সাহিত্যে নারীর উপস্থাপন বরাবরই প্রান্তিক: ফাল্গুনী তানিয়া
Published: 26th, February 2025 GMT
ফাল্গুনী তানিয়া মূলত একজন গবেষক। ‘বাংলাদেশের নারী-লেখকদের উপন্যাস: নারীচরিত্রের স্বরূপ’ শিরোনামে পিএইচডি করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বাংলা একাডেমি থেকে গবেষণাবৃত্তি পেয়ে বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরের মিশুসাহিত্যের ওপর গবেষণা করেছেন। চলতি বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার নতুন গবেষণাগ্রন্থ ‘পাঠ ও পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের সাহিত্য’। নতুন গবেষণার বিষয়বস্তুসহ নানা বিষয়ে রাইজিংবিডির সঙ্গে কথা বলেছেন এই গবেষক। সাক্ষাৎকার গ্রহণে স্বরলিপি।
রাইজিংবিডি: চলতি বইমেলায় আপনার গবেষণা গ্রন্থ ‘পাঠ ও বিশ্লেষণে বাংলাদেশের সাহিত্য’ প্রকাশিত হযেছে। বিশেষভাবে উপস্থাপন করেছেন নারীর মনো-সামাজিক অবস্থা। নারীর মনস্তত্ত্বের একাকিত্ব ও নৈঃসঙ্গের স্বরূপ সন্ধানের ব্রত নিলেন কেন?
ফাল্গুনী তানিয়া: পাঠ ও পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের সাহিত্য মূলত কিছু তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের সাহিত্যকে বিশ্লেষণ করার একটি প্রয়াস। এ্রর অংশ হিসেবে নারীর মনস্তত্ব ও সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়াটি পাঠকের দৃষ্টিগোচর করতে চেয়েছি। একজন নারী গবেষক হিসেবে এটিকে আয়ত্ব করা ও উপস্থাপন করা আমি আমার দায়িত্ব মনে করেছি।
রাইজিংবিডি: এই গবেষণা শেষে সাহিত্যে নারীর উপস্থাপনের বিষয়ে আপনার প্রস্তাবনা কি কি?
ফাল্গুনী তানিয়া: সাহিত্যে নারীর উপস্থাপন বরাবরই প্রান্তিক। পুরুষরা নারীকে প্রধান চরিত্র করেছে এমন উপন্যাসের সংখ্যা কম। এবং পুরুষরা নারীর একটি স্টেরিওটাইপ তৈরি করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লক্ষ্মী ও উর্বশী ছকে নারীচরিত্র তৈরি করেছেন তারা। এই ছকে মাতা, কন্যা, প্রিয়া ব্যতীত নারীর নিজস্ব পরিচয় নেই। এই ছকের বাইরে গেলেই সে ডাইনী, ছলনাময়ী। নারীলেখকরা এই ছকে পরিবর্তন আনছেন। স্বাধীন নারীচরিত্র আসছে। ইবসেনের নোরার মত চরিত্র দিন বদলের বার্তা পাঠাচ্ছে। নাসরীন জাহানের ‘উড়ুক্কু’র নীনা, সেলিনা হোসেনের ‘দীপান্বিতা’র সুনীতি, নসিরন, চন্দ্রভানু সবাই ব্যক্তিস্বাতন্ত্রে উজ্জ্বল চরিত্র। আকিমুন রহমানের উপন্যাসের প্রতিটি নারীচরিত্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে দীপ্যমান। তবে পুরুষ সাহিত্যিকরা যদি এই ধারাকে স্বাগত না জানান তবে নারীচরিত্রের প্রচলিত ভাবমূর্তির কোনো পরিবর্তন হবে না। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’র কুলসুমের মত চরিত্রের বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি প্রয়োজন।
আরো পড়ুন:
বইমেলায় আহমেদ শরীফের দুইটি বই প্রকাশিত হয়েছে
বইমেলায় বাংলা একাডেমির ‘গুণিজন স্মৃতি’ পুরস্কার ঘোষণা
রাইজিংবিডি: প্রবন্ধ রচনায় আপনি বর্ণনাত্মক রীতির আশ্রয় নিয়েছেন, কেন?
