‘লাতিন ইসরায়েল’ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বার্তা
Published: 1st, February 2025 GMT
আমেরিকা থেকে পাঠানো অবৈধ অভিবাসী বোঝাই দুটি সামরিক উড়োজাহাজ নামতে দেয়নি কলম্বিয়ার সরকার। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি কলম্বিয়া থেকে আসা সব পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ করে কর বসাবেন।
পরবর্তী সময়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ ৫০ শতাংশ কর বাড়াবেন। শুধু তাই নয়, যেসব দেশ কলম্বিয়াকে সহায়তা করবে তাদেরও ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেবেন।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার কলম্বিয়া। কফির ২০ শতাংশ ছাড়াও কৃষিপণ্যসহ অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের জোগানদাতা। দেশটির বামপন্থি প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোও পাল্টা বলেছেন, তিনিও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা সব পণ্যে ২৫ শতাংশ কর বসাবেন।
পরে অবশ্য সমঝোতায় পৌঁছান ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং গুস্তাভো পেত্রো। হোয়াইট হাউস বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঠানো অবৈধ অভিবাসীবাহী সামরিক উড়োজাহাজ নামতে দেবে কলম্বিয়া। এর বিনিময়ে ট্রাম্প প্রশাসন কলম্বিয়ার ওপর শুল্ক আরোপের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থেকে সরে আসবে।
ওদিকে ট্রাম্প বিশ্বের জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশের প্রতিনিধিত্বকারী ব্রিকস দেশগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ শুল্কসহ বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন। তিনি গ্রিনল্যান্ডকে উপনিবেশ করতে চান, পানামা খাল দখল করতে চান। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুই বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার কানাডাকে তাঁর দেশের অংশ এবং মেক্সিকোতেও আগ্রাসন চালাতে চান। মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের যাত্রা শুরু করেছেন।
ট্রাম্প যখন তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নব্য রক্ষণশীল মার্কো রুবিওকে নির্বাচিত করেছিলেন, তখনই পরিষ্কার হয়েছিল যে তিনি লাতিন আমেরিকার দিকে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করছেন। তিনি মার্কিন আধিপত্য আরোপ করে অঞ্চলটিকে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি থেকে বিরত রাখতে চান।
ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদেও মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে উৎখাতের আহ্বান জানিয়েছিলেন। একইভাবে কিউবা, নিকারাগুয়া ও লাতিন আমেরিকার অন্যান্য স্বাধীন বামপন্থি সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করে প্রথম সপ্তাহেই যে দেশগুলোকে টার্গেট করেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম কলম্বিয়া। যদিও ঐতিহাসিকভাবে কলম্বিয়া এ অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল।
সেই সময় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ কলম্বিয়াকে ‘লাতিন আমেরিকার ইসরায়েল’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল– ইসরায়েল যেমন পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন আধিপত্য সম্প্রসারণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে, একইভাবে কলম্বিয়াও লাতিন আমেরিকাতে মার্কিন স্বার্থের পক্ষের লাঠিয়াল হিসেবে ভূমিকা রাখবে এবং এ অঞ্চলের দেশগুলোকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করবে। ২০২২ সালে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয় যখন কলম্বিয়ার জনগণ প্রথমবারের মতো বামপন্থি গুস্তাভো পেট্রোকে সে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। গুস্তাভো ক্ষমতায় আসার পর মার্কিন সরকার নানাভাবে কলম্বিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তাঁকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে।
চীন মেক্সিকো বাদে দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে উঠেছে। রুবিও চীনের সঙ্গে লাতিন আমেরিকার সেই সম্পর্ক ছিন্ন করতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। ২০২৩ সালে পেট্রো বেইজিং সফর করেছিলেন, যেখানে কলম্বিয়া ও চীনের সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বের’ পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। রুবিও টুইটারে ক্ষোভের সঙ্গে লিখেছেন, “চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে পেট্রোর নতুন ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ কলম্বিয়াকে তাদের কর্তৃত্ববাদী ও জিম্মি করে রাখবে।” মার্কিন সরকার যখন কলম্বিয়ার তীব্র সমালোচনা করছে তখন চীনের রাষ্ট্রদূত ঝু জিংইয়াং জোর দিয়ে বলেন, ‘চীন ও কলম্বিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা তাদের সেরা সময় পার করছেন।’
অভিবাসী নিয়ে কলম্বিয়ার সঙ্গে মার্কিন ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বন্দ্ব নিরসনকে কেউ কেউ গুস্তাভো সরকারের নতিস্বীকার বলে মন্তব্য করছেন। বিষয়টি কি সেই রকম কিছু? একজন দেশপ্রেমিক ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রাজনীতিক হিসেবে গুস্তাভো মার্কিন সরকারের কাছে সম্মানজনক আচরণ আশা করেছেন। প্রত্যাশা অনুযায়ী সেটি না পেয়ে তিনি প্রতিবাদ করেছেন; তাদের একটি বার্তা দিয়েছেন যে তারা দুর্বল হলেও প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে। তাদের অবহেলা করা চলবে না।
কলম্বিয়ার সরকারের প্রতিবাদ থেকে ছোট, দুর্বল ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর শেখার আছে অনেক কিছু। বিশ্বের বৃহৎ প্রতিবেশী পরাশক্তির হুমকি ও ধমকিতে ভীত না হয়ে পেত্রো মেরুদণ্ড সোজা করে যে মর্যাদাবোধ প্রদর্শন করেছেন, তার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে।
ড.
