বরিশাল নগরের কাশীপুরের ইছাকাঠির একটি দিঘি, সংলগ্ন পুকুর ও আশপাশে গত তিন দিন ধরে মিলছে হাত-পাসহ মানবদেহের খণ্ডিত অংশ। আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে আটটি অংশ। এ নিয়ে এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে।

সর্বশেষ পাওয়া খণ্ডিত হাত থেকে ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো নারীদেহের। তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। মাথা ও ধড় না পাওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দফায় দফায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেও তারা হত্যাকাণ্ডের কোনো রহস্য পাচ্ছে না।

জানা যায়, ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের সীতারামের দিঘি, সংলগ্ন আলতাফ হোসেনের পুকুর ও একটি ডাস্টবিন থেকে মানবদেহের খণ্ডিত অন্তত আটটি অংশ উদ্ধার হয়। গত রোববার দিঘিতে পায়ের অংশ, পরে অন্যান্য স্থানে একে একে বাকি অংশ পাওয়া যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা ইউনুস আলী জানান, রোববার সকালে দিঘির পাড়ে গিয়ে কিছু একটা ভাসতে দেখে তিনি মৃত বড় মাছ মনে করেন। পরে টেনে কাছে আনার পর পলিথিনে মোড়ানো পায়ের অংশ পান। খবর পেয়ে পুলিশ উদ্ধারকাজ শুরু করে। ওই দিন সংলগ্ন আলতাফ হোসেনের পুকুরে আরেকটি পলিথিনে কলিজাসহ দেহের বিভিন্ন অংশের চারটি টুকরো উদ্ধার হয়। এরপর দমকল বাহিনীর কর্মী ও জেলেদের দিয়ে পুলিশ জাল টানালেও কিছু মেলেনি। সোমবার অদূরে একটি ডাস্টবিনে পলিথিনে মোড়ানো একটি হাতের অংশ পাওয়া যায়। মঙ্গলবার আরেকটি হাতসহ দুটি খণ্ডাংশ পাওয়া যায় দিঘিতে।

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা সাবেক সেনাসদস্য শাহীন কাদের জানান, তাদের এলাকার কেউ নিখোঁজ নেই। দূরে কোথাও নারীকে হত্যা করে লাশ টুকরোর পর বস্তায় করে বিভিন্ন এলাকায় ফেলা হয়েছে। কারণ দিঘির পাড়ে রক্তমাখা একটি প্লাস্টিকের বস্তা পাওয়া গেছে।

বিমানবন্দর থানার ওসি জাকির হোসেন জানান, উদ্ধার খণ্ডাংশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে।

মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শহিদুল ইসলাম জানান, উদ্ধার হাত দেখে মনে হচ্ছে, এটি কোনো নারীর। মেট্রোপলিটন পুলিশের চার থানায় কারও নিখোঁজের তথ্য নেই। এটি দুর্ধর্ষ কোনো হত্যাকারীর কাজ। পরিচয় শনাক্তে থানায় থানায় বার্তা পাঠানো হয়েছে। ওই এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে যাচাই-বাছাই চলছে বলে জানান তিনি।

.

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: বর শ ল

এছাড়াও পড়ুন:

শুল্ক–কর নির্ধারণে ট্রাম্পের সূত্র, বাংলাদেশ যা করতে পারে

বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি এবং দেশটিতে রপ্তানির পরিমাণ বিবেচনায় এনে এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এর মানে হলো, যুক্তরাষ্ট্র যে শুল্ক আরোপ করেছে, তা কমাতে হলে বাংলাদেশের আমদানি বাড়াতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয় কম। তবে রপ্তানি হয় বেশি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি বেশি। বাংলাদেশ বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি যদি কমে তাহলে সামনে বাংলাদেশের ওপর শুল্ক–কর কমতে পারে। আবার বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে গেলে শুল্কহার আরও বাড়তে পারে। অবশ্য ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র এই পর্যালোচনা করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট করেনি দেশটি।