ফাল্গুনী তানিয়া: আমার রচিত প্রবন্ধগুলো মূলত একাডেমিক তাই বর্ণনাত্মক রীতিই অনুসরণ করা হয়েছে। তবে, প্রবন্ধের প্রয়োজনে তুলনামূলক অন্বেষণ রয়েছে যথেষ্ট। শিরোনামের মধ্যেই এটা পাবেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চিহ্ন ’উপন্যাসের তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। ‘লালসালু’ উপন্যাসের রহিমা, জমিলা, হাসুনির মা সব চরিত্রের মিল অমিল তুলে ধরা হয়েছে। এই তুলনার জন্য দুটো চাবি শব্দ আমি বেছে নিয়েছি। একটি ‘মাতৃত্ব’ অন্যটি ‘ভগ্নিত্ব’। শামসুর রাহমানের প্রবন্ধটিতে বাকস্বাধীনতার আলোচনার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ উপনিবেশের সময়ের কাজী নজরুল ইসলাম থেকে পেন ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক লেখকরা তুলনামূলক আলোচনাতে এসেছেন। আবার বিশ্লেষণাত্মক রীতিও বেছে নিয়েছি কোনো কোনো প্রবন্ধে। এটা আসলে কোন বিষয়ের ওপর লিখছি তার গঠনকাঠামো ও পদ্ধতি কী হওয়া উচিৎ তা নির্ধারণ করে দেয়।
রাইজিংবিডি: সাহিত্য গবেষণা পরবর্তী সাহিত্য এবং সমাজকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করেন?
ফাল্গুনী তানিয়া: সাহিত্য গবেষণা অথবা সমালোচনা সাহিত্যের ধারাটিকেও বদলে দিতে পারে। আমরা পঞ্চপাণ্ডবের কথা জানি যে তারা বাংলা সাহিত্যের বাঁক-বদলে কী রকম ভূমিকা রেখেছিলেন। বুদ্ধদেব বসু, সূধীন্দ্রনাথ দত্ত, জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে রবীন্দ্র প্রভাবের বাইরে আসার জন্য রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্যের আদ্যোপান্ত ঘাটাঘাটি করেছিলেন। সমালোচনা করতে গিয়েই তারা মুখের ভাষা, আঞ্চলিক ভাষা এমনকি স্ল্যাংকে পর্যন্ত সাহিত্যে স্থান দিলেন। সাহিত্য উচ্চবিত্ত থেকে দরিদ্র এমনকি বস্তিতে প্রবেশ করল। সাহিত্য আন্দোলনের কথাও এক্ষেত্রে অনস্বীকার্য। বিভিন্ন সাহিত্য আন্দোলন বাংলা সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে সেটা হোক প্রাচ্যের অথবা পাশ্চাত্যের।
রাইজিংবিডি: চলতি বইমেলায় আপনার শিশুসাহিত্যের বইও প্রকাশিত হয়েছে। কোন বয়সী শিশুদের জন্য লিখলেন?
ফাল্গুনী তানিয়া: এবার গবেষণার পাশাপাশি দুটি শিশুদের বই নিয়ে পাঠকের সম্মুখে এসেছি। একটি ‘হারিয়ে গেল বানর ছানার মা ’অন্যটি ‘তুমিই সবার সেরা’। প্রথমটি একেবারে ছোট শিশুদের জন্য। এটা পড়লে শিশুরা বিভিন্ন প্রাণীর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে পারবে।
অপরটি ছয় থেকে আট বছর বয়সের উপযোগী। ‘তুমিই সবার সেরা’ বইটি প্রতিটি শিশুকে আত্মসচেতন করে তুলবে। এই বইয়ে আমি অভিভাবকদের জন্যও একটা বার্তা রেখেছি। বলতে চেয়েছি তুলনা নয় বরং প্রতিটি শিশুর স্বাতন্ত্রই তার প্রতিভা বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তাদের সামর্থ্য সম্পর্কে যে কোনো পরিস্থিতিতে ইতিবাচক মন্তব্য করা জরুরি। সুন্দর একটি পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য শিশুদের আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
রাইজিংবিডি: একজন নারী হিসেবে সাহিত্যকর্ম করা কতটা ‘চ্যালেঞ্জিং’ মনে করেন?
