যদি প্রশ্ন করা হয়, কোন প্রাণী কৃষিক্ষেত্রে বিলিয়ন ডলারের অবদান রাখছে? উত্তরে নিশ্চয়ই ক্ষুদ্র প্রাণী মৌমাছির কথা খুব কম মানুষই বলবে। এটিই বাস্তবতা। এক দশক আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতিবছর পোকামাকড় বিশেষ করে মৌমাছি পরাগায়নের ক্ষেত্রে যে সেবা দেয়, তার আর্থিক মূল্য ১৩১ বিলিয়ন পাউন্ড; যা বিশ্ব কৃষির প্রায় এক-দশমাংশ। আমেরিকান ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের এক গবেষণামতে, এই সেবার আর্থিক মূল্য বর্তমানে প্রায় ৪১০ বিলিয়ন পাউন্ড। মৌমাছি আমাদের অস্তিত্বের জন্য এতটা গুরুত্বপূর্ণ যে জাতিসংঘ ২০ মে তারিখকে বিশ্ব মৌমাছি দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, ‘পৃথিবী থেকে মৌমাছি যদি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তাহলে মানুষ বড়জোর চার বছর বাঁচবে।’
অন্য অনেক ফসলের মতো মধু উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম সারির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ১০০-১৫০ টন মধু আহরণ করা হতো। বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে ২০ থেকে ২৫ হাজার টন মধু উৎপাদন হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ লক্ষ্যমাত্রা ১ থেকে দেড় লাখ টনে উন্নীত করা সম্ভব।
দেশে মধু বিপণন ও বাজারজাতকরণে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আস্থা প্রতিষ্ঠিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। অনেকেই দেশি মধুর ওপর আস্থা রাখতে পারেন না বলে বিদেশি ব্র্যান্ডকে গুরুত্ব দেন। অনেক ছোট চাষি এখন নিজস্ব ব্র্যান্ডে মধু বাজারজাত করে থাকেন। তার পরিমাণ খুবই কম।
মধুর বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে কমোডিটি মার্কেট ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের মার্কেট আমাদের দেশে নতুন বা স্বল্প পরিচিত হলেও উন্নত বিশ্বে এটি অত্যন্ত পরিচিত এবং ব্যাপকভাবে চর্চিত। কৃষিপণ্যের দাম সাধারণত প্রতিদিন সকালে বা সন্ধ্যায় স্টক মার্কেটগুলোতে নির্ধারিত হয়। আমাদের দেশে মধুসহ বিভিন্ন পণ্যের যথাযথ ভ্যালু চেইন স্টাডি করা হয় না। ফলে মুনাফার সঠিক বণ্টন সম্ভব হয় না এবং এর সিংহভাগ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে। কমোডিটি মার্কেটের একটি ভালো দিক হলো, মধ্যস্বত্বভোগীরা এখানে অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জন করতে পারে না।
অনেকে খাঁটি ভেবে বিদেশি মধু বেশি পছন্দ করেন। সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশিদের জন্য বাংলাদেশের মধুই উত্তম। কারণ, নিজ এলাকার মধু সে এলাকার মানুষের জন্য ওষুধ এবং তাতে সে এলাকার রোগ-
জীবাণুর প্রতিষেধক রয়েছে। যেমন– সরিষা ফুলের মধুতে প্রচুর পরিমাণে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ থাকে। এ কারণে এই মধু জমে যায়।
সমন্বয়হীনতা, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব এবং বাজারজাত করার অনিশ্চয়তার কারণে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদিত মধুর নিরাপদ ও যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সম্ভাবনাময় মধুর বাজার বিদেশি ব্র্যান্ডের দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তখন ক্ষুদ্র মৌচাষিরা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং ক্রমান্বয়ে মৌ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন।
সম্ভাবনাময় মৌশিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে গবেষণা, নিরাপদ উৎপাদন, বিনিয়োগ, মান নিয়ন্ত্রণ, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়সাধনের জন্য ‘মৌ নীতি’ প্রয়োজন। মৌমাছির কোনো ব্রিডিং সেন্টার না থাকার কারণে মৌচাষিরা নিজেরাই ব্রিডিং করে রানী উৎপাদন এবং ব্যবহার করছেন। দেশে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মৌমাছির ব্যবস্থাপনা মোটামুটি ঠিক থাকলেও বাকি সময় যখন ফুল থাকে না, প্রাকৃতিক খাদ্য থাকে না, তখন ফিডিংয়ের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। ফলে কালক্রমে নানা সমস্যায় মৌমাছির জাত দুর্বল হচ্ছে। উন্নত জাত সংরক্ষণে বছরব্যাপী মৌমাছি এবং রানীর পরিচর্যা এবং মৌশিল্প রক্ষা করতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ‘ব্রিডিং সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
সাকিউল মিল্লাত মোর্শেদ: প্রধান উপদেষ্টা, উত্তরবঙ্গ মৌচাষি সমিতি ও নির্বাহী পরিচালক, শিক্ষা স্বাস্থ্য উন্নয়ন কার্যক্রম-শিসউক
.উৎস: Samakal
এছাড়াও পড়ুন:
বিবিসির সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের পর ফেরত পাঠাল তুরস্ক
যুক্তরাজ্যের সরকারি সংবাদমাধ্যম ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের (বিবিসি) সাংবাদিক মার্ক লোয়েনকে গ্রেপ্তারের পর ফেরত পাঠিয়েছে তুরস্ক। তিনি দেশটিতে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করছিলেন। লোয়েনকে ফেরত পাঠানোর ঘটনাকে বিবিসি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছে।
বিবিসি বলেছে, লোয়েনকে বুধবার ইস্তাম্বুলে গ্রেপ্তার করা হয়। চলমান বিক্ষোভের খবর সংগ্রহে কয়েক দিন তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন। গত সপ্তাহে ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুকে গ্রেপ্তারের পর এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
এক বিবৃতিতে বিবিসি বলেছে, ‘আজ (বুধবার) সকালে বিবিসি নিউজের প্রতিবেদক মার্ক লোয়েনকে ইস্তাম্বুল থেকে ফেরত পাঠিয়েছে তুরস্কের কর্তৃপক্ষ। যে হোটেলে তিনি অবস্থান করছিলেন, সেখান থেকে আগের দিন তুলে এনে তাঁকে ১৭ ঘণ্টা আটক রাখা হয়। সাম্প্রতিক বিক্ষোভের খবর সংগ্রহে মার্ক লোয়েন তুরস্কে অবস্থান করছিলেন। আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি হওয়ায় তাঁকে তুরস্ক ছাড়তে বলা হয়।’
দেশজুড়ে চলা সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ১ হাজার ৮৫০ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে তুরস্কের ১১ জন সাংবাদিকও রয়েছেন।
আরও পড়ুনতুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের প্রতিদ্বন্দ্বী কে এই একরেম ইমামোগলু২৬ মার্চ ২০২৫রোববার রাতে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষের ব্যাপকতা বাড়ে। এ সময় কিছু বিক্ষোভকারীকে লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোড়ে পুলিশ। এর আগে ২০ মার্চ বিক্ষোভ দমনে পিপার স্প্রে ও জলকামান ব্যবহার করা হয়।
ইমামোগলুকে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হয়। তাঁকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। গ্রেপ্তারের পর ইমামোগলুকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি)।