রেলওয়ের রানিং স্টাফদের ডাকা কর্মবিরতির সময় রাজশাহী রেল স্টেশনে ভাংচুরের ঘটনায় সুমন আহম্মেদ নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) সাইবার ক্রাইম ইউনিটের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাকে চুয়াডাঙ্গা সদর থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃত সুমন আহম্মেদ (২৩) চুয়াডাঙ্গা জেলার সদর থানার হুসকপাড়ার আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের রানিং স্টাফ ঐক্য পরিষদের (লোকোমাস্টার, গার্ড, টিটিই) ডাকা কর্মবিরতির কারণে মঙ্গলবার সারাদেশের মতো রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনেও ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। এ সময় কিছু যাত্রী রাজশাহী রেল স্টেশনে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং টিকিট পরীক্ষক (টিটিই) কক্ষের চেয়ার-টেবিল ভেঙে ফেলে। যার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সাধারণ জনগণের মধ্যে ভীতি এবং দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা দেখা দেয়। পরে এ ঘটনায় রাজশাহী রেলওয়ে থানায় একটি মামলা রুজু হয়।

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান জানান, এ ঘটনার পর আরএমপির নগর বিশেষ শাখা (সিটিএসবি) ও সাইবার ক্রাইম ইউনিট দুষ্কৃতিকারীদের শনাক্ত করার কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে সাইবার ক্রাইম ইউনিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো পর্যালোচনা করে ঘটনার মূলহোতা সুমনকে শনাক্ত করে। পরবর্তীতে আরএমপি ও রাজশাহী রেলওয়ে থানা পুলিশ আসামি সুমনকে গ্রেপ্তারের জন্য চুয়াডাঙ্গা জেলার সদর থানাকে অবহিত করে। এসময় চুয়াডাঙ্গা সদর থানা পুলিশের একটি টিম মঙ্গলবার রাতেই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে সুমন আহম্মেদকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে রাজশাহী রেলওয়ে থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।

রাজশাহী রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফয়সাল বিন আহসান জানান, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় স্টেশন মাস্টার শহিদুল আলম বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। সে মামলায় সুমনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

.

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: র লওয সদর থ ন র লওয় ঘটন য়

এছাড়াও পড়ুন:

ইউটিউবের বাংলাদেশি উদ্ভাবক

সবার নিজের টিভি

২০০৫ সালের গোড়ার দিকের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের নর্দার্ন ক্যালিফোর্নিয়া। দিনের বেশির ভাগ সময় কম্পিউটারের পর্দায় ডুবে থাকেন চ্যাড হার্লি। নতুন একটা কিছু করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। কিন্তু কী, সেটাই ভেবে উঠতে পারছেন না। তাঁর সময় অবশ্য এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বয়স মোটে ২৮ ছুঁয়েছেন। এর মধ্যেই নতুন একটা ব্যবসা শুরু করেছেন। কিনতে গিয়েছিলেন একটা ল্যাপটপ ব্যাগ। কিন্তু বাজারে যেগুলো ছিল, একটাও মনে ধরেনি। দেখতে মোটেও ভালো না। তাই এক বন্ধুর সঙ্গে মিলে নিজেই বাজারে এনেছেন ল্যাপটপ ব্যাগ।

কিন্তু নতুন বলতে এমন কিছুকে ভাবছেন না চ্যাড। পেশায় তিনি ওয়েব গ্রাফিক ডিজাইনার। জানেন, আসছে দিনে অনলাইনেই চলবে দুনিয়া। কাজেই নতুন কিছুটাও সেখানেই করতে হবে। আর এই ভাবনায় তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন তাঁর দুই সঙ্গী প্রোগ্রামার—জাভেদ করিম ও স্টিভ চ্যান। দুজনেই তাঁর চেয়ে বয়সে বছরখানেকের ছোট। জীবনের অভিজ্ঞতাতেও তাঁদের চেয়ে অনেক এগিয়ে চ্যাড। এরই মধ্যে বিয়ে করে ফেলেছেন। এক সন্তানের বাবাও হয়ে গেছেন। তার ওপর তাঁর শ্বশুর জিম ক্লার্ক আবার সিলিকন ভ্যালির অত্যন্ত প্রভাবশালী মানুষ। সব মিলিয়ে চ্যাডই তাঁদের অঘোষিত নেতা।

অনলাইন জগতেও তখন নতুন এক ভাবনা উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করেছে। ওয়েব ২.০। ব্যবহারকারীরা এত দিন ওয়েবসাইটে কেবল ঘুরতেই আসতেন। ব্রাউজ করে কনটেন্ট পড়তে বা দেখতে পারতেন। আর সেসব কনটেন্ট বানাতেন পেশাদার মানুষজন। ভিডিও বানাত প্রোডাকশন হাউস, লেখা লিখতেন লেখক-সাংবাদিক, ছবি তুলতেন আলোকচিত্রীরা। সেগুলোকে বলা হতে লাগল ওয়েব ১.০। নতুন দিনের ওয়েবসাইট বা ওয়েব ২.০-তে ব্যবহারকারীদেরই কনটেন্ট বানিয়ে আপ (প্রকাশ) করার সুযোগ দেওয়া হতে লাগল। নিত্যদিনের রোজনামচা, আনকোরা হাতে তোলা ছবি, কবিতা, রান্নার রেসিপি, হাবিজাবি লেখা, যার যেমন খুশি। এগুলোর নাম দেওয়া হলো ইউজার-জেনারেটেড কনটেন্ট।

চ্যাড এই ‘ইউজার’দের নাম দিলেন ‘আমজনতা’ (এভরিডে পিপল)। এদের নিয়েই কিছু একটা করতে হবে। আনকোরা নতুন কোনো অনলাইন ব্যবসা। কিন্তু কী? মাসের পর মাস তিনজনে আলাপ চলছে। কখনো মেনলো পার্কে চ্যাডের বাসায়, কখনো আশপাশের কোনো ক্যাফেতে। তখন নিত্যনতুন বাজারে আসছে ওয়েব ২.০। তরুণদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে। ‘ফ্রেন্ডস্টার’ নামের একটা সামাজিক যোগাযোগের ব্লগিং সাইটে সবাই রীতিমতো আসক্ত হয়ে পড়েছে। ‘হট অর নট’ নামের একটা রেটিং সাইটও ভীষণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। খুবই সাদামাটা ডিজাইন। ব্যবহারকারীরা তাঁদের মুখের ছবি দেন। সবাই ভোট দিয়ে জানান, তিনি কতটা হট। নৈতিক দিক দিয়ে কাজটা মোটেও সমর্থনযোগ্য না। কিন্তু তাই বলে মানুষ তো আর সমর্থন দেওয়া বন্ধ করেনি। সাইটটির নির্মাতাদের একজনকে তাঁরা চেনেন। সেই সূত্রেই জানেন, ওটা থেকে অর্থাগম মন্দ হচ্ছে না।

