‘পানিযুদ্ধের’ পথে চীন-ভারত, ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
Published: 28th, January 2025 GMT
স্থানীয়দের বিক্ষোভ উপেক্ষা করে অরুণাচল প্রদেশে সিয়াং নদীর ওপর বাঁধ দিতে যাচ্ছে ভারত, উদ্দেশ্য হলো একই নদীর উজানে চীনের তৈরি বাঁধকে টেক্কা দেওয়া। কিন্তু এই দুই পাল্টাপাল্টি বাঁধ তৈরির দৌড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভাটির বাংলাদেশ।
ভারতের উত্তর-পূর্ব অরুণাচল প্রদেশে সিয়াং নদীর ধারে জড়ো হয়েছেন একদল বিক্ষোভাকারী। পড়ন্ত বিকেলে শীত উপেক্ষা করে সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়ে যাচ্ছেন তারা।
‘আনে সিয়াং (সিয়াং মা) এর ওপর কোনো বাঁধ হবে না,’ পারং গ্রামের বিক্ষোভকারীদের স্লোগানে শোনা যায়।
পারং গ্রাম এবং আশেপাশের এলাকায় বাস করেন কৃষিজীবী ‘আদি’ নৃ গোষ্ঠীর মানুষ। শত শত বছর ধরে অরুণাচলের পাহাড়ি এলাকায় বয়ে চলা সিয়াং নদীকে পবিত্র মেনে আসছেন তারা। কিন্তু বর্তমানে এই নদী, তাদের গ্রাম, এমনকি তাদের জীবিকা পড়তে যাচ্ছে হুমকির মুখে। কারণ সিয়াং নদীর ওপর তৈরি হতে যাচ্ছে ভারতের বৃহত্তম বাঁধ। রিপোর্ট- আল জাজিরা।
ভারত সরকারের পরিকল্পনা মোতাবেক ১৩ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যায়ে তৈরি হবে সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট। এই বাঁধ ধরে রাখবে নয় বিলিয়ন ঘনমিটার পানি, আর উৎপাদন করবে ১১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। বাঁধ থেকে এত বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের নজির ভারতে নেই। ২০১৭ সালে প্রস্তাবনা দেওয়ার পর বর্তমানে এই বাঁধ তৈরির সম্ভাব্যতা নিয়ে চলছে জরিপ।
তবে বাঁধ তৈরির খবরে অসন্তুষ্টির ছায়া নেমে এসেছে সিয়াং নদীর অববাহিকায় বসবাস করা কৃষিজীবী মানুষের মনে। সিয়াং নদীতে বাঁধ দিলে পুরোপুরি তলিয়ে যাবে অন্তত ২০টি গ্রাম, এছাড়া আংশিক নিমজ্জিত হবে ভাটির আরও ১২টি গ্রাম। ঘরছাড়া হয়ে পড়বে হাজারো মানুষ।
এলাকাবাসীর বিক্ষোভ দমন করতে আধা-সামরিক বাহিনী নামাতে নির্দেশ দিয়েছে ভারত সরকার। তবে এখনও এই অঞ্চলে কোনো সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি।
"সরকার আমাদের জমি নিয়ে নিচ্ছে, আমাদের ‘সিয়াং মা’কে নিয়ে নিচ্ছে, এখানে ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলায় পাঁয়তারা করছে। আমরা তা হতে দিতে পারি না," বলেন স্থানীয় বাসিন্দা গেগং জিজং। তিনি সিয়াং আদিবাসী কৃষক ফোরামের প্রধান।
‘আমি যতক্ষণ বেঁচে আছি, ততক্ষণ এই বাঁধ হতে দেবো না।’
ভারত সরকারের মতে, বিক্ষোভকারীরা ভুল বুঝছেন। অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু দাবি করেন, এই বাঁধের উদ্দেশ্য শুধু পানিবিদ্যুৎ নয়, বরং সিয়াং নদীকে বাঁচানো।
কিন্তু কার হাত থেকে সিয়াং নদীকে বাঁচাতে চাইছে ভারত?
