কুষ্টিয়া শহরে রাস্তা পার হওয়ার সময় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। বুধবার রাত সাড়ে আটটার দিকে শহরের এন এস রোডের মুঘল কুইজিন নামের একটি রেস্তোরাঁর সামনে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত ইশরাত জাহান লাবনী (৪০) ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক আমানুর আমান প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ইশরাত জাহান কুমারখালী উপজেলার পান্টি ইউনিয়নের পান্টি বাজার এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জাহিদ হোসেন জাফরের মেয়ে। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ইশরাত জাহান মেয়ের সঙ্গে কুষ্টিয়া শহরের কাটাইখানা মোড় এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাতে শহরের এন এস রোডের মুঘল কুইজিন রেস্তোরাঁর সামনে থেকে রাস্তা পার হচ্ছিলেন ইশরাত জাহান। এ সময় মজমপুর রেলগেটের দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগতির ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা তাঁকে ধাক্কা দেয়। তিনি রাস্তায় পড়ে গিয়ে কানে ও মাথায় আঘাত পান। রক্তক্ষরণ হলে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়।

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ইমাম বলেন, রাত ৯টা ৫ মিনিটে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত নারীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তির আধা ঘণ্টার ভেতরে তাঁর মৃত্যু হয়। আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় নাক ও কান দিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছিল।

এদিকে ইশরাত জাহান লাবনীর মৃত্যুর খবর শোনার পর হাসপাতালে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে স্বজনেরা স্থানীয় এক গণমাধ্যমকর্মীর ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এই নিয়ে নিহতের স্বজনদের সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের হট্টগোল বাধে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক আমানুর আমান বলেন, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। অর্থ ও হিসাব বিভাগ থেকে তাঁকে তথ্য ও জনসংযোগে সহকারী রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বুধবার তাঁর যোগদান করার কথা ছিল। কিন্তু তিনি কোনো কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে পারছেন না বলে মুঠোফোনে জানিয়েছিলেন।

কুষ্টিয়া মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কামরুল ইসলাম বলেন, একজন নারী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। খবর শোনার পরেই হাসপাতালে এসেছেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

.

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: ইশর ত জ হ ন ইসল ম

এছাড়াও পড়ুন:

