Samakal:
2025-03-28@01:32:21 GMT

শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব সংগত

Published: 24th, February 2025 GMT

শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব সংগত

রবিবার এনবিআর-জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রাক-বাজেট বৈঠকে সংবাদপত্রের স্বত্বাধিকারীগণের সংগঠন ‘নোয়াব’ যেই সকল দাবি জানাইয়াছে, সেইগুলির যৌক্তিক সমাধান জরুরি বলিয়া আমরা মনে করি। সোমবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নোয়াব নিউজপ্রিন্টের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশের পরিবর্তে ২ শতাংশ এবং ভ্যাট ১৫ শতাংশ হইতে কমাইয়া ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়াছে। ইহার সহিত সংবাদপত্র শিল্পকে সেবামূলক শিল্পরূপে বিবেচনাপূর্বক করপোরেট কর সর্বনিম্ন নির্ধারণ অথবা অবলোপনেরও অনুরোধ করিয়াছে নোয়াব। সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ তাহাদের দাবির সপক্ষে যেই সকল যুক্তি উপস্থাপনা করিয়াছেন, সেইগুলিও প্রণিধানযোগ্য। তাহারা যথার্থই বলিয়াছেন, বর্তমানে সংবাদপত্রের মূল কাঁচামাল নিউজপ্রিন্টের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ হইলেও এই বাবদ ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। এইগুলির সহিত অগ্রিম আয়কর ও পরিবহন বীমা যুক্ত করিলে নিউজপ্রিন্ট আমদানিতে শুধু কর-শুল্ক বাবদ প্রকৃত ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছে। তদুপরি যুক্ত হইয়াছে নিউজপ্রিন্ট ও ডলারের বর্ধিত দাম। কয়েক বৎসর পূর্বে এক টন নিউজপ্রিন্টের দাম ছিল ৬০০ ডলারের কম। এখন তাহা ৭০০ ডলার অতিক্রম করিয়াছে। টাকা-ডলারের বিনিময় হারও পূর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাইয়াছে। সংবাদপত্রের মূল আয় যেই বিজ্ঞাপন, উহার উপরেও কর-ভ্যাট অধিক। সরকারি বিজ্ঞাপনের বিল বৎসরের পর বৎসর আটকাইয়া থাকে। বিবিধ কারণে ব্যক্তি খাতের বিকাশ রুদ্ধ হইবার কারণে এই খাত হইতে বিজ্ঞাপনও হ্রাস পাইয়াছে। এইদিকে এই সংকটসমূহ এমন সময়ে সংবাদপত্র শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করিতেছে যখন বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল মাধ্যমের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়াছে; হ্রাস পাইয়াছে সংবাদপত্র পাঠকের সংখ্যা।
স্মরণে রাখিতে হইবে, সংবাদপত্র নিছক শিল্প নহে; দেশ ও জাতির প্রয়োজনে নিবেদিত জরুরি সেবাও বটে। এনবিআর চেয়ারম্যান স্বয়ং স্বীকার করিয়াছেন, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির লক্ষ্যে বর্তমানে জনপরিসরে সচেতনতা সৃষ্টির যেই ব্যাপক কার্যক্রম চলিতেছে উহাতে সংবাদপত্র উল্লেখযোগ্য অবদান রাখিতেছে। বহু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দিবসের সূচনায় দেশ-বিদেশের বিবিধ ঘটনা সবিস্তারে মানুষ সংবাদপত্র হইতেই পায়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিবিধ ঘটনা সম্পর্কিত বিজ্ঞজনদের বৈচিত্র্যপূর্ণ বিশ্লেষণও সংবাদপত্র তুলিয়া ধরে। সংবাদপত্র সঠিক তথ্য মুদ্রণ করে বলিয়াই রাষ্ট্র বা সরকার ক্ষতিকর গুজব প্রতিরোধ করিতে পারে। সর্বোপরি, রাষ্ট্র ও সমাজের যেই কোনো টেকসই উন্নয়নের বিষয়ও সংবাদপত্র শিল্পের সতেজতার উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু বাস্তবে দেশের সংবাদপত্র শিল্প এক প্রকার রুগ্‌ণ হইয়া পড়িয়াছে। 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইল, বিগত সরকার সংবাদপত্রকে সেবা শিল্পের মর্যাদা দিলেও এই শিল্প-সংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য কোনো প্রস্তাবের প্রতি উহারা কর্ণপাত করে নাই। এই প্রেক্ষাপটে এই শিল্প-সংশ্লিষ্ট সকলের কথা শ্রবণ করা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। এই কথাও স্মরণে রাখিতে হইবে, যেই গণঅভ্যুত্থান বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পথ সুগম করিয়াছে, মতপ্রকাশ তথা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের দাবিটি সেই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম জ্বালানিস্বরূপ কাজ করিয়াছে। অর্থাৎ অন্তত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের অংশরূপেও সংবাদপত্র শিল্পের যথার্থ বিকাশের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করিতে হইবে। আমরা জানি, সংবাদপত্রের সহিত শুধু সাংবাদিক বা অন্যান্য কর্মীই জড়িত নন; ইহার মুদ্রণ, বিপণন, বিতরণ, বিজ্ঞাপনসহ বহু কাজে অগণিত মানুষ যুক্ত। এই সকল মানুষের পরিবারগুলিও এই শিল্পের উপর নির্ভরশীল। আমাদের বিশ্বাস, আসন্ন বাজেটে সংবাদপত্র শিল্পের অব্যাহত অগ্রগতি ও মসৃণ পরিচালনার স্বার্থে বিদ্যমান শুল্ক ও কর নীতিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গৃহীত হইবে। নোয়াবের অন্য প্রস্তাবগুলি সম্পর্কেও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসিবে। একটা বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র গঠনে অঙ্গীকারবদ্ধ সরকারের নিকট এমনটা আশা করা আদৌ বাহুল্য নহে।