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: কলম ব য় র কর ছ ল ন সরক র র কলম ব য কর ছ ন র ওপর
এছাড়াও পড়ুন:
মানিপ্লান্ট
লকডাউন শুরু হওয়ার দু’দিন পরেই হঠাৎ রান্নাঘরের সিঙ্কের কলটা ভেঙে গেল। মিশুর রাগ পরিণত হলো অসহায়ত্বে। কতদিন থাকবে এই লকডাউন? লকডাউন না থাকলেই কি এর সমাধান আছে? করোনা কি এত সহজে যাবে? নতুন কল পাবে কোথায়, সব দোকান বন্ধ। কল জোগাড় হলেও লাগাবে কে? মিস্ত্রি নিয়ে এলে সঙ্গে আসতে পারে করোনাও। আপাতত পানি বন্ধ করতে হবে। মিশু পলিথিন ঢুকিয়ে দড়ি-পলিথিনে মুখটা কোনোমতে বন্ধ করতে পারল। সিঙ্ক পরিষ্কার করে ফেলল।
সিঙ্কের নিচের কলটা সে কোনোদিন ব্যবহার করেনি। প্রয়োজনও পড়েনি কখনও। ওটা বানানোই হয়েছে নোংরা মতন করে। কাজ করার রুচিই হয় না। রান্নাঘরের পাশের বাথরুমই ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিল মিশু। কিছুদিন দৌড়াদৌড়ি করে কাজ করলেও টুকটাক কাজের জন্য ওই নিচের কলটাই ভরসা। মিশু বাধ্য হয়ে নিচের কলটাই ব্যবহার করা শুরু করল। এতদিন সিঙ্কে দাঁড়িয়ে কাজ করার জন্য কাটাকাটিও দাঁড়িয়ে করত। এখন পানির জন্য বসে কাজ করতে হচ্ছে তাই কাটাকাটির কাজগুলোও বসেই করছে, বঁটিতে।
মিশু লক্ষ্য করে অবাক হলো, রান্নাঘরের প্রতি তার মায়া বাড়ছে। আগের থেকে পরিচ্ছন্নও দেখাচ্ছে ঘরটা। জিনিসপত্রের অবস্থানেরও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আরও কিছুদিন পর, সিঙ্কের নিচের মোজাইকের অংশটুকু বেশি সাদা মনে হচ্ছে, অন্যদিকের মোজাইকের অংশ থেকে। নেতিবাচক ব্যাপারও যে হচ্ছে না তা নয়, বসে কাজ করে অভ্যাস না থাকায় আর বারবার দাঁড়ানো– বসার কারণে শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা এবং জ্বর-জ্বর ভাব হয়েছিল। মিশু ভেবেছিল, করোনা হয়েছে তার। কিছুদিন পরে আবার স্বাভাবিক। মাঝে মাঝে ওপরের সিঙ্কটাও পরিষ্কার করে। মাঝে মাঝে ভুল করে সিঙ্কের কলে হাত চলে যায়, এত বছরের অভ্যাস ...