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করেছে ৮৩৬ কোটি ডলারের পণ্য। বিপরীতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করেছে ২২১ কোটি ডলারের পণ্য। এই হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ৬১৫ কোটি ডলার।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাণিজ্য ঘাটতিকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানির পরিমাণ দিয়ে ভাগ করে যা পাওয়া যায়, তার শতাংশ ধরে ট্যারিফ নির্ধারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর হার হয় ৭৪ শতাংশ। এর অর্ধেক বা ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে বাংলাদেশের পণ্যে।

বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে কী কী আসে, কীভাবে আমদানি বাড়ানো যাবে, তাই এখন আলোচনার বিষয়।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে যা যা আসে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যভান্ডারে দেখা যায়, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৯১ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল রয়েছে ২৯ কোটি ডলার। অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের পণ্য রয়েছে ২৬২ কোটি ডলারের।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি হিসাবের সঙ্গে এনবিআরের হিসাবের পার্থক্যের কারণ সময়ের ব্যবধান। এনবিআর পণ্য খালাসের পর হিসাব করে, যুক্তরাষ্ট্র পণ্য রপ্তানির সময় হিসাব করে। আরেকটি হলো, তৃতীয় দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আসছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে দেখানো হয়নি।

এনবিআরের হিসাবে অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য আমদানি হওয়া ২৬২ কোটি ডলারের পণ্যের মধ্যে ১৩৩ কোটি ডলারের পণ্য আমদানিতে কোনো শুল্ক–কর দিতে হয়নি। যেমন গম, তুলার মতো পণ্যে শুল্ক–কর নেই। এরপরও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া পণ্যে গড়ে ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ শুল্ক–কর দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে কাস্টমস শুল্ক–কর আদায় করেছে ১ হাজার ৪১১ কোটি টাকা।

এবার দেখা যাক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোন পণ্য বেশি আসে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২ হাজার ৫১৫টি এইচএসকোডের (পণ্যের শ্রেণি বিভাজন) পণ্য আমদানি হয়েছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে আট ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছে ৬৭ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি পণ্যের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে রড তৈরির কাঁচামাল—পুরোনো লোহার টুকরা বা স্ক্র্যাপ। গত অর্থবছরে পণ্যটি আমদানি হয় ৭৭ কোটি ৮৬ লাখ ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া মোট পণ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ। গড়ে ৪ শতাংশ শুল্কহার রয়েছে পুরোনো লোহার পণ্য আমদানিতে।

আমদানিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পণ্য হলো এলপিজির উপাদান বিউটেন। গত বছর এই পণ্য আমদানি হয়েছে ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের। বাংলাদেশের শুল্কহার গড়ে ৫ শতাংশ।

তৃতীয় সর্বোচ্চ আমদানি পণ্য হলো সয়াবিন বীজ। সয়াবিন তেল ও প্রাণিখাদ্য তৈরির এই কাঁচামাল আমদানি হয়েছে ৩২ কোটি ডলারের। এই পণ্য আমদানিতে শুল্ক–কর নেই।

চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল তুলা। এই পণ্য আমদানি হয়েছে ২৬ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের। এটিতেও শুল্ক–কর নেই।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির তালিকায় আরও রয়েছে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, হুইস্কি, গাড়ি, গম, উড পাল্প, পুরোনো জাহাজ, সয়াকেক, কাঠবাদাম ইত্যাদি।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া সর্বোচ্চ শুল্ক–কর আছে এমন পণ্যের মধ্যে রয়েছে হুইস্কি। হুইস্কিতে শুল্ক–কর ৬১১ শতাংশ। তবে আমদানি খুবই কম। গত বছর ২২৮ বোতল জ্যাক ডেনিয়েল হুইস্কি আমদানি হয়েছে দেশটি থেকে। এ ছাড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শুল্ক–করযুক্ত পণ্য হলো মার্সিডিজ বেঞ্চ। এই গাড়িতে শুল্ক–কর ৪৪৩ শতাংশ। গত বছর আমদানি হয়েছে চারটি গাড়ি।