আলোচনার টেবিলে এসব ওয়েব ২.০ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন তিনজন। আর ভাবতে থাকেন, কী নিয়ে হবে তাঁদের ওয়েব ২.০। একসময় উত্তরও পেয়ে যান। ভিডিও। তাঁদের ওয়েব ২.০-তে নিজেদের বানানো ভিডিও শেয়ার করবেন ব্যবহারকারীরা।

কিন্তু নাম কী হবে? ঠিক করতে চ্যাডের গ্যারেজে আলোচনায় বসলেন তাঁরা। ভ্যালেন্টাইনস ডের দিন। চলল দীর্ঘ সময় ধরে। আলাপে উঠে এল টিভি নিয়ে এক পুরোনো রসিকতা। পঞ্চাশের দশকে তখন মাত্রই মার্কিন মুলুকে টিভি জনপ্রিয় হয়েছে। সেই সঙ্গে জনপ্রিয় হয়েছে আরেকটি আলোচনা। যারা টিভি দেখে, হয় তারা শুরু থেকেই বোকা, নয়তো টিভি দেখতে দেখতে বোকা হয়ে যাচ্ছে। বোকা লোকদের তখনকার প্রচলিত ভাষায় বলা হতো ‘বুব’। তার সঙ্গে সিআরটি টিভির মার্কা মারা ‘টিউব’ আকৃতি মিলিয়ে টিভিকে বলা হতো ‘বুব টিউব’। ওরা যে সাইটটা বানাতে যাচ্ছে, সেটা তো একধরনের টিভিই হতে যাচ্ছে, সবার নিজেদের টিভি। নামটাও তেমনই হওয়া উচিত। তাই ‘বুব টিউব’-এর সঙ্গে মিলিয়ে এমন নাম ভাবল, যার অর্থ দাঁড়ায়, তোমার টিভি। এই নামে কোনো ওয়েবসাইট আছে কি না, গুগলে সঙ্গে সঙ্গে খুঁজে দেখা হলো। না, নেই। সে রাতেই ডোমেইনটা ওরা কিনে ফেলল। অনলাইনে প্রথম পা ফেলল ‘ইউটিউবডটকম’।

আমার টিউব

৮ দিন পর চ্যাডকে একটা লম্বা ইমেইল পাঠালেন জাভেদ। তাঁদের ওয়েব ২.০-এর পুরো ছকই তিনি কষে ফেলেছেন। সাইটটি কেমন হওয়া উচিত, কেমন হওয়া উচিত নয়, কী থাকবে তাঁদের মনোযোগের কেন্দ্রে, কারা তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী—সব। ইমেইলটা সেটারই খসড়া। বিষয়ের ঘরে লেখা, ‘কৌশল: মন্তব্য প্লিজ’। সাইটের ডিজাইন নিয়ে লিখেছেন, ‘সাইট দেখতে সুন্দর হওয়া দরকার। কিন্তু পেশাদার যেন না লাগে। যেন মনে হয়, স্রেফ কয়েকজন মিলেই সাইটটা দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। মনে রাখতে হবে, “হট অর নট” আর “ফ্রেন্ডস্টার”—দুটোই ব্যবহার করা সহজ, কিন্তু দেখতে কোনোটাই পেশাদার না। অথচ দুটোই পাহাড়সম সাফল্য পেয়েছে। সাইটটা দেখতে বেশি পেশাদার মনে হলে ব্যবহারকারীরা ভিডিও দিতে অস্বস্তি বোধ করবে।…তবে ডিজাইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যবহারপদ্ধতি খুবই সহজ হতে হবে। আমাদের যেন মায়েরাও স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করতে পারেন।’

জাভেদের মতে, ইউটিউবের কাজ শুরুর জন্য এখনই প্রশস্ত সময়। লিখেছেন, ‘আমার মনে হয়, আমরা সঠিক সময়ে কাজে নামতে যাচ্ছি। গত বছর থেকেই ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডিং প্রযুক্তি মানুষের হাতে হাতে চলে এসেছে। বেশির ভাগ ডিজিটাল ক্যামেরাই এখন এই ফরম্যাট সাপোর্ট করে।’ নিজেদের এক প্রতিদ্বন্দ্বীকেও খুঁজে বের করেছেন জাভেদ। তাদের নিয়ে লিখেছেন, ‘একটা ওয়েবসাইট নিয়ে আমি চিন্তিত। “স্টুপিটভিডিওজডটকম” (http://stupidvideos.com)। ওখানেও ব্যবহারকারীরা ভিডিও প্রকাশ করতে পারে। অন্যরা তা দেখে রেটিংও করতে পারে। ভালো ব্যাপার হলো, এখনো সাইটটার কথা বেশি মানুষ জানে না। এটা নিয়ে আমাদের আলোচনা করা দরকার। সাইটটা কেন জনপ্রিয়তা পেল না, কেনই-বা আমাদের সাইটে মানুষ আকৃষ্ট হবে।’

সাইটটার মনোযোগের কেন্দ্রে কী থাকবে, সেটা নিয়ে জাভেদ লিখেছেন, ‘“হট অর নট”-এর মতো পরোক্ষভাবে আমাদের সাইটেরও লক্ষ্য হওয়া উচিত ডেটিং। মনে রাখতে হবে, ডেটিং সাইট হলেও “হট অর নট” দেখতে কিন্তু মোটেও তেমনটা না। ফলে ব্যবহারকারীদের মধ্যে এটা নিয়ে কোনো চাপও কাজ করে না। আমার বিশ্বাস, ডেটিংকে মনোযোগের কেন্দ্রে রাখলে ভিডিও সাইটে অনেক বেশি আগ্রহী হবে মানুষ। ফলে “স্টুপিডভিডিওজ”-এর মতো পিছিয়ে থাকতে হবে না। কেন? কারণ যারা বিয়ে করেনি তাদের বেশির ভাগ সময়ই কাটে ডেটিং করে আর ডেটিংয়ের জন্য নারীসঙ্গী খুঁজে। সে কারণেই অজস্র “স্টুপিড ভিডিও” থাকলেও একটা সময় পর তুমি আর সেগুলোতে আগ্রহ পাবে না।’

চ্যাড নিজে বিবাহিত। তারপরও জাভেদের সঙ্গে একমত না হয়ে পারলেন না। সঙ্গী খোঁজা, তারপর তার সঙ্গে সুন্দর সময় কাটানো—এ দুটো কাজ আসলেই মানুষের জীবনের একটা বড় অংশজুড়ে থাকে। সপ্তাহখানেক পরে এক ইমেইলে তিনি আরও যোগ করেন, ‘মানুষ যেমন দেখতে চায়, তেমনি নিজেকে দেখাতেও চায়।’

শেষ কোরো না শুরুতে খেলা

এবার হাতে-কলমে কাজে নামার পালা। সে জন্যও একটা লক্ষ্য ইমেইলের শেষে ঠিক করে দিয়েছেন জাভেদ। তাঁদের ওয়েবসাইট প্রকাশের দিন—১৫ মে ২০০৫। সে লক্ষ্যে এবার কোমর বেঁধে নামলেন তিনজন। জাভেদ আর স্টিভ নিলেন কোডিংয়ের ভার। সোজা বাংলায়, ইউটিউব বানানোর কাজ। আর চ্যাডের কাজ তাঁদের বানানো সাইটে মানুষ আনা।

