ক্রাইসিস অপরচুনিটি ও ট্রাম্পের অপরাজনীতি
Published: 15th, February 2025 GMT
বর্তমানে অনেকেই ক্রাইসিস অপরচুনিটি টার্মটির সঙ্গে পরিচিত। চীনা দর্শনের এই টার্ম আধুনিক যুগে জন এফ কেনেডি, উইন্সটন চার্চিল ও পিটার ড্রাকারের মতো কুশলী পশ্চিমা রাজনীতিবিদদের হাত ধরে জনপ্রিয়তা পায়। ক্রাইসিস অপরচুনিটি এমন একটি ধারণা, যাতে সংকট বা সমস্যাকে সুযোগ হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ যে কোনো সংকটের মধ্যেই নতুন সম্ভাবনা থাকে; যা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে উন্নয়ন, পরিবর্তন ও অগ্রগতি সম্ভব। যেমন– সাম্প্রতিক সময়ে কভিড-১৯ সংকট বিশ্বে লাখো মানুষের প্রাণ কেড়ে নিলেও এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি, ডিজিটালাইজেশনের প্রসার, অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা ও ব্যবসার প্রসারে জোরালো ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে ১৯১২ সালের টাইটানিকডুবিতে হাজারো মানুষের মৃত্যু হলেও তা সমুদ্রে জীবনের নিরাপত্তাসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ (সোলাস) প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক আইস প্যাট্রল (আইআইপি) চালুসহ জাহাজের নকশায় পরিবর্তন ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
ক্রাইসিস অপরচুনিটিকে কাজে লাগিয়ে একদিকে যেমন উন্নয়ন ও পজিটিভ পরিবর্তন করা হয়, তেমনিভাবে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে এটি ব্যবহার করেন। বিশেষ করে রাজনীতি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে এর ব্যবহার আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ঘটলেও আমরা তা বুঝতে পারি না।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে যাত্রীবাহী প্লেনের সঙ্গে সামরিক হেলিকপ্টারের সংঘর্ষের ঘটনায় ৬০ জনের বেশি আরোহী নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদে দেখা যাচ্ছে, অনেকেই এ দুর্ঘটনার জন্য হেলিকপ্টারটিকে প্রাথমিকভাবে দায়ী করেছেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিমানের ব্ল্যাক বক্স উদ্ধার করা গেছে এবং তদন্তের পর হয়তো দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যাবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি এ দুর্ঘটনার জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও জো বাইডেনের ডিইআই (ডাইভারসিটি বা বৈচিত্র্য, ইকুয়ালিটি বা সাম্য ও এনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তি) নীতিকে দায়ী করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নির্বাহী আদেশ জারি করার অতীতের সব রেকর্ড ভাঙলেও তিনি শুরুর দিকে যেসব নীতি বাতিল করেছেন, তার মধ্যে ডিইআই একটি। ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠিনভাবে এর বিরোধিতা করেন। কারণ, তিনি যে বিভক্তির রাজনীতি করেন, ডিইআই ধারণাটি ঠিক তার বিপরীত। এ জন্য তিনি তাঁর (অপ) রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বিমান দুর্ঘটনার জন্য ডিইআইকে দায়ী করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে যেটিকে ডিইআই বলা হয়, যুক্তরাজ্যে সেটিকে ইডিআই বলে। যুক্তরাজ্যে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইডিআই কমিটির একজন সদস্য হিসেবে আমি দেখেছি, ইডিআই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও মূল্যবোধের ধারণা; যা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাক্ষেত্র ও সামাজিক জীবনে সমতা, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন একটি ধারণা নিয়ে এবার ক্ষমতায় এসেছেন, যার মূল ভিত্তি– সব মানুষ সমান নয়। সবার অধিকারও সমান না। তিনি ব্যবসায়ের লাভ-ক্ষতির মতো করে রাষ্ট্রজীবনকে মূল্যায়ন করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কোথাও কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যদি সেখানকার কোনো বড় পদে কৃষ্ণাঙ্গ কেউ দায়িত্বে থাকেন, সে ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ডিইআই বলে কৌশলে বর্ণবাদকে উস্কে দিচ্ছেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের অন্যতম সহযোগী ইলন মাস্ক ডিইআইকে পরিহাস করে ডিআইই (ডাই) হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে আনভেরিফায়েড বা অশ্লীল ভাষা প্রত্যাশিত