কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে খাবার, চারণভূমি ও করিডোর ধ্বংস হওয়ায় প্রায়ই লোকালয়ে হানা দিচ্ছে হাতির পাল। হাতির ভয়ে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে বন এলাকার পাশে বসবাসরত জনগোষ্ঠী। বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতেও নিজেদের নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছেন স্থানীয়রা।
চকরিয়ায় সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, লক্ষ্যাচর, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, খুটাখালী, বরইতলী ও হারবাং এলাকার লোকজন আতঙ্কে বসবাস করছেন। আতঙ্কে রয়েছেন চট্টগ্রাম বনাঞ্চলের আশপাশের লোকজনও। লোকালয়ে ঢুকে পড়া হাতি তাড়াতে তৎপর বনকর্মীরা। তার পরও হানা দিচ্ছে হাতির পাল। যে কারণে বিদ্যুতের তার দিয়ে ফাঁদ পেতে রাখছেন লোকজন। বৈদ্যুতিক ফাঁদে পা দিয়ে লামার কুমারী এলাকায় একটি হাতি মারা গেছে।
পরিবেশবাদীদের অভিমত, খাবারের খোঁজে আগে আমন ও বোরো মৌসুমে ধানক্ষেতে নামতে পারত হাতির পাল। কিন্তু তামাকের আগ্রাসনে কমে গেছে ধান চাষ। এসব কারণে লোকালয়ে আসছে হাতি।
এদিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের যত্রতত্র বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতার কারণে হাতির অবাধ বিচরণ, প্রজনন ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। নির্ধারিত করিডোর দিয়ে হাতির পাল চলাচল করে থাকে। বেশির ভাগ করিডোরে স্থাপনা গড়ে তোলায় আগের মতো চলাচল করতে পারছে না হাতির পাল।
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহেরাজ উদ্দিন জানান, কক্সবাজার উত্তর-দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম উত্তর-দক্ষিণ বন বিভাগের ১২টি করিডোর থাকলেও বর্তমানে বেশির ভাগ হাতি চলাচলের অনুপযোগী। তাঁর ভাষ্য, কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের সংরক্ষিত বনে উখিয়া-ঘুমধুম, তুলাবাগান, টেনারছড়ি, নাইক্ষ্যংছড়ি, রাজারকুল ও কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের তুলাতলি, ঈদগড়, ভূমুরিয়াঘোনা রাজঘাট, খুটাখালী মেধা-কচ্ছপিয়া, ছাইরাখালী, মানিকপুর করিডোরের বেশির ভাগ অংশ দখল হয়ে গেছে। এসব জায়গায় জনবসতি, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা গড়ে তোলায় হাতির চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। খুটাখালী ও মেধাকচ্ছপিয়ার ওপর দিয়ে নির্মিত রেললাইনে হাতি পারাপারের জন্য আন্ডারপাস নির্মাণের কথা থাকলেও সেখানে কোনো আন্ডারপাস করা হয়নি। ফলে হাতি পারাপারে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন বিভাগের চুনতি, সাতগড়, বদ্দোয়ারা, শুকছড়ি, কোদালা, লারিশ্যা কোদালা করিডোরেরও চিত্রও একই রকম। চুনতি অভয়ারণ্যের রেললাইনে একটি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হলেও তা দিয়ে হাতি চলাচল করতে পারছে না। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে একটি হাতি ট্রেনের ধাক্কায় মারা গেছে।
ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহেরাজ উদ্দিন বলেন, সিএমসির সহযোগিতায় বনের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের অধীন পাঁচটি বন বিটের যেসব স্থানে বন্যহাতির আবাসস্থল ছিল, সেখানে কলাগাছ ও ঘাস রোপণের মাধ্যমে খাদ্যভান্ডার তৈরি করা হয়েছে। বন বিভাগের টহল দলের তৎপরতা অব্যাহত আছে। অনেক
স্থান থেকে হাতি মারার ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে।
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: বন ব ভ গ র কর ড র
এছাড়াও পড়ুন:
মুখোমুখি হব দুঃখগুলোর
২৬ মার্চ ২০২৫, ভোরবেলা উঠেই দৌড়াতে হলো পিজি হাসপাতালে নানুকে (সন্জীদা খাতুন) গোসল করানোর জন্য। অনেক বছর আগে নানু বলে গেছিল তার মৃত্যুর পর যেন আমি আর তিন্নি (নানুর সবচেয়ে বড় বোনের নাতনি) তাকে গোসল করাই। বিষয়টাকে আমি বিশেষ গুরুত্ব দিইনি। কারণ, নানুর মৃত্যু যে আসতে পারে, সেই চিন্তাটাই আমার ছোট, দুর্বল মস্তিষ্ক কখনো ধারণ করতে পারেনি। কিন্তু দিনটি এল এবং পুরোটা সময় আমি হতবিহ্বল হয়ে থাকলাম।
গোসলের পর নানুকে পরানো হলো একটা লাল পাড়ের সাদা শাড়ি, কপালে লাল টিপ। এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হলো ছায়ানটে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। পালিয়ে পালিয়ে থাকার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু প্রকৃতি (নানুর আরেক নাতনি, পার্থ তানভীরের মেয়ে) টেনেটুনে সামনে নিয়ে গেল। তারপর লিসা (নানুর পুত্রবধূ) ঠেলে দিল একেবারে নানুর কাছে; কারণ, আমার সঙ্গে আছে তুলা, যে তুলা দিয়ে একটু পরপর নানুর মুখ মুছে দিতে হবে আর তাড়াতে হবে মাছি। আমার সারা শরীর ভেঙে কান্না আসছিল, কিন্তু শত শত মানুষের ভিড়ে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতেও পারছিলাম না। এর মধ্যে একের পর এক গান হয়েই যাচ্ছে, ‘এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা…’। ‘আগুনের পরশমণি’ যখন শুরু হলো, তখন আর কান্না চেপে রাখতে পারলাম না। চেষ্টা করলাম মাথা নিচু করে যতটুকু মানুষের চোখ এড়িয়ে কাঁদা যায়। এরপরই জাতীয় সংগীত। মনে হচ্ছিল আমার সুন্দর করে সাজানো–গোছানো পৃথিবীটা কেউ হাতুড়ি ঠুকে ঠুকে ভেঙে দিচ্ছে। এত দুঃখ কেন আসে জীবনে?
আমি নানু বা মায়ের মতো শক্ত মনের মানুষ নই। কেউ একটু চোখ রাঙিয়ে তাকালেই বুক ভেঙে কান্না পায়। যখনই মন খারাপ হতো, তখনই চলে যেতাম নানুর কাছে নালিশ করতে। নানু সব সময় উৎসাহ দিত আমাকে, যেন মনের কথাগুলো লিখে ফেলি। লিখে ফেললে মনটা হালকা লাগবে। এই কৌশল যে কতবার আমার জীবনে কাজে এসেছে, তা গুণে শেষ করতে পারব না।
জীবনের চাপে, সমাজের চাপে, মানুষের চাপে অনেকবারই মন ভেঙে গেছে। যখনই ভগ্ন হৃদয়ে নানুর কাছে যেতাম, নানু বলত গান করতে। অবশ্যই আমি নানুর কথা শুনতাম না। সুতরাং আমাকে ধরেবেঁধে নতুন গান শেখাতে শুরু করত নানু।
এভাবেই জীবনের বড় দুটো দুঃসময়ে নানুর কাছে শিখেছিলাম ‘বেলা গেল তোমার
পথ চেয়ে/ শূন্য ঘাটে একা আমি, পার ক’রে লও খেয়ার নেয়ে’ আর ‘মধুর মধুর
ধ্বনি বাজে হৃদয়কমলবনমাঝে’—এই দুটি গান।
