আগস্টের ৫ তারিখ শেখ হাসিনার পতনের পর সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ হলো সংস্কার। শুরুতে অভ্যুত্থানের পক্ষের প্রায় সব দল সংস্কারের পক্ষে সোচ্চার ছিল। কিন্তু ইদানীং নির্বাচন যেন সংস্কারের দাবিকে ছাপিয়ে উঠতে শুরু করেছে। ফলে সংস্কার, না নির্বাচন; কোনটা আগে হওয়া দরকার– এ নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে।

সংস্কার মানে বিদ্যমান রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামো বদলাতে বহুমুখী পদক্ষেপ হাতে নেওয়া, যা নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করবে। গত পাঁচ দশক যাবৎ যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা বহাল রয়েছে, তা উপড়ে ফেলতে রাজনৈতিক কর্মসূচি হাজির করা। এই পরিপ্রেক্ষিতে নতুন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর উত্থান ঘটা স্বাভাবিক। 

এই রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যেতে পারে, নৈতিকতাভিত্তিক রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বা পলিটিক্যাল মোরালিজম। সমাজে ন্যায্যতা, সমতা, স্বাধীনতা, প্রশান্তি, ভ্রাতৃত্ব ও জাতীয়ভাবে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করাই এ রাজনীতির লক্ষ্য। কেউ কেউ এ ধারার রাজনীতিকে ‘কাল্পনিক’ বলেও চিহ্নিত করেন। ১৫১৬ সালে টমাস মুরের ‘ইউটোপিয়া’ বই প্রকাশ পায়; যেখানে একটি আদর্শিক জাতি গঠনের কথা তুলে ধরা হয়েছিল। প্লেটোর ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থের মধ্যেও সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থা কায়েমের প্রস্তাব দেখা যায়। এ ধারার চিন্তাকে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন, যা সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু তুলনামূলক কল্যাণকর ব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে এ ধারার চিন্তা একটি চলমান প্রক্রিয়া। সমাজে ইনসাফ কিংবা সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে ন্যায্যতা ও অধিকারের মতো অভীষ্ট সামনে রেখেই আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংস্কারপন্থিদের এই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন বেশ দুরূহ হলেও নিঃসন্দেহে অসম্ভব নয়। কনফুসিয়াস সে ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতা ও বাস্তবতাভিত্তিক রাষ্ট্রনীতির প্রস্তাব করেছেন, যা সংস্কারপন্থিরা কাজে লাগাতে পারেন। 

অন্যদিকে বর্তমানে দেশের রাজনীতিতে নির্বাচনপন্থিরা আরেকটি শক্তিশালী ধারা। তাদের উদ্দেশ্য দ্রুত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হস্তগত করা। এ ক্ষেত্রে কোনো রকম কিংবা তাদের ভাষায় প্রয়োজনমতো সংস্কার করে নির্বাচন দিতে হবে। এই আকাঙ্ক্ষার নেপথ্যে আছে বিদ্যমান সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঠেকিয়ে দেওয়া, যাতে পুরোনো শ্রেণিস্বার্থ বহাল থাকে। বিগত আওয়ামী শাসনের সুবিধাভোগীদের জায়গায় নতুন সুবিধাবাদীদের বসানো। জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক তাঁর ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ ইন ইন্ডিয়া’ বইয়ে ’৪৭-এর দেশভাগ সম্পর্কে বলেছেন, ক্ষমতার হাত বদলানো কিংবা শ্বেতাঙ্গদের কাছ থেকে বাদামিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। 

নির্বাচনপন্থিদের কাছে রাজনীতিতে নৈতিক ভিত্তি কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচারের মূল্য তুলনামূলক কম। তারা ক্ষমতাকে রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য মনে করেন। যে কোনো ছলচাতুরী, ধূর্ততা, সহিংসতা কিংবা অন্যায়ভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। নাগরিক অধিকার সমুন্নত হলো কিনা, সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলো কিনা, সেটি তাদের ভাবার সময় নেই। তাদের চিন্তাধারা ম্যাকিয়াভেলি ও হবসপন্থি। সততা, নৈতিকতা, বুদ্ধিমত্তার বদলে ছলচাতুরী, ফাঁকি, ধূর্ততা কিংবা চালাকিকে তারা গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান করেন। তাদের কাছে সমাজে মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক প্রতারণাপূর্ণ। প্রকৃতির নিয়মের এই রাজ্যে প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতিপক্ষ। এই ‘ব্রুটিশ’ রাষ্ট্রের একচ্ছত্র ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধান জনসাধারণের ওপর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এ রাজনৈতিক ধারায় পরিবার ও গোষ্ঠী রাজনীতির নিয়ন্ত্রক, যাদের হাতে অর্থনীতি কুক্ষিগত থাকে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মর্জিমতো কাজ করে। 