আমদানি কীভাবে বাড়ানো সম্ভব

ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানিতে দুটি বিষয়ের ওপর জোর দেন। আমদানিতে খরচ কত এবং পণ্যের মান কেমন? তবে শিল্পের কাঁচামালের ক্ষেত্রে কত কম সময়ে আনা যাবে, তা–ও গুরুত্ব দেন ব্যবসায়ীরা।

শুল্ক–করের হার সব দেশেই প্রায় একই। কিছু মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আওতায় (যেমন দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা সাফটা) নির্ধারিত পণ্যে শুল্ক সুবিধা রয়েছে। এখন বেসরকারি আমদানিকারকদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিতে উৎসাহ দিতে হলে শুল্ক–করে সুবিধা দিতে হবে। কারণ, খরচ কম পড়লে সেখান থেকে আমদানিতে উৎসাহিত হবেন ব্যবসায়ীরা।

আবার যেসব পণ্যে শুল্কহার নেই, সেগুলোর ক্ষেত্রে বিকল্প ভাবতে হবে। যেমন এনবিআরের হিসাবে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া পণ্যের ৪৪ শতাংশে কোনো শুল্ক–কর দিতে হয়নি। এই তালিকায় রয়েছে সয়াবিন বীজ, তুলা ইত্যাদি।

তবে আমদানিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে সরকার। যেমন সরকার যেসব পণ্য আমদানি করে তার তালিকায় রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, এয়ারক্রাফট ও যন্ত্রাংশ, অস্ত্র ইত্যাদি। গত বছর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ২১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের এয়ারক্রাফট ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ আমদানি করেছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করেছে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি ডলারের।

আমদানি বাড়লে শুল্ক কত কমতে পারে

পোশাক খাতের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে হিসাব করেছে তাতে আমাদের আমদানি বাড়ানোর বিকল্প নেই। সরকারি–বেসরকারি খাত মিলিয়ে যদি আমদানি বাড়াতে পারি, তাহলে দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি কমে আসবে। যেমন এখন যা আমদানি তা যদি দ্বিগুণ করা যায় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের হার ২৪–২৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তারা পর্যালোচনার ঘোষণা না দিলেও আমাদের প্রস্তুতি এখনই শুরু করে দেওয়া দরকার। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরকারি আমদানি বাড়িয়ে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। এ রকম উদ্যোগ নেওয়া হলে রপ্তানি খাত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারবে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলেন

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শুল্ক–কর কমিয়ে কৃত্রিমভাবে আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং দেশে মার্কিন বিনিয়োগ আনা হলে সহজভাবে আমদানি বাড়বে। কারণ, মার্কিন উদ্যোক্তারা নিজ দেশ থেকে বাংলাদেশে যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ আমদানি করবেন।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুল্ক আরোপের পর সব দেশই নানামুখী নীতি নিচ্ছে। কেউ শূন্য শুল্কের পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কেউ পাল্টা শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। আমাদের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বাইরে অন্য কোনো সুযোগ নেই। আমরা যেসব পণ্য রপ্তানি করি, তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রান্তিক মানুষের জন্য। আবার তাদের তুলা ব্যবহার করছি। বিষয়টি যদি আমরা যুক্তি দিয়ে দাঁড় করাতে পারি এবং যুক্তরাষ্ট্র বিবেচনায় নেয়, তাহলে প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে বিশেষ প্রণোদনা দিতে পারে সরকার।

ট্রাম্পের সূত্র যুক্তিসংগত নয় উল্লেখ করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ট্রাম্পের সূত্র ব্যবহার করলে বাংলাদেশ ভারত থেকে পণ্য আমদানিতে ৮৫ শতাংশ এবং চীন থেকে পণ্য আমদানিতে ৯৫ শতাংশ শুল্ক বসাতে পারবে। এভাবে হলে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা ভেঙে যাবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