ফাল্গুনী তানিয়া: এই প্রশ্নের উত্তরে বহু প্রসঙ্গ আসবে। উত্তরটাও দীর্ঘ হবে। প্রথমত ভার্জিনিয়া উলফ শতাব্দীকাল পূর্বেই যা বলেছেন সেটি বলতেই হবে। ‘একজন নারীর যত দিন লেখার জন্য নিজের একটি ঘর ও পর্যাপ্ত অথর্নৈতিক স্বচ্ছলতা না থাকবে ততদিন সাহিত্যের পথটিতে চূড়ান্ত সফলতা পাবে না।’ যেহেতু আমি একজন গবেষক আমার জন্য পথটি আরো কঠিন। কারণ গবেষণার জন্য নিরবচ্ছিন্ন সাধনার প্রয়োজন হয়। কিছু কিছু কাজের ব্যয় অত্যন্ত বেশি। মাঠ পর্যায়ে কাজ না থাকলেও কিছু কিছু বইয়ের জন্য আমাকে দূর-দূরান্তে যেতে হয়। বাংলাদেশের নারীলেখকদের উপন্যাস নিয়ে যখন কাজ করেছি শৈলবালা ঘোষজায়া, ইন্দিরা দেবি, সরলা দেবি এদের উপন্যাসের জন্য হায়াৎ মামুদ স্যারসহ অনেকের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ব্যবহার করতে হয়েছে। যশোরের অনেক পুরনো কালেক্টরেট লাইব্রেরিতে কাজ করেছি। ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগরের সব লাইব্রেরিতে যেতে হয়েছে। যাতায়াত ভাড়া, ফটোকপি এগুলোর ব্যায় তো কম নয়। কিছু কিছু লাইব্রেরি ব্যবহারের জন্য ফি দিতে হয়। বাংলাদেশের নারী যোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করার সময় আমাকে প্রায়ই আর্কাইভে যেতে হয়েছে। যেহেতু সংসার-সন্তান সব সামলিয়ে কাজ করতে হয় তাই বই ও কিনতে হয় প্রচুর। যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকত এবং গবেষকদের যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হত তাহলে গবেষণার মান উন্নয়ন সম্ভব ছিল। বাংলা একাডেমির একটি গবেষণা বৃত্তি পেয়ে ‘বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরের শিশুসাহিত্য’ নিয়ে এক বছর মেয়াদের একটি কাজ করেছি। দুঃখজনক বিষয় হচেছ সময় এবং টাকা দুটোর পরিমাণই খুব কম। ভাল গবেষণার জন্য টিমওয়ার্ক ও খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে পেশাদারী মনোভাব নিয়ে লেখালিখি করার মূল অন্তরায়ও এটা।
একজন নারী গবেষকের প্রতিকূলতা অনেক। সহজ ভাবে আপনাকে বলি,মার্কেজের ‘নিঃসঙ্গতার একশো বছর’’ বিশ্বের বহুল পঠিত একটি বই। ধ্রপদী সাহিত্যের মর্যাদা পেয়েছে গ্রন্থটি। মার্কেজ যখন পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে আকাপুলকো যাচ্ছিলেন তখন উপন্যাসটির থিম তার মাথায় আসে এবং তৎক্ষণাৎ তিনি গাড়ি ঘুরিয়ে মেক্সিকো সিটিতে ফিরে আসেন। পরবর্তী আঠারো মাস তিনি তার স্ত্রীর হাতে পরিবারের সমস্ত ভার চাপিয়ে এই কালজয়ী উপন্যাস রচনা করেন। এখন আপনি বলেন এই সহযোগিতা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো নারীর পক্ষে পাওয়া সম্ভব কিনা? আমি আমার বড় সন্তানকে একটি খাতা ও রঙ পেন্সিল হাতে দিয়ে পাঠাগারে বসিয়ে রেখেছি। যখন ঘরে ফিরতাম বাসের মধ্যে ও ঘুমিয়ে পড়ত। ওর ক্লান্ত ঘুমন্ত মুখ দেখে খুব কষ্ট হত। আমার ছোট সন্তানকে বাম স্তন পান করিয়েছি কোলে বসিয়ে আর ডান হাতে লিখেছি। ওরা মায়ের হাতে ওদের পছন্দের খাবারের জন্য অনেক অনেক দিন অপেক্ষা করে থেকেছে। তাদের খাইয়েছি হাতে রেখেছি বই, তাদের ঘুম পাড়িয়েছি পাশে রেখেছি বই। তাদের অসুস্থতার সময় রাত জেগেছি বই হাতে নিয়ে। কত বার ভাত ও দুধ পুড়িয়েছি ঠিক নেই। এমনকি ডিম সিদ্ধও পুড়িয়েছি। একজন পুরুষ দরজা বন্ধ করে কাজ করতে পারেন অথচ আমার পড়ার ঘরটি এমন রেখেছি যেন আমি আমার সন্তানদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে পারি। মাছির মত আমার মাথার সব পাশে চোখ বানাতে হয়েছে। এই যাত্রাটা খুব কঠিন। অর্ন্তগত তাগিদ না থাকলে এই পথ পাড়ি দেওয়া অসম্ভব। গবেষণাকে আমি আমার আরেকটি সন্তানের মত দেখেছি। আমি ভেবেছি আমার যমজ মৃত সন্তানরা বেঁচে থাকলে ওদেরকেও তো আমার সময় দিতে হত। যখন সন্তানের মত ভেবেছি তখন কাজ করা অনেক সহজ হয়েছে।