.

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: স ব দপত র স ব দপত র শ ল প স ব দপত র র কর য় ছ সরক র

এছাড়াও পড়ুন:

জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হউক

আজ আমাদের ৫৫তম স্বাধীনতা দিবস। পাকিস্তানি প্রায়-ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণবিরোধী ২৩ বৎসরের সংগ্রামের ধারাবাহিকতায়, বিশেষত ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ নিরীহ বাঙালির উপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পরিচালিত বর্বর হত্যাযজ্ঞের প্রেক্ষাপটে, একই বৎসরের এই দিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। ইহার ধারাবাহিকতায় প্রায় ৯ মাসব্যাপী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লক্ষ মানুষের শহীদি আত্মদান এবং দুই লক্ষাধিক নারীর অপরিসীম নির্যাতন ভোগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশ উচ্চ শিরে আপন অস্তিত্ব ঘোষণা করে বিশ্ব-মানচিত্রে। এই দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করি মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদ, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, সম্ভ্রমহারা মাতা-ভগিনি এবং স্বজন হারানো পরিবারসমূহকে। মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জাতীয় নেতৃবৃন্দ, সকল সেক্টর কমান্ডারসহ রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের। তাহাদের ঋণ আমরা কোনোদিন ভুলিতে পারিব না। 

ইহা অনস্বীকার্য, বিশেষ কিছু মহল ব্যতীত জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই ভূখণ্ডের সকলেই ঐ যুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল, এই দেশের ভালো-মন্দের সিদ্ধান্ত আমরা নিজেরাই গ্রহণ করিব। আমাদের ভাগ্য আমরাই গড়িব। পাশাপাশি আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত সকলের জন্য সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিতকরণের প্রতিশ্রুতিও বিস্মৃত হইলে চলিবে না। তদনুযায়ী আমাদের স্বাধীনতার ৫৪তম এই বার্ষিকীতে সকল স্বপ্ন ও বাস্তবতার সংগতি-অসংগতি লইয়া আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ।

