খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থাপনার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। এতে বাদ পড়েছে প্রখ্যাত রসায়নবিদ ও শিক্ষক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, পদার্থবিজ্ঞানী ও শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ বসু, কবি জীবনানন্দ দাশ, পদার্থবিদ ও জীববিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর মতো মনীষীদের নাম। সিন্ডিকেটের সভায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নেওয়া এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন পদক্ষেপে মর্মাহত বলে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকে জগদীশ বসুর গল্প শুনেছি। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে জগদীশচন্দ্র বসু, তাঁর মতো বিজ্ঞানীর নামে করা ভবন-স্থাপনা ছিল, সেগুলোর নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের নামে স্থাপনা ছিল। আরও কয়েকজনের নামে করা স্থাপনার নাম বদলানো হয়েছে। এটি আমাকে মর্মাহত করেছে। জগদীশচন্দ্র বসুর নামে করা ভবনের নাম পাল্টানো হবে, এটা কল্পনার বাইরে। আমি আশা করব, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীরা মিলে এর প্রতিকার করবে।’

গত সোমবার খুলনা নগর বিএনপির দ্বিবার্ষিক সম্মেলনেও নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গটি আসে। সেখানে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুন্ডু বলেন, ‘ফ্যাসিবাদীদের ছবি নামানো হবে, নাম পরিবর্তন হবে, এটা ঠিক। কিন্তু খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, আপনি কোন শক্তিবলে বিভিন্ন ভবন থেকে লালন সাঁইয়ের নাম, জীবনানন্দ দাশের নাম, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জগদীশচন্দ্র বসুর নাম সরিয়ে ফেলেছেন? … আজ হোক, কাল হোক, পরশু হোক; যত বড় শক্তি আপনার পেছনে কাজ করুক, এর জবাব আপনাকে দিতে হবে।’

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) খুলনার সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এককথায় এটা খুবই নিম্ন মানসিকতা ও নিম্ন রুচির পরিচয়। একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের এ ধরনের মানসিকতা থাকতে পারে, এটা চিন্তায়ও আসে না। এটা পুরোপুরি নিন্দনীয় বিষয়।’

৮ ফেব্রুয়ারি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় নামকরণের বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে ১২ ফেব্রুয়ারি নাম পরিবর্তন–সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রশাসনিক ভবনের নাম পরিবর্তন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য গোলাম রহমানের নামে করা হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন হল, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের নাম বিজয় ২৪ হল, সত্যেন্দ্রনাথ বসু একাডেমিক ভবনের নাম একাডেমিক ভবন ১, জগদীশচন্দ্র বসু একাডেমিক ভবনের নাম একাডেমিক ভবন ২, কবি জীবনানন্দ দাশ একাডেমিক ভবনের নাম একাডেমিক ভবন ৩, জয় বাংলা ভবনের নাম একাডেমিক ভবন ৪ করা হয়েছে।

শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ প্রশাসনিক ভবনের নাম প্রশাসনিক, শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা.

আলীম চৌধুরী চিকিৎসাকেন্দ্রের নাম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টার, সুলতানা কামাল জিমনেসিয়ামের নাম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় জিমনেসিয়াম, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় কেন্দ্রীয় গবেষণাগারের নাম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গবেষণাগার করা হয়েছে। এর পাশাপাশি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নামে শিক্ষকদের চারটি কোয়ার্টারের নামও পরিবর্তন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ট্রেজারার মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিতর্তিক নামের ক্ষেত্রে কোনো বক্তব্য নেই। তবে যদি কোনো সম্মানিত মানুষের নামে আমরা কোনো নাম দিই, সেটা পরিবর্তন ঠিক না। এটা সব সময়ের জন্য। বিশিষ্ট মানুষ তো আবেদন করেন নাই যে তাঁদের নাম দিতে হবে। মনীষী তাঁরা। তাঁদের অসম্মান করার অধিকার আমাদের নেই। এ কাজটা করা ঠিক হয়নি।’

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন খুলনা মহানগরের সদস্যসচিব জহুরুল তানভীর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘মাথাব্যথা করতেছে, তাই মাথাটাই কেটে ফেললাম—এই হলো খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনের নাম পরিবর্তনের অবস্থা!’