কিন্তু তার আগেই একটা বড় ঘটনা ঘটে গেল। ২০ মার্চ ‘ফ্লিকার’ কিনে নেওয়ার ঘোষণা দিল ইয়াহু। এটাও প্রথম দিককার একটা ওয়েব ২.০। ব্যবহারকারীরা এখানে নিজেদের তোলা ডিজিটাল ছবি প্রকাশ করে। সেই সাইটই আড়াই কোটি মার্কিন ডলারে কিনে নিল ইয়াহু। সেটা নিয়ে রীতিমতো হইচই পড়ে গেল। অনলাইনে তখন ইয়াহু-রাজ চলছে। নতুন এই প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিয়েও আলোচনায় বসতে হলো। আসতে লাগল নতুন নতুন ভাবনা। কিছুদিন পরই জাভেদের আরেকটি ইমেইল এল চ্যাড আর স্টিভের কাছে। বিষয়—‘নতুন গতিপথ’। তাতে লিখলেন, ‘চ্যাড আর আমি আজকে আলাপ করছিলাম, আমাদের সাইটের লক্ষ্য হওয়া উচিত ফ্লিকারের মতো। যেটা হবে ইন্টারনেটে সব ব্যক্তিগত ভিডিওর একটা সংগ্রহশালা।’

এ নিয়ে চাপান-উতোরে কাটল পরের কয়েক সপ্তাহ। ওদের সাইটটা কি ‘হট অর নট’-এর মতো ডেটিং সাইটের আদলে হবে? নাকি ‘ফ্লিকার’-এর আদলে পেশাদার ও দক্ষদের লক্ষ্য করে? স্টিভ এক মেইলে লিখলেন, ‘দুটি সাইটের ব্যবহারকারী ভিন্ন। “হট অর নট” আকর্ষণ করেছে আবেগে থরথর কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের। আর “ফ্লিকার”-এর ব্যবহারকারী মূলত ডিজাইনার, শিল্পী ও সৃষ্টিশীল লোকজন। প্রশ্ন হলো, এদের মধ্যে কাদের লক্ষ্য করে আমরা ইউটিউব বানাব? নাকি দুটো আলাদা সাইট বানাব?’

ফ্লিকারের আদলে সাইট বানানোর পক্ষে চ্যাড। কারণ, অনলাইনে ভিডিও আপলোড ও এডিট করা বেশ জটিল প্রক্রিয়া। অল্পবিস্তর পেশাদারি দক্ষতা ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্তু ইউটিউবকে শুধু পেশাদারদের জন্য সীমাবদ্ধ করার ভাবনাটাও তাদের পছন্দ না। শেষে ৩ এপ্রিল এক ইমেইলে এই আলোচনার সাময়িক ইতি টানলেন চ্যাড। আপাতত তারা কেবল সাইটটাই বানাবে। বাকিটা ঠিক করবে ভবিষ্যৎ।

এই টানাপোড়েন শেষে মাত্রই যখন ঠান্ডা মাথায় আবার কাজে নেমেছেন তাঁরা, তখনই এল সবচেয়ে বড় ধাক্কা। চ্যাডের ওই মেইলের ঠিক ১০ দিনের মাথায় গুগলের তরফ থেকে এল আরেকটা ঘোষণা। অনেকটা ওদেরই কায়দায় সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানানো হলো, ভিডিও বানিয়ে ওদের পাঠাতে। না, ওরাও কোনো পেশাদার ভিডিও চায় না। ওরাও চায় শখের বশে বানানো ঘরোয়া ধরনের ভিডিও। সেগুলো থেকে বাছাই করা ভিডিও ওরা প্রকাশ করবে।

এ যে তীরে এসে তরি ডোবার দশা। ভাবনা মিলে যাওয়াটাই ভয়ের একমাত্র কারণ না। তার চেয়েও বড় কারণ যাদের সঙ্গে ভাবনাটা মিলে গেল। স্রেফ একটা সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল গুগল। বাজারে তাদের অনেক প্রতিদ্বন্দ্বীই ছিল। দ্রুতই সবাইকে চুনোপুঁটিতে পরিণত করে তারা। তারপর ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল নিয়ে আসে ইমেইল সার্ভিস—জিমেইল। সবাইকে বিনা মূল্যে এত পরিমাণ জায়গা দেওয়ার ঘোষণা দেয় তারা যে প্রথমে সবাই ভেবেছিল বোধ হয় মজা করছে ওরা! তার ওপর তারিখটাও ছিল ‘এপ্রিল ফুলস ডে’! তারপর একে একে আসতে থাকে আরও সব অসম্ভব ঘোষণা। চালু করল বিনা মূল্যের বৈশ্বিক ডিজিটাল মানচিত্র—গুগল ম্যাপ। এমন কিছুর কথা তখন কল্পনাও করা যেত না। বছর না ঘুরতেই ওরাই হয়ে ওঠে নেট-দুনিয়ার ভবিষ্যৎ।

সেই গুগলই কিনা ঘোষণা দিয়েছে, ব্যবহারকারীদের বানানো ভিডিও প্রকাশ করবে। ঠিক যেই ভাবনা নিয়ে ইউটিউবের কাজ করছেন তাঁরা। স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ মুষড়ে পড়লেন তাঁরা। পরের সভায় আলোচনার এজেন্ডা দাঁড়াল, ‘আমরা কি কাজ চালিয়ে যাব? নাকি ইস্তফা দেব?’

পেপ্যাল–মাফিয়া

জাভেদ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। তাঁর জন্ম কিন্তু এ দুই দেশের কোনোটিতেই না। পূর্ব জার্মানিতে। ১৯৭৯ সালে। কিন্তু সেখানকার বর্ণবাদী বৈষম্য অসহ্য হয়ে ওঠায় কয়েক বছরের মধ্যেই ওকে নিয়ে পশ্চিম জার্মানিতে পাড়ি জমান বাবা-মা। সেখানেও থাকেননি বেশি দিন। ১৯৯২ সালে চলে আসেন যুক্তরাষ্ট্র। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের সেন্ট পল শহরে গড়ে তুললেন আবাস। স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ১৯৯৭ সালে ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন জাভেদ। কম্পিউটার সায়েন্সে।

বিষয়টা তাঁর জন্য একদম জুতসই ছিল। ইন্টারনেটের জগৎ তাঁকে ভীষণ টানত। তখনো সেখানে আইন-কানুনের তেমন কঠোরতা নেই। ইচ্ছামাফিক কাজ করা যেত। নেপস্টারের আগেই তিনি বানিয়ে ফেললেন অনলাইনে গান বিনিময়ের সেবা। ‘এমপিথ্রি ভয়ের’। কলেজপড়ুয়াদের মধ্যে সাড়াও ফেলে দিল। কিছুদিন পরই পড়াশোনায় ইস্তফা দিয়ে পেপ্যালে যোগ দিলেন জাভেদ। আসলে ক্লাসে বসে শেখার চেয়ে হাতে-কলমে কাজ শেখাতেই তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি।