উত্তর হলো- চীন।
দুই দেশের ঠুনকো সম্পর্ক
ভূ-রাজনৈতিক কারণে পানি সরবরাহ, পানি নিরাপত্তা নিয়ে অনেকদিন ধরেই ভারত ও চীনের মাঝে রয়েছে রেষারেষি। এর রেশ ধরে সীমান্ত এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনাও দেখা যাচ্ছে কিছু বছর ধরে।
যে সিয়াং নদী নিয়ে দুই দেশের মাঝে অশান্তি চলছে, তার উৎপত্তি তিব্বতের মেদং এলাকায়, কৈলাস পর্বতে। স্থানীয়ভাবে নদীটির নাম ইয়ারলুং জাংবো/সাংপো। তিব্বত থেকে নদীটি অরুণাচলে প্রবেশ করে, হয়ে যায় প্রশস্ত। ভারত হয়ে বাংলাদেশে এসে নদীটি মিশে যায় বঙ্গোপসাগরে।
ভাবছেন, কী সেই নদী? তাকে আমরা চিনি ব্রহ্মপুত্র নদ নামে।
গত মাসে চীন জানায়, ইয়ারলুং জাংবো নদীর ওপর তারা তৈরি করতে যাচ্ছে পৃথিবীর বৃহত্তম বাঁধ। বাঁধটি বসবে ঠিক ভারত-চীন সীমান্ত ঘেঁষে, মেদং অঞ্চলে। ১৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নির্মিত হবে বাঁধটি। তবে এই বাঁধের কারণে কী পরিমাণ গ্রাম বা বাসিন্দা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, এ বিষয়ে কিছু জানা যায়নি। বছরে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে এ থেকে।
ইয়ারলুং জাংবো এবং তার শাখা-প্রশাখার ওপর এর আগেও ছোট ছোট বাঁধ দিয়েছে চীন। তবে এটাই হবে সর্ববৃহৎ, জানিয়েছেন বি আর দীপক, দিল্লীর জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চাইনিজ স্টাডিজ বিষয়ের অধ্যাপক।
চীনের এই ঘোষণার পরপরই বাঁধের বিপরীতে বাঁধ দেওয়ার কথা ভাবে ভারতের সরকার। ভারতের মতে, চীন বাঁধ দিলে সিয়াং নদীর গতিপথে পড়বে নেতিবাচক প্রভাব। কিন্তু ভারত পাল্টা একটি বাঁধ দিতে পারলে এই প্রভাব কমিয়ে আনা সম্ভব হবে, আর হুটহাট বন্যা বা খরার সম্ভাবনাও কমে যাবে।
স্থানীয়দের বুঝ দিতে ভারতীয় রাজনীতিবিদরা বলেন, চীন যে কোনো সময়ে তাদের বাঁধ খুলে দিয়ে বন্যায় ভাসিয়ে দিতে পারে সিয়াং নদীর তীর। এমন দুর্ঘটনা এড়াতেই পাল্টা বাঁধ দিতে হবে ভারতকে।
কিন্তু এত কাছাকাছি দুইটি বাঁধ দিলে আদতে ওই নদীর অববাহিকায় যে লাখ লাখ মানুষ বাস করেন, তাদের উপকার না হয়ে বরং অপকার হওয়ারই ঝুঁকি রয়েছে, হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পরিবেশবাদী এবং বিশেষজ্ঞরা। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন আদিবাসী জনগোষ্ঠী।
চীন এবং ভারত এই দুই দেশের ওপর দিয়েই যেসব নদী গেছে, সেসব নদীর পানি নিয়ে দেশ দুটির রেষারেষি নতুন কিছু নয়। তবে চীনের বাঁধের বিপরীতে সিয়াং নদীতে ভারত পাল্টা একটি বাঁধ দিলে আগুনে বরং ঘি ঢালা হবে, অধ্যাপক দীপক বলেন।
অস্ট্রেলিয়ার গবেষণা প্রতিষ্ঠান লোয়ি ইন্সটিটিউট ২০২০ সালের এক প্রতিবেদনে বলে, তিব্বতীয় মালভূমিতে উৎপত্তি হওয়া নদীগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে চীন। আর এর মাধ্যমে আসলে দেশটি ভারতের অর্থনীতির ‘গলা চেপে ধরার’ ক্ষমতাও রাখে।
পানি যখন অস্ত্র
চীনের ইতিহাসে ইয়ারলুং জাংবোকে বলা হয় ‘বেয়াড়া নদী’। চীনের অন্য সব নদীর মতো সে পশ্চিম থেকে পূর্বে যায়নি, বরং তীক্ষ্ণ এক বাঁক নিয়ে দক্ষিণে চলে গেছে, প্রবেশ করেছে ভারতে। সীমান্ত ঘেঁষে এই নদীতে চীনের বাঁধ বসবে, এতে ভারতের দুশ্চিন্তার কারণ রয়েছে বই কি।