সংস্কারপন্থি ও নির্বাচনপন্থিদের মধ্যে চলমান বিতর্কে সাধারণত রাজনৈতিক দল বর্গ দিয়ে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে দেখা যায়। কিন্তু বিশ্লেষণের এ পন্থায় দেশের মূল চিত্র ধরা পড়ে না। তত্ত্বীয় দিক থেকে কার্ল মার্ক্স ‘শ্রেণি’ ধারণা দিয়ে সামাজিক চিত্রটি কার্যকরভাবে তুলে ধরার পথ জনপ্রিয় করে গেছেন। সেদিক থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি রাজনৈতিক দলগুলোর বৈশিষ্ট্য দিয়ে বিচার করা যতটা যুক্তিযুক্ত, তার চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হলো শ্রেণি ধারণা দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করে দেখা। 

এখন বিতর্কের গোড়ায় যাওয়া যাক। অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান অভ্যুত্থানের পাঁচ দিন পর ১০ আগস্ট সমকালে এক সাক্ষাৎকারে গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা ষোলোআনা বলে মন্তব্য করেছিলেন। এই ষোলোআনার নেপথ্যেও প্রধান কারণ দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা রাজনীতির প্রধান অংশীদার। জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক উল্লিখিত বইয়ে উনিশ শতকের পরিপ্রেক্ষিতে যাদের ‘শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন; স্বাধীনতার পর মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাজনীতি গড়ে উঠেছে ব্যাপক লুটপাটের মধ্য দিয়ে। বদরুদ্দীন উমরের ভাষায়, ‘এই যে শ্রেণি বাংলাদেশে তৈরি হলো, এরা এলো লুটপাট ও নানা রকম দুর্নীতির মাধ্যমে। এই মধ্যশ্রেণির মধ্য থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের জন্ম হলো।’

বুদ্ধিজীবীদের কথা আসাতেই সমকালীন নাগরিক সমাজের প্রশ্নটি উঠে আসে, যারা লুটেরা মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্যতম শরিক। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতেই রাজনীতি পরিপুষ্ট হয়েছে। সমাজের চারদিকে বিভিন্ন শ্রেণিস্বার্থ গেড়ে বসেছে, অর্থনীতির সর্বস্তরে রয়েছে ছোট-বড় সিন্ডিকেট। নদী থেকে বালু উত্তোলন, ঔষধশিল্প, যানবাহন, কাঁচাবাজার, মিডিয়া, বিজ্ঞাপন– এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে সিন্ডিকেটের বিস্তার ঘটেনি। 

এ সবকিছুই গত পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপহার! গেড়ে বসা এসব কাঠামোর মূলোৎপাটন হলে পুরোনো শ্রেণিস্বার্থ আর বহাল থাকে না। সেখানেই সংস্কারপন্থিদের সঙ্গে নির্বাচনপন্থিদের ফ্যাসাদ। এ সংঘাত কেবল তর্কে সীমাবদ্ধ নেই, অনেক ক্ষেত্রে খুনোখুনি পর্যন্ত হচ্ছে। নির্বাচনপন্থিরা যে কোনো মূল্যে পুরোনো ব্যবস্থা বহাল রাখতে চাইবেন। এতেই তাদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকে। সম্প্রতি প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে নরওয়ের ইউনিভার্সিটি অব অসলোর সাউথ এশিয়া স্টাডির অধ্যাপক আরাইল্ড এঙ্গেলসন বাংলাদেশে একটি নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা খুব কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেছেন।
সংস্কারপন্থি ও নির্বাচনপন্থিদের বিতর্ক যে দিকেই যাক না কেন; বাংলাদেশে আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হলে সংস্কারের বিকল্প নেই। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কেবল ক্ষমতার হাতবদল ঘটবে, ক্ষমতা কাঠামো নয়। এ দেশে বহুবার ক্ষমতার হাতবদল ঘটেছে, কিন্তু সামাজিকভাবে আমূল পরিবর্তন কখনও সম্ভব হয়নি। তাই সংস্কারের দুরূহ পথই হতে পারে সুবিচার তথা ইনসাফ কায়েমে সম্ভাবনার দুয়ার।