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২২ অক্টোবর তৎকালীন উপাচার্য ফায়েক উজ জামানের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সভায় ১৯টি ভবন ও স্থাপনার নতুন নামকরণ করা হয়। জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের পর গত বছরের ২৮ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার ও শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে ৩৭ দফা দাবি উত্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সেসব দাবির মধ্যে অন্যতম ছিল ক্যাম্পাসের সব স্থাপনা থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম পরিবর্তন করা।

ওই দাবি উত্থাপনকারীদের মধ্যে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী আয়মান আহাদ। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, যেসব ভবন বা স্থাপনা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নামে ছিল, সেগুলো পরিবর্তন করার। কিন্তু বেশ কিছু অরাজনৈতিক ব্যক্তির নামে থাকা ভবনের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে গ্রহণ করেননি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত শিক্ষার্থীদের অভিমত বিবেচনা করে পুনরায় সিদ্ধান্ত নেওয়া।’

এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তো আমাদের মতো করে কিছু করিনি। আমরা আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে গেছি। ছাত্রদের দাবি ছিল এগুলো। তাদের লিখিত দাবির বিষয়ে একটা কমিটি করা হয়, এটা আমার একক কোনো সিদ্ধান্ত না। তারপরও আমরা দেখি যদি ছাত্ররা এটা নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা করতে চায়, আমরা আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত রেখেছি।’

তাঁর ওপর দায় চাপানো ঠিক না মন্তব্য করে উপাচার্য বলেন, ‘অনেকে এটা আমার ওপরে এককভাবে চাপিয়ে দিচ্ছেন, এটা ঠিক না। এটা সিন্ডিকেট করেছে। সিন্ডিকেটে অনেক বিজ্ঞ বিজ্ঞ মানুষ আছেন, তাঁরা আলোচনা করেছেন।’ তিনি বরং আগের প্রশাসনের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, যে প্রশাসন নামগুলো দিয়েছিল, অতি উৎসাহী হয়ে কাজটা করেছিল, তারাই ভুল কাজটা করেছে। এমন জটিল জটিল নাম, এটা অনেকে বলতে পারে না। যাঁরা এখানে ঢোকেন তাঁরাও বুঝতে পারেন না।’

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: ক ভবন র ন ম ভবন র ন ম প র জন ত ক উপ চ র য প রথম

এছাড়াও পড়ুন:

ফতুল্লার শীর্ষ সন্ত্রাসী কাদির সিপাই গ্রেপ্তার

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার শীর্ষ সন্ত্রাসী কাদির সিপাই (৪৬) কে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১১। মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে সদর থানার দুধ বাজার এলাকায় গোপন সংবাদের মাধ্যমে এই আসামিকে  গ্রেপ্তার করা হয়।

বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে বিষয়টি  নিশ্চিত করেছেন র‌্যাব-১১এর উপ-পরিচালক মেজর অনাবিল ইমাম।

র‌্যাব জানায়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে তারা জেনেছে এই শীর্ষ সন্ত্রাসী ফতুল্লা থানার উত্তর গোপালনগর এলাকার প্রভাবশালী ও বক্তাবলী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক সামেদ আলীর প্রধান সহযোগী হিসেবে এলাকাব্যাপী পরিচিত।

মূলত সামেদ আলীর ছত্রছায়ায় ভয়ংকর এই কাদের সিপাই তার দলবল নিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র, দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চাঁদাবাজি,দখলবাজি ও প্রতিপক্ষের উপর হামলাসহ এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছিল। বক্তাবলীর এই গ্রুপটি এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম।

৫ আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হবার পর হতে  গ্রেপ্তারকৃত আসামি কাদির সিপাই আত্মগোপনে চলে যায়। তার বিরুদ্ধে  ফতুল্লা, সদর, বন্দর, ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখাঁন থানায় হত্যা, ডাকাতি, হুমকি, চাঁদাবাজি, নাশকতা, হত্যাচেষ্টা ও মারামারিসহ মোট ২৮ টি মামলা রয়েছে। 

গ্রেফতারকৃত আসামিকে পরবর্তী আইনানুগ কার্যক্রমের জন্য ফতুল্লা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।
 

সম্পর্কিত নিবন্ধ