শহীদ জোহার আত্মত্যাগের স্মরণে
Published: 18th, February 2025 GMT
ফাগুন আসে পলাশের আগুন হয়ে; কৃষ্ণচূড়ার লালে মিশে যায়, প্রেম আর দ্রোহের ছোঁয়া। কিন্তু এক ফাল্গুনে, ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কৃষ্ণচূড়ার রং মলিন হয়ে গিয়েছিল এক মহান শিক্ষকের রক্তে; সেই সঙ্গে চক্র ক্রমিক হারে বসন্ত ছাপিয়ে দরজায় কড়া নেড়েছিল অবহেলা! ঠিক যেন কবি দর্পণ কবিরের স্বরচিত কবিতার মতো; মধ্য দুপুরের তির্যক রোদের মতো; অনেকটা নির্লজ্জভাবে আলিঙ্গন করে নিয়েছিল অনাকাঙ্ক্ষিত অবহেলা! ড.
উনসত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে বাঙালি আত্মত্যাগের মন্ত্রে নিজেদের উৎসর্গ করার দীক্ষা নিচ্ছিল। উত্তাল বিক্ষোভের মধ্যে ২০ জানুয়ারি পাকিস্তানি পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, শহীদ আসাদ নামে তিনি ইতিহাসে খ্যাত। এরই ধারাবাহিকতায় ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখে ঢাকা সেনানিবাসে হত্যা করা হয় সার্জেন্ট জহুরুল হককে।
ফলে দেশের মানুষের মধ্যে আন্দোলনের আগুন দাবানলের রূপ নেয়। প্রতিবাদস্বরূপ ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহস্র ছাত্র–ছাত্রী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাস থেকে শহরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কাজলা গেটে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সে মিছিলে গুলি করার প্রস্তুতি নেয়।
‘ডোন্ট ফায়ার, আই সেইড—ডোন্ট ফায়ার; কোনো ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে যেন আমার বুকে গুলি লাগে’—নিজেকে প্রক্টর পরিচয় দিয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠে চিৎকার দিয়ে ওঠেন ড. জোহা। তর্কযুদ্ধের একপর্যায়ে সেনাসদস্যরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েই ক্ষান্ত হয়নি, বেয়নেট দিয়ে নৃশংসভাবে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে।
‘ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও/ ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও!’ প্রারম্ভ থেকেই এ দেশের শিক্ষকেরা অসহায় শিক্ষাব্যবস্থার কাছে, নানা বাহিনীর কাছে, ছাত্র নামের দুর্বৃত্তদের কাছে! শিক্ষক সম্পর্কে মানুষের মনে যে বিষয়টি গেঁথে গেছে, তারা খুব সাধারণ মানের জীবনযাপন করবে এবং সেই সাদামাটা জীবনের জন্য সমাজ তাদের ধন্য ধন্য করবে। অর্থাৎ বাংলা সিনেমায় দেখানো শিক্ষকদের সেলুলয়েড ও জেরক্স ভার্সন! অথচ শিক্ষকদের তাঁরা মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবেও গণ্য করেন।
আজকের শিক্ষাব্যবস্থা চরম সংকটে। শিক্ষার পবিত্র অঙ্গনেও ব্যবসার ছায়া, উচ্চশিক্ষার নামে বিদেশে মেধা পাচারের কালো হাতছানি। শিক্ষকদের বেতন, পারিতোষিক, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ—সবকিছুতেই ঘাটতি। আদর্শচর্চা ও নৈতিক শিক্ষার স্থান দখল করেছে গ্রেডভিত্তিক শিক্ষা। একসময় যাদের সামনে জাতি মাথা নত করত; আজ তাঁরা অবহেলিত। শিক্ষকের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে ন্যায় ও নীতির স্বাধীনতা।
জীবন ঠুনকো, জীবন সংকটময়। তবে রক্ত যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে, তখন তা ইতিহাস গড়ে। শহীদ জোহার আত্মত্যাগ তেমন ইতিহাসই তৈরি করেছে। শহীদ ড. শামসুজ্জোহার মৃত্যুর ৩৯ বছর পর ২০০৮ সালে এই রাষ্ট্র তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেছে এবং তাঁর নামে চার টাকা মূল্যের স্মারক ডাকটিকিট চালু করা হয়েছে। রাবি ক্যাম্পাসে একটি ছাত্র হলের নামকরণ করা হয় তাঁর নামে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করলে প্রশাসন ভবনের সামনে নজরে পড়বে শহীদ জোহার সমাধিক্ষেত্র।
কয়েক বছর ধরে জোহা দিবস পালনে যোগ দিয়েছে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। একুশে পদকও দেওয়া হয়নি ড. জোহাকে। এ জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার আবেদন জানিয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। প্রতিবছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সকালে সূর্যোদয়ের সঙ্গে কালো পতাকা উত্তোলন, ড. জোহার সমাধি ও স্মৃতিফলকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। পাশাপাশি জোহা স্মারক বক্তৃতা ও আলোচনাসভা, রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। তবে ‘সংসারের জন্য যে নিজেকে প্রতিনিয়ত ক্ষয় করিলো, তাহাকে সকলে মাথায় করিয়া দায়মুক্তি পাইলো; কিন্তু তাহাতে তাহার ক্ষয় পূরণ হইল কি?’
