ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে যাওয়ার পথে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন সদ্য কারামুক্ত সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। পরে তাকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১১টার দিকে দুবাই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

শুক্রবার সকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন বাবরের একান্ত সহকারী মির্জা হায়দার আলী।

তিনি জানান, ঢাকা থেকে মদিনার উদ্দেশে রওনা দেন লুৎফুজ্জামান বাবর। যাত্রাপথে উড়োজাহাজে (অ্যামিরাটস এয়ারলাইন্স) হঠাৎ তার প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হয়। পরে দুবাইতে বিমান অবতরণের পরে দ্রুত বিমানবন্দরের কাছে একটি ক্লিনিকে তাকে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাবরকে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন।

মির্জা হায়দার বলেন, স্যার এখন দুবাইয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি আছেন। চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তার চিকিৎসা চলছে।

১৭ বছর কারাবাসের পর গত ১৬ জানুয়ারি মুক্তি পান লুৎফুজ্জামান বাবর। এর আগে ১৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনায় অস্ত্র আইনে করা পৃথক মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের দায় থেকে খালাস পান তিনি। 

২০০৪ সালের ১ এপ্রিল চট্টগ্রামের সিইউএফএল ঘাট থেকে ১০ ট্রাকভর্তি অস্ত্রের চালান আটক করা হয়। এ নিয়ে কর্ণফুলী থানায় অস্ত্র আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে দুটি মামলা করে পুলিশ। দুটি মামলায় ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ রায় দেন। এর মধ্যে অস্ত্র চোরাচালান মামলায় মতিউর রহমান নিজামী (অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর), লুৎফুজ্জামান বাবর, পরেশ বড়ুয়া, দুটি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। অস্ত্র আইনে করা অন্য মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ হয় একই আসামিদের।

বিচারিক আদালতের রায়ের পর ২০১৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রায়সহ মামলার নথি হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় পৌঁছায়, যা হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স মামলা হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষে নথিভুক্ত হয়। অন্যদিকে কারাগারে থাকা দণ্ডিত আসামিরা সাজার রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে হাইকোর্টে পৃথক আপিল করেন। অস্ত্র আইনের মামলায় উভয় পক্ষের আবেদনের শুনানি নিয়ে ১৪ জানুয়ারি রায় দেন হাইকোর্ট।  

লুৎফুজ্জামান বাবর ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নেত্রকোনা-৪ (মদন-মোহনগঞ্জ-খালিয়াজুরি) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য হন। তিনি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।

.

উৎস: Samakal

এছাড়াও পড়ুন:

মুখোমুখি হব দুঃখগুলোর

২৬ মার্চ ২০২৫, ভোরবেলা উঠেই দৌড়াতে হলো পিজি হাসপাতালে নানুকে (সন্‌জীদা খাতুন) গোসল করানোর জন্য। অনেক বছর আগে নানু বলে গেছিল তার মৃত্যুর পর যেন আমি আর তিন্নি (নানুর সবচেয়ে বড় বোনের নাতনি) তাকে গোসল করাই। বিষয়টাকে আমি বিশেষ গুরুত্ব দিইনি। কারণ, নানুর মৃত্যু যে আসতে পারে, সেই চিন্তাটাই আমার ছোট, দুর্বল মস্তিষ্ক কখনো ধারণ করতে পারেনি। কিন্তু দিনটি এল এবং পুরোটা সময় আমি হতবিহ্বল হয়ে থাকলাম।

গোসলের পর নানুকে পরানো হলো একটা লাল পাড়ের সাদা শাড়ি, কপালে লাল টিপ। এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হলো ছায়ানটে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। পালিয়ে পালিয়ে থাকার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু প্রকৃতি (নানুর আরেক নাতনি, পার্থ তানভীরের মেয়ে) টেনেটুনে সামনে নিয়ে গেল। তারপর লিসা (নানুর পুত্রবধূ) ঠেলে দিল একেবারে নানুর কাছে; কারণ, আমার সঙ্গে আছে তুলা, যে তুলা দিয়ে একটু পরপর নানুর মুখ মুছে দিতে হবে আর তাড়াতে হবে মাছি। আমার সারা শরীর ভেঙে কান্না আসছিল, কিন্তু শত শত মানুষের ভিড়ে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতেও পারছিলাম না। এর মধ্যে একের পর এক গান হয়েই যাচ্ছে, ‘এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা…’। ‘আগুনের পরশমণি’ যখন শুরু হলো, তখন আর কান্না চেপে রাখতে পারলাম না। চেষ্টা করলাম মাথা নিচু করে যতটুকু মানুষের চোখ এড়িয়ে কাঁদা যায়। এরপরই জাতীয় সংগীত। মনে হচ্ছিল আমার সুন্দর করে সাজানো–গোছানো পৃথিবীটা কেউ হাতুড়ি ঠুকে ঠুকে ভেঙে দিচ্ছে। এত দুঃখ কেন আসে জীবনে?