আবার আপনি যদি পথটা অতিক্রম করেনও স্বীকৃতির পথটি আরো বন্ধুর। এখানে কাজ করে পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় রাজনীতি। সোফিয়া তলস্তায়া ভালো লিখতেন। তবে তার লেখা তার মৃত্যুর এক শতাব্দী পরে প্রকাশিত হয়। কারণ তার লেখাতে লিউ তলস্তয়ের অনেক সমালোচনা ছিল। রুশ সরকার চাননি জনপ্রিয় একজন লেখকের জনপ্রিয়তায় ঘাটতি পড়ুক। আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ ও স্বর্ণৃকুমারী দেবীর ‘কাহাকে’ উপন্যাসের একটি তুলনামূলক আলোচনা করেছিলাম। কিন্তু সেটি কোথাও প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামাজিক ও সাহিত্যিক ভাবমূর্তির সমালোচনা কোনো সম্পাদক প্রকাশ করতে চাননি। এক শতাব্দী পূর্বে যারা সাহিত্যকর্ম করতে এসেছিলেন তারাও নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তাদের লেখালিখিকে তুলনা করা তো ‘আরশোলার পাখি হবার’ সাধের সঙ্গে তুলনা করার মতো। আজ এটার পরিবর্তন ঘটেছে ঠিকই তবু লিঙ্গীয় বিভাজন থেকে এখনো মুক্ত হতে পারেনি আমাদের সাহিত্যজগৎ। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব ও নিষ্পেষণ থেকে মুক্তি না পেলে আমাদের সাহিত্যের মুক্তি সম্ভব নয়।
ঢাকা/লিপি
.উৎস: Risingbd
কীওয়ার্ড: চ কর চ কর উপন য স র র উপন য স একজন ন র প রবন ধ বইম ল য় এক ড ম র জন য কর ছ ন ক জ কর র সময় র একট
এছাড়াও পড়ুন:
প্ল্যাটফর্মে একা
তখন আমি বোর্ডিং স্কুলের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সেদিন আম্বালা স্টেশনের ৮ নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আমি উত্তরমুখী ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। মনে হয়, আমার তখন বয়েস বারো বছর হবে। বাবা-মা ভাবতেন, একা একা ট্রেনে ক’রে চলার মতো যথেষ্ট বয়েস আমার হয়েছে। সেদিন আমি বাসে ক’রে সন্ধ্যের বেশ আগেই পৌঁছে গিয়েছিলাম আম্বালা স্টেশনে। আমার ট্রেন আসার অনেক দেরি। তা প্রায় রাত বারোটা বাজবে। আমি আর কোনো কাজ না পেয়ে প্ল্যাটফর্মের এধার থেকে ওধার পর্যন্ত পায়চারি করছিলাম, মাঝে মাঝে বইয়ের স্টলে গিয়ে বই ঘাঁটছিলাম আর বেওয়ারিশ কুকুরগুলোকে ভাঙা বিস্কুটের টুকরো খাওয়াচ্ছিলাম। এক এক করে ট্রেন আসছিল, যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ প্ল্যাটফর্মটা থাকছিল নীরব, তারপর যখন আর একটি ট্রেন আসছিল, অমনি মানুষের হৈ হল্লা, চেচামেচি আর মানুষের ব্যস্ততায় জমজমাট হয়ে উঠছিল জায়গাটা। গাড়ির দরজা খোলা মাত্র সেখান থেকে নেমে আসছিল একটা মানুষের স্রোত আর তারা ঝাঁপিয়ে পড়ছিল গেটে দাঁড়ানো হাঁপিয়ে ওঠা বেচারা টিকিট কালেক্টরের ওপর। প্রতিবার এমনটি ঘটার সাথে সাথে আমিও মানুষের স্রোতের সাথে মিলেমিশে একেবার বেরিয়ে আসছিলাম স্টেশনের বাইরে। শেষমেশ এমনটি করতে করতে হাঁফিয়ে উঠলাম আমি। না পেরে শেষে এসে বসে পড়লাম প্ল্যাটফর্মে রাখা আমার স্যুটকেসটার ওপর। সেখানে বসে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে তাকিয়ে থাকলাম রেললাইনের ওপাশের দিকে।
এক একটা ট্রলি আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল। তার মধ্যেই আমি মন দিয়ে শুনছিলাম প্রত্যেক বিক্রেতার হাঁকডাক। একজন বেচছিল দই আর লেবু, অন্য একজন মিষ্টি বিক্রেতা, একজন খবরের কাগজের হকার– কিন্তু আমি কিছুতেই সেই হাঁকডাক আর ব্যস্ততায় মনোসংযোগ করতে পারছিলাম না। রেললাইনের ওপাশেই আমি চেয়েছিলাম একদৃষ্টে। এইসব একঘেয়েমির মাঝে নিজেকে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছিল।
আমার পেছন থেকে কোমল সুরে একজন জিজ্ঞাসা করল, ‘খোকা, তুমি কি একা একাই যাচ্ছ?’