পেপ্যালের নাম অবশ্য তখন কনফিনিটি। তখনো অবশ্য অনলাইনে অর্থ লেনদেনের কারবারে নামেনি তারা, হাতেধরা যন্ত্রপাতির জন্য সিকিউরিটি সফটওয়্যার তৈরি করত তারা। কিন্তু তাতে খুব একটা সুবিধা করতে না পেরে ব্যবসা বদলাল তারা। ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেম হিসেবে কাজ শুরু করল। এই সিস্টেমটারই রিয়েল-টাইম অ্যান্টি-ফ্রড সিস্টেম বানানোর কাজে হাত লাগান জাভেদ। সেখানেই চ্যাড ও স্টিভের সঙ্গে তাঁর আলাপ।

সেটা ১৯৯৯ সাল। সিলিকন ভ্যালির আকাশে-বাতাসে তখন টাকা উড়ছে। হু হু করে বাড়ছে স্টার্টআপগুলোর কদর আর শেয়ারদর। পরের বছর হলো ডট-কম বাবল বিস্ফোরণ। এই ধাক্কায় বহু কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেল। ‘কনফিনিটি’ অবশ্য টিকে গেল। নাম বদলে প্রথমে হলো ‘এক্সডটকম’। পরে ‘পেপ্যাল’। ২০০২ সালে কোম্পানিটির মালিকানা হাত বদলে যখন ‘ইবে’-র কাছে গেল, পেপ্যালের প্রভাবশালী অনেক কর্মী তখন ‘ইয়েল্প’, ‘লিংকডইন’, ‘স্পেসএক্স’-এর মতো বড় বড় সব কোম্পানিতে চলে গেল।

বড় বড় সব কোম্পানিতে ছড়িয়ে পড়লে কী হবে, পেপ্যালের এই কর্মীদের মধ্যে বন্ধন কিন্তু অটুটই রইল। বরং নানা কোম্পানিতে ছড়িয়ে পড়ে আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠল তারা। মিডিয়া তাদের নাম দিল ‘পেপ্যাল মাফিয়া’। চ্যাড-স্টিভ-জাভেদ অবশ্য সেই তালিকায় ছিল না। তাঁরা ছিলেন পেপ্যালের ‘দ্বিতীয় সারি’র কর্মী। নিজেদের উদ্যোগটা নিয়ে উদ্যোগী হয়ে প্রথম সারির সঙ্গে আলাপের চেষ্টা করলেন তাঁরা। কিন্তু কারও কাছ থেকেই তেমন উৎসাহ পেলেন না। মিলল না ‘পেপ্যাল মাফিয়া’দের আশীর্বাদ। একজন তো স্টিভের ইমেইলের উত্তরে লিখে বসলেন, ‘সাইটটা তো ভালোই করছে। কিন্তু পর্নোকে তোমরা কীভাবে দূরে রাখবে?’

ইচ্ছেমতো টিভি

পরিচিতদের থেকে উৎসাহ মিলছে না। অন্যদিকে মাঠে নেমেছে গুগলের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী। শুধু কি তাই, একা গুগলে রক্ষা নাই, মাইক্রোসফট দোসর। মাঠে যে ওরাও নেমেছে। আর রেভার, মেটাক্যাফে, বিগ বয়েজ, ইবমস ওয়ার্ল্ডের মতো ছোট ছোট স্টার্টআপের কথা নাহয় বাদই দিলাম। সবাই ব্যবহারকারীদের ভিডিও প্রকাশ করতে দিচ্ছে। অন্যদের ভিডিও দেখতে দিচ্ছে। একটা জায়গায় ওদের ভাবনা অবশ্য অনন্য, আর কেউ যেটা দিতে পারবে না। শুধু নিজস্ব ওয়েবসাইটেই নয়, যেকোনো জায়গায় চালানো যাবে ইউটিউবের ভিডিও।

কীভাবে? ফ্ল্যাশে।

পেপ্যালে ওদের সহকর্মী উ পান-কে এক পার্টিতে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিল জাভেদ। ফ্ল্যাশের মাধ্যমে টেক্সট, অডিও বা ভিডিও গ্রাফিকস, যেকোনো কিছু রেন্ডার করা যায়। এটা ব্যবহার করার কারণেই ইউটিউবের ভিডিও প্লেয়ার বক্স অন্য ওয়েবসাইটেও কাজ করে। পরখ করার জন্য উ পান-কে ইউটিউবের একটা ভিডিও বের করে দেখান জাভেদ। সেটা পেপ্যালের সাইটে বসায় উ পান। সুন্দর চলছে। বুঝতে পারে, কী শক্তিশালী এক অস্ত্র বানিয়েছে ওরা।

এই এক অস্ত্রেই আর সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘায়েল করে দেওয়া সম্ভব। লোগোতে তাই এই ভাবনাটাকেই ফুটিয়ে তুললেন চ্যাড। চারকোনা একটা বক্সের মধ্যে তিনকোনা একটা প্লে বাটন। যেন খুদে একটা টিভি, যেখানে ইচ্ছে বসিয়ে চালিয়ে দেওয়া যায়। ঠিক যেমন ইউটিউবের ভিডিওকে যেকোনো ওয়েবসাইটে বসিয়ে চালিয়ে দেওয়া যায়।

বাস্তবে ব্যাপারটা অবশ্য এত সহজ হলো না। ফ্ল্যাশ দিয়ে ভিডিও সহজেই বসাতে পারল ওরা। কিন্তু অডিও কোনোভাবেই মেলানো যাচ্ছিল না। সে জন্য স্টিভকে কতবার যে নিজের ভিডিও বানাতে হলো। ৪ সেকেন্ডের ভিডিও বানান, ফ্ল্যাশ দিয়ে বসিয়ে দেখেন ঠিক হয়েছে কি না। ঠোঁট আর শব্দ মেলেই না। আবার কোড ঠিক করে। আবার ভিডিও বানায়। বসিয়ে দেখেন…নাহ, মিলছে না। শেষ পর্যন্ত তা-ও মিলল। নিজেদের সাইটে এবার ভিডিও তোলার পালা।

প্রথমে নিজের নামে একটা অ্যাকাউন্ট খুললেন জাভেদ (jawed)। সেই অ্যাকাউন্ট থেকে ২০০৫ সালের ২৩ এপ্রিল রাত ১২টা ১৮ মিনিটে আপলোড করা হলো ইউটিউবের প্রথম ভিডিও। ‘চিড়িয়াখানায় আমি’ (মি অ্যাট দ্য জু)। সান ডিয়েগো চিড়িয়াখানায় একটা হাতির সামনে দাঁড়িয়ে জাভেদ। পরনে কালো স্কি জ্যাকেট। আশপাশে বাচ্চাদের চেঁচামেচিতে তাঁর কথা প্রায় চাপাই পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু ঠোঁটের নড়ার সঙ্গে তাঁর কথার কোনো নড়চড় নেই। ক্যামেরার দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে সে বলছে, ‘ঠিক আছে, এই যে আমরা হাতির সামনে দাঁড়িয়ে। ওদের নিয়ে সেরা ব্যাপার হলো, ওদের ভীষণ, ভীষণ, ভীষণ…লম্বা শুঁড় আছে। আর আমার শুধু এটাই বলার ছিল।’

