Samakal:
2025-04-03@15:55:45 GMT

মাধবী থেকে মাধবী মার্ট

Published: 1st, February 2025 GMT

মাধবী থেকে মাধবী মার্ট

ফেসবুকে হাজারো ছবির মধ্যে একটি ছবি চোখ কেড়ে নেয়। পিকআপভর্তি নকশিকাঁথা। এর ওপর বসে আছেন এক তরুণী। তাঁর নাম মাধবী। এসএমই মেলা শেষ করে ফেরার পথে কাঁথা ও অন্যান্য পণ্য ট্রাকে তোলার লোক পাননি। তাই মাধবী নিজেই পণ্য তোলেন। নারী হিসেবে আমার গর্ববোধ তো অবশ্যই; কিছুটা কৌতূহলও জাগল। ‘মাধবী মার্ট’ নামে তাঁর একটি শোরুম রয়েছে। উত্তরা উত্তর মেট্রো স্টেশনের কাছে। 
মেট্রোতে করে একদিন মাধবী মার্টের শোরুমে হাজির হলাম। সেখানে সৃজনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। শোরুমে এমন পণ্য দেখতে পেলাম, যা আগে কখনও দেখিনি। আমি জানতাম, বাংলাদেশের অনুমোদিত জিআই পণ্যের সংখ্যা ৩১টি। মাধবী মার্টে গিয়ে মনে হলো, পুরো বাংলাদেশটাই জিআই পণ্যে ভরপুর। যেমন– মানিকগঞ্জের ঘিওরের বেত দিয়ে তৈরি ঝুড়ি, আয়নার ফ্রেম, বাটি ও থালা, টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের বাঁশের পণ্য, নীলফামারীর হোগলাপাতা ও কচুরিপানার পণ্য, টেকনাফের সুপারির খোল দিয়ে তৈরি ওয়ানটাইম থালা-বাসন, কেরানীগঞ্জের মাটির পণ্য, নারায়ণগঞ্জের জামদানি, টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি, সিলেটের কমলগঞ্জের মণিপুরি শাড়ি। সব থেকে অবাক হলাম নারকেলের শলার ঝাড়ু দেখে। এটা ভীষণ নান্দনিক। মাধবী বলেন, ‘‘নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলায় আমার বাড়ি। আমার চাচা এই শলার ঝাড়ু তৈরি করেন। একদিন আমাকে বলেন, দেখ তো মাধবী, এটি বিক্রি করা যায় কিনা? আমি দেখেই বলি, বিক্রি করা যাবে না আবার। এটি দৌড়াবে। সেই থেকে শুরু নারকেলের শলার ঝাড়ু বিক্রি। যেদিন মাধবী মার্টের পেজে নারকেলের শলার ঝাঁড়ু বিক্রির ভিডিও ‍দিলাম, সেদিন আমার ফেসবুকে ভালোমন্দ মন্তব্যের ঝড় ওঠে। কেউ আমাকে ‘ঝাড়ুওয়ালি’ উপাধি দেন। কেউ বলেছেন ‘ফাতরা মহিলা’, কেউ বলেছেন ‘বেটির মাথায় সমস্যা আছে’, আবার এর বিপরীতে কেউ কেউ ইতিবাচক মন্তব্যও করেছেন।’’ শান্ত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন মাধবী মার্টের স্বত্বাধিকারী।
চোখে একরাশ আলোর ঝলক নিয়ে মাধবী বলেন, ‘আমার ব্যবসার মূলধন আমার গ্রাহক। আমি ব্যবসা শুরু করেছি ২০১৭ সালে, জামালপুরের নকশিকাঁথা এবং সালোয়ার-কামিজ দিয়ে। তখন আমার কোনো শোরুম ও মূলধন ছিল না। সম্বল ছিল একটা বাইসাইকেল আর রুমমেট সানজিদা ইভা আপুর দেওয়া ১০ হাজার টাকা। আমার গণ্ডির মধ্যে যে কয়জন মানুষ ছিলেন তাদের কাছে সাইকেল চালিয়ে যেতাম ব্যাগে নকশিকাঁথা বা থ্রিপিস নিয়ে। যেহেতু আমার কোনো দোকান ভাড়া নেই। আমি একটু কম দামে পণ্য দিতাম। অল্প কয়েকদিনের মধ্যে বেশ ভালো সাড়া