আমি নানু বা মায়ের মতো শক্ত মনের মানুষ নই। কেউ একটু চোখ রাঙিয়ে তাকালেই বুক ভেঙে কান্না পায়। যখনই মন খারাপ হতো, তখনই চলে যেতাম নানুর কাছে নালিশ করতে। নানু সব সময় উৎসাহ দিত আমাকে, যেন মনের কথাগুলো লিখে ফেলি। লিখে ফেললে মনটা হালকা লাগবে। এই কৌশল যে কতবার আমার জীবনে কাজে এসেছে, তা গুণে শেষ করতে পারব না।

জীবনের চাপে, সমাজের চাপে, মানুষের চাপে অনেকবারই মন ভেঙে গেছে। যখনই ভগ্ন হৃদয়ে নানুর কাছে যেতাম, নানু বলত গান করতে। অবশ্যই আমি নানুর কথা শুনতাম না। সুতরাং আমাকে ধরেবেঁধে নতুন গান শেখাতে শুরু করত নানু।
এভাবেই জীবনের বড় দুটো দুঃসময়ে নানুর কাছে শিখেছিলাম ‘বেলা গেল তোমার
পথ চেয়ে/ শূন্য ঘাটে একা আমি, পার ক’রে লও খেয়ার নেয়ে’ আর ‘মধুর মধুর
ধ্বনি বাজে হৃদয়কমলবনমাঝে’—এই দুটি গান।

যেহেতু আমি নাচ শিখেছি জীবনের বড় একটা সময়, নাচটা ভালোই দখলে ছিল। নানু ছোটবেলা থেকেই বলত নাচতে। নিজের মতো করে নিজের জন্য নাচতে। আমি বুঝেই পেতাম না কেন আমি নিজের জন্য নাচব! নাচ তো একটা পারফর্মিং আর্ট। এর মানেই হলো নাচতে হবে মানুষকে দেখানোর জন্য, মানুষের সামনে পারফর্ম করার জন্য। একা একা কেউ নাচে নাকি? নানু বলেছিল, নাচ এমন একটা জিনিস, যেটা সুদিনে মন আরও ভালো করে দেয় আর দুর্দিনে মনের ভার কমায়। ছোটবেলায় বেশি পাত্তা দিইনি কথাগুলো। তবে যত বড় হয়েছি, যত জীবনের ভারে জর্জরিত হয়েছি, ততই বুঝতে পেরেছি নানু আসলে কী বোঝাতে চেয়েছিল। মন খারাপ থাকলে বিছানা থেকেও উঠতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু একটু কষ্ট করে বিছানা থেকে উঠে আধা ঘণ্টা নেচে ফেলতে পারলে মনে যে প্রশান্তি আসে, তা অতুলনীয়।

মা মারা যাওয়ার পর কিছুই ভালো লাগত না, খেতে পারতাম না, ঘুমাতে পারতাম না, হাসতে পারতাম না। জগৎ–সংসারের সবকিছুর ওপর জেগে উঠেছিল পরম অভিমান আর চরম রাগ। নানু তখন কোথা থেকে যেন ৩৬ হাজার টাকার অল-ইনক্লুসিভ ট্রাভেল প্যাকেজ জোগাড় করল ভুটান যাওয়ার জন্য। একরকম নিমরাজি হয়েই নানুর সঙ্গে রওনা দিলাম ভুটানের উদ্দেশে। অনেক বছর লেগেছিল বুঝতে যে সেটা কোনো আনন্দভ্রমণ ছিল না, সেটা ছিল বিষাদভ্রমণ।

ভুটানের রাজধানী থিম্পু হিমালয়ে ঘেরা একটা উপত্যকা, আর হিমালয়ের পারো নদীর তীরে পারো শহর—এই দুই জায়গায় আমরা ঘুরেছিলাম সেবার। হিমালয়ের বিশালতার মধ্যে বারবার নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলাম আবার খুঁজেও পাচ্ছিলাম অন্য এক আমাকে। সেখান থেকেই মায়ের মৃত্যুর শোক পরিক্রম করার প্রক্রিয়া শুরু হয় আমার। তখন থেকেই জানি, মন খারাপ হলেই চলে যেতে হয় দূর কোন পাহাড়ে বা হ্রদের ধারে। পৃথিবীর বিশালতার কাছে উজাড় করে দিতে হয় মনের যত দুঃখ, আর সেখান থেকেই শুরু হয় বিষাদ থেকে উত্তরণের পথযাত্রা।

নানু আর আমি ছিলাম বিপরীত মেরুর দুটি মানুষ। আমার সঙ্গে তার এমন বন্ধুত্ব হওয়াটা খুবই রহস্যজনক। একেই কি বলে ‘বিপরীত মেরুর প্রতি আকর্ষণ’?

নানুর প্রায় কোনো গুণই পাইনি আমি। কিন্তু যা পেয়েছি তা হলো, স্বাধীনভাবে নিজের মতো করে বাঁচার অসীম স্পৃহা, নির্ভয়ে অকপটে নিজের মতটা প্রকাশ করতে পারার, আর ভিন্ন মতটা যৌক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠভাবে শোনার চেষ্টা এবং মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসার শক্তি।

নানু ছিল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, নিরাপদ আশ্রয়। এই আশ্রয় ছাড়া বেঁচে থাকাই মুশকিল হয়ে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু এখন বুঝতে পারি, নানু আসলে জীবনের কঠিন মুহূর্তগুলোর জন্যই সারা জীবন ধরে আমাকে প্রস্তুত করেছে। নানুর মৃত্যু আমার জন্য ছিল কঠিনতম পরীক্ষা এবং এ পরীক্ষা পার হওয়ার পথও সে-ই দেখিয়ে দিয়ে গেছে। 

যত্ন করে তুলে রাখলাম দুঃখগুলো। কোনো একদিন চলে যাব কোনো এক পাহাড়চূড়ায়, সেখানে একলা বসে নানুর শেখানো গানগুলো গুনগুন করব, একটু হয়তো নাচব বা লেখার চেষ্টা করব নানুকে না বলা কথাগুলো আর মুখোমুখি হব দুঃখগুলোর।

সম্পর্কিত নিবন্ধ