আমি পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি, একজন ভদ্রমহিলা। তিনি আমার পেছন থেকে ঝুঁকে আমাকে দেখছিলেন। তার মুখটা বিবর্ণ, চোখ দু’টো মমতা মাখানো। তার গায়ে কোনো অলংকার ছিল না, পরনে অতি সাদাসিধে একটা সাদা শাড়ি।
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, আমি স্কুলে যাচ্ছি।’ আমি উঠে দাঁড়িয়ে যথেষ্ট সম্মানের সাথেই বললাম কথা কয়টা। দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি বেশ দরিদ্র। কিন্তু তার সমস্ত অবয়বে ছিল একটা সম্ভ্রমের প্রলেপ, যা দেখে তাকে সম্মান না করে পারা যায় না।
তিনি বললেন, ‘আমি বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ তোমাকে লক্ষ্য করছি। তোমার মা-বাবা কেউ তোমাকে বিদায় জানাতে আসেন নি?’ আমি বললাম, ‘আমি এখানে থাকি না। ট্রেন পাল্টে তবে আমি এখানে এসেছি। তারপরও, আমি একা একাই চলাফেরা করতে পারি।’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই তুমি তা পার।’ তার এ কথাটা আমার ভালোই লাগল, আরও ভালো লাগল তার ওই সহজ সরল পোশাক আর তার নরম, কোমল কণ্ঠস্বর, তার বিষণ্ন মলিন মুখ।
উনি বললেন, ‘তোমার নাম কি?’
আমি বললাম ‘অরুণ’।
‘কতক্ষণ তোমাকে তোমার ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে?’
‘আমার মনে হয়, প্রায় এক ঘণ্টা। গাড়িটার এখানে আসার সঠিক সময় রাত বারোটা।’
‘তাহলে তুমি আমার সাথে এসো, কিছু খেয়ে নেওয়া যাক।’
আমি চেয়েছিলাম না বলতে। একটু লজ্জা করছিল, আবার মনে মনে একটু সন্দেহ হচ্ছিল। কিন্তু উনি আমার হাত ধরে টান দিলেন। তখন আমার মনে হলো আর প্রতিবাদ করা ঠিক হবে না। উনি একজন কুলিকে বললেন আমার স্যুটকেসটা একটু দেখে রাখতে। তারপর তিনি আমার হাত ধরে নিয়ে চললেন প্ল্যাটফর্মের ওপর দিয়ে। নরম ছিল তার হাতটা, আমার হাতটাকে ধরে ছিলেন আলগা করেও না আবার শক্ত করেও নয়। আমি আবার মাথা উঁচু করে তাকালাম তার মুখের দিকে। তিনি মোটেও তরুণী নন এবং মোটেও বৃদ্ধ নন। তার বয়েস অবশ্যই ত্রিশের বেশি, পঞ্চাশও হতে পারে, তবে আমার মনে হয়, বয়েস তার ওপর ছাপ ফেলতে পারেনি।
তিনি আমাকে নিয়ে ঢুকলেন স্টেশনের ডাইনিং রুমে, সেখানে চা, শিঙাড়া আর জিলিপি অর্ডার দিলেন। আমি তখনই মনোযোগ দিয়ে সেই মমতাময়ী মহিলাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। এই অদ্ভুত যোগাযোগটা আমার ক্ষুদপিপাসার ওপর প্রভাব ফেলেছিল সামান্যই। আমি ছিলাম একজন ক্ষুধার্ত স্কুলের ছাত্র, আর মোটামুটি ভদ্রভাবে প্রাণপণে যতটা সম্ভব গলধঃকরণ করে ফেললাম। স্পষ্টভাবে দেখলাম তিনি আমার খাওয়া দেখে যথেষ্ট আনন্দ উপভোগ করছেন। আর আমার মনে হয় কি, ওই খাবারগুলোই আমাদের দু’জনের মধ্যকার বন্ধন আরো দৃঢ় করে তুলেছিল, আমাদের দু’জনের নৈকট্যকে করেছিল আরো সংহত। চা আর মিষ্টিই আমকে করে তুলেছিল আরো সহজ এবং স্বচ্ছন্দ। আমি তাকে বলতে লাগলাম আমার স্কুলের নাম, আমার বন্ধুদের গল্প, আমার ভালোলাগা মন্দলাগার কথা। তিনি মাঝে মাঝেই নানা ব্যাপারে প্রশ্ন করছিলেন আমাকে, কিন্তু তার শোনার ব্যাপারেই আগ্রহ ছিল বেশি। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আমি আমার ব্যাপারে সবকিছুই তুলে ধরলাম তার সামনে, আমরা তখন আর দু’জন দু’জনের মোটেও সদ্যপরিচিত নই। কিন্তু তিনি কখনও আমার পরিবারের কথা জিজ্ঞাসা করলেন না বা কোথায় আমি থাকি সে কথাও জানতে চাইলেন না। আমিও তার কাছে জানতে চাইলাম না, তিনি কোথায় থাকেন। আমি, যেমন তিনি, তেমনভাবেই তাকে গ্রহণ করেছিলাম– একজন মিতবাক, মমতাময়ী এবং শান্ত ভদ্রমহিলা, যিনি আমার মতো একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত বালককে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে চা, মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করেছিলেন।
আধাঘণ্টা পরে আমরা বেরিয়ে এলাম ডাইনিং রুম ছেড়ে, হাঁটতে লাগলাম প্ল্যাটফর্ম ধরে। ৮ নম্বর প্ল্যাটফর্মের পাশ দিয়ে একটা ইঞ্জিন বারবার সামনে পেছনে যাতায়াত করছিল। একবার ইঞ্জিনটা আমাদের অতিক্রম করে গেল, একটা ছেলে প্ল্যাটফর্ম থেকে লাফ দিয়ে রেললাইনের উল্টো পাশে চলে গেল। ওটা ছিল তার পাশের প্ল্যাটফর্মে যাবার সহজ, সংক্ষিপ্ত পথ। ছেলেটা ইঞ্জিনটা থেকে নিরাপদ দূরত্বেই ছিল, সে পড়ে না গেলে তার কোনো বিপদ ঘটত না। কিন্তু ছেলেটা লাফ দেবার সাথে সাথেই ভদ্রমহিলা শক্ত করে ধরে ফেললেন আমার হাত। তার আঙুলগুলো চেপে বসেছিল আমার হাতে, তাতে আমি ব্যথায় কঁকিয়ে উঠেছিলাম। আমি তার হাতের আঙুলগুলো ধরে মাথা তুলে তার মুখের দিকে তাকালাম। সেখানে আমি দেখতে পেলাম যেন একটা ভয়, দুঃখ এবং ব্যথার ঝলক খেলে গেল। তিনি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দেখছিলেন তার অন্য প্ল্যাটফর্মে গিয়ে ওঠার দৃশ্য। ছেলেটা যতক্ষণ না ওই প্ল্যাটফর্মে মানুষের ভিড়ের মধ্যে মিশে যায়, ততক্ষণ তিনি সেদিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর তিনি আমার ধরে রাখা হাতটা ছেড়ে দিলেন। তিনি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তাকালেন আমার দিকে এবং আবার তিনি ধরলেন আমার হাত, কিন্তু তার হাতের হাতের আঙুলগুলো তখন কাঁপছিল।
‘ও ঠিকমত পৌঁছে গেছে’, আমি বললাম। আমার মনে হচ্ছিল তিনি যেন কারও কাছ থেকে আশ্বাস খুঁজছিলেন। তিনি আমার হাতে চাপ দিয়ে কৃতজ্ঞতার হাসি হাসলেন। নিঃশব্দে হেঁটে চললাম আমরা। এক সময় আমরা পৌঁছে গেলাম আমার রেখে যাওয়া স্যুটকেসগুলোর কাছে। সেখানে দেখা হলো আমার এক স্কুলের বন্ধুর সাথে। সে তার মাকে সাথে করে এসেছে। ওর নাম সতীশ। ওর বয়েস আমারই মতো।
ও বলে উঠল, ‘হ্যালো, অরুণ! ট্রেনটা বোধ হয় অন্যদিনের মতো আজও দেরি করে আসছে। তুমি কি জান, আমাদের একজন নতুন হেডমাস্টার এসেছেন এ বছর?’
