কেন্দ্র ও প্রান্ত খুব সহজেই রেটোরিক হয়ে পড়তে পারে। রাজনীতিতে তো বটেই, বিদ্যাজগতের আলোচনাতেও। অনেকটা সরকারের মুখে শোনার মতো– ‘জনগণ আমাদের সাথে আছে’। কিংবা বিদ্বানের মুখে শোনার মতো– ‘মানুষের উপকারের জন্য আপনাদের পড়ালেখা করতে হবে’। সরকার যখন বলেন ‘জনগণ’, তখন তা মূলগতভাবেই প্রান্তের দ্যোতনা আচ্ছামতো নিজেদের কণ্ঠে ঠেসে দিয়ে বলেন। তেমনি বিদ্যাজগতে যখন বলা হয় ‘সাধারণ মানুষের জন্য উপকারী’, তখনও একই ঘটনা ঘটে। আচ্ছামতো প্রান্ত কণ্ঠস্বরে ঠেসে। এই রেটোরিকের উপদ্রবের মধ্যে আসল বা ‘খাঁটি’ প্রান্ত নিজেই অত নিশ্চিত হতে পারে না যে সে আছে নাকি নাই, থাকলে ঠিক কোথায় আছে। ভাষা প্রসঙ্গে এই কেন্দ্র-প্রান্ত আরও যথেচ্ছ ধরনের গোলমেলে। এত গোলমেলে যে, প্রান্তজন নিয়ে কোনো ধরনের ঠাহর করাই মুস্কিল। বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক জীবনে এই দুর্যোগ আরও ঘনীভূত। আমল নির্বিশেষে এই দুর্যোগের আমলনামা বদলায় না। আমি ঠিক করেছি, আজকে গাদাগাদা উদাহরণই দেব। 
মাত্র বছরখানেক আগেও যদি তালিকা করতে যেতেন যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাংলাদেশে কত বই আছে, আপনার হিমশিম খাবার জোগাড় হতো। এই কৌতূহল আমার দেখা দিয়েছিল একদা। আমি ডিজিটাল বাংলাদেশে, বাসায় বসে-বসেই বিভিন্ন দপ্তরের ওয়েবসাইট ঘেঁটে কখনো দেড় হাজার কখনো দুই হাজারের অধিক বইয়ের তালিকা ডাউনলোড করেছি। তারপর কোন তালিকায় কোন বইগুলো অভিন্ন তা নিয়ে কম্পুস্ক্রিনে খোঁজাখুঁজি করেছি। এখনো কোন কোন শিরোনামে বঙ্গবন্ধুবিষয়ক আরও বই লিখিত হতে পারে তার কিছু শিরোনামও বানিয়েছিলাম। নিজে লিখব ভেবে নয়, বরং নতুন উৎসাহী রচয়িতা কেবল শিরোনামের অভাবে না– লিখতে পারেন এই দুর্যোগ যেন তাঁর জীবনে না আসে সেই মহতী মন নিয়ে করেছিলাম। ভেবেছিলাম কেউ চাইলে দিতে পারব। আমার এই নিবিড় গবেষণা ও সৎকর্মে কী লাভ হয়েছে তা যদি জিজ্ঞাসা করেন তো জবাব দিতে পারব না। তবে অনুসন্ধিৎসা তো এরকমই হবার কথা! আমার ধারণা নেই এই ফাইলগুলো ওসব দপ্তর এখনো আপলোড করে রেখেছে কিনা। কিন্তু এই ধারণা আমার আলবৎ আছে যে গত ছয় মাসে ওসব লেখকের অনেকেই চাইছেন না যে আপনি তাঁর কষ্টসৃজিত কিতাবখানি আবিষ্কার করে ফেলুন। তিনি কোন প্রান্তে যেএখন আছেন তা ভাবতেই গা ছমছম করে। সাকিব আল হাসানকে ঠিক সুবক্তা বলার মতো কিছু ঘটেছিল না আমার জীবনে। তাছাড়া তাঁর বক্তৃতাই বা শুনেছি কোথায়! মৃদুমন্দ হাসিমুখে তিনি কিছু বিজ্ঞাপনের মুখস্থ বাক্য বলতে টিভিতে আসতেন। তাঁর হাসি সুন্দর, পণ্যটার ছবিও স্ক্রিনে থাকত। তাঁর ভাষাতে অত মনোযোগ না দিলেও চলত। এর বাইরে তো চৌকষ দুর্দান্ত খেলোয়াড় তিনি। কখনো তাঁকে প্রান্ত ভাবার মতো কিচ্ছুটি ঘটেনি। কিন্তু যেই না তিনি ‘জন’জবানে ‘দালাল’ সাব্যস্ত হলেন, অমনি তাঁকে বেচারি মনে হতে শুরু করল। তবে ষোলকলার তখনও বাকি। যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা, তাঁর কষ্টার্জিত হাসিহীন মুখে যখন বার তিনেক অন্তত ব্যাখ্যা দিলেন সাকিবের কী ধরনের নাকখৎ দিয়ে জনতৃপ্তি আনতে হবে, তখন প্রকৃতই সাকিবকে প্রান্ত মনে হতে বাধ্য। লক্ষ্য করুন, আমরা শুনছি একজন জনপ্রশাসকের মুখের ভাষা। তদুপরি একটা অভ্যুত্থান-উত্তর সরকারের প্রতিনিধির ভাষা। সেই ভাষাতে কোনো স্নেহ নাই, দায়িত্ব নাই, দায় নাই, দরদ নাই। আছে কেবল কেন্দ্রের ধামকি। তখন মহাতারকা সাকিবও প্রান্ত হতে বাধ্য। এই উদাহরণ দেবার কারণে পরীমণির উদাহরণ না দিলেও চলে। কেন্দ্র ও প্রান্ত নিয়ে ন্যূনতম আমাদের বোঝাবুঝির জন্য সাধারণভাবে যাকে বুর্জোয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বলা হয়, সেটার নিশ্চয়তাও জরুরি হয়ে পড়ে। যখন সেই ব্যবস্থাও আমাদের অধরা থাকে, প্রান্ত তখন সর্বত্রময়। এই কথা বলার মাধ্যমে ঐতিহাসিক প্রান্তিকতাতে লঘু করা আমার আগ্রহ নয়। আমি চাইছি ভাষার প্রান্তিকতা ও প্রান্তজনের ভাষার চক্রাকার দশাটা যেন বিস্মৃত না হই। 
