কৃষি সামগ্রীর দাম কমিয়ে কৃষক বাঁচান
Published: 18th, February 2025 GMT
সম্প্রতি আলুসহ সবজির দাম বেশি কমে যাওয়ায় ভোক্তা লাভবান হয়েছেন, কিন্তু কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কারণ কৃষি সামগ্রীর দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। কৃষক হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে জমিতে ফসল ফলান। সেই ফসল সারাদেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ করে। কোনো কোনো ফসল দেশের চাহিদা পূরণের পর বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা হয়। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির অবদান অনস্বীকার্য।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যে কয়টি সেক্টর কাজ করছে তার মধ্যে কৃষি সেক্টর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। আমাদের জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি হচ্ছে কৃষি। খাদ্য সরবরাহ, আমিষের ঘাটতি পূরণ ও পুষ্টি চাহিদার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে কৃষক ও কৃষি সম্পদ। আমাদের কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণে কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু এ খাতে পর্যাপ্ত বাজেট না থাকার কারণে কৃষকরা ফসল উৎপাদনে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছেন। এমতাবস্থায় কৃষি খাতে সরকারের আরও উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও সহযোগিতার হাত বাড়ানো জরুরি।
দেশের অনেক যুবক এখন কৃষি ক্ষেত্রে নিজেদের কর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রহণ করছেন। বাংলাদেশে সম্ভবত একমাত্র কৃষি ক্ষেত্রেই অপেক্ষাকৃত কম পুঁজিতে বড় উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে অনেকেই চাকরির চিন্তা না করে কৃষি কাজের মাধ্যমে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টায় নিমজ্জিত।
বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক শিল্পের মধ্যে রয়েছে পোলট্রি ফার্ম, ডেইরি ফার্ম, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, মৎস্য হিমায়িতকরণ ও প্রক্রিয়াকরণ শিল্প। কৃষিজ শিল্প খাতের মধ্যে খাদ্য ও কাঁচামাল সংরক্ষণের প্রক্রিয়াজাত শিল্প অন্যতম। আমরা জানি, প্রকৃতিগতভাবেই আমাদের খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প বহুমুখী একটি ক্ষেত্র। দেশে প্রায় আটশত প্রক্রিয়াকরণ খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সময়ের পরিবর্তন ও জাগতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে কৃষির উন্নয়নেও এক অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির আনুপাতিক অবদান কমলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির দ্রুতগতির সঙ্গে সীমিত ও সংকুচিত হয়ে আসা জমি নিয়েও মোট কৃষি উৎপাদন বাড়ছে। কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তি, বীজ, সার ও আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ। এর অসাধারণ অবদান রয়েছে আমাদের দেশের গবেষক ও কৃষিবিজ্ঞানীদের। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর নিষ্ঠার সঙ্গে গবেষণার কারণে উচ্চফলনশীল ফসল অথচ অতি স্বল্পতম সময়ে ঘরে তোলা যায় এমন জাত ও পরিবেশ সহিষ্ণু নতুন জাতের ফসল উদ্ভাবন করেছেন।
ধান-পাটের পাশাপাশি খাদ্যশস্য, রবিশস্য, শাকসবজিসহ নানা রকমের ফল, সমুদ্র ও মিঠাপানির মাছ, গবাদি পশু, পোলট্রি, মাংস ও ডিম, উন্নত জাতের হাঁস-মুরগি, দুগ্ধ উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ব উৎপাদন তালিকায় শীর্ষস্থান দখলের জন্য যুদ্ধ করছে বাংলাদেশের কৃষি সেক্টর। কাজেই ৭০ ভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরতার প্রতীক কৃষিক্ষেত্র এখন সামগ্রিক অগ্রগতির অনবদ্য দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ এবং শ্রমশক্তির প্রায় ৬০ শতাংশ সরাসরি কৃষিকাজে নিয়োজিত থেকে কৃষির উন্নয়নে অবদানে রেখে কাজ করে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। তার পরও কৃষকরা এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। ২০২৪ সালের বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। কোনো প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে আরও উন্নতমানের ধান চাষের মাধ্যমে বাংলাদেশ চাল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বিশ্বে সুখ্যাতি পাবে বলে আমার ধারণা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের প্রায় ৫৮ শতাংশ চাল আসে বোরো ধান থেকে। বোরো ফসলের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে প্রায় ২০ শতাংশ চাষের জমি কমলেও চাল উৎপাদন বেড়েছে মাত্র চার থেকে পাঁচ গুণ। আমাদের দেশের বহু কৃষিজ ফসল ও পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
অন্যদিকে ইরি চাষের সময় যে ফসল কৃষকরা ঘরে তোলে তাতে খাদ্য চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত ফসল বিক্রি করে কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ পান। ধান কাটার পর বিচুলি বিক্রি করে আমাদের দেশের কৃষকরা প্রতি সিজনে বিঘাপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা আয় করে থাকেন। আমাদের দেশের নাগামরিচ, হবিগঞ্জের লেবু, কচুরলতি, উত্তরবঙ্গের শজিনার ডাঁটা উৎপাদন কৃষিক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখছে। এসব কৃষিদ্রব্য বিদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়। তাছাড়া খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে ঘেরের মাধ্যমে চিংড়ি মাছ ও কাঁকড়ার চাষ করে কৃষকরা বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক অর্থ উপার্জন করছেন। কিন্তু স্বল্প পুঁজির কৃষকরা কৃষি উৎপাদনের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে পদে পদে বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন। অর্থের অভাবে খরা মৌসুমে সময় মতো জমিতে পানি সেচের ব্যবস্থা করতে না পারা এবং যথাসময়ে সার ও কীটনাশক দিতে না পারার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং কৃষির মাধমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ ছাড়া কৃষিসামগ্রীর দাম দিন দিন বৃদ্ধির কারণে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এমতাবস্থায় সরকারকে কৃষি সরঞ্জামের মূল্য কমানো, শস্য উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহ প্রদান ও কৃষি খামার প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার জন্য কৃষকদের বিনা সুদে কৃষিঋণের ব্যবস্থা করলে কৃষকরা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি কৃষির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধনে কৃষকরা অসামান্য অবদান রাখতে সক্ষম হবেন।
ড.
বি এম শহীদুল ইসলাম : শিক্ষাবিদ ও গবেষক
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: আম দ র দ শ র অবদ ন র ক ষকর
এছাড়াও পড়ুন:
প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে, বাবা-মেয়ে নিহত
নাটোরের লালপুরে প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বাবা-মেয়ে নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও দুইজন। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে নাটোর-পাবনা সড়কের গোধড়া এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে।
নিহতরা হলেন– বগুড়া সদরের কইতলা এলাকার শাহরিয়ার শাকিল ও তার দুই বছরের মেয়ে সুমাইয়া আক্তার। এ ঘটনায় শাকিলের স্ত্রী আয়শা আক্তার রুমী ও প্রাইভেটকার চালক গুরুতর আহত হয়েছেন।
বনপাড়া হাইওয়ে থানার ওসি মো. ইসমাইল হোসেন জানান, সকালে প্রাইভেটকারটি যশোর থেকে বগুড়ার উদ্দেশে রওনা দেয়। গাড়িটি নাটোর-পাবনা সড়কের গোধরা এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে খাদে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই শাহরিয়ার শাকিল ও তাঁর মেয়ে মারা যান। স্ত্রী ও প্রাইভেটকার চালককে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ওসি আরও জানান, নিহত বাবা ও মেয়ের লাশ ও দুর্ঘটনাকবলিত প্রাইভেটকারটি উদ্ধার করে বনপাড়া হাইওয়ে থানায় আনা হয়েছে।