যে জাতি জোহার মতো বীরের স্বীকৃতি জানাতে কুণ্ঠাবোধ করে, সেই জাতির চেতনা কীভাবে বিকশিত হবে?
আজ যখন অন্যায় সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহিত, যখন সত্য বলতে ভয় পায় মানুষ, যখন ন্যায়বিচার অবরুদ্ধ—তখন আমাদের প্রয়োজন শামসুজ্জোহার মতো সাহসী শিক্ষকদের, যাঁরা জ্ঞানের আলোয় পথ দেখাবেন, যাঁরা আবারও বুক পেতে দেবেন সত্যের জন্য; কিন্তু একফালি ছেঁড়া চাঁদ আঁকড়ে পুরো পূর্ণিমা উপভোগের আকাঙ্ক্ষা করাটা বাড়াবাড়ি! হৃদয় স্পর্শ করলে দেখা যাবে, সেখানে একটা মাংসপিণ্ড ব্যতীত কোনো অনুভব নেই।
উনসত্তরের রক্তস্নাত কৃষ্ণচূড়া প্রকৃতি থেকে হৃদয়ে বিশালতা জাগ্রত করে। সেই ফাগুনের বাতাসের কিংশুকের দোলায় আমাদের প্রত্যাশা এক মহান শিক্ষকের যথাযথ মর্যাদা। ১৮ ফেব্রুয়ারিকে ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস' হিসেবে স্বীকৃতিদান এখন সময়ের দাবি।
তাই সময়ের উজান-স্রোতে গা ভাসানো এই প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে শিক্ষকের যথাযথ মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে হবে, তাঁদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। সময়ের প্রভাবমুক্ত, মুক্তচিন্তার একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকদের আবার শ্রদ্ধার আসনে বসাতে হবে, যেন তাঁরা জাতি গঠনে চেতনাস্রষ্টা হয়ে উঠতে পারেন।
শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি, শহীদ সৈয়দ ড.শামসুজ্জোহার প্রতি;সেই সব শিক্ষককের প্রতি, যাঁরা এখনো আলোর মশাল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন অন্ধকারের বিরুদ্ধে, সত্যের পক্ষে, শিক্ষার মর্যাদা রক্ষার জন্য!
