Samakal:
2025-04-03@03:06:44 GMT

মঞ্চে বলয় ভাঙার লড়াই

Published: 30th, January 2025 GMT

মঞ্চে বলয় ভাঙার লড়াই

থিয়েটার আর্ট ইউনিটের নতুন নাটক ‘বলয়’-এর উদ্বোধনী মঞ্চায়ন হয়ে গেল গত ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে। নাটকটির পাণ্ডুলিপি, পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন মোকাদ্দেম মোরশেদ। নাটকটির উদ্বোধনী মঞ্চায়নকালে হলের লবিতে একটি ইনস্টলেশন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। ‘বলয়’ নাটকটি এগিয়ে গেছে মূলত তিনটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে। এঁরা হলেন– রাজনীতিক, বিজ্ঞানচিন্তক ও ধর্মতাত্ত্বিক। তারা গেছেন মনোবিশ্লেষকের কাছে কাউন্সিলিংয়ের জন্য। কারণ, তাদের উপলব্ধি, তারা একটি বলয়ের মধ্যে আটকে গেছেন । হাঁপিয়ে উঠেছেন তারা, বলয় থেকে মুক্ত হতে চান। 

বিজ্ঞান-ধর্ম-রাজনীতির কথা, যুক্তির পিঠে যুক্তি, যুক্তি খণ্ডন, আস্থা-অনাস্থা অনুভবের কথা, তারা ফিরে যান তাদের আপন সত্তায়। নিজের সঙ্গেই নিজের কথোপকথন। নাট্যকারের ভাষায় এটি অন্তর্দ্বন্দ্বের নাটক। একটি চক্র, একটি বলয় ঘিরে রেখেছে আমাদের প্রত্যেককে। সামাজিক বলয়, রাজনীতির বলয়, ধর্মীয় বলয়, যুক্তি-অযুক্তির বলয়, ক্ষমতার বলয়, শোষণের বলয়, শাসকের বলয়। বলয়বৃত্তে ছটফট করা প্রাণ ছুটে যেতে চায়, মুক্ত হতে চায়; হয়তো ছুটে যায়ও কিন্তু পড়ে যায় আরেক বলয়ে। 

সংলাপই এ নাটকের প্রাণ। চমৎকার অর্থপূর্ণ সংলাপগুলো দর্শককে নাড়া দিয়ে যায়, জাগিয়ে তোলে কিছু প্রশ্ন অথবা অনুসন্ধানের ইচ্ছা। এ কনটেম্পোরারি অন্তর্দ্বন্দ্বের নাটকটি যেন নিজেকেই নিজে বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দেয় নানান অসংগতি, অযুক্তির বলয়ে আমাদের বসবাস। গল্পের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ সেট, আলো, আবহ, অভিনয় দক্ষতা এবং সর্বোপরি ডিরেক্টোরিয়াল ওয়ার্ক নাটকটিকে অর্থবহ করে তুলেছে। বলয় নাটকটিকে থিয়েটার আর্ট ইউনিটের একটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রযোজনা বলা যেতে পারে। রাজনীতিক বিজ্ঞানচিন্তক ধর্মতাত্ত্বিক চরিত্রে যথাক্রমে– সেলিম মাহবুব, স্বাধীন শাহ্, রেজাউল আমিন সুজনের দুর্দান্ত অভিনয় দর্শকদের নজর কেড়েছে। মনোবিশ্লেষক চরিত্রে নাহিদ সুলতানা লেমন উতরে গেছেন। দর্শনার্থী এবং অমৃতা চরিত্রে রূপদানকারী রানা সিকদার ও মাহমুদা সুলতানা ভাবনার অভিনয় উপস্থাপনের আরও সুযোগ আছে বলে মনে হয়। আরেকটি ইন্টারেস্টিং চরিত্র মানসিক রোগী, তিনি একজন পিটিএসডি। যে চরিত্র আমজনতার পক্ষে কথা বলে, তাঁর কথাই যেন আমজনতার কথা। চরিত্রের রূপদানকারী হাসনাত প্রদীপ তাঁর অভিনয়শৈলী দিয়ে দর্শকের নজর কেড়েছেন। 