পেলাম। ২০১৯ সালে ফার্মগেটে জেনেটিক মার্কেটে একটি দোকান নিলাম। হঠাৎ করে ব্যবসা খারাপ চলায় দোকানের তিন মাসের ভাড়া দিতে পারিনি। পরে দোকানের মালিক দোকানে তালা দিয়ে দেন। আমি অনেক অনুরোধ করলেও তিনি দোকানের তালা খুলে দেননি। আমাকে বিপদে পড়তে দেখে তিনি আমাকে বাজে প্রস্তাব দেন। আমি মাথা নতো করিনি। মার্কেটের দোকান মালিক সমিতিকে লিখিত বিচার দিলাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে মার্কেটের সবার সামনে তিনি আমার কাছে ক্ষমা চান। তিনি তা ভুলে যাননি। ২০২০ সালে একদিন রাস্তায় পেয়ে আমার সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন। আমার ওড়না টেনে ধরেন। এ ঘটনার পর আমি মামলা করি।  কোনো অপরাধ না করেও চারদিকের মানুষের কাছে অপরাধী হয়ে গেলাম। মা-বাবাও আমাকে ভুল বুঝলেন।’
নিজের সংগ্রামের কথা বলে চলেন মাধবী– “ব্যবসা নেই। হাতে টাকা নেই। পরিবার বা বন্ধু-বান্ধবও পাশে নেই। আমি হাঁপিয়ে উঠছিলাম। হঠাৎ আমার মনে হয়েছে, প্রজাপতি বেঁচে থাকে মাত্র ২৮ ঘণ্টা। এরই মধ্যে সে চমৎকার পাখা মেলে দুনিয়াকে জানান দিয়ে যায়। আমার মনে হলো– একটাই তো জীবন। এখানে মানুষের জন্য কিছু করতে হবে। তখন শূন্য হাতে সাইকেল নিয়ে বের হয়ে যাই। উদ্দেশ্য– মানুষকে ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতন করা। বিশেষ করে ব্রেস্ট ক্যান্সার ও জরায়ু ক্যান্সার নিয়ে স্কুল বা উঠানে বসে নারীদের সচেতন করতাম। এ কাজ করতে গিয়ে সচেতনতা তো হয়েছেই। আমি পুরো বাংলাদেশের কোথায় কী বিখ্যাত, তা কাছ থেকে দেখেছি এবং কিছু ভালো মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে তারা আমার ব্যবসায় সাহায্য করেন। ২০২১ সালে আইপিডিসি ফাইন্যান্স এবং ডেইলি স্টারের উদ্যাগে ‘অদম্য সাহসী নারী’ হিসেবে নির্বাচিত হই। সেখানে ২ লাখ টাকা পুরস্কার পাই। সেটি দিয়ে আবার ব্যবসা শুরু করি। শোরুম নিলাম। জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার বাউশি বাজারে নকশিকাঁথা উৎপাদন কেন্দ্রে একটি কারখানা খুলি।” 
মাধবী মার্ট এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। মাধবী বলেন, ‘আমি চাই আমার বাংলাদেশ পুরো পৃথিবীর ঘরে ঘরে থাকুক। দু’এক বছর ধরে আমরা পোস্ট অফিসের মাধ্যমে বিশ্বের ৫০টির বেশি দেশে পণ্য পাঠাচ্ছি।’ 
এ নারী উদ্যোক্তার কথা শুনে শুধু এটাই মনে হচ্ছিল– নারীকে সাহসী হতে হবে। এভাবেই এগিয়ে আসতে হবে। অধিকার বুঝে নিয়ে অংশগ্রহণ করতে হবে। নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজারে নারীর অংশীদারিত্ব সহজ করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আরও পদক্ষেপ এবং এর তদারকি জরুরি। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দরকার বলে মনে করেন মাধবী। v

.