লেখক ও কথক হিসেবে আমি নিজের দশাকেও লাগাতার বিশ্লেষণ করার মুডে থাকি। রচনাতে তৎসম-তদ্ভব শব্দের পাশাপাশি কিছু আরবি-ফারসি শব্দ ও ‘গ্রামীণ’ শব্দ ব্যবহারের কারণে আমি সেক্যুলার পরিচিতদের কটাক্ষের মধ্যে পড়তাম। সেসব কটাক্ষের কিছু সামনে প্রকাশিত হতো। বেশির ভাগই আমার সামনে নয়, কিন্তু এতটাই তীব্রভাবে যে না-টের পাবার উপায় ছিল না। এর মধ্যে একটা ছিল “অমুকের ভাব ধরছেন?” কিন্তু এটাই সবচেয়ে কর্কশ নয়। সবচেয়ে কর্কশটা ছিল “আপনারা তো ইসলামি/পাকিস্তানের ভাষা প্রোমোট করতেছেন”। পাকিস্তানের যে একটা বাংলা ভাষা থাকতে পারে এই কল্পনাই তো কঠিন! আর এই বহুবাচনিক সর্বনাম ‘আপনারা’তে অতি অবশ্যই আমি ও অমুক বলবৎ থাকতাম। যে অমুকের কথা বলা হতো, তাঁর শব্দসীমানা ও চিন্তাসীমানা আমার আগ্রহের জায়গা। কিন্তু ওই টিপ্পনিতে গৌরব বোধ করব নাকি পোতানো বোধ করব, একা করব নাকি সেই অমুক চিন্তক সমেতই করব তা ফয়সালা অত নিশ্চিত ছিল না। কিন্তু জগৎ মধুর শ্লেষময়। এই একই বর্গ আমার কথনে/বচনে সম্পূর্ণ আরেক ফয়সালা করত: “দাদাদের ভাষায় কথা কন”। এখানে দাদা না কোনো সম্মানের, না কোনো সত্যের। ঢাকা শহরে যাকে ‘প্রমিত’ বাংলা হিসাবে সাব্যস্ত করা হয়েছে তা নিছকই উচ্চারণীয়, ক্রিয়াপদীয় ও অল্প কিছু অব্যয়-সংশ্লিষ্ট। কিন্তু এই সাব্যস্তকরণের মধ্যে যদি বাচনিকভাবে কেউ ‘প্রমিত’পন্থি ঠাহরিত হন, তাহলে তাঁর নির্দিষ্ট অল্প কিছু আসর ছাড়া আর কোথাও আরামসে চলাফেরার বন্দোবস্ত নাই। তিনি একটা বিশাল প্রান্তই হবেন। আমি এমনকি সেসব আসরেও যাই না। তাহলে আমার কপাল ভাবুন! আমার বেলাতে কম্বোপ্যাকেজটা বেশ দুর্লভ তা পাঠকের স্বীকার করে নেয়াই উত্তম। লিখনে ‘ইসলাম’ প্রমোটার ও বচনে ‘দাদা’ধারী। 
দুইটাই প্রায় সমবর্গ থেকে নির্ধারিত, দুইটার কোনোটাই, পরিপ্রেক্ষিত বিচারে, আমাকে কোনো আরামদায়ক মর্যাদা দেয় নাই। এখন, পাঠককে নিশ্চয়ই মনে করিয়ে দেবার দরকার নাই যে আগস্ট-২০২৫ পরবর্তীকালে আমার এই দশার (বা দুর্দশার) পূর্বতন ব্যাকরণটা একইভাবে অটুট আছে কিনা তা আবার খতিয়ে দেখতে হবে। বইমেলার ঠিক প্রাক্কালে, ৩১ জানুয়ারি, পুলিশের সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁরা (মানে পুলিশের কর্মকর্তারা) বলেছিলেন যেন বইমেলায় আনার আগেই পাণ্ডুলিপি তাঁদের দেখানো হয়। যেসব বইয়ের বিষয়বস্তু/কন্টেন্ট পরিস্থিতি ‘অস্থিতিশীল’ করতে পারে সেগুলো ঠেকানোর উদ্যোগ হিসেবেই তাঁরা এই রূপরেখাটি সামনে এনেছেন। ২০২৬ সালের বইমেলা থেকে এই ব্যবস্থা চালু করতে সুপারিশ তাঁদের। লেখক, পাঠক অনেকেই পুলিশের এই প্রস্তাবে হাসাহাসি করেছেন, বিরক্ত হয়েছেন। কিন্তু আমি একদম হাসাহাসি করিনি, বিরক্তির তো প্রশ্নই নেই। বরং, আমি পুলিশের (ঊর্ধ্বতন) কর্মকর্তাদের এই প্রস্তাবে বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা পেয়েছি। এখানে বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা নিয়ে একটা বাক্য না-বললেই নয়। 
যা কিছুকে আমার বিচক্ষণ লাগে তা কিছুকে আমার দূরদর্শীও লাগে। বস্তুত, বিচক্ষণ মাত্রই দূরদর্শী, বা উল্টোটা। এই সিদ্ধান্তে আসার পর আমি আগামীতে দুইটা পদ/বিশেষণ একত্রে আর ব্যবহার করব কিনা তা নিয়ে সংশয়ে পড়ে গেছি। যাহোক, পুলিশের কর্মকর্তারা দেখলেন ০৫ আগস্টের পর নিম্নপদস্থ পুলিশদের ন্যায্য দাবিগুলো পড়বার বা শুনবার বা আলাপ করবার কোনো উদ্যোগ সরকারের নাই। 