আমরা হ্যান্ডশেক করলাম। ও তখন ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মা, এ হচ্ছে অরুণ। ও আমার বন্ধু। জান, ও আমাদের ক্লাসের সেরা বোলার।’
‘খুব ভালো লাগল শুনে’, তিনি বললেন। তার চোখে চশমা এবং তিনি একজন ভারিক্কি ধরনের মহিলা। যে মহিলা আমার হাতটা ধরেছিলেন, তার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘আপনি বোধ হয় অরুণের মা?’
এ কথার উত্তরে আমি যেই কিছু ব্যাখ্যা দিতে যাব, অমনি আমার বলার আগেই তিনি বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ, আমি অরুণের মা।’
আমার কথা বন্ধ হয়ে গেল। আমি তক্ষুণি মহিলার দিকে তাকালাম। তাকে মোটেও বিব্রত বোধ হচ্ছিল না বরং তিনি হাসছিলেন সতীশের মায়ের দিকে চেয়ে।
সতীশের মা বললেন, ‘মাঝরাতে এই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে দারুণ খারাপ লাগে। একজন ছেলেকে একা একা এখানে ছেড়ে দেওয়া যায় না। এরকম বড় স্টেশনে ওদের মতো ছোট একটা ছেলের যা কিছু ঘটে যেতে পারে। এখানে কত সন্দেহভাজন লোক চারদিকে ঘোরাফেরা করছে। আজকাল সবরকমের মানুষের কাছ থেকে সাবধানে থাকতে হয়।’
আমার পাশ থেকে সেই মহিলা বলে উঠলেন, ‘যদিও অরুণ একা একাই যাতায়াত করতে পারে।’ এই কথাগুলো বলায় আমি একদিক থেকে মহিলার প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করলাম। ততক্ষণে আমি তার মিথ্যা ভাষণের জন্য মনে মনে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। অপরপক্ষে, অন্যদিকে আমি সতীশের মায়ের প্রতি খুবই বিরক্ত বোধ করছিলাম।
‘যাই হোক, অরুণ খুব সাবধানে থেকো’– সতীশের মা তার চশমার ফাঁক দিয়ে তীক্ষ্ণভাবে তাকিয়ে বললেন কথাক’টি। ‘সাবধানে থেকো, তোমার মা থাকছেন না তোমার সাথে। কখনও কোনো অচেনা মানুষের সাথে কথা বলবে না!’
আমি সতীশের মায়ের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে যে মহিলা আমাকে মিষ্টি খাইয়েছিলেন তার দিকে তাকালাম, তারপর আবার আমি ফিরে তাকালাম সতীশের মায়ের দিকে।
আমি বলে উঠলাম, ‘অচেনা নতুন মানুষকে আমি পছন্দ করি।’ এতে সতীশের মা অবশ্যই বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন, কারণ তিনি কিছুতেই ছোট ছেলেদের তার কথার প্রতিবাদ করাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারতেন না।
‘ও, এই কথা! তুমি যদি তাদের ভালোভাবে না চেনো তাহলে একসময় তারা তোমার বিপিত্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সবসময় তোমার মায়ের কথা শুনে চলবে,’ একটা মোটা খাটো আঙুল নাড়াতে নাড়াতে কথা কয়টি আমার উদ্দেশ্যে বললেন তিনি। ‘আর কখনও অচেনা মানুষের সাথে কথা বলবে না।’
আমি বেশ বিরক্তির সাথে তাকালাম তার দিকে, আর সরে গেলাম তার কাছে, যিনি আমাকে আপন করে নিয়েছিলেন। সতীশ ওর মায়ের পিছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছিল আমার দিকে তাকিয়ে। ওর মায়ের আর আমার বিবাদ দেখে ও বেশ খুশি হচ্ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল, ও ছিল আমারই দলে।
ঘণ্টা বেজে গেল স্টেশনের, মানুষেরা যারা প্ল্যাটফর্মের ওপর ইতস্তত অলস ভঙ্গিতে ঘোরাফেরা করছিল, ব্যস্ত সমস্ত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করে দিল। সতীশ চেচিয়ে বলল, ‘দেখ, গাড়ি এসে গেছে।’ তীব্র স্বরে ইঞ্জিন থেকে বেজে উঠল হুইসেল, রেললাইনের ওপর দূরে ফুটে উঠল হেডলাইটের আলো।