নিজেকে সম্প্রচার করো

চিড়িয়াখানার ভিডিওর পর জাভেদ প্রকাশ করলেন বোয়িং ৭৪৭ উড্ডয়ন আর অবতরণের ভিডিও। স্টিভ প্রকাশ করলেন তাঁর বিড়ালের ভিডিও। কিন্তু এই একটা-দুটো ভিডিওতে কী হবে, দরকার তো আরও অনেক। শয়ে শয়ে হাজারে হাজার ভিডিও। সে জন্য শ্রেণিবদ্ধ বিজ্ঞাপনের ওয়েবসাইট ক্রেইগসলিস্টে একটা বিজ্ঞাপন দিলেন স্টিভ।

এখনো সঙ্গী খোঁজার ভাবনাটা হিসাব থেকে বাদ দেননি তাঁরা। যাকে বলে ডেটিং সাইট। কে জানে, এটাই হয়ে উঠতে পারে ইউটিউবে ব্যবহারকারী আনার বড় এক হাতিয়ার। সে কথা মাথায় রেখেই ক্রেইগসলিস্টে একটা বিজ্ঞাপন প্রকাশ করলেন স্টিভ। ‘আপনি কি নারী? কিংবা ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী দারুণ সৃষ্টিশীল পুরুষ? আপনার একটা ডিজিটাল ক্যামেরা আছে? সেটা দিয়ে ছোট ভিডিও বানাতে পারেন? তাহলে আপনিও আয় করতে পারেন ২০ ডলার!’ কীভাবে? লিখে দিলেন সেই ধাপগুলোও। ‘ইউটিউবডটকমে যান, অ্যাকাউন্ট খুলুন, তিনটি ভিডিও প্রকাশ করুন।’ শুধু তা-ই না, ড্রপডাউনে তাঁরা একটা অপশনও যোগ করেন। ‘আমি একজন নারী, ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী পুরুষ খুঁজছি।’

বিজ্ঞাপনটা তাঁরা দিলেন লাস ভেগাস আর লস অ্যাঞ্জেলেসের ব্যবহারকারীদের উদ্দেশে। তাতে একটাও সাড়া মিলল না। মিলবে যে না, চ্যাডও তাই আশঙ্কা করেছিলেন। বিজ্ঞাপনটা পড়েই মনে হচ্ছে, পেশাদার কাউকে খুঁজছে ওরা। সৃষ্টিশীল কাজ চাইছে। আর এ কারণেই সাধারণ মানুষ, চ্যাডের আমজনতা, হয়তো ভিডিও দিতে ভয় পাচ্ছেন। যদি তাঁদের কাজ ভালো না হয়! তাঁদের আসলে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। বলতে হবে, ব্যক্তিগত আটপৌরে জীবন নিয়ে বানানো সাদামাটা ভিডিওই তাঁরা চান।

তবে এর চেয়েও বড় বাধা, চ্যাডের মতে, এখনো তাঁরা সাইটের লক্ষ্য ঠিক করে উঠতে পারেনি। ইউটিউবে মানুষ কেন ভিডিও প্রকাশ করবে? নিজের মত প্রকাশ করতে? নাকি নিজেকে আকর্ষণীয় প্রমাণ করতে? এক ইমেইলে লিখেই বসলেন, ‘তোমাদের দুজনের থেকেই আমি মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি। আমরা কি ব্লগিং সাইট বানাচ্ছি? না ডেটিং সাইট?’ উত্তরে জাভেদ লিখলেন, ‘ব্লগিংয়ের কথা ভুলে যাও। সাইটটা এমন হওয়া উচিত যেখানে তুমি নিজেকে নিয়ে ভিডিও বানাবে। নিজেকে সম্প্রচার করবে [ব্রডকাস্ট ইয়োরসেলফ]। ব্যস, এই।’

সাইটটার জন্য একটা স্লোগান তাঁরা ঠিক করেছিলেন। ‘টিউন ইন, হুক আপ’। নতুন এই ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে ওই স্লোগানটাও বাতিল হয়ে গেল। বদলে নতুন মটো প্রস্তাব করলেন জাভেদ। চ্যাড আর স্টিভেরও পছন্দ হলো। এখনো ওটাই আছে। ‘ব্রডকাস্ট ইয়োরসেলফ’। নিজেকে সম্প্রচার করো।

ব্যবহারকারীর ঢল

যা বলার একদম মুখের ওপর বলে দেন জাভেদ। এ কারণে তাঁকে নিয়ে মাঝেমধ্যে একটু অস্বস্তিতেই পড়ে যান চ্যাড আর স্টিভ। জাভেদের এই ঠোঁটকাটা স্বভাবটা এখন পর্যন্ত অবশ্য তাঁদের উপকারই করেছে। এই যেমন দোলাচল ঝেড়ে ঝট করে তাঁদের লক্ষ্য ঠিক করে ফেললেন। দুর্দান্ত একটা মটোও দিয়ে দিলেন। কিন্তু সব সময় তো এমন কথা শুনতে ভালো লাগে না।

এর মধ্যে চলে এল মে মাস। ‘বেটা লঞ্চ’ হলো। পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহারকারীদের জন্য চালু হলো ইউটিউব। জাভেদের টোটকা ভালোই কাজে দিল। পরের মাসে তাঁরা নতুন বেশ কিছু ফিচার যোগ করলেন। ভিডিওর নিচে ব্যবহারকারীদের মন্তব্য করার সুযোগ দিল। সঙ্গে আরেকটা বাটন, যেটাতে ক্লিক করে ভিডিওর লিংক ইমেইলে যাকে খুশি পাঠানো যায়। আর ভিডিও চালু করলেই পেজের ডান পাশে একই ধরনের আরও কিছু ভিডিও চলে আসে। ফিচারগুলো ব্যবহারকারীদের ভীষণ পছন্দ হলো।

ওদিকে প্রথাগত মিডিয়ায় তখন উথাল-পাথাল চলছে। নব্বইয়ের দশকজুড়ে কেব্‌ল টিভির সঙ্গে লড়াই করেছে ব্রডকাস্ট টিভি চ্যানেল। রিয়েলিটি শো দিয়ে সে দফায় রক্ষা পায় ব্রডকাস্ট চ্যানেল। কিন্তু এতেও আর তখন কাজ হচ্ছিল না। এক নেপস্টার কীভাবে পুরো মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিকে ধসিয়ে দিতে বসেছিল, সে স্মৃতি তখনো টাটকা। ব্রডকাস্ট চ্যানেলগুলো টিকে গেল মূলত ‘বেবি বুমার’দের [১৯৪৬ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে যাদের জন্ম] ওপর ভর করে। আর ‘মাইস্পেস’-এ মজল নতুন দিনের তরুণ প্রজন্ম। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ল এই সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সেবা, দেড় কোটির ওপরে যার ব্যবহারকারী। জুলাই মাসে সেই মাইস্পেস কিনে নিল নিউজ করপোরেশন। চার শীর্ষ ব্রডকাস্ট নেটওয়ার্কের অন্যতম ‘ফক্স’-এর প্যারেন্ট কোম্পানি। নেট-দুনিয়ার সবচেয়ে আলোচিত সাইট আর তার তরুণ ব্যবহারকারী গোষ্ঠীর জন্য তারা খরচ করল ৫৮ কোটি মার্কিন ডলার।