নাট্যকার, নির্দেশক মোকাদ্দেম মোরশেদ বলেন, রাজনৈতিক বলয়সহ সামগ্রিক পারিপার্শ্বিক বলয়ের একটা স্থানান্তর ঘটেছে। এক বলয় থেকে অন্য বলয়ে আমরা স্থানান্তরিত হয়েছি। বলয় কিন্তু রয়েই গেছে। বলয় থেকে বলয়ে গমন অথবা আটকেপড়া বলয়ে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের স্পন্দন, অনুকূলে বা প্রতিকূলে মুক্তিহীন বলয়বন্দি বহমান এই জীবন– এ উপলব্ধিই ‘বলয়’ নাটকের চিন্তা সূত্র। এতে আছে চরিত্রের স্ববিরোধী অবস্থান; নিজেকেই নিজে বিশ্লেষণ করার একটি ইচ্ছা। দলের ৪০তম প্রযোজনাটির আবহ পরিকল্পনায় সেলিম মাহবুব, আলোক পরিকল্পনায় সুদীপ চক্রবর্তী। থিয়েটার আর্ট ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক এবং প্রযোজনা অধিকর্তা কামরুজ্জামান মিল্লাত বলেন, এস এম সোলায়মানের ভাব ও আদর্শে প্রতিষ্ঠিত নাট্যদল সব সময় নাটকের মধ্য দিয়ে মানুষের কথা মানুষের সামনে বলেছে। নাটক বলয়-এ মানবজীবনের সংকটকে চিনে নিয়ে সম্ভাবনার দুয়ার খোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত। থিয়েটার আর্ট ইউনিটকে অভিনন্দন চমৎকার একটি প্রযোজনা উপহার দেওয়ার জন্য, বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় মৌলিক নাটকের যাত্রা অব্যাহত থাকুক।   

.

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: র জন ত ন টকট র একট

এছাড়াও পড়ুন:

প্রবাসে কেটে যায় ঈদ, থেকে যায় স্মৃতি

টানা ১১তম ঈদ পালন করলাম প্রবাসে। ২০১৫ সাল থেকে কখনো দেশে ঈদ পালন করা হয়নি আমার। তবে এ নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই, নেই কোনো অভিযোগ। আমি বরাবরই অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা হতে পছন্দ করি। 

ঈদ আসলে দেড় কোটি প্রবাসীর আকুতি শুনতে পাই। তবে, আমি কখনো আকুতি জানাইনি। কখনো কাউকে বলা হয়নি, ঈদে আমার খারাপ লাগে, কষ্ট লাগে। ঈদ আসলে অন্যরা কষ্ট পেলেও আমি আনন্দ খোঁজার চেষ্টা করি। অন্যরা কষ্ট পায়, কারণ ঈদটাকে তারা উপলব্ধি করে, যখন তারা তাদের মনের সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে না! যেমন তাদের ইচ্ছে করে, পরিবারের সাথে ঘুরবে, বউ-বাচ্চা, মা-বাবার মুখ দেখবে; যখন সেটি করতে পারে না, তখনই তারা কষ্ট পায়।

আর যার কোনো আকাঙ্ক্ষাই থাকে না, তার তো কষ্ট পাওয়ারও কিছু থাকে না। আমার কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। ঈদ এলে আমার আলাদা কোনো অনুভূতি কাজ করে না। ফলে, আমি কষ্ট না পেয়ে আনন্দ খুঁজি।

যে বছর প্রথম প্রবাসে ঈদ পালন করেছি, সে বছর বরাবরের মতোই বাংলাদেশের আমেজ উপলব্ধি করতাম। যখন দেখলাম, ঈদের দিনেও কাজ থেকে ছুটি পাইনি, ঈদের জন্য কোনো নতুন জামা কিনতে পারিনি, সেদিনই প্রবাস জীবন কী, তা আর বুঝতে বাকি রইল না। ঈদের দিন ছুটি না পাওয়ার কারণ হলো—আমার প্রবাস জীবন শুরু হয়েছে ইউরোপের দেশ সাইপ্রাসে। সাইপ্রাস খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের দেশ হওয়ায় সে দেশে মুসলমানদের ধর্মীয় কোনো উৎসবে সরকারিভাবে বন্ধ দেওয়া হয় না। আমি জানতাম না, এ দেশে এরকম সিস্টেম। আমি তখন গাড়ির ওয়ার্কশপে কাজ করতাম সাইপ্রাসের রাজধানী নিকোশিয়ার ফ্যাক্টরি এরিয়াতে। আমার দেশের বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনাইশে।