প্রায় দুই মাস হয়ে গেল এই অবস্থা চলছে। মিশু টের পায় না, সে ক্রমশ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাচ্ছে।
২.
লকডাউনের ছুটি পেয়ে দীপু প্রথমে একটু খুশিই হয়েছিল। সে করোনা নিয়ে মোটেও চিন্তিত না। ছুটিতে বাড়ি থেকে ঘুরে আসাটা জরুরি– এই কথাটাই মাথায় এসেছিল। নিজেই ড্রাইভ করে চলে এলো তার নিজের বাড়িতে। তার সংসার, তার ঘরবাড়ি সব একই বিভাগে; তার আশ্রয়, তার ঠিকানা সবকিছু। ঢাকায় কিছুই নেই তার, শুধু চাকরিটা ছাড়া।
লকডাউন যখন কঠিন থেকে কঠিন হলো সে এক জেলা থেকে আরেক জেলাতেই যেতে পারছে না, ঢাকা তো দূরের কথা, তখন একটু মেজাজ খারাপ হলো তার। বাড়ছে করোনাও। বাচ্চাদের কথা মনে করে করোনাকে একটু ভয় লাগছে, এই রকম পরিস্থিতিতে সে যেন রোবট হয়ে যায়। যদিও সে অনেক আগে থেকেই রোবটের রোলই প্লে করে আসছিল তার পরিবারের কাছে। সবাই জানত তার কোনো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই, মেসেঞ্জার নেই, সে সম্পূর্ণ সোশ্যাল নেটওয়ার্কের বাইরের একজন মানুষ। ধীরে ধীরে অপ্রকাশিত নেটওয়ার্ক প্রকাশিত হতে লাগল। কারণ তার মনে হচ্ছে এই দুর্যোগে কারও ঠেকা পড়ে নাই যে অন্যের ফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবে!
করোনা নিয়ে ভাবতে আর ভালো লাগছে না তার। চাকরি, কাজবাজ আর নিজের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করে সে আতঙ্কিত হয়। ঢাকায় থাকাটা অর্থহীন হয়ে যাবে দীপুর। তবু সে স্থির; নিয়মে, আদেশে বন্দি সে।
হাতে ফোনটা নিয়ে হঠাৎ মনে পড়ল তার বারান্দায় রাখা গাছগুলোর কথা। সে অবাক হলো, কেন সে ভুলে গিয়েছিল গাছগুলোর কথা? কতদিন হলো সে এসেছে? কত মাস?
চার ঘণ্টার পথ একাই ড্রাইভ করে আবারও সে চলে এলো ঢাকায় শুধু গাছগুলোর জন্য। কোনো লাভ হলো না, তার বিল্ডিং লক করে রাখা হয়েছে করোনার বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে। ‘প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়েই চলে যাবে’ বলেও লাভ হলো না। ফিরে যেতে হলো তাকে।
সপ্তাহ দুইয়ের মধ্যেই সব শিথিল হলো। সে চলে এলো ঢাকায়, তার ঘরে। এই ঘর, এই শহর কি তার? কিসের সম্পর্ক এই শহরের সাথে? কিসের টান? এখন ভাবার সময় নেই তার। বারান্দার দরজা খুলে শুকিয়ে যাওয়া মানিপ্লান্টের দিকে তাকাল সে। মুখ দিয়ে এক টুকরো শব্দই বেরোল, “আহা!”