স্টিভও এই মাইস্পেস ব্যবহারকারীদেরই লক্ষ্য বানালেন। সেখানে ব্লগ লেখা যায়, গান প্রকাশ করা যায়, এমনকি দেওয়া যায় বিজ্ঞাপন। মোটকথা এক ভিডিও প্রকাশ ছাড়া আর সবকিছুই করা যায়। এদিকে আবার ফ্ল্যাশের কল্যাণে যেকোনো ওয়েবসাইটেই চালানো যায় ইউটিউব ভিডিও। একদম খাপে খাপে মিলে গেল, একপক্ষ যেন আরেক পক্ষের পরিপূরক। মাইস্পেসের ব্যবহারকারীরা বানাতে লাগল দৈনন্দিন কাজের ব্যক্তিগত সব ভিডিও। সপরিবার ছুটি কাটানোর ভিডিও। পোষা বিড়ালের ভিডিও। যেগুলো টিভিতে দেখা যায় না। আর ইউটিউবের মাধ্যমে মাইস্পেসে সেগুলো প্রকাশ করতে লাগল। সেগুলো দেখতে দলে দলে মাইস্পেস থেকে ইউটিউবে আসতে লাগল ব্যবহারকারী। ঠিক যেমনটা স্টিভরা চাইছিলেন।

মাইস্পেস থেকে আসা এই ব্যবহারকারীর ঢল, সঙ্গে ভিডিওতে মন্তব্য চালাচালির সুযোগ আর ভিডিওর পাশের লিস্ট থেকে আরেক ভিডিওতে চলে যাওয়ার সুবিধা, সব মিলিয়ে ব্যবহারকারী নিয়ে আর ভাবনা রইল না।

ছড়িয়ে গেল সবখানে

এত দিন ব্যবহারকারী বাড়ানোর চিন্তায় অস্থির হয়ে ছিলেন তাঁরা। এবার হলো উল্টো। ব্যবহারকারীর চাপে চিড়েচ্যাপটা হওয়ার জোগাড়। উপায় না দেখে পেপ্যালের বন্ধুদের দিকে হাত বাড়ালেন জাভেদরা। প্রথমে এল ‘ম্যাড সায়েন্টিস্ট’ উ পান। তারপর এরিক ক্লাইন। তাঁদের পথ ধরে যোগ দিলেন আরও কয়েকজন।

প্রতিদিন তাঁদের একটাই কাজ। ইউটিউবকে ক্রাশ করার হাত থেকে বাঁচানো। সবাইকে ল্যাপটপ আর ওয়্যারলেস মডেম ধরিয়ে দেওয়া হলো। প্রয়োজনে যাওয়া-আসার পথেও যেন কাজ করতে পারে। স্টিভের এমনিতেই রাত জাগার অভ্যাস। সারা রাত ধরে ব্যবহারকারীদের অভিযোগ মেইলগুলো মন দিয়ে পড়েন। সকালে এসে সবাই দেখেন, তাঁদের জন্য লম্বা লিস্ট বানিয়ে রেখেছেন স্টিভ।

কেবল লোকবলই না, বিপুল ব্যবহারকারী ও তাদের ভিডিও চালানোর জন্য ব্যান্ডউইডথও কম লাগছে না। সংকুলান করতে সার্ভারের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে লাগল। সেগুলোর জন্য বিশাল বিশাল র‌্যাক কেনা হলো। একেকটা ফ্রিজের চেয়েও বড়। কিন্তু তাতেও বেশি দিন চলল না। টেক্সাসে একটা কোম্পানির খোঁজ পেলেন স্টিভ। ওদের থেকে সার্ভারের জায়গা ভাড়া নিয়ে চালাতে লাগল কাজ।

সার্ভারের জায়গার এই সমস্যা পেপ্যালেও ছিল। তা নিয়ে একটা রসিকতাও চালু ছিল। সার্ভারের ওপর চাপ কমাতে ওখানকার প্রোগ্রামাররা কেউ পেপ্যাল ব্যবহার করতেন না। সব লেনদেন করতেন নগদে। ইউটিউবেও সেই ঐতিহ্য জারি রাখলেন তাঁরা। যতটা সম্ভব নিজেদের সাইটে ভিডিও দেখা এড়িয়ে চলছেন সবাই। ব্যতিক্রম কেবল প্রতিষ্ঠাতারা। বিশেষ করে চ্যাড। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি খেয়াল করলেন, ঘরে বানানো ভিডিওর ভিড়ে প্রায়ই চলে আসছে ঝাঁ-চকচকে পেশাদার হাতের তৈরি ভিডিও। মনে হয় যেন টিভিতে সম্প্রচারের জন্য বানানো।

তখন জুলাই মাস। এমনই একটা ভিডিওর শিরোনামে একদিন চোখ আটকে গেল। লেখা ‘বাডলাইটের বিজ্ঞাপন’। টিভিতে দেখানো বিজ্ঞাপনের পাইরেটেড কপি। দ্রুত স্টিভ আর জাভেদকে ঘটনা জানালেন চ্যাড। এই বিজ্ঞাপনের কপিরাইট বাডলাইটের কাছে। তাদের অনুমতি ছাড়া যদি কেউ সেটা ইউটিউবে চালিয়ে থাকে, আর বাডলাইট তা নিয়ে আদালতে যায়, ভালোই ফ্যাসাদে পড়বে তারা।

ঠিক হলো কপিরাইটের সমস্যা হতে পারে, এ রকম ভিডিও সরিয়ে ফেলা হবে। এ রকম ২৮টি ভিডিও নামিয়েও ফেলা হলো। কিন্তু বেঁকে বসলেন জাভেদ। তাঁর যুক্তি, এই ভিডিওগুলো ব্যবহারকারীরা পছন্দ করছে। তার মানে আরও ছড়িয়ে পড়ার, আরও বেশি ব্যবহারকারী টেনে আনার সম্ভাবনা সেগুলোর আছে। কাজেই এগুলোর জন্য ‘এটুকু ঝুঁকি নেওয়াই যায়।’

উত্তরে চোখ টিপ দেওয়ার ইমো জুড়ে দিয়ে চ্যাড লিখলেন, ‘ঠিক আছে। মামলা মোকাবিলার জন্য এক বেলা কম খেয়ে টাকা জমানো শুরু করে দাও।’

সব কটি ভিডিওই আবার প্রকাশ করে দিলেন জাভেদ।

পরের মাসে চ্যাডও কিন্তু জাভেদের পথে হাঁটা শুরু করলেন। এবার তিনি আবিষ্কার করলেন, নাসার একটা শাটল অবতরণের ভিডিও। সরাসরি সিএনএনের পর্দা থেকে ধারণ করা। এবার নিজেই ইমেইলে লিখলেন, ‘[সিএনএনের মালিক টেড] টার্নারের লোকেরা যদি এই সাইটের খোঁজ পায়, ওরা কি খেপে যাবে না? …এই লোকেরাই কিন্তু আমাদের সাইটটা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে কিনে নিতে চাইবে। কাজেই ওদের খুশি (!) করা যাক।’

তাহলে বিদায়

দিন দিন ইউটিউব বড় হচ্ছে। সাইট চালু রাখতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর মধ্যেই জাভেদের এক ঘোষণায় স্টিভের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।

ইউটিউব ছেড়ে দিতে চান জাভেদ!

স্টিভ আর জাভেদ, দুজনই ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। দুজনেই সে পাট না চুকিয়েই যোগ দিয়েছিলেন পেপ্যালে। জাভেদ অবশ্য পরে অনলাইনে স্নাতক শেষ করেছেন। যেসব কাজও ইতিমধ্যেই করে ফেলেছেন, তার পরে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির খুব একটা প্রয়োজন নেই। কিন্তু গোল বাধিয়েছে তাঁর বাবা-মা। তাঁরা দুজনেই বিজ্ঞানী। ছেলে পড়াশোনা শেষ না করে স্টার্টআপে কাজ করছে, পেপ্যালের সাফল্যের জ্বলজ্বলে উদাহরণ সত্ত্বেও এটা তাঁরা কিছুতেই মানতে পারছিলেন না।

কাজেই নিজের প্রতিষ্ঠিত স্টার্টআপ ছেড়ে জাভেদকে আবার শিক্ষাঙ্গনে ফিরতে হলো। ফল সেমিস্টারে ভর্তি হলেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতকোত্তর করতে। আর সে মাসেই, সেপ্টেম্বরে ইউটিউবে দৈনিক ভিডিও দেখার পরিমাণ ১ লাখ ছাড়িয়ে গেল।

ইউটিউবের ‘চাকরি’ ছাড়লেও একেবারে সম্পর্কচ্ছেদ করেননি জাভেদ। করবেইন-বা কীভাবে! ভাবনাটা যে তাঁরই মাথা থেকে এসেছিল। আগে, মানে টিভির যুগে, কোনো কিছু সময়মতো দেখতে না পারলে পরে আর দেখার সহজ কোনো উপায় ছিল না। ২০০৪ সালে যখন সুনামি হলো, খবরে দেখাল, তারপর আর সে ভিডিও দেখার সুযোগ নেই। কিংবা সুপার বোলের জ্যানেট জ্যাকসনের সেই নিপলগেট কেলেঙ্কারি। তাঁর কেবলই মনে হতো, ‘একবার যদি দেখানো হয়েই থাকে, আবার কেন দেখা যাবে না?’ পরে যখন তাঁরা নতুন ধরনের ওয়েব ২.০ বানানোর চিন্তা শুরু করেন, জাভেদের মাথায় সেই ভাবনাটাই ঘুরেফিরে আসে। পরিণতিতে ভিডিও নিয়ে কাজ শুরু করেন তাঁরা।

সেই ইউটিউবে আর সরাসরি কাজ না করলেও উপদেষ্টা হয়ে থেকে গেলেন জাভেদ। কোম্পানির সিংহভাগ শেয়ার চ্যাড আর স্টিভকে ছেড়ে দিলেন। তার ভাগে রইল অল্প কিছু শেয়ার। ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল ইউটিউব। প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে লোকে কেবল চ্যাড আর স্টিভের কথাই জানল। জাভেদের কথা জানাজানি হলো পরের বছর। যখন ইউটিউব কিনে নিল গুগল। ওই অল্প শেয়ার নিয়েও প্রায় সাড়ে ৬ কোটি মার্কিন ডলার সমমূল্যের গুগলের শেয়ার পেলেন জাভেদ।

আজও কথা বলে সেই ভিডিও

বরাবরই উচিত কথা মুখের ওপর বলে দিয়েছেন জাভেদ। এখনো ইউটিউবের কোনো কাজ পছন্দ না হলে সরব হতে দ্বিধা করেন না। সেসব অবশ্য মুখে বলেন না। কথা বলে তাঁর সেই চিড়িয়াখানার ভিডিও।

না, ভিডিওটাতে কোনো রদবদল করেন না জাভেদ। খালি বদলে দেন তার বিবরণ। যেমন ২০১৩ সালে ইউটিউব ব্যবহারকারীদের ঘাড়ে গুগল প্লাস চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল গুগল। নিয়ম করেছিল, গুগল প্লাস অ্যাকাউন্ট দিয়েই কেবল ইউটিউবে মন্তব্য করা যাবে। তাই নিয়ে ভীষণ খেপেছিলেন ব্যবহারকারীরা। এক অনলাইন আবেদনে স্বাক্ষর করেছিল প্রায় আড়াই লাখ মানুষ। তখন ভিডিওটার বিবরণ বদলে জাভেদ লেখেন, ‘আমি আর এখানে মন্তব্য করতে পারব না, যেহেতু আমি গুগল প্লাস অ্যাকাউন্ট খুলতে চাই না।’

সেবার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল গুগল। প্রকাশ্যে ক্ষমাও চেয়েছিল। আর ২০১৮ সালের অক্টোবরে তো ওরা গুগল প্লাস বন্ধের ঘোষণাই দিয়ে দেয়। পরের এপ্রিলের শুরুতেই বন্ধ করে দেয় সব ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট।

২০২১ সালে আরেকবার একই রকমভাবে প্রতিবাদে সরব হন জাভেদ। সেবার ডিসলাইক বাটন সরিয়ে দিয়েছিল ইউটিউব। আবারও সরব হয়ে ওঠে ব্যবহারকারীরা। তখন ভিডিওটার বিবরণে জাভেদ লেখেন, ‘প্রত্যেক ইউটিউবার যখন একমত যে ডিসলাইক বাটন সরিয়ে দেওয়াটা স্রেফ বোকামি, তখন বোধ হয় সেটাই ঠিক। আরেকবার চেষ্টা করো, ইউটিউব।’

কিছুদিন পরই সেই বিবরণ বদলে আরও বিস্তারিত লেখেন জাভেদ। আস্ত একটা ফিচারই লিখে ফেলেন বলা চলে। ইউটিউবের ক্রিয়েটর লিয়াজোঁ তখন ম্যাট কোভেল। এক ইউটিউব ভিডিওতে তিনি ডিসলাইক বাটন সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন। সেটাকে অ্যাডমিরাল জেরেমিয়া ডেন্টনের কুখ্যাত সাক্ষাৎকারের সঙ্গে তুলনা করেন জাভেদ। ভিয়েতনাম যুদ্ধে বন্দী হয়েছিলেন এই মার্কিন সেনা কর্মকর্তা। ভিয়েতনামের কারাগারে আটকা ছিলেন সাড়ে সাত বছর। ১৯৬৬ সালে তাঁর একটা সাক্ষাৎকার প্রচার করে এক জাপানি টিভি চ্যানেল। মুখে বলেন তাদের বেশ আদর-আপ্যায়নেই রাখা হয়েছে। তারই ফাঁকে ফাঁকে চোখ টিপে টিপে মোর্স কোডে বলেন একটি শব্দ—‘নির্যাতন।’