নীরবতা কখনো মুক্তির পথ হতে পারে না। পরিশেষে ‘আলো হাতে চলিতেছে আঁধারের যাত্রী’—আমরা যেন সেই যাত্রী হই; যারা সত্য, ন্যায় ও জ্ঞানের আলো বহন করে এগিয়ে যায়।
দীপা সাহা
শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: শ ক ষকদ র র জন য ব যবস
এছাড়াও পড়ুন:
চট্টগ্রামে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আড়াই লাখ ভবন
দেশের ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার অন্যতম বন্দর নগর চট্টগ্রাম। মিয়ানমারের মতো বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এই অঞ্চলের প্রায় ৭০ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ চট্টগ্রাম নগরে থাকা ৩ লাখ ৮২ হাজার ভবনের মধ্যে ২ লাখ ৬৭ হাজার ভবন কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
চট্টগ্রামে ভূমিকম্পে ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নিয়ে এমন শঙ্কার কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে আইন-বিধি না মানা, নকশা না মেনে ভবন করা এবং গুণগত মানসম্পন্ন নির্মাণ উপকরণসামগ্রী ব্যবহার না করার কারণে বেশি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ভূমিকম্প হলে উদ্ধার তৎপরতা চালানো ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যত কোনো ধরনের প্রস্তুতি নেই বলেও দাবি তাঁদের।
বিশেষজ্ঞ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের দাবি, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে তদারকি সংস্থা হিসেবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) যে ভূমিকা থাকা উচিত ছিল, তাতে যথেষ্ট গাফিলতি ও ঘাটতি ছিল। সঠিক দায়িত্ব পালন করেনি সংস্থাটি। এই কারণে পরিস্থিতি আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে। লোকবল–সংকটের কারণে ভবন নির্মাণের তদারকিতে ঘাটতি থাকার কথা স্বীকার করেছেন সিডিএর কর্মকর্তারা। তাঁরাও শঙ্কা করছেন, ৭ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প হলে চট্টগ্রামের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ভবন হয় ধসে পড়বে, না হয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ভূমিকম্পে চট্টগ্রামের ঝুঁকির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে গত শুক্রবার মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়ার পর। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্যমতে, শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এর কেন্দ্র ছিল মিয়ানমারের দ্বিতীয় বড় শহর মান্দালয় থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পের ১২ মিনিট পর ৬ দশমিক ৪ মাত্রার একটি পরাঘাত (আফটার শক) হয়। ভূমিকম্পে শুধু মিয়ানমারে নিহত মানুষের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। ভূমিকম্পে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে ভবন ধসে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভূমিকম্পে চট্টগ্রামে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি। তবে ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টা ৫৫ মিনিটে ৬ দশমিক ৯৯ মাত্রার ভূমিকম্পে নগরে ১২টি ভবন হেলে পড়েছিল। এর আগে ১৯৯৭ সালের ২১ নভেম্বর ৬ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পে চট্টগ্রাম নগরে পাঁচতলা ভবন ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল।
ঝুঁকিতে আড়াই লাখের বেশি ভবনসিডিএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১১টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে একতলা ভবন রয়েছে ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫টি। ২ থেকে ৫ তলাবিশিষ্ট ভবন রয়েছে ৯০ হাজার ৪৪৪টি। ৬ থেকে ১০তলা পর্যন্ত ভবনের সংখ্যা ১৩ হাজার ১৩৫। ১০তলার ওপরে ভবন রয়েছে ৫২৭টি। নগরে এখন ২০তলার বেশি ভবন রয়েছে ১০টি। এই বিপুলসংখ্যক ভবন নির্মাণ করা হলেও এগুলোর অধিকাংশই ইমারত বিধিমালা মানেনি।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ও সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস প্রথম আলোকে বলেন, শুক্রবার মিয়ানমারে যে মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে, তা যদি এখানে হয়, তাহলে ৭০ শতাংশ ভবন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁদের হিসেবে, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ভবন।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভবন ও স্থাপনাগুলো ভূমিকম্পে কী ধরনের ঝুঁকিতে আছে, তা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কোনো জরিপ পরিচালনা করা হয়নি। তবে ২০০৯ থেকে ২০১১ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভূমিকম্পে ঝুঁকি মূল্যায়ন নিয়ে জরিপ করেছিল। সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিডিএমপি) আওতায় ঢাকা ও সিলেটের পাশাপাশি চট্টগ্রামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ওই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ভবন ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার (মূলত একতলার ঊর্ধ্বে ভবনগুলোকে জরিপের আওতায় আনা হয়েছিল)। এর মধ্যে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রাখা হয় ১ লাখ ৬৮ হাজার ১৫০টি ভবন, যা মোট ভবনের ৯২ শতাংশ। বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুযায়ী, ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়নি। জরিপ অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে হাসপাতাল, ক্লিনিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