এমনকি কিছুদিন যদি তাঁরা (ঊর্ধ্বতনরা) একটু উৎকণ্ঠায় থাকেনও সেটা কাটতে সময় লাগেনি। পুলিশ বিভাগ বুঝেছেন, এই সরকারও বড় পুলিশদেরই কাছের সরকার। পুলিশের কর্তারা দেখলেন যে প্রশাসকেরা ধমক দেন বেশি, গভর্ন্যান্স প্রণালীর সুষমতা আনয়নে সময় প্রায় দেনই না। মবে জুজু দেখে, সরকারও তাই দেখে। কখনো আনসার জুজু, কখনো শ্রমিক জুজু, কখনো আগস্ট ৩১-এর মধ্যে ‘প্রতিবিপ্লবের’ জুজু। মবে ধমকায়, সরকারও তাই। জনগণ সন্ত্রস্ত, সরকারও তাই। এতটাই সন্ত্রস্ত যে সকালের সিদ্ধান্ত বিকালে বদলান। ‘আয়নাঘর’ দেখার অনুমতি পান সরকার পাক্কা ৬ মাস পর। কার অনুমতি তা আজকে বলব না। বেঁচে থাকলে আগামীতেও না বলতে পারি। এরকম একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা দেখার পর পুলিশের কর্তারা যদি সরকার-অংশ হিসেবে পাণ্ডুলিপি পড়ে মেলায় আসার ছাড়পত্র দিতে চান, তাকে দূরদর্শী বা বিচক্ষণ না-বলবেন কীভাবে?
ডিএমপি কমিশনারের এই বিচক্ষণ ঘোষণার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথাতেই যখন কবি গ্রেপ্তার (মতান্তরে নিরাপত্তা হিফজত) পেলেন, তখন কি প্রমাণ হলো না তাঁদের দাবির যৌক্তিকতার? মেলায় বই আসতে দিয়ে মবলেলানির থেকে অবশ্যই কবি/লেখকের নিরাপত্তা অধিক কাঙ্ক্ষিত। এর থেকে অবশ্যই ভাল ‘বই সরা ব্যাডা, বাসায় গিয়া ছালামুড়ি দিয়া শুইয়া থাক’ বলা। কারণ সেটা প্র্যাগম্যাটিক, জানমালের জন্য অধিক আশ্বস্তকার।
প্রান্ত তামাম দেশের প্রান্তর জুড়ে আছে। আছে খোদ কেন্দ্রে। সরকারের মধ্যেও। ধ্রুপদি সংজ্ঞায় প্রান্তজন কে বা কারা তা নিয়ে আরেকদিন ভাবার অবকাশ নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। কিন্তু একটা অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের নাজুকতা দেখবার কালে প্রান্তকে কেন্দ্রে দেখার চর্চা করবারই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি। গভর্ন্যান্সকে মব-গুণ্ডামির আউটলেট হতে দেখবার পরিস্থিতিতে কেন্দ্র আর প্রান্তের সম্পর্কের পুনর্বিবেচনা দেবার দরকার দেখছি আমি। হতে পারে এই মুহূর্তের বাংলাদেশে কেন্দ্র চিনবার আরও আরও শক্ত চোখ তৈরি করতে হবে আমাদের। 