দিল্লীর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চাইনিজ স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক সাহেলি চট্টজার মতে, এই বাঁধ ব্যবহার করে ভারতের ভেতরে এই নদীর পানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে চীন। আর এতে দুই দেশের সম্পর্কেও প্রভাব পড়বে।
এই মতের সঙ্গে সম্মতি জানিয়ে অধ্যাপক দীপক বলেন, এই নদীর ভাটিতে অবস্থিত ভারত ও বাংলাদেশ, দুই দেশেরই আশঙ্কা আছে যে, পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে চীন। এই বাঁধ অনেক বিশাল পরিমাণে পানি ধরে রাখতে পারে (৪০ বিলিয়ন ঘনমিটার) এটাই বেশি ভয়ের ব্যাপার।
সমঝোতায় রয়েছে ঘাটতি
সুপেয় পানি ব্যবহার নিয়ে জাতিসংঘের একটি চুক্তি আছে, যাতে অংশ নিয়েছে বিভিন্ন দেশ। ভারত বা চীন কেউই ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। তবে এ দুই দেশ ২০০২ সালে আলাদা একটি চুক্তি করে, যাতে বলা হয় বর্ষার মৌসুমে ব্রহ্মপুত্রের পানি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য একে অপরকে সরবরাহ করবে তারা।
কিন্তু ২০১৭ সালে ভুটানের কাছাকাছি চীন-ভারত সীমান্তে এক সামরিক সংঘর্ষের পর বেইজিং থেকে এ তথ্য সরবরাহ ব্যহত হয়। সে বছর বসন্তেই আসামে একের পর এক বন্যা দেখা দেয়, এতে নিহত হন অন্তত ৭০ জন, বাস্তচ্যুত হন চার লাখ মানুষ।
‘যখনই দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হয়, চীন সাথে সাথে তথ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়,’ দাবী করেন অধ্যাপক দীপক।
ডিসেম্বরের ২৫ তারিখে মেদং বাঁধ নির্মাণের ঘোষণা দেয় চীন। এর পর পরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় ভারত। এর প্রেক্ষিতে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং সাংবাদিকদের বলেন, ভাটি অঞ্চলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না, এবং বেইজিং ভাটির দেশগুলোর সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে।
এ মন্তব্যের পরও চীনের ওপর ঠিক ভরসা করতে পারছে না ভারত।
ভারত ও চীনের মাঝে সম্পর্কের তিক্ততা এত সহজে দূর হবে না, বলেন মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়াভিত্তিক পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান। তিনি বলেন, পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে বিভিন্ন দুর্যোগের শিকার হয়েছে ভারত ও চীন। ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে, এবং পানি নিয়ে এই দুই দেশের মাঝে টানাপোড়েন চলতেই থাকবে।
ভূমিকম্পের ভয়
ভূমিকম্পের দিক দিয়ে হিমালয় খুবই উর্বর একটি অঞ্চল। ২০ শতকের অন্তত ১৫ শতাংশ বড় ভূমিকম্প এই এলাকাতেই ঘটে, বলেন অধ্যাপক দীপক। এই মাসেরই ৭ তারিখেই তিব্বতের দিংরি অঞ্চলে এক ভূমিকম্পে নিহত হয়েছেন অন্তত ১২৬ মানুষ। শুধু তাই নয়, এই অঞ্চলের অন্তত ১৪টি বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই ভূমিকম্পে। কিছু বাঁধের দেওয়াল হেলে গেছে, কোথাও কোথাও ফাটল দেখা দিয়েছে। তিনটি বাঁধের পানি নিষ্কাশন করা হয়েছে, সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বেশ কিছু গ্রামের বাসিন্দাদের। চীন ও ভারত যে দুটি নতুন বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে, ভূমিকম্পে এর কোনো একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঝুঁকিতে পড়ে যাবে ভাটি অঞ্চলের অগুণিত মানুষ।