ওই জরিপে চট্টগ্রাম অংশের নেতৃত্বে ছিলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি আজ শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ভূমিকম্পে চট্টগ্রাম ভয়াবহ ঝুঁকিতে আছে। চট্টগ্রাম নগরে যেসব ভবন রয়েছে, তার মধ্যে ৭০ ভাগই ৭ মাত্রার চেয়ে বেশি ভূমিকম্প হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেননা এসব ভবন ইমারত বিধিমালা বা জাতীয় বিল্ডিং কোড মেনে হয়নি। ভবনগুলোতে ভূমিকম্প প্রতিরোধী কোনো ব্যবস্থা নেই। সিডিএও কোনো ধরনের তদারকি করেনি। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এগুলোর বেশির ভাগ পুরোপুরি ধসে পড়বে, কিছু আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে প্রচুর মানুষ হতাহত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এখন জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে তার শক্তি বৃদ্ধি করার পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।
এ ধরনের বিপর্যয় পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য এখানে কোনো ধরনের প্রস্তুতি নেই বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, এককথায় ভূমিকম্প–পরবর্তী অবস্থা মোকাবিলা করতে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত। ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন, সিডিএ—কারও কোনো ভূমিকম্প নিয়ে বিশেষ কোনো প্রস্তুতি নেই। উদ্ধার তৎপরতার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও নেই। আবার অনেক ভবন নির্মিত হয়েছে ঘিঞ্জি এলাকায়। কোথাও কোথাও গলিগুলো এমন সরু সেখানে উদ্ধারকারী গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স যাওয়ার সুযোগ পর্যন্ত নেই। থাইল্যান্ডের মতো দেশ যেখানে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে এখানকার অবস্থা কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
চট্টগ্রাম মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী, ভবন নির্মাণের সময় ৮টি স্তরে অনুমোদন নিতে হয় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের। এগুলো হলো ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, নির্মাণ অনুমোদন, নির্মাণকাজ শুরু অবহিতকরণ ও কারিগরি ব্যক্তিদের সম্মতিপত্র, ভবনের প্লিন্থস্তুর (ভিত্তি স্তম্ভ) পর্যন্ত কাজ সম্পর্কে কারিগরি ব্যক্তিদের প্রতিবেদন, ভবনের নির্মাণকাজ সমাপ্তি অবহিতকরণপত্র, কারিগরি ব্যক্তিদের প্রত্যয়নপত্র, ব্যবহার সনদ ও পাঁচ বছর পর ব্যবহার সনদ নবায়ন। কিন্তু চট্টগ্রামে গড়ে ওঠা অধিকাংশ ভবনের নকশা অনুমোদন নিলেও অনুমোদনের পরের ধাপগুলো অনুমোদন নিতে তোয়াক্কা করেন না মালিকেরা।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ভূমিকম্প–পরবর্তী সময়ে উদ্ধার তৎপরতায় যেসব নির্দেশনা অনুসরণের নীতিমালা আছে, তা ফায়ার সার্ভিস অনুসরণ করতে প্রস্তুত। আর নগরে যেসব ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, এগুলোর অধিকাংশ নিয়মনীতি না মেনে গড়ে উঠেছে। এতে ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকির মাত্রাও বেড়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণে সিডিএর তদারকি যেভাবে হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। আবার সংস্থাটি এমন সব জায়গায় ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে, সেখানে উদ্ধার তৎপরতা চালানোও কঠিন।
সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস ঘাটতির কথা স্বীকার করেছেন। তবে এখন নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। প্রথম আলোকে বলেন, ১ থেকে ১০তলা ভবনগুলো নিজেরা যাচাই করছেন। ১০তলার ওপরের ভবনগুলো বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক দিয়ে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ভূমিকম্প–বিশেষজ্ঞ হুমায়ুন আখতার বলেন, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। তাই এখন থেকে প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। এর জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। জনগণকে ব্যাপকভাবে সচেতন করে তোলার বিকল্প নেই। মানুষকে প্রশিক্ষিত করতে হবে। আর দরকার নিয়মিত মহড়ার ব্যবস্থা করা।