যেহেতু আমি নাচ শিখেছি জীবনের বড় একটা সময়, নাচটা ভালোই দখলে ছিল। নানু ছোটবেলা থেকেই বলত নাচতে। নিজের মতো করে নিজের জন্য নাচতে। আমি বুঝেই পেতাম না কেন আমি নিজের জন্য নাচব! নাচ তো একটা পারফর্মিং আর্ট। এর মানেই হলো নাচতে হবে মানুষকে দেখানোর জন্য, মানুষের সামনে পারফর্ম করার জন্য। একা একা কেউ নাচে নাকি? নানু বলেছিল, নাচ এমন একটা জিনিস, যেটা সুদিনে মন আরও ভালো করে দেয় আর দুর্দিনে মনের ভার কমায়। ছোটবেলায় বেশি পাত্তা দিইনি কথাগুলো। তবে যত বড় হয়েছি, যত জীবনের ভারে জর্জরিত হয়েছি, ততই বুঝতে পেরেছি নানু আসলে কী বোঝাতে চেয়েছিল। মন খারাপ থাকলে বিছানা থেকেও উঠতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু একটু কষ্ট করে বিছানা থেকে উঠে আধা ঘণ্টা নেচে ফেলতে পারলে মনে যে প্রশান্তি আসে, তা অতুলনীয়।
মা মারা যাওয়ার পর কিছুই ভালো লাগত না, খেতে পারতাম না, ঘুমাতে পারতাম না, হাসতে পারতাম না। জগৎ–সংসারের সবকিছুর ওপর জেগে উঠেছিল পরম অভিমান আর চরম রাগ। নানু তখন কোথা থেকে যেন ৩৬ হাজার টাকার অল-ইনক্লুসিভ ট্রাভেল প্যাকেজ জোগাড় করল ভুটান যাওয়ার জন্য। একরকম নিমরাজি হয়েই নানুর সঙ্গে রওনা দিলাম ভুটানের উদ্দেশে। অনেক বছর লেগেছিল বুঝতে যে সেটা কোনো আনন্দভ্রমণ ছিল না, সেটা ছিল বিষাদভ্রমণ।
ভুটানের রাজধানী থিম্পু হিমালয়ে ঘেরা একটা উপত্যকা, আর হিমালয়ের পারো নদীর তীরে পারো শহর—এই দুই জায়গায় আমরা ঘুরেছিলাম সেবার। হিমালয়ের বিশালতার মধ্যে বারবার নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলাম আবার খুঁজেও পাচ্ছিলাম অন্য এক আমাকে। সেখান থেকেই মায়ের মৃত্যুর শোক পরিক্রম করার প্রক্রিয়া শুরু হয় আমার। তখন থেকেই জানি, মন খারাপ হলেই চলে যেতে হয় দূর কোন পাহাড়ে বা হ্রদের ধারে। পৃথিবীর বিশালতার কাছে উজাড় করে দিতে হয় মনের যত দুঃখ, আর সেখান থেকেই শুরু হয় বিষাদ থেকে উত্তরণের পথযাত্রা।
নানু আর আমি ছিলাম বিপরীত মেরুর দুটি মানুষ। আমার সঙ্গে তার এমন বন্ধুত্ব হওয়াটা খুবই রহস্যজনক। একেই কি বলে ‘বিপরীত মেরুর প্রতি আকর্ষণ’?
নানুর প্রায় কোনো গুণই পাইনি আমি। কিন্তু যা পেয়েছি তা হলো, স্বাধীনভাবে নিজের মতো করে বাঁচার অসীম স্পৃহা, নির্ভয়ে অকপটে নিজের মতটা প্রকাশ করতে পারার, আর ভিন্ন মতটা যৌক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠভাবে শোনার চেষ্টা এবং মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসার শক্তি।
নানু ছিল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, নিরাপদ আশ্রয়। এই আশ্রয় ছাড়া বেঁচে থাকাই মুশকিল হয়ে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু এখন বুঝতে পারি, নানু আসলে জীবনের কঠিন মুহূর্তগুলোর জন্যই সারা জীবন ধরে আমাকে প্রস্তুত করেছে। নানুর মৃত্যু আমার জন্য ছিল কঠিনতম পরীক্ষা এবং এ পরীক্ষা পার হওয়ার পথও সে-ই দেখিয়ে দিয়ে গেছে।
যত্ন করে তুলে রাখলাম দুঃখগুলো। কোনো একদিন চলে যাব কোনো এক পাহাড়চূড়ায়, সেখানে একলা বসে নানুর শেখানো গানগুলো গুনগুন করব, একটু হয়তো নাচব বা লেখার চেষ্টা করব নানুকে না বলা কথাগুলো আর মুখোমুখি হব দুঃখগুলোর।