ইহা সত্য, গত ৫৪ বৎসরে বিভিন্ন সরকারের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ দারিদ্র্যমুক্তিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করিয়াছে। জাতিসংঘ স্বীকৃত নানা মানবউন্নয়ন সূচকেও অনুরূপ সাফল্যের প্রকাশ স্পষ্ট। উহারই প্রমাণস্বরূপ, আমরা ইতোমধ্যে জাতিসংঘ স্বীকৃত উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হইয়াছি, যাহা আগামী বৎসরই স্থায়ী রূপ পাইবে বলিয়া আমরা সকলে জ্ঞাত। তবে ইহাও সত্য, উক্ত সময়ে বিশেষত ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য উদ্বেগজনকরূপে প্রকট। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না গৃহীত হইলে তাহা রাষ্ট্র ও সমাজকে দীর্ঘ মেয়াদে অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিরতায় নিমজ্জিত করিতে পারে। বিশেষত বিগত সরকারের সময়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণসহ ব্যাংক খাতে যেই অরাজকতা চলিয়াছে, উহার ক্ষত এখনও শুকায় নাই। ঊচ্চহারের মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ প্রবাহে ভাটা, বেকারত্ব ইত্যাদি এই সময়ের বিশেষ শঙ্কার বিষয়। শত শত প্রাণের বিনিময়ে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা বিগত সরকারের কবল হইতে মুক্ত হইয়াছি বটে, কিন্তু জানমালের নিরাপত্তার প্রশ্নটি অদ্যাবধি জনপরিসরে বৃহৎ উদ্বেগ ছড়াইয়া চলিয়াছে। আমাদের রাজনীতি যেই দোষারোপ ও সংঘর্ষের বৃত্তে আটকা পড়িয়াছিল, উহা হইতেও মুক্তি মিলিয়াছে, বলা যায় না। আমরা দেখিয়াছি, ঐ রাজনীতির ফলস্বরূপ গণতন্ত্র সংহত হইবার পরিবর্তে বিগত দিনগুলিতে ক্রমশ সংকুচিত হইয়াছে। বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং সংবিধান স্বীকৃত অন্যান্য নাগরিক অধিকারের পরিসর ক্রমশ সংকীর্ণ হইয়াছে। রাজনীতি ও সমাজে সাম্প্রদায়িকতা বেশ জাঁকিয়া বসিয়াছিল। এই সকল কিছুই সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদাবিরোধী। তাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয় বেশ প্রাধান্য পাইয়াছে।

তবে ইহাও স্বীকার্য, দেশে একটি কার্যকর নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করিতে না পারা বিগত ৫৪ বৎসরে অন্যতম বৃহৎ ব্যর্থতা। জনগণের শাসন নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে একমাত্র ব্যবস্থা হইল নিয়মিত বিরতিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান। ইতিহাস সাক্ষী– কেবল নির্বাচিত সরকারের সময়েই এই দেশে সার্বিক উন্নয়ন ঘটিয়াছে। বিগত সরকার জবরদস্তিমূলক ক্ষমতা ধরিয়া রাখিতে গিয়া দেশে নির্বাচন ব্যবস্থাকে যেইভাবে ধ্বংস করিয়া দিয়াছে, উহা নজিরবিহীন। আমরা মনে করি, ঐ বিধ্বংসী ধারা হইতে দেশকে বাহির করিয়া আনা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। রাষ্ট্রের উপর সর্বার্থে জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্বার্থে একটা কার্যকর নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। অদ্যকার স্বাধীনতা দিবসে সরকার উক্ত বিষয়কে প্রাধান্য দিয়া সকল কর্মসূচির বিন্যাস করিবে– ইহাই আমাদের প্রত্যাশা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হউক