ভেবেছিলাম, মালিকের কাছ থেকে ঈদের দিন ছুটি চেয়ে নেব। কিন্তু, ঈদের দুই দিন আগ থেকে কাজের এতটাই চাপ ছিল যে, তার কাছে যে ছুটি চাইব, সে পরিস্থিতি ছিল না। রাতে পরিকল্পনা করি, ঈদের নামাজ আর পড়ব না। কারণ, আমি যেখানে কাজ করি, ওখান থেকে মসজিদ প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু, কয়েকজন বন্ধুর অনুরোধে ভোরে উঠে পুরাতন জামা পরে বাসে করে চলে গেলাম রাজধানী নিকোশিয়ায় নামাজ পড়তে। কিন্তু, নামাজ শেষ করে কিছুতেই আর কাজে ফিরতে ইচ্ছে করছে না। বন্ধুরা ডেকে নিয়ে গেল বাসায়। তারা রান্না করছে, আমাকে না খেয়ে আসতে দিচ্ছিল না। কিন্তু, যখন সকাল ৯টা বাজে, মালিকের ফোনের পর ফোনে বিরক্ত হয়ে খাবার না খেয়েই চলে আসতে হয়েছে কাজে। রাগ করে আর বাড়িতেও কাউকে ফোন দিয়ে বলিনি এ কষ্টের কথা। কিন্তু, তারা ধরে নিয়েছিল যে, আমি অনেক আনন্দ করছি বিদেশে।

পরের বছর থেকে আর কখনো এটা নিয়ে আক্ষেপ করিনি। আমার ছয় বছরের সাইপ্রাস প্রবাস জীবনে একবার ছুটি পেয়েছিলাম ঈদের দিন। কারণ, সেদিন ছিল রবিবার। সাইপ্রাসে রবিবারে সরকারি ছুটি। সাইপ্রাসে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশির একই অবস্থা—কারো মনে ঈদের আনন্দ নেই।

এরপর ২০২০ সালের শেষের দিকে চলে আসলাম সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এখানে এসে বড় ভাইয়ের কন্সট্রাকশন ঠিকাদারি কোম্পানিতে জয়েন করলাম। এখানে এসে নতুন করে ঈদের অনুভূতি হতে লাগল। কারণ, এখানে এসেই ঈদের দিন মা, ভাই ও ভাইয়ের পরিবারকে পেয়েছিলাম। আমিরাতে প্রথম ঈদ ছিল অনেক আনন্দের। মনে হয়েছিল, আমি দেশেই ঈদ করছি। ঈদের সময়টা নিজের পরিবারের সাথে কাটাতে পারার মাঝে যে প্রশান্তি, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

আমার কাছে ইউরোপ আর মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীদের মাঝে অনেক তফাৎ মনে হয়। ইউরোপ প্রবাসীরা অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হয়। ইউরোপ প্রবাসীরা চাইলেও দেশে যেতে পারে না, যেটা মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীরা পারে।

কত মানুষ দেশে ঈদের আগে স্বজন হারিয়ে ফেলে, কত অসহায় মানুষ দেশে ঈদ করতে পারে না। কত মানুষ পরিবার থেকে দূরে কাজ করার কারণে ঈদে বাড়ি যেতে পারে না। কিন্তু, আমরা কি কখনো তাদের কথা ভেবেছি? তারা হয়ত প্রবাসী নয়, কিন্তু তারাও তো আমাদের মতো কষ্টের ভাগিদার। শুধু প্রবাসীদেরকেই সহানুভূতির চোখে তাকাতে হবে, তা আমি একজন প্রবাসী হয়েও সমর্থন করি না। বরং আমরা সেসব মানুষের চেয়ে ভালো আছি। অন্তত আমাদের আত্মতৃপ্তি পাবার মতো একটা বিষয় আছে। আমরা তাদের চেয়ে বেশি টাকা ইনকাম করি, তাদের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছি। আসলে পৃথিবীটা কারো জন্যই পুষ্পশয্যা নয়। 

ঢাকা/হাসান/রফিক

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • প্রবাসে কেটে যায় ঈদ, থেকে যায় স্মৃতি