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল
iftekarulbd@gmail.

com

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: র জন ত র জন ত ক ব র র জন ত র জন ত র ব যবস থ ক ষমত

এছাড়াও পড়ুন:

সারাদিন কাঠফাটা রোদ, রাতে কাঁথামোড়া শীত

চৈত্র মাসে কাঠফাটা রোদই স্বাভাবিক। দিনের বেলায় হচ্ছেও তাই। কিন্তু রাত নামছে ভিন্ন আয়োজনে। যেন পৌষের শীত! সকালে তার রেশ থাকে কুয়াশা হয়ে। এই চিত্র কেবল উত্তরের জেলা দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারীতে নয়; দক্ষিণের খুলনা, দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা কুষ্টিয়া, চূয়াডাঙ্গা; সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার হাওরবেষ্টিত উপজেলাগুলোর চিত্রও তাই।

বিভিন্ন স্থান থেকে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে দেখা যায়, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এসব এলাকায় রাতে শীতের আবহ বিরাজ করছে। সকাল ঢেকে থাকছে কুয়াশায়। গতকাল বুধবার ঠাকুরগাঁওয়ে সকাল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত সূর্যের মুখ দেখা যায়নি।

ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে  ঠাকুরগাঁও বেড়াতে গেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ। তিনি সমকালকে বলেন, ঢাকায় ফ্যান ছাড়া ঘুমাতে পারি না। আর গ্রামে এসে কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুমাতে হচ্ছে। ফজরের নামাজের পর কুয়াশা পড়ে। এর আগে এই সময়ে এমন ঘন কুয়াশা খুব একটা দেখা যায়নি। দিনে আবার উল্টো চিত্র; কাঠফাটা গরম।

ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক আব্দুস সালাম  বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে উত্তরাঞ্চলে কুয়াশার প্রভাব বেশি যাচ্ছে। এর প্রভাবে ঠাকুরগাঁও ও  পঞ্চগড় জেলায় রাতে কনকনে শীতের ভাব থাকে। তবে দিনে তাপমাত্রা বেশি থাকে। এ অঞ্চলে প্রথমবারের মতো বসন্তে শীতের কুয়াশা পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে চৈত্রের এই রূপ। কোথাও বেশি, কোথাও কম। আবার অসময়ে তাপপ্রবাহও শুরু হচ্ছে। এটিকে তারা ঋতু পরিবর্তনের ধারায় পরিবর্তন বলছেন। তাদের ভাষ্য, জলবায়ু বদলের কারণেই এমনটি হচ্ছে। এই বিরূপ প্রকৃতি উদ্বেগেরও। কারণ এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে গাছগাছালির। বাড়বে ফসলের রোগবালাই।

গতকাল সকালে পঞ্চগড়ের পথঘাটও ঘন কুয়াশায় ঢাকা ছিল। স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক বছরে এমন কুয়াশা তারা দেখেননি। এলাকায় জ্বর, সর্দিসহ নানা রোগের কথাও জানালেন কেউ কেউ। 

আবহাওয়া অফিস জানায়, পঞ্চগড়ে গতকাল সকাল ৯টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে মঙ্গলবার দিনে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ বলেন, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আকাশে জমা মেঘ কুয়াশা হয়ে ঝরছে। আবার বাতাসে ধূলিকণা বেশি ও আর্দ্রতা কম থাকছে। আরও কয়েক দিন এমন অবস্থা চলতে পারে বলে জানান তিনি।

দিনাজপুরে কয়েক দিন ধরে দিনের বেলায় রোদে গা পুড়ে যাচ্ছে। গভীর রাতে বাড়ে ঠান্ডা। নীলফামারীতে দিনের আবহাওয়া অনেকটা স্বাভাবিক থাকলেও শেষ রাতে তাপমাত্রা অর্ধেকে নেমে আসে। 