এ দুই ভিডিওর তুলনা দিয়ে লেখা শুরু করেন জাভেদ, ‘(ম্যাট কোভেলের) মুখের কথা আর চোখের ভাষায় কোনো মিল নেই। ভিডিওটা দেখে আমার অ্যাডমিরাল জেরেমিয়া ডেন্টনের ১৯৬৬ সালের সেই সাক্ষাৎকারের কথা মনে পড়ে গেল। দারুণ কিছু হতে যাচ্ছে, এমন কিছুর এত উৎসাহহীন অনিচ্ছুক ঘোষণা আমি জীবনে দেখিনি।

‘নিজের মনের সঙ্গে লড়াই না করে ইউটিউবের ক্রিয়েটর লিয়াজোঁর পক্ষে এটা বলা কোনোভাবেই সম্ভব না যে ডিসলাইক বাটন সরিয়ে দেওয়াটা ক্রিয়েটরদের জন্য ভালো পদক্ষেপ। আমরা এটা জানি কারণ একজন ইউটিউব ক্রিয়েটরও নেই যিনি মনে করেন এটা ভালো কিছু হতে যাচ্ছে—না ইউটিউবের জন্য, না ক্রিয়েটরদের জন্য।

‘কেউ পছন্দ করছে না এমন সিদ্ধান্ত ইউটিউব কেন নিতে যাচ্ছে? তার একটা কারণ আছে বটে, কিন্তু সেটা ভালো কিছু না, প্রকাশ্যে যেটা বলা হবে সেটা তো নয়-ই। বদলে, বিভিন্ন গবেষণার দিকে ইঙ্গিত করা হবে। এমন সব গবেষণা যেগুলো প্রত্যেক ইউটিউবারের কাণ্ডজ্ঞানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

‘দ্রুত ও সহজে খারাপ কনটেন্ট চিহ্নিত করতে পারাটা একটা ইউজার-জেনারেটেড কনটেন্ট প্ল্যাটফর্মের জন্য খুব জরুরি ফিচার। কেন? কারণ ব্যবহারকারীদের বানানো সব কনটেন্ট ভালো হয় না। হতে পারে না। সত্যি বলতে কি, বেশির ভাগই ভালো হয় না। তাতে কোনো সমস্যাও নেই। এটা কখনোই ভাবা হয়নি যে সব কনটেন্টই ভালো হচ্ছে। ভাবনাটা ছিল, কনটেন্টের এই ঢলের মধ্যে থেকে লুকিয়ে থাকা দারুণ সব সৃষ্টিশীল কাজ বেরিয়ে আসবে। সেটা হওয়ার জন্য, যেগুলো ভালো নয় সেগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব ঝরে যেতে দিতে হবে।

‘এটা একটা প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করে। এটার একটা নামও আছে। জনতার প্রজ্ঞা (উইজডম অব ক্রাউড)। এর মধ্যে প্ল্যাটফর্ম হস্তক্ষেপ করলে প্রক্রিয়াটা বাধাগ্রস্ত হয়। তাতে প্ল্যাটফর্মটার মান নামতে থাকে। ইউটিউব কি এমন একটা জায়গা (প্ল্যাটফর্ম) হতে চায়, যেখানে সবকিছু মাঝারি মানের? কারণ দারুণ কিছু হতে হলে খারাপ কিছুও হতে হয়।

‘কার্যক্ষেত্রে, কেবল একটাই বিষয় আছে যেটা “আরও ভালো করা”র চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হলো, “নষ্ট কোরো না”।’

আর এখন…

জাভেদ ছাড়ার বছরখানেকের মধ্যে ইউটিউব বিক্রি করে দেন চ্যাড ও স্টিভ। ২০০৬ সালের ৯ অক্টোবর ১৬৫ কোটি মার্কিন ডলারে ইউটিউব কিনে নেয় গুগল। তাতে দুজনেরই বিপুল অর্থপ্রাপ্তি ঘটে। তিনজনের কেউ-ই অবশ্য তারপরও প্রযুক্তিজগৎ ছাড়েননি। ওয়াইভেঞ্চারসের সঙ্গে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল নিয়ে কাজ করছেন জাভেদ। প্রযুক্তিজগতে এখনো তিনি বেশ প্রভাবশালী। বেশ কিছু সম্ভাবনাময় স্টার্টআপে তাঁর বিনিয়োগ আছে। সে লিস্টিতে আছে এয়ারবিএনবি, রেডিট, ইভেন্টব্রাইটের মতো সফল সব উদ্যোগ। বর্তমানে তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি মার্কিন ডলার।

বেশ কিছু উদ্যোগের সঙ্গে কাজ করেছেন চ্যাড। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভিডিও কোলাবরেশনের সাইট ‘মিক্সবিট’। এর বাইরে ক্রীড়াজগতেও বিনিয়োগ করেছেন। এনবিএর গোল্ডেন স্টেট ওয়ারিয়র্স (সান ফ্রান্সিসকো) এবং এমএসএলের লস অ্যাঞ্জেলেস ফুটবল ক্লাবে তাঁর মালিকানা আছে। এ ক্লাবে খেলেই ২০২৩ সালে ক্যারিয়ার শেষ করেছেন গ্যারেথ বেল। সব মিলিয়ে চ্যাডের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮০ কোটি মার্কিন ডলার।

স্টিভের সম্পদের পরিমাণও এর চেয়ে খুব একটা কম হওয়ার কথা নয়। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে কাজ করছেন তিনি।

আর প্রভাব-প্রতিপত্তিতে প্রায় সব ওয়েবসাইটকেই এখন ছাড়িয়ে গেছে তাঁদের ইউটিউব। দৈনিক ব্যবহারের (ভিজিট) হিসেবে সামনে আছে কেবল ইউটিউবের মালিক প্রতিষ্ঠানের মূল ওয়েবসাইট—গুগল। বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন ১২ কোটিরও বেশি মানুষ ১০০ কোটি ঘণ্টারও বেশি সময় ইউটিউব দেখে। তাদের জন্য প্রতি মিনিটে সেখানে আপলোড হচ্ছে কয়েক শ ঘণ্টার ভিডিও। মাঝখানে টিকটকের ছোট দৈর্ঘ্যের ভিডিও বেশ সাড়া ফেলেছিল। ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ইউটিউবও চালু করে শর্টস। প্রথমে ভারতে, পরের বছর সারা বিশ্বে। বর্তমানে ইউটিউবে দিনে ৭ হাজার কোটিরও বেশি শর্টস দেখে মানুষ। শুধু ইউটিউব প্রিমিয়ামেরই সাবস্ক্রাইবার ১০ কোটির বেশি। সব মিলিয়ে ইউটিউবের বর্তমান বাজারমূল্য ১৮ হাজার কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি।

সম্পর্কিত নিবন্ধ