম্পর্কিত নিবন্ধ