রাজশাহীর গ্রামাঞ্চল কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ছে। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক উম্মে ছালমা বলেন, এমন কুয়াশা রাজশাহীর আমের মুকুল ও গুটির জন্য ক্ষতিকর। আমের মুকুলে ‘পাউডারি মিলডিউ’ নামে এক ধরনের রোগ দেখা দিচ্ছে। এতে মুকুল ঝরে পড়ছে।

গত সোমবার নোয়াখালীর সুবর্ণচর হঠাৎ কুয়াশায় ঢাকা পড়ে বলে জানান স্থানীয় লোকজন। মাঝারি ও ঘন কুয়াশায় সামান্য দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছিল না। চৈত্র মাসে এমন ঘন কুয়াশায় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন বোরো চাষিরা। নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চাষি মাহফুজুল হক বলেন, এবার চার একর জমিতে বোরো ধান চাষ করেছি। বেশির ভাগ গাছে শীষ বের হয়েছে। হঠাৎ ঘন কুয়াশার কারণে চিন্তায় পড়েছি।

স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছাইফুল আলম জানান, বিভিন্ন এলাকায় এক সপ্তাহ ধরে কুয়াশা পড়ার খবর পাচ্ছি। কুয়াশা দীর্ঘ সময় ধরে পড়লে বোরো ফসল ব্লাস্টে আক্রান্তের আশঙ্কা আছে।

কুয়াশা দেখে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। তারা বলছে, বায়ুমণ্ডলে তাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় দিনে ভূপৃষ্ঠ উত্তপ্ত থাকে, ভোরের দিকে শীতল হয়। ওই সময়টায় বাতাস জলীয় বাষ্প ধারণ করতে না পারায় তা কুয়াশা আকারে ভেসে বেড়ায়।

আবহাওয়াবিদরা জানান, কেবল চলতি বছর নয়, গত ১০-১২ বছর মার্চ মাসজুড়েই এমন কুয়াশা থাকছে এবং অসময়ে তাপপ্রবাহ শুরু হচ্ছে। এটিকে তারা ‘সিজনাল প্যাটার্ন চেঞ্জ’ (ঋতু পরিবর্তনের ধারায় পরিবর্তন) বলছেন। এই পরিবর্তনটাকে তারা ‘অস্বাভাবিক আচরণ’ বলে মনে করছেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল জলবায়ু : আবহাওয়ার পর্যবেক্ষণে ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের প্রবণতা এবং পরিবর্তন’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও নরওয়ের পাঁচজন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ গত ৪৩ বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে গবেষণাটি করেন। এতে দেখা যায়, প্রতি ঋতুতে তাপমাত্রা আগের তুলনায় বাড়ছে। পাশাপাশি মৌসুমি বায়ু দেরিতে প্রবেশ করায় স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বর্ষাকাল পিছিয়ে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় মার্চের শেষ সপ্তাহেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কুয়াশা দেখা যাচ্ছে, শীত অনুভূত হচ্ছে। এর মূল কারণ হিসেবে দূষণকে চিহ্নিত করেন আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মমিনুল ইসলাম বলেন, এই কুয়াশা তৈরির পেছনে বাতাসের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার পার্থক্য দায়ী। এবার রাতে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার আগেই কুয়াশা তৈরি হয়ে যাচ্ছে। আর বাতাস কম থাকায় কুয়াশা সরে যেতে পারছে না। তিনি জানান, এ সময় ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং চীনেও কুয়াশা তৈরি হচ্ছে।

কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক পিএইচডি গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, এক সপ্তাহ আগে রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টি হয়েছিল। ফলে ওইসব জেলার মাটিতে কিছুটা আর্দ্রতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হওয়ায় ভূপৃষ্ঠ কয়েক ডিগ্রি সেলসিয়াস ঠান্ডা হয়েছে। এর মধ্যে হঠাৎ এসব জেলার ঊর্ধ্ব আকাশ দিয়ে গরম বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। শীতকালে যেমন মানুষের মুখ ও নাক থেকে বের হওয়া গরম বাতাস বাইরের শীতল বাতাসের সঙ্গে মিশে ধোঁয়ার সৃষ্টি করে, ঠিক একইভাবে এখন শীতকালের মতো কুয়াশা সৃষ্টি হচ্ছে।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও নীলফামারী প্রতিনিধি)

সম্পর্কিত নিবন্ধ