ব্যবসায়ী লুৎফুল্লাহেল মাজেদকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে আয়নাঘরে রাখা হয়েছিল। উল্টো করে নির্যাতনের পর পানি চাইলে তাঁকে বলা হয় প্রস্রাব খেতে। গুম-সংক্রান্ত কমিশনে দেওয়া অভিযোগে এমন তথ্য জানিয়েছেন এই ব্যবসায়ী।

অভিযোগে বলা হয়, গত জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় মাজেদের ওপর নেমে আসে ভয়ংকর নির্যাতন। অস্ত্রধারীরা বাসা থেকে তুলে নেওয়ার ৬ দিন পর তাঁকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠায়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন ৬ আগস্ট মুক্তি পান। 

মাজেদ এভিয়েশন খাতের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এরোনেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিএনপির ময়মনসিংহ জেলার সহসভাপতি। তিনি জানান, ২৮ জুলাই রাতে তাঁকে রাজধানীর গুলশানের বাসা থেকে সাদা পোশাকের অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা তুলে নেয়। গাড়িতে তোলার আগে যমটুপি পরিয়ে দেওয়া হয়।

অভিযোগে মাজেদ আরও জানান, শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণেই তাঁকে গুমের শিকার হতে হয়েছিল। গুমকারীরা তাঁর কাছে জানতে চান ছাত্র আন্দোলনে কত টাকা খরচ করেছেন, লন্ডন থেকে তারেক রহমান কত টাকা পাঠিয়েছেন। নির্যাতনের এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে ৩ আগস্ট তাঁর চোখ খোলা হয়। পরে তাঁকে পাঠানো হয় কারাগারে।

.

উৎস: Samakal

এছাড়াও পড়ুন:

একাকী মায়ের সন্তান বাক্‌প্রতিবন্ধী সেলিম আন্দোলনে হারালেন চোখ

‘ছেলেটা (সেলিম) যে কত কিছু খাইতে চাইত! কিনতে পারতাম না। মাংস পছন্দ করত। মাসে, দুই মাসে পারলে একবার মাংস কিইন্যা খাওয়াইছি। ছেলেটার চোখ নষ্ট হইয়া গেছে দেইখ্যা মনে এত কষ্ট লাগে যে খালি পুরান কথা মনে পড়ে। ছেলেটা জন্ম থ্যাইকাই কষ্ট করতেছে।’ কথাগুলো বলছিলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় এক চোখে গুলি লাগা সেলিমের মা সেলিনা খাতুন।

সেলিনা খাতুন ও সেলিম মিয়ার (১৮) সঙ্গে ১৭ মার্চ জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে কথা হয়। ওই সময় সেলিমের ফলোআপ চিকিৎসার জন্য তাঁকে নিয়ে হাসপাতালে ছিলেন সেলিনা।

 সেলিনা খাতুন প্রথম আলোকে জানান, গত বছরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ১৮ জুলাই গাজীপুরে তাঁর ছেলে গুলিবিদ্ধ (ছররা গুলি) হন। ডান চোখে দুটি গুলি লেগেছিল, এর মধ্যে একটি বের করতে পেরেছেন চিকিৎসকেরা। সেলিমের ডান চোখে আলো ফিরে আসবে না, জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ডান চোখে প্রস্থেটিক আই (কৃত্রিম চোখ) স্থাপন করা হবে।

এই প্রতিবেদকের সঙ্গে অল্প সময় কথা বলে সেলিনা খাতুন ছেলের চোখের পরীক্ষার প্রতিবেদন আনার জন্য আরেক হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে পরে কথা হয়েছিল ২৮ মার্চ মুঠোফোনে। তবে সেদিন (১৭ মার্চ) ইশারায় সেলিম জানিয়েছিলেন, ডান চোখে তিনি কিছু দেখেন না। চোখে অনেক যন্ত্রণা হয়। তাঁর শরীরেও লেগেছিল ছররা গুলি।

হাসপাতালে নিজ শয্যায় বসে এই প্রতিবেদককে এক্স–রে, সিটি স্ক্যান বের করে দেখাচ্ছিলেন সেলিম। ওই ওয়ার্ডে গণ-অভ্যুত্থানে চোখে আঘাত পাওয়া আরও কয়েকজন রোগী ছিলেন। তাঁরা জানান, কথা বলতে না পারলেও সেলিম ওর গুলিবিদ্ধ হওয়া, অসুস্থতা, চিকিৎসার বিষয়গুলো সব বোঝাতে পারেন।

সেলিম কীভাবে গুলিবিদ্ধ হলেন, জানতে চাইলে তাঁর মা সেলিনা খাতুন (৩৩) বলেন, তাঁদের বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলায়। ১৫ বছর বয়সে জন্ম নেয় তাঁর প্রথম সন্তান সেলিম। তাঁর স্বামী তাইজুল ইসলাম রিকশাচালক ছিলেন। সেলিমের বয়স যখন আড়াই বছর, তখন তাইজুল ইসলাম তাঁদের ছেড়ে চলে যান। এরপর তিনি দিশাহারা হয়ে পড়েন। তাঁর মা–বাবাও খুব গরিব। পরে সংসার চালানোর জন্য গাজীপুরে চলে আসেন তিনি। রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেলিম গ্রামে অন্য শিশুদের সঙ্গে ব্র্যাক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। শিক্ষক তাঁকে আলাদাভাবে পড়া বোঝাতেন।

সেলিনা খাতুন আরও জানান, সংসারে অভাব থাকায় ও বাক্‌প্রতিবন্ধী হওয়ায় সেলিমকে বেশি পড়াশোনা করাতে পারেননি। আড়াই বছর আগে সেলিমকে তিনি তাঁর সঙ্গে কাজ করার ব্যবস্থা করেন। ১৮ জুলাই তিনি কাজে গেলেও সেলিম বাসায় ছিলেন। বেলা আড়াইটার সময় গাজীপুরের চৌরাস্তায় আন্দোলন চলাকালে সেলিম গুলিবিদ্ধ হন। তাঁর ডান চোখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছররা গুলি লাগে। ওই সময় পুলিশের ভয়ে তাঁরা হাসপাতালে নিতেও দেরি করেন। রাত ৮টার দিকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। আগস্টের প্রথম দিকে সেলিমকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নিয়ে আসেন। ওই দিন চিকিৎসকেরা জরুরি ভিত্তিতে সেলিমের ডান চোখে অস্ত্রোপচার করেন। এরপর ৬ ফেব্রুয়ারি ও ১০ মার্চ ওই চোখে আরও দুটি অস্ত্রোপচার করা হয়।

সেলিমের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক খায়ের আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ছররা গুলি সেলিমের ডান চোখ ভেদ করে গেছে। এ অবস্থায় যতবার অস্ত্রোপচার হবে, ততবার চোখের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেলিমের ডান চোখে দৃষ্টি নেই। লন্ডনের মুনফিল্ডস আই হাসপাতালের চিকিৎসকেরাও সেলিমকে দেখে গেছেন। এখন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চোখের ভেতর পরিষ্কার করে প্রস্থেটিক আই (কৃত্রিম চোখ) স্থাপন করা হবে।

চিকিৎসকেরা কৃত্রিম চোখ স্থাপনে অস্ত্রোপচারের কোনো সময় দিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে সেলিনা খাতুন বলেন, গত বৃহস্পতিবার তিনি গাজীপুরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় দুর্ঘটনার শিকার হন, পা ভেঙে গেছে। এ কারণে সেলিম বৃহস্পতিবার হাসপাতাল ছেড়ে বাসায় চলে এসেছেন। চিকিৎসকেরা বলেছেন, ঈদের পর তিনি যখন যেতে পারবেন, তখনই সেলিমের চোখে অস্ত্রোপচার করা হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