বাংলাদেশের শত্রুদের সঙ্গে যোগসাজশ করে পিলখানায় চৌকস কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়েছে: মির্জা ফখরুল
Published: 25th, February 2025 GMT
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়ে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের শত্রুদের সঙ্গে যোগসাজশ করে পিলখানায় দেশপ্রেমী সেনাবাহিনীর ৫৭ জন চৌকস কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, সেদিন যিনি রাষ্ট্রের দায়িত্বে ছিলেন—শেখ হাসিনা, তিনি কী ভূমিকা পালন করেছিলেন? সহকর্মীদের রক্ষায় সেনাপ্রধান কী ভূমিকা পালন করেছিলেন? শেরাটন থেকে ভালো ভালো খাবার নিয়ে যাঁরা বিদ্রোহ করলেন, তাঁদের খাওয়ানো হলে কী বুঝবে মানুষ।
আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানী রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মির্জা ফখরুল। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে এই সভার আয়োজন করে বিএনপি।
আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের ক্ষোভ ও ঘৃণা এক দিনে তৈরি হয়নি উল্লেখ করে আলোচনা সভায় বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘১৯৭২ সাল থেকে এই দলের প্রতি, শেখ মুজিবের প্রতি ঘৃণা জন্ম হয়েছে। কারণ, তারা কোনোদিনই বাংলাদেশের মানুষকে ভালোবাসেনি। তারা ভালোবেসেছে তাদের পদ, তাদের ক্ষমতা, তাদের পরিবার—এভাবেই তারা বাংলাদেশকে ধ্বংস করা শুরু করেছে।’
৫৭ জন অফিসার মুক্তিযুদ্ধেও শহীদ হননি—এমন মন্তব্য করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ৫৭ জন অফিসারকে হত্যা করা হয়েছে। সেনাবাহিনী দেশের শক্তি। দুঃসময়ে এগিয়ে আসে। ১৯৭১ সালে যখন গোটা জাতি কিংকর্তব্যবিমূঢ়, সেই সময়ে এই সেনাবাহিনীর মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। আবার ৭ নভেম্বর একইভাবে এই সেনাবাহিনীই মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করেছে। এবারও দেখেছি, ২৪–এর গণ–অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশপ্রেমী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।’
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনাকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা ধ্বংসের চক্রান্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা আশ্রয় নিয়েছেন সেই দিল্লিতে, ভারতে। সেখান থেকে তিনি চক্রান্ত করছেন, পরিকল্পনা করছেন কী করে এই গণ–অভ্যুত্থানের বিজয়ের সব ফলাফল নস্যাৎ করে দেওয়া যায়। সেখান থেকে চক্রান্ত করছেন, বাংলাদেশে কীভাবে আবার নৈরাজ্য সৃষ্টি করা যায়। একটা অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টি করা যায়। তারই চক্রান্তে দেখছি বিভিন্নভাবে বিভিন্ন পক্ষ থেকে একটা অস্থির অবস্থা সৃষ্টি করা হচ্ছে।’
দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না করলে কোনোভাবেই স্থিতিশীল অবস্থা আসবে না উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, সে জন্যই বারবার বলেছি, দেশে প্রকৃতপক্ষে নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটার জন্যই আন্দোলন করেছি দীর্ঘদিন ধরে। সেই জায়গায় বিভিন্ন রকম প্রশ্ন তুলে একটা নৈরাজ্যের দিকে দেশকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
কারও নাম উল্লেখ না করে ফখরুল বলেন, কিছু মানুষ অন্যায়ভাবে দেশকে, দেশের মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তোলার চেষ্টা করছে। সবাইকে রাস্তায় নামানোর চেষ্টা করছে। একইভাবে একই কায়দায় দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এটা কোনোমতেই দেশের স্বাধীনতার জন্য শুভ নয়। এটা কোনোমতেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। স্থিতিশীলতার জন্য শুভ নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আপনি শক্ত হাতে সরকারকে পরিচালিত করুন। এ কথা কেউ যেন না বলে, আপনারা পক্ষপাতিত্ব করছেন। আমরা সেটা শুনতে চাই না। কারণ, আপনি অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত মানুষ। সারা বিশ্বে আপনার নাম আছে। আশা করব, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রেখে যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সংস্কার সম্পন্ন করে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যান এবং সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে স্থিতিশীলতা শান্তি এবং ভবিষ্যতের জন্য সমৃদ্ধি আনবেন।’
আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.
হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা শক্তিশালী সরকার চাই। দুর্বল সরকার আর দেখতে চাই না। অতি দ্রুত সম্ভব নির্বাচন দেখতে চাই। যে সরকার প্রতিবেশী বা অন্যান্য পরাশক্তির ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে পারে—এ ধরনের সরকার হতে পারে কেবল নির্বাচিত সরকার।’
আলোচনা সভায় শহীদ সেনা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পিলখানা হত্যাযজ্ঞে নিহত সাবেক বিডিআরের (বর্তমান বিজিবি) মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের ছেলে রাকিন আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, তাঁর বাবা ছিলেন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জন্য আতঙ্ক। এই হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ ধ্বংস করতেই সাংবাদিক দম্পতি সাগর–রুনিকে হত্যা করা হয়েছে।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে শেখ হাসিনা নিজে জড়িত বলে আলোচনা সভায় অভিযোগ করেন সে সময় র্যাব–২–এর সিইওয়ের দায়িত্বে থাকা লে. কর্নেল (অব.) শামসুজ্জামান খান। আলোচনা সভায় তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে সকাল ১০টার মধ্যে পৌঁছালেও তাঁকে ভেতরে ঢুকে বিদ্রোহ দমনে বাধা দেওয়া হয়েছিল।
আলোচনা সভায় আরও বক্তৃতা করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান ও দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবদুস সালাম।
উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: র সদস য ব এনপ র র জন য করছ ন ফখর ল সরক র
এছাড়াও পড়ুন:
পবিত্র রমজানের শিক্ষা বিস্তৃত হোক জীবনব্যাপী
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের দ্বিতীয় স্তম্ভ হলো সালাত বা নামাজ। ইমানের পরেই নামাজ। পবিত্র রমজান মাস হলো নামাজের মাস, যেমন তারাবিহর নামাজ ও কিয়ামুল লাইল নামাজের পাশাপাশি পবিত্র রমজানে সাহ্রির বদৌলতে তাহাজ্জুদ নামাজের অভ্যাস গড়া সহজ হয়; এশা ও ফজরের নামাজ জামাতে পড়ার সুযোগ বৃদ্ধি পায়। ফজরের নামাজ আগেভাগে পড়ে ঘুমানোর কারণে সকালে ইশরাক নামাজ পড়ার সুবিধা হয়।
পবিত্র রমজানের কারণে কাজের চাপ কম থাকায় চাশত নামাজ ও জোহরের আগে আওয়াবিন নামাজ আদায়ের সুযোগ হয়। বিকেলে অফিস বা কর্মস্থল থেকে আগে ফেরার কারণে আসরের নামাজ জামাতে পড়া যায়। একসঙ্গে ইফতার করার সুবাদে মাগরিবের নামাজের জামাতও পাওয়া যায়। অন্যান্য নফল নামাজও বেশি পড়া হয়। পবিত্র রমজানেই নামাজের পূর্ণতা আসে।
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের তৃতীয় স্তম্ভ হলো জাকাত। সাহাবায়ে কিরাম পবিত্র রমজানেই জাকাত প্রদান করতেন। পবিত্র রমজানে জাকাত প্রদানে চান্দ্রবর্ষের হিসাব অনুযায়ী সঠিকভাবে জাকাত প্রদান করা সহজ হয়।
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের চতুর্থ স্তম্ভ হলো হজ। পবিত্র রমজানে ওমরাহ পালন করলে নবীজি (সা.)–এর সঙ্গে হজ করার সমান সওয়াব পাওয়া যায়। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের পঞ্চম স্তম্ভ হলো সিয়াম বা রোজা। রোজা হলো পবিত্র রমজানের প্রধান অনুষঙ্গ। আগুন যেমন সোনাকে বিশুদ্ধ করে, তেমনি রোজা ইমানদারের কামনা–বাসনাকে দহন করে তাঁকে খাঁটি বান্দায় পরিণত করে।
রোজার ফিদইয়া পবিত্র রমজানেরই অংশ। রোজা একটি শারীরিক ও মানসিক ইবাদত। কিন্তু অসুস্থ ও দুর্বল ব্যক্তির জন্য কাজার পাশাপাশি অপারগতায় ফিদইয়ার বিধান রাখা হয়েছে, যা আর্থিক ইবাদত। এতে বোঝা যায় রোজার পরিধি কত ব্যাপক।
রোজার কাফফারা পবিত্র রমজানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রোজা শারীরিক ইবাদত হওয়া সত্ত্বেও দুর্বলচিত্তের ব্যক্তি যদি রোজা ভঙ্গ করেন, তবে তাঁর জন্য কাফফারার বিধান রয়েছে। এটি হলো দাস মুক্তি দেওয়া অথবা ৬০ জন গরিবকে দুই বেলা পরিপূর্ণ আহার করানো অথবা একাধারে ৬০টি রোজা রাখা। অর্থাৎ যদি কেউ রমজান মাসের একটি রোজা ভঙ্গ করেন, তবে তাঁকে ৬০ দিনের রোজা রাখতে হবে অথবা কাফফারা আদায় করতে হবে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, দান–খয়রাত ও সমাজকল্যাণই পবিত্র রমজানের অন্যতম উদ্দেশ্য।
রোজা শেষে পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হয়। দাতা ও গ্রহীতার সুবিধার্থে পবিত্র রমজানেও এটি প্রদান করা যায়। ঈদের সঙ্গে ফিতরার সম্পৃক্ততার কারণে এর নাম হয়েছে ঈদুল ফিতর। সদকাতুল ফিতর হলো ঈদের আনন্দ সর্বজনীন করার উপায়। ধনী–গরিব সবাই যেন ঈদের আনন্দে শামিল হতে পারেন, সে জন্য এই ব্যবস্থা। সদকাতুল ফিতর পবিত্র রমজানে রোজা পালনের শুকরিয়াস্বরূপ এবং এটি রোজাকে পূর্ণতা দেয়।
পবিত্র রমজানের বিশেষ উপহার হলো ইতিকাফ। মানবজীবনে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের অন্যতম মাধ্যম হলো ইতিকাফ। পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশকে ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা কিফায়া। এখান থেকেও পবিত্র রমজানের মহিমা বোঝা যায়। এক দশকের কম সময়ের ইতিকাফ নফল হলেও এই ইতিকাফ অন্য সময়ের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি ফজিলতের। ইতিকাফ বছরের যেকোনো সময় করা যায়, তবে সর্বনিম্ন সীমা হলো এক দিন অর্থাৎ সূর্যাস্তের আগে থেকে পরের দিনের সূর্যাস্ত পর্যন্ত।
পবিত্র রমজানের অনন্য উপহার হলো শবে কদর। এটি এমন এক রাত, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। হাজার মাস মানে প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাস, যা একটি মানবজীবনের সময়ের সমান। সুতরাং পবিত্র রমজানের সুফল জীবনব্যাপী।
● মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম
[email protected]