না হলেও ট্রাম্প তা হরহামেশাই করে চলছেন। কথাবার্তায় ন্যূনতম শালীনতা না রেখেই তিনি মানুষকে ‘অপরাধী’, ‘এলিয়েন’ হিসেবে সম্বোধন করছেন। তিনি অবৈধ অভিবাসীদের দেশ ছাড়া করতে তাদের হাত-পায়ে শিকল পরিয়ে পশুর মতো সামরিক বিমানে করে নিজ দেশে ফেরত পাঠাচ্ছেন। এমনকি তিনি গুয়ানতানামো বে-তে অবৈধ অভিবাসী ‘অপরাধী’র জন্য ৩০ হাজার বেড তৈরির নির্বাহী আদেশ দিয়েছেন। কারণ, গুয়ানতানামো বে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূমির বাইরে হওয়ায় সেখানে পাঠানো অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রের আইনে সুরক্ষা পাওয়া কঠিন। অন্যদিকে সেখানে অমানবিক আচরণ করলেও সেটি সহসাই লোকচক্ষুর আড়ালে রাখা সম্ভব।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুধু নির্বাহী আদেশেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখছেন না। তিনি তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পলিসি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে দেশকে বের করে এনেছেন। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সাহায্য, অনুদান ও ফান্ডিং কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত করেছেন। ইলন মাস্কের মতো সাবেক টুইটারের কর্মী ছাঁটাইয়ের নীতি অনুসরণ করে তিনিও প্রায় একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করে নিজ দেশের ২০ লাখ সরকারি চাকরিজীবীকে চাকরি ছাড়ার জন্য ই-মেইল পাঠিয়েছেন। আট মাসের বেতন এককালীন দেওয়ার ‘লোভ’ দেখিয়ে পাঠানো এসব ই-মেইলের সঙ্গে একটি পদত্যাগপত্রের নমুনাও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে যা লেখা হয়েছে, তাতে চাকরি ছাড়লে তাঁর জন্য ট্রাম্প প্রশাসন নয়; বরং যিনি ছাড়ছেন তিনিই এর জন্য দায়ী।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর অন্যতম সহচর ধনকুবের ইলন মাস্ক মিলে সম্ভবত নতুন এক ‘ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ রচনা করতে চাচ্ছেন, যেখানে তারা প্রবলভাবেই বাক্স্বাধীনতার সংজ্ঞা নিজেদের মতো করে লিখতে চাচ্ছেন। রাষ্ট্রের কল্যাণমুখী হওয়ার প্রথাগত ধ্যান-ধারণা বদলে দিয়ে তারা একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিন্তা করছেন। যেখানে সবকিছুকে লাভ-লোকসানের পাল্লায় মাপা হচ্ছে। নিজেদের মতাদর্শ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে উগ্র ডানপন্থাকে উস্কে দিচ্ছেন। অবাক বিষয় হলো, উদারপন্থি দেশ হিসেবে পরিচিত উত্তর আমেরিকার কানাডা ও ইউরোপের জার্মানির রাজনৈতিক নেতারা পর্যন্ত অভিবাসী ইস্যুতে ট্রাম্পের নীতির সঙ্গে সুর মেলাচ্ছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’-এর মাধ্যমে আসলে কোন আমেরিকা গড়তে চাচ্ছেন, তা হয়তো তিনিই ভালো জানেন। কারণ, অভিবাসীর বিষয়টি চিন্তা করলে ট্রাম্পের পূর্বসূরিরাও সেখানকার অভিবাসী ছিলেন। আমেরিকা রেড ইন্ডিয়ানদের আদি নিবাস, কোনো শ্বেতাঙ্গের নয়। বিখ্যাত ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়নবি ‘অ্যা স্টাডি অব হিস্টরি’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সিভিলাইজেশনস ডাই ফ্রম সুইসাইড নট মার্ডার।’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়ে বৈশ্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর বন্দোবস্ত তৈরি করে দিচ্ছেন। তাঁর এমন সব পদক্ষেপ রাশিয়া, চীন কিংবা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী দেশগুলোর জন্য শুল্ক আরোপ ও নিষেধাজ্ঞার মতো কিছু ক্রাইসিস নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে চালকের আসনে বসার এক বিরল ও সুবর্ণ সুযোগও নিয়ে এসেছে। এ কারণে আগামী বিশ্বনেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে নতুন কোনো দেশ বা জোট যদি চালকের আসনে থাকে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ, ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গেলে হয়তো একশ্রেণির মানুষ লাভবান হয়, কিন্তু বড় একটি অংশ এই সুবিধার বাইরে থাকে। এতে একদিকে যেমন বাড়বে বিভক্তি-বৈষম্য, অন্যদিকে দুর্বল হবে রাষ্ট্রের সফট পাওয়ার। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো আগামী চার বছর পর বিদায় নেবেন, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত রেখে যাবেন, তা শুকাতে হয়তো কয়েক যুগ লেগে যাবে।
মো.
বাংলাদেশ পুলিশ; যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইকের পলিটিকস
ও ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিস বিভাগের
পিএইচডি গবেষক
emranahmmed1991@gmail.com
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: দ র ঘটন র কর ছ ন আম র ক র জন ত র জন য ব যবস
এছাড়াও পড়ুন:
৩০০ বছরের পুরোনো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘উলচাপাড়া শাহী জামে মসজিদ’
বিশাল চওড়া ফটক। ফটকের ওপর কারুকাজে নির্মিত দুটি মিনার। সুউচ্চ ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকলে ছয়টি ছোট–বড় মিনার ও তিন গম্বুজবিশিষ্ট প্রাচীন মসজিদ চোখে পড়ে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার উলচাপাড়া এলাকার এই মসজিদের নাম উলচাপাড়া মসজিদ। এলাকাবাসীর কাছে এটি ‘উলচাপাড়া শাহী জামে মসজিদ’ হিসেবে পরিচিত।
মসজিদটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো। এটি বর্তমানে দেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা।
চার ফুট উচ্চতার মজবুত প্ল্যাটফর্মের ওপর চুন–সুরকি, ইট আর কালো পাথরের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে মসজিদের অবকাঠামো। মসজিদের দেয়ালে অসংখ্য খোপকাটা মৌলিক টেরাকোটার অলংকরণ। মসজিদটি প্রধানত দুটি অংশে বিভক্ত। পশ্চিমাংশে নামাজের কক্ষ আর নামাজের কক্ষের পূর্ব পাশে বারান্দা। মসজিদের ওপর বর্গাকার এক গম্বুজবিশিষ্ট নামাজের কক্ষ এবং পূর্ব ভাগে ছোট তিন গম্বুজবিশিষ্ট একটি বারান্দা আছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে স্থানের তালিকায় উলচাপাড়া মসজিদের নাম উল্লেখ আছে। সেখানে উলচাপাড়া মসজিদের বিষয়ে উল্লেখ আছে, মসজিদের নির্মাণ কৌশল ও মসজিদে ব্যবহৃত ইট দেখে মনে হয় যে এটি সপ্তদশ শতাব্দীতে নির্মিত। মসজিদে পাওয়া শিলালিপি পাঠ থেকে জানা যায়, ১৭২৭–২৮ সালে কোনো বণিক কর্তৃক মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল।
এই মসজিদে দীর্ঘ ২১ বছর ধরে ইমামের দায়িত্ব পালন করছেন হাফেজ মাওলানা উবায়দুল্লাহ। অসুস্থতার কারণে তিনি বর্তমানে আসতে পারেন না। বর্তমানে মসজিদ তত্ত্বাবধান করছেন মাওলানা আখতারুজ্জামান। কথা হলে তাঁরা দুজন প্রথম আলোকে বলেন, মসজিদটি ৩০০ বছরের পুরোনো। অনেক মানুষ এই মসজিদ দেখতে এলাকায় আসেন। তবে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে তাঁরা বেশি কিছু জানেন না বলে জানালেন।
মসজিদে কথা হয় ইতিকাফে বসা উলচাপাড়ার গ্রামের ষাটোর্ধ্ব মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানের (৬৫) সঙ্গে। তাঁর বাবা এনায়েত আলী এই মসজিদের মুয়াজ্জিন ছিলেন। ১৯৭৫ সালে ১০৫ বছর বয়সে এনায়েত আলী মারা যান। হাবিবুর রহমানের দাদা মোহাম্মদ তোরাব আলী মৃধাসহ পরদাদারা এই মসজিদে নামাজ পড়েছেন।
গ্রামের বাসিন্দা ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনাইটেড কলেজের প্রভাষক মোবারক হোসেন বলেন, প্রায় ৩০ বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদের দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েছে। এর পর থেকে মসজিদের কোনো সংস্কারকাজ এলাকাবাসী চাইলেও করতে পারছেন না। মসজিদটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো। প্রতিদিন অনেক মানুষ মসজিদটি দেখতে এই গ্রামে আসেন।