মিশু যখন পুরোপুরি অভ্যস্ত তার সিঙ্কবিহীন কিচেনের সাথে ইথার ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেল ভাঙা কল ঠিক করার জন্য। মিশুও একদিন ইথারকে ফাঁকা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। সিঙ্কের দিকে তাকিয়ে ছিল একদৃষ্টিতে। মিশু কঠোরভাবে নিষেধ করেছিল, কল ঠিক করার কোনো প্রয়োজন নেই, সবকিছু পুরোপুরি ঠিক হোক তারপর। পরদিন সকালেই কল কিনে হাজির। দোকানপাট খুলেছে, বাইরে অনেকটাই স্বাভাবিক। বাইরে স্বাভাবিক হোক কিন্তু মৃত্যুর হার দিনে দিনে বাড়ছেই, মেজাজ খারাপ হলো মিশুর। ইথার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো, মিশুও। এইবার আর শত চেষ্টাতেও ভাঙা কলের মুখ বন্ধ করা গেল না। মিস্ত্রিকে ফোন দিলে সাথে সাথেই চলে এলো, কর্মহীন মানুষদের অভাব এতদিন সে ফেসবুকেই দেখে আসছিল। আজ সামনাসামনি বুঝতে পারল। আধা ঘণ্টার মধ্যেই ঠিক হয়ে গেল মিশুর কলখানি।
স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পেরে আনন্দিতই হলো সে কিন্তু বারবার ভুল করে নিচের কলে চলে যাচ্ছে। প্রথম কয়েকদিন বাজে রকমের ভুল হতে থাকল, নিজের বোকা হওয়া দেখে নিজেরই হাসি পাচ্ছে। সিঙ্কের কলে এমন কিছু ব্যাপার আছে, যেগুলো মিশুর কাছে অসুবিধার মনে হচ্ছে, সেগুলো এখন থেকে সে নিচের কলেই করবে। নিচের কলের জায়গাটার সে এখনও যত্ন নেয়, সিঙ্কের মতোই। রান্না বসিয়ে মিশুর রান্নাঘরে বসে থাকতে হলে চেয়ারে বসে সে সিঙ্কের ওপরে আর নিচের জায়গাটা পর্যবেক্ষণ করে। মানুষের অভ্যাস, না-পাওয়া এইসব ব্যাপার তাকে ভাবায়, সে ভাবে আর তাকিয়ে থাকে। ইথারও কি বুঝতে পেরেছে এই ব্যাপারগুলো? একদিন ইথার মিশুকে বলছিল, “কিচেনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ তোমাদের দেখলাম।”
“তোমাদের মানে, কাকে কাকে?” মিশু কিছুটা হাসির ছলেই জিজ্ঞেস করল।
“তোমাকে আর তোমাকে ... একজন ওপরের সিঙ্কে কাজ করে চুলার দিকে যাচ্ছে, আরেকজন নিচের কলে কাজ করছে।”
মিশু রসিকতায় বিরক্ত হলো কিন্তু হাসছিল, যেন মজার কোনো কৌতুক করছে ইথার।
“হতে পারে হ্যালুসিনেশন।” ইথারও যেন পরিবেশ স্বাভাবিক করতে চাইছে, “চা খাবো, হবে?”
মিশু চা বানাচ্ছে আপনমনে ...। ইশ! কী কষ্টটাই না সে করেছে, সামান্য চা বানাতেও আপ-ডাউন, আপ-ডাউন করতে হয়েছে। আজ মনে হচ্ছে জীবন যত সহজ তত সুন্দর! নাকি যত সুন্দর তত সহজ? একটা হলেই হলো, সহজ-সুন্দর।
“পটেটো!” এমন একটা শব্দে ঘোর কাটল মিশুর। রান্নাঘরে চার্জে দিয়ে রাখা ফোনটা। এই কয়েক মাসে এই ঘরেই বেশি সময় কাটিয়েছে সে। টিভির ঘরে টিভি ছেড়ে দিয়ে রান্নাঘরে বসেই গান শুনেছে। চুলায় কোনো না কোনো রান্না থাকছেই, বন্দিত্বের কারণে হয়তো; সাথে তো আছেই চা আর কফি। নিচের কলটাও কয়েকবার গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার করেছে সে এই কয়েকদিন। তাই এখানেই ফোন, এখানেই চেয়ার, এখানেই টেবিল। ফোনে ‘পটেটোর’ মতো শব্দ করে মেসেঞ্জার নোটিফিকেশন এসেছে।
মিশু পেছনে তাকাল না, রান্নাবান্না নিয়ে ভাবতে ভাবতে জীবনটা আলু-বেগুনই হয়ে গেছে; হাসি পাচ্ছে তার। ফোনেও এখন পটেটো শুনতে পায়। সে চা নিয়ে চলে যাচ্ছে বেডরুমের দিকে।
সিঙ্কের নিচের কলে বাসন মেজে উঠে আসছে অন্য আরেক মিশু তার ফোনের কাছে। মেসেঞ্জার খুলল। একটা নেতানো মানিপ্লান্টের ছবি– নিচে লেখা, “গাছটা শুকিয়ে গেছে।”
মিশু উত্তর দিল, “পানি দিতে হবে।”
“পানি দিলে বাঁচবে?”
মিশু জানে না বাঁচবে কিনা তবু লিখল, “বাঁচবে।”
মিশুর হঠাৎ খেয়াল হলো, এখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে; রাতে গাছে পানি দিতে হয় না। আবার মনে হলো, মৃত্যুপথযাত্রীর রাতই কি আর দিনই কি!
“অনেক ফাইট করেছে ... দুই মাস। পানি ছাড়া।”
মেসেজের জবাব দিতে দিতে মিশু যে বারান্দায় চলে এসেছে বুঝতেই পারেনি। ফোনটা ড্রয়িংরুমের বেডে রেখে তার মানিপ্লান্টগুলোর সামনে বসে পড়ল। বারান্দাটা ড্রয়িংরুমের। ফিসফিস করে মিশু তাদের বলছে, “তোদের মধ্যে কে যোগাযোগ করেছিস ওই গাছটার সাথে?” মিশু জানে তার এই মানিপ্লান্টগুলোর সাথে দীপুর মানিপ্লান্টের যোগাযোগ আছে।
প্রথম গাছটার দিকেই মিশুর সন্দেহ মেশানো চোখ, “তোদের মেসেঞ্জার নেই, হোয়াটসঅ্যাপ নেই, ফেসবুক নেই ... তবু কীভাবে এই যোগাযোগ তোদের?”
প্রশ্ন করে নিঃশব্দে ঝিরঝির করে হাসছে মিশু। সেও যেন সামনের গাছগুলোর মতোই লতানো একটা গাছ।
“আমাদের যোগাযোগের জন্য সবকিছুই আছে, কিন্তু আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। আমরা ইচ্ছে করলেই কারও সাথে যোগাযোগ করতে পারি না। এক দেশ থেকে আরেক দেশে কিংবা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় কাউকে ডেকে আনার সামর্থ্য আমরা রাখি না। কারণ আমাদের ইগো আছে, ব্যক্তিত্ব আছে, পাপ আছে, পুণ্য আছে, বিভেদ আছে। তোদের এগুলো নেই?”
মিশু বারান্দায় বসেই সামনের বারান্দার দিকে তাকায়, ড্রয়িংরুমের বারান্দা থেকে বেডরুমের বারান্দার চমৎকার এক যোগাযোগ এই বাড়িটাতে, ঝুলন্ত বারান্দারা মুখোমুখি, দুটো বারান্দাই পড়েছে বাড়ির সামনের রাস্তার ওপর। এমন আরও দুটো বারান্দা আছে মিশুদের এই বাসাতে। সেই বারান্দার ঘর থেকে কাপ-পিরিচের শব্দ আসে। মিশু-ইথারের চায়ের আসর ভাঙল, মিশু ফোন খুঁজছে, “ফোন যে কোথায় রাখি নিজেই জানি না!” স্বভাবজাত বিরক্তি ফুটে উঠল মিশুর মুখে।
ড্রয়িংরুমের বারান্দার সামনে বেডের ওপর পেল ফোনটা। একটা সিনেমা ডাউনলোড করার কথা ছিল তার, ভুলেই গিয়েছিল। সার্চ দিয়ে রাখা ছিল, এখন কী সব এসেছে, বুঝতে পারছে না।
স্ক্রিনে লেখাটা পড়ে বিরক্তির মধ্যেও হাসি পেল তার, “আওয়ার সিস্টেম থিংকস ইউ মাইট বি এ রোবট।”
মূল শিরোনামে বোল্ড করে লেখা। মিশুর ইচ্ছা হলো সেও মজা করবে। রোবট যদি মানুষের সাথে মজা করতে পারে, মানুষ কেন পারবে না? স্ক্রল করতেই নিচে ছোট ছোট করে লেখা আরেকটা বাক্য “উই আর রিয়েলি সরি অ্যাবাউট দিজ বাট ইটস গেটিং হার্ডার অ্যান্ড হার্ডার টু টেল দ্য ডিফারেন্স বিটুইন হিউম্যান অ্যান্ড বট্স দিজ ডেজ।”
মিশু অবাক হলো, সে ঠিক করল টিক চিহ্ন দিয়ে বলবে, ইয়েস আই অ্যাম এ রোবট। দেখলাম না সিনেমা, তোহ্!
মিশু ফোন চার্জে দিয়ে তার ঘরে চলে গেল। দুই রোবটেরই বিশ্রাম প্রয়োজন।