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: নকশ ক ব যবস

এছাড়াও পড়ুন:

‘আর কোনো দিন বাবার সঙ্গে কথা বলতে পারব না’

‘‘যাওয়ার সময় বাবা বলেছিল, তুই যাবি নে? আমি বলেছিলাম, না বাবা আমার শরীর খারাপ। বমি হচ্ছে, আমি যাব না। বাবা বলেছিল, আর কোনো জায়গায় তোকে নিয়ে যাব না। ওই দিন বাবার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। আর কোনো দিন কথা বলতে পারব না বাবার সঙ্গে। বাবা আমারে কয়ে থুয়ে গেছিল, তুই থাকিস আমি আসবনে।’’ 

বাবার মরদেহের পাশে বসে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিল চট্টগ্রামের জাঙ্গালিয়া এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত কুষ্টিয়ার আশীষ মন্ডলের ৯ বছরের মেয়ে আনুশকা মন্ডল পরী।

এর আগে বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) দুপুরে আশীষের মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স কুষ্টিয়া শহরের কুমারগাড়া ঘোষপাড়ায় বাড়িতে পৌঁছালে তার স্বজনেরা আহাজারি করতে থাকেন। তাকে শেষবারের মতো এক নজর দেখার জন্য ভিড় করে এলাকাবাসী। বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন আশীষের স্ত্রী। স্বজনেরা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছিলেন। সে সময় পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন আশীষের শ্বশুর মিহির বিশ্বাস। 

আরো পড়ুন:

চট্টগ্রামে সড়কের সেই অংশে লাল পতাকা স্থাপন

মোটরসাইকেলে এক পরিবার, যশোরে বাসের ধাক্কায় শেষ তিনজন

কথা হলে চোখ মুছে তিনি বলেন, ‘‘গত রবিবার (৩০ মার্চ) কুষ্টিয়া থেকে আশীষ তার ভাইয়ের ছেলে দুর্জয়কে নিয়ে পিকনিকে যাওয়ার জন্য ঢাকায় বোনের বাড়িতে যায়। সেখানে থেকে বোন সাধনা রানী মন্ডল, ভগ্নিপতি দিলীপ কুমার বিশ্বাস, ভাগনি আরাধ্য বিশ্বাসসহ কয়েকজন মাইক্রোবাসে কক্সবাজার যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ে। এতে আশীষ, তার বোন ও ভগ্নিপতির মৃত্যু হয়।’’ ওই সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ১০ জন মারা যায়। 

তিনি বলেন, ‘‘আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে আশীষের নিথর দেহ বাড়িতে পৌঁছেছে। এখন কীভাবে চলবে এই পরিবার এই ভেবে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ছে।’’

স্বজন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আশীষ মন্ডল স্থানীয় বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। কর্মস্থলের কাছাকাছি কুষ্টিয়া শহরের নিজ বাড়িতে স্ত্রী ও এক মেয়েকে নিয়ে থাকতেন। খুব ছোটবেলায় মামা তাকে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছিলেন। সেই সূত্রে মামা বাড়ির পাশেই জমি কিনে স্থায়ী বসবাস করছেন। নিহত আশীষ মন্ডল কুমারখালী উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের মৃত যতীন্দ্রনাথ মন্ডলের ছেলে। 

এদিকে, ভাগনেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ মামা গোপাল চন্দ্র বিশ্বাস। কথা হলে তিনি বলেন, ‘‘আশীষের যখন দেড় বছর বয়স, তখন আমি তাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছি। সন্তানের মতো কোলে-পিঠে করে তাকে বড় করেছি।’’

কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে পড়াশোনা করে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করছিল আশীষ। বিবাহিত জীবনে তার ৯ বছরের একটি মেয়ে আছে। 

ঢাকা/কাঞ্চন/বকুল

সম্পর্কিত নিবন্ধ