বয়ান বদলালেই ইতিহাস বদলায় না

ইতিহাস সৃষ্টির কাজ খুব সহজ নয়। কোনোকালেই তা সহজ ছিল না। ইচ্ছা করলেই ইতিহাস সৃষ্টি করা যায় না; ইতিহাসের নিয়মেই ইতিহাস জন্ম নেয়। সেই অর্থে বলা চলে, ইতিহাস স্বয়ম্ভু। তবে এও সত্য, মানুষই ইতিহাস সৃষ্টি করে। যারা সেটি করেন, তাদের আবার ইতিহাসই সৃষ্টি করে। এই উপমহাদেশের যেসব মনীষীর নাম আমরা শ্রদ্ধাভরে উচ্চারণ করি; যাদের মনে করি ইতিহাসের স্রষ্টা, তাদেরকে ইতিহাসই সৃষ্টি করেছে। নেতাজি সুভাষ বোস, মহাত্মা গান্ধী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান– তারা সবাই ইতিহাসের সৃষ্টি। একই সঙ্গে ইতিহাসের স্রষ্টা।
ইতিহাসের আরেকটি সত্য হলো, ইতিহাস বদলায় না। তবে এর বয়ান বা ন্যারেটিভ বদলায়। বয়ান বদলালেই ইতিহাস বদলায় না; ইতিহাস ইতিহাসের জায়গাতেই থেকে যায়। যেমন নবাব সিরাজউদ্দৌলার কথাই ধরা যাক। প্রায় দেড়শ বছর এ দেশের মানুষ জেনে আসছিল– সিরাজ ১৭৫৬ সালে ১৫ ফুট বাই ১৮ ফুট একটি কামরায় ১৪৬ জন ইংরেজকে বন্দি করে রেখেছিলেন। আলো-বাতাসের অভাবে এক রাতেই তাদের ১২৩ জন মারা যায়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী, পরে সেনাপতি জন জেফানিয়াহ হলওয়েল অন্তত এমনটিই তাঁর ‘ইন্ডিয়া ফ্যাক্টস’ গ্রন্থে লিখে গিয়েছেন। প্রথমদিকে মানুষ তা বিশ্বাসও করেছে। কেউ একবারও প্রশ্ন তোলেনি– এত ছোট্ট একটি কামরায় এত সংখ্যক মানুষের স্থান সংকুলান হয়েছিল কেমন করে। এমনটিই চলে আসছিল ১৮৯৮ সাল পর্যন্ত। গবেষক ও ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ওই সালে প্রকাশিত তাঁর ‘সিরাজদ্দৌলা’ গ্রন্থে যুক্তিতর্ক দিয়ে প্রমাণ করেন– এটি ছিল সাজানো বয়ান। তখনই মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে– বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হেয় এবং নির্দয়, উদ্ধত ও স্বেচ্ছাচারী প্রতিপন্ন করার জন্যই  হলওয়েল বর্ণিত কাহিনিটি রচনা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে হলওয়েল বিবৃত অন্ধকূপ কাহিনির অসত্যতা সর্বজনীনভাবে প্রতিপন্ন হয়েছে। এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, ইতিহাসের বয়ান সবসময় সত্য তুলে ধরে– এমন মনে করার কোনো কারণ নেই।
এটিও সত্য, যখন যে ক্ষমতায় থাকে, অর্থাৎ শাসকগোষ্ঠী তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সময়ে সময়ে ইতিহাসের নতুন নতুন বয়ান সৃষ্টি করে। উদ্দেশ্য খুবই সাধারণ; মানুষকে বিভ্রান্ত করা। যেমন হলওয়েল করেছিলেন। এই উপমহাদেশে বিশেষ করে আমাদের দেশেও সময়ে সময়ে ইতিহাসের নতুন নতুন বয়ান আবিষ্কার থেমে থাকেনি। অনেক সময় নতুন বয়ান দিয়ে পুরোনো বয়ানকে ঢেকে দেওয়া, কখনও বা পুরোনোটাকে একেবারেই মুছে দেওয়ার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। কেউ কেউ আবার একটি দিয়ে আরেকটিকে প্রতিস্থাপনও করতে চান।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, ৫৪ বছর হয়ে গেল। দুঃখজনক হলেও এই অল্প সময়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা রকমের বয়ান চালু হয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০২৪-এর আগস্ট অভ্যুত্থানের পর অনেকেই ২০২৪-কে ১৯৭১-এর সঙ্গে তুলনা করতে সচেষ্ট। এটি করতে গিয়ে ’৭১-এর তাবৎ অর্জনকে পর্যন্ত অস্বীকার করতে চাইছেন; তৈরি করছেন ’৭১-এর নতুন বয়ান। এর সবই যে বিশেষ উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে– তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অবশ্য এ কথা স্বীকার করতেই হবে, বাংলাদেশে আগামী দিনে ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে আবশ্যিকভাবেই ২০২৪-এর কথা আসবে। একই সঙ্গে আসবে ১৯৯০-এর গণআন্দোলনের কথা; আসবে ১৯৭৫-এর কথা। অনিবার্যভাবে সবার আগে আসবে  ১৯৭১-এর কথা। এসবের প্রতিটিরই যেমন আছে ইতিহাসের নিজস্ব বয়ান, তেমনি আছে সমসাময়িক রাজনৈতিক বয়ান।  অনেকেই ইতিহাসের রিসেট বাটনের কথা বলেন। আসলে ইতিহাস কোনো কম্পিউটার সফটওয়্যার নয় যে. ইচ্ছা করলেই তাকে রিসেট করা যাবে।

আরও একটি কথা মনে রাখা দরকার, ইতিহাসে কোনো ঘটনাই একটি আরেকটির সমান্তরাল নয়। ফরাসি বিপ্লবের সঙ্গে অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে মেলানো যাবে না। মেলানো যাবে না চীন বিপ্লবের সঙ্গে কিউবান বিপ্লবকে। একইভাবে ১৯৭১-এর সঙ্গে ২০২৪-কেও মেলানো যাবে না। ইতিহাসের প্রতিটি ঘটনাই আপন স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল কিংবা কালিমালিপ্ত। ২০২৪-এর আগস্টে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর থেকে অনেককেই বলতে শোনা যায়, আমরা দ্বিতীয় স্বাধীনতা পেয়েছি। তারা ভুলে যান– স্বাধীনতার কোনো দ্বিতীয় হয় না। তারা ভুলে যান রেজিম পরিবর্তন মানে স্বাধীনতা নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ এসেছিল আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘ পথ বেয়ে। এটিকে শুধু পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরের সংগ্রাম বললেও ভুল হবে। তারও অনেক আগে থেকেই এর যাত্রা শুরু। হাজার বছর ধরেই বাঙালি জাতিসত্তা আঁকুপাঁকু করছিল নিজের পরিচয় ফিরে পাওয়ার। কিন্তু পথ পাচ্ছিল না। শুধু পথই নয়, পথ দেখানোর মানুষও। এই সময়ে অনেকেই ইতিহাসের মঞ্চে এসেছেন। আবার হারিয়েও গেছেন। ইতিহাসও অনেক বাঁক ঘুরেছে। কিন্তু সঠিক গন্তব্য কেউ দেখাতে পারেননি। না, এটি তাদের ব্যর্থতা নয়। সময় হয়নি, তাই তারা পারেননি। একাত্তর আমাদের সেই সময় এনে দিয়েছিল। তাই একাত্তরকে ভুলে যাওয়ার কোনো সুযোগই নেই।

বলছিলাম, সময়ে সময়ে ইতিহাসের বয়ান বদলায়। আসলে বদলায় না; বদলানো হয়। ক’দিন আগে দেখলাম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রধান বলেছেন, একাত্তরে নাকি তারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। কথাটা সরাসরি বলেননি; একটু ঘুরিয়ে। তিনি বলেছেন, ‘স্বাধীনতার ৫৪ বছর কেটে গেলেও যে লক্ষ্য নিয়ে আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম, তা আজও পূরণ হয়নি।’ এও যে মুক্তিযুদ্ধের এক নতুন বয়ান তৈরির প্রয়াস– তা না বুঝতে পারার কোনো কারণ নেই। এ কথা সবাই জানেন, একাত্তরে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবেই কাজ করেছিল। তাদের তত্ত্বাবধানেই গড়ে উঠেছিল রাজাকার-আলবদর বাহিনী, যারা ৩০ লাখ মানুষের প্রাণ হরণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। এদের অনেকেই একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পরপরই পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা করেছিল। তারপরও যখন তারা বলে, তারা স্বাধীনতা এনেছিল, তখন একে খাটো করে দেখার কোনো কারণ নেই। আসলে জামায়াতের এই বয়ান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করার অপপ্রয়াস ছাড়া আর কিছু নয়।
সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এএইচএম কামারুজ্জামান, মনসুর আলীসহ চার শতাধিক রাজনৈতিক নেতার মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করে তাদের সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করলেন, রাতারাতি তারা হয়ে গেলেন সহযোগী! হাস্যকর শোনালেও এমন সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে। আসলে এসবই মুক্তিযুদ্ধের নতুন বয়ান তৈরির প্রয়াস– যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ যা ছিল জনযুদ্ধ, সেই সত্যই অস্বীকারের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে সত্য এটাই– বয়ান বদলালেই ইতিহাস বদলায় না; ইতিহাস কখনোই বদলানো যায় না– হোক সেটা ’৭১ কিংবা ’২৪।

মোশতাক আহমেদ: অবসরপ্রাপ্ত পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার, জাতিসংঘ

সম্পর্কিত নিবন্ধ