বাংলাদেশের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি
বাঁধ নিয়ে ভারত ও চীনের মাঝে দড়ি টানাটানি চলছে বটে, কিন্তু এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ। ব্রহ্মপুত্রের মাত্র ৮ শতাংশ বাংলাদেশের ওপর দিয়ে গেছে, কিন্তু দেশের ৬৫ শতাংশ পানিই আসে এই নদ দিয়ে, বলেন শেখ রোকন, ঢাকাভিত্তিক সংস্থা রিভারাইন পিপলের মহাসচিব।
"চীন ও ভারতের মাঝে এই 'বাঁধের বদলে বাঁধ' প্রতিযোগিতায় আমাদেরই ক্ষতি হবে বেশি," তিনি আল জাজিরাকে বলেন।
একই ভয় পাচ্ছেন মালিক ফিদা খান, ঢাকাভিত্তিক সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) এর নির্বাহী পরিচালক।
"আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রতিবেদন, নেই, এমনকি বাঁধ তৈরিতে কী প্রযুক্তি ব্যবহার হতে পারে এরও তথ্য জানি না আমরা," তিনি বলেন।
মালিক ফিদা খান আরও বলেন, বঙ্গোপসাগরে মিশে যাওয়ার আগে ব্রহ্মপুত্র তৈরি করেছে পাললিক বদ্বীপ। উজানে বাঁধ তৈরির কারনে পলিমাটির গতিপথে কোনো পরিবর্তন এলে আরও বেড়ে যেতে পারে ভাঙনের পরিমান।
একটি বাঁধ দিয়ে আরেকটি বাঁধের মোকাবিলা করা যায় না, তিনি বলেন। বরং ভাটি অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের ওপর বিশাল দুর্যোগ নেমে আসবে তাতে।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান নীতি হলো হাত গুটিয়ে অপেক্ষা করা, কিন্তু এই নীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে, শেখ রোকন মনে করেন।
"ব্রহ্মপুত্র নদ নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বাংলাদেশ-ভারত বা ভারত-চীনের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না, বরং এর অববাহিকার সব দেশ নিয়েই আলোচনায় বসা উচিত।"
বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে দিল্লীর সুসম্পর্ক ছিল। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে ভাটা পড়েছে। এর ফলে ব্রহ্মপুত্রের ওপর চীনের বাঁধ দেওয়া নিয়েও বাংলাদেশ ও ভারতের মাঝে কোনো যৌথ উদ্যগ দেখা যাচ্ছে না, বিশ্লেষকরা বলেন।
মালিক ফিদা খানের মতে, এই সুযোগে নিজেদের সম্পর্ক ঝালিয়ে নিতে পারে বাংলাদেশ ও ভারত। কিন্তু উইলসন সেন্টারের মাইকেল কুগেলম্যান এতটা আশাবাদী হতে পারছেন না।
"ভারত আর বাংলাদেশ একজোট হয়ে চীনের ওপর চাপ প্রয়োগ করলেও তাদের কাজে বাধা দেওয়ার জন্য তা যথেষ্ট হবে না," তিনি মনে করেন। যত সময় গড়াবে, এই বাঁধের কারণে ভাটির মানুষের ক্ষতির আশংকাও তত বাড়বে।
.উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: ভ ম কম প সরক র র ব যবহ র সরবর হ এল ক য় র ওপর সবচ য়
এছাড়াও পড়ুন:
ফিলিস্তিনিরা হামাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেন?