আস্তে আস্তে চলছিল ট্রেনটা, একসময় এসে ঢুকে গেল স্টেশনের ভেতর। হিস্ হিস্ শব্দ করে ইঞ্জিনটা ওপরের দিকে ছুড়ে দিচ্ছিল ধোঁয়ার কুণ্ডলী। গাড়িটা থামা মাত্রই সতীশ একটা আলোজ্বলা কম্পার্টমেন্টের পাদানিতে উঠে গেল লাফ মেরে, আর সেখান থেকে চেচাতে লাগল। ‘অরুণ, এদিকে এসো! এই কম্পার্টমেন্ট ফাঁকা আছে!’ আমি স্যুটকেসটা তুলে দিয়েই ছুটলাম দরজাটার দিকে।
আমরা দেখেশুনেই জানালার পাশে আমাদের সিট করে নিলাম। আর দু’জন ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে রইলেন বাইরে, প্ল্যাটফর্মের ওপর। সেখান থেকেই তারা আমাদের সাথে কথা বলছিলেন। সতীশের মাই বেশি কথা বলছিলেন।
তিনি বললেন, ‘এখন আর হুট হাট করে ট্রেন থেকে লাফ দিও না, ঠিক এখন যেমনটা করলে। জানালা দিয়ে তোমাদের মাথা বাইরে বের করে দিও না, আর পথে যা তা কিনে খেও না।’ তিনি আমাকেও তার উপদেশমালার অংশভাগী করলেন। কারণ তিনি আমার ‘মা’-কে সম্ভবত এসব পরামর্শ দেবার মতো উপযুক্ত মানুষ বলে মনে করছিলেন না। তিনি সতীশের হাতে এক থলি ফল, একটি ক্রিকেট ব্যাট আর একটা চকোলেটের বাক্স দিয়ে সেটা দু’জনে ভাগ করে খেতে বললেন। তারপর তিনি সরে দাঁড়ালেন জানালার কাছ থেকে। তিনি দেখতে চাইছিলেন, আমার ‘মা’ আমার জন্যে কী করেন।
আমি সতীশের মায়ের গুরুজনী, সর্দারি কণ্ঠস্বরকে মোটেই সহ্য করতে পারছিলাম না; কারণ উনি স্পষ্টত মনে করেছিলেন আমি যেন খুব একটা দরিদ্র পরিবারের ছেলে। আমি চাইছিলাম না অন্য ভদ্রমহিলা ওই স্থান ছেড়ে চলে যান। আমি তাকে আমার হাতটা ধরে থাকতে দিলাম, কিন্তু কিছুই বলার মতো খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমি বুঝতে পারছিলাম সতীশের মা বিস্ফারিত নেত্রে চেয়ে আছেন আমার দিকে আর আমি ততক্ষণে সতীশের মাকে মনে মনে দারুণ ঘৃণা করতে শুরু করেছি। গাড়ির গার্ড প্ল্যাটফর্মের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাঁশি বাজিয়ে সংকেত দিলেন গাড়ি ছাড়ার। আমি সরাসরি ভদ্রমহিলার চোখের দিকে তাকালাম। তিনি তখনও আমার হাত ধরে ছিলেন। তার মুখের শান্ত হাসি বলে দিচ্ছিল, তিনি সবই বুঝতে পারছেন। আমি গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বের করে তার ঠোঁটের ওপর রাখলাম আমার ঠোঁট দুটো। আমি তাকে চুম্বন করলাম।
তখনই গাড়িটা ঝাঁকা দিয়ে নড়েচড়ে উঠে এগিয়ে চলল সামনের দিকে। ভদ্রমহিলা ছেড়ে দিলেন আমার হাত।
সতীশ বলে উঠল, ‘বিদায়, মা।’ আর তখনই একটু একটু করে সামনের দিকে চলতে লাগল গাড়িটা। সতীশ আর তার মা দু’জনেই পরস্পরকে উদ্দেশ করে হাত নাড়তে লাগল।
‘বিদায়,’ আমি অন্য ভদ্রমহিলাকে উদ্দেশ করে বললাম। ‘বিদায়– মা...।’
আমি হাতও নাড়লাম না চীৎকারও করলাম না, চুপ করে বসে থাকলাম জানালার পাশে, শুধু তাকিয়ে থাকলাম প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো ভদ্রমহিলার দিকে। সতীশের মা ভদ্রমহিলার সাথে কথা বলছিলেন, কিন্তু দেখে মনে হচ্ছিল, কিছুই শুনছেন না তিনি, তিনি তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে, ট্রেনটা এগিয়ে চলল আমাকে নিয়ে। ওই ব্যস্ত প্ল্যাটফর্মে ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি, একজন সাদা শাড়ি পরা মিষ্টি, বিবর্ণ মহিলা, আর আমি তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে, যতক্ষণ না মানুষের ভিড়ে মিশে যান তিনি। v