লেখক

কথাসাহিত্যিক
শিক্ষাবিদ

.

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: প ল শ র কর দ রদর শ সরক র র আম দ র র জন য কর ত র

এছাড়াও পড়ুন:

নরসিংদীতে সেইলরের আউটলেট উদ্বোধন

ঈদুল ফিতরের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিতে লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড সেইলর, নরসিংদীতে তাদের ২৪তম আউটলেট চালু করেছে। সম্প্রতি জেলা শহরের সদর রোডে, এসকে টাওয়ারে এই নতুন আউটলেটটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়।

দুই তলা বিশিষ্ট এই আউটলেটে শিশু থেকে শুরু করে কিশোর-কিশোরী, ছেলে-মেয়ে, পুরুষ এবং নারীদের জন্য ট্রেডিশনাল, ক্যাজুয়াল এবং ফরমাল পোশাকের বিশাল সংগ্রহ থাকছে। বিশেষ করে, আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে থাকছে এক্সক্লুসিভ কালেকশন। পাশাপাশি এখানে অ্যাক্সেসরিজ এবং অন্যান্য লাইফস্টাইল পণ্য পাওয়া যাবে।

সেইলর এর একজন মুখপাত্র বলেন, "আসন্ন ঈদুল ফিতরের আনন্দকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে, আমরা নরসিংদীতে আমাদের ২৪তম আউটলেট চালু করতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত। আমাদের লক্ষ্য, দেশের প্রতিটি প্রান্তে সেইলরের আধুনিক ও মানসম্মত পোশাক পৌঁছে দেওয়া। 

উদ্বোধনী উপলক্ষে সেইলর আউটলেটে চলছে আকর্ষণীয় র‍্যাফেল ড্র অফার, যা চলবে চাঁদ রাত পর্যন্ত । বিশেষ অফারে থাকছে পোশাকের উপর আকর্ষণীয় ডিসকাউন্টসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা। 

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • নরসিংদীতে সেইলরের আউটলেট উদ্বোধন