এ সপ্তাহের শুরুর দিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার সড়কে কয়েক শ ফিলিস্তিনি নেমে এসে ইসরায়েলি বর্বর গণহত্যার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। এ সময় তাঁরা অবরুদ্ধ গাজা থেকে হামাসের নিয়ন্ত্রণ অবসানের দাবি জানান। উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়া বৃহত্তম একটা প্রতিবাদ, যেখানে ৫০০ জন বিক্ষোভকারী অংশ নেন।
কিছুসংখ্যক মানুষ হামাস ও ফিলিস্তিন প্রতিরোধ আন্দোলনের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। বক্তাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘আমরা বেইত লাহিয়ার মানুষেরা শান্তির পক্ষে। আমরা শান্তি ভালোবাসি এবং আমরা চাই এই যুদ্ধের অবসান হোক।’
ইসরায়েলি, ইসরায়েলপন্থী মিডিয়া এবং ফিলিস্তিন প্রতিরোধ আন্দোলনের বিরুদ্ধে থাকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা ফিলিস্তিনিদের এই প্রতিবাদকে ব্যবহার করে। এটিকে ফিলিস্তিন প্রতিরোধ আন্দোলনকে, বিশেষ করে হামাসকে, আক্রমণ করার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
এমনকি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কার্টজ এই বিক্ষোভে উল্লাস প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে বর্ণবাদী রাষ্ট্র হামাসকে পরাজিত করার প্রচেষ্টায় তাদেরকে বাজি ধরছে।
পাঁচ মাস আগে ইসরায়েলে একজন সাংবাদিক বলেছিলেন, ইসরায়েলি লোকেরা তাঁদের ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধ নিয়ে বিরক্ত এবং সে কারণে তাঁরা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছেন এবং যুদ্ধ শেষ করার দাবি জানাচ্ছেন। এরপর তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, ‘গাজার লোকেরা কবে হামাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেন?’ তিনি আমাকে বলেছিলেন, ইসরায়েলি নেতারা সেই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছেন।
প্রকৃতপক্ষে, গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা চলছে। ইসরায়েলি নেতারা ও তাঁদের মিত্ররা অবরুদ্ধ ছিটমহলে ইসরায়েলি সেনারা যেসব যুদ্ধাপরাধ করে চলেছেন, তার জন্য হামাস এবং ফিলিস্তিন প্রতিরোধ আন্দোলনকে দায়ী করে চলেছেন। গাজাকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার তাঁদের পূর্বপরিকল্পনায় ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য তাঁরা এটা সাজিয়েছেন।
ফিলিস্তিনিরা যদি তাঁদের অস্ত্র ত্যাগ করেন এবং বৈধ প্রতিরোধ বন্ধ করেন, তাহলে সেটা হবে না। প্রতিরোধ আমাদের মর্যাদা, প্রতিরোধ আমাদের সম্মান। আমাদের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের একমাত্র রাস্তা প্রতিরোধ।একজন ফিলিস্তিনি, আরেকজন ফিলিস্তিনি—ইসরায়েল কখনো এভাবে ভাগ করে না। তারা সব ফিলিস্তিনিকে শত্রু বলে মনে করে এবং সবাইকে নির্মূল করা উচিত বলে মনে করে। কারণ হলো, তাঁদের জোর করে নিজেদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করার পরও, তাঁদের জমি চুরি করার পরও এবং তাঁদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর পরও তাঁরা প্রতিরোধ ছেড়ে দেননি।
একটা বড় অংশের লোকেদের স্মৃতিশক্তি খুবই স্বল্পমেয়াদি। তাঁরা আমাদের বিরুদ্ধ ইসরায়েলি নৃশংসতাগুলো এবং ইসরায়েলি নেতাদের অপমানজনক মন্তবগুলো এবং মিথ্যা দাবিগুলো মনে রাখতে অক্ষম। অতএব তাঁরা সেই ইসরায়েলি নেতাকে জানতে আগ্রহী না–ও হতে পারেন, যিনি বলেছিলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের সেরা বন্ধু হলো সেই ফিলিস্তিনি, যিনি মারা গেছেন।’
গণহত্যা শুরুর পর একটি টেলিভিশন ভাষণে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইহুদি বাইবেল থেকে ধার নিয়ে ফিলিস্তিনিদের ‘আমালেক’ বলেছিলেন। এটি ইঙ্গিত করে যে সেখানে একটি আদেশ ছিল, যা নির্ধারণ করে যে ফিলিস্তিনিদের অবশ্যই ইহুদিদের দ্বারা ধ্বংস করতে হবে।
নেতানিয়াহুর সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ত ফিলিস্তিনিদের ‘নরপশু’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। এর মাধ্যমে গাজায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার যৌক্তিকতা দিতে চেয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, একটি দখলকৃত জায়গায় এ সবকিছুর সরবরাহ অবশ্যই জনগণকে বিনা মূল্যে দিতে হবে।
এরপর নেসেটের (ইসরায়েলের আইনসভা) উপ–স্পিকার নিসিম ভাতুরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ইসরায়েলের একটি সাধারণ লক্ষ্য হচ্ছে, ‘গাজাকে দুনিয়ার মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা।’ গাজার এতিহ্যবিষয়ক মন্ত্রী আমিচায় ইলিয়াহু গাজায় পারমাণবিক বোমা ফেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, গাজায় একজনও বেসামরিক নাগরিক নেই।
গাজার বাসিন্দাদের জোর করে উচ্ছেদ করে দেওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ইসরায়েলের যোগাযোগমন্ত্রী শোহলো কারহি ফিলিস্তিনিদের দ্রুত বের করে দেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিলে ফিলিস্তিনিরা মিসরে যেতে বাধ্য হবেন।
ইসরায়েলি নেতাদের কাছে ফিলিস্তিনি মানেই শত্রু। তাঁরা ফিলিস্তিনিদের নির্বিচারে হত্যা করছেন। কোনো প্রতিরোধযোদ্ধা নেই, সেটা জানার পরও তাঁরা সেই সব এলাকাকে টার্গেট করছেন।
বিক্ষোভকারীরা শান্তির দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা হয়তো ভুলে গেছেন যে ১৯৯৩ সাল থেকে আমাদের শান্তিতে বাস করা উচিত ছিল। কেননা, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন ফাতাহকে নিরস্ত্রীকরণের মধ্য দিয়ে ১৯৯৩ সালে পিএলও ওসলো শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। আমাদের তাতে কী হয়েছে? তারা আমাদের খুন করা অব্যাহত রেখেছে।
ফিলিস্তিনিদের প্রমাণ করতে হবে না যে তারা শান্তিপূর্ণ লোক। সেটা প্রমাণ করতে হবে ইসরায়েলিদের। যা–ই হোক, বিশ্বের ভণ্ড পরাশক্তি ও আরব নেতারা যতক্ষণ ইসরায়েলকে সমর্থন করে যাবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সেটা হবে না।
ফিলিস্তিনিরা যদি তাঁদের অস্ত্র ত্যাগ করেন এবং বৈধ প্রতিরোধ বন্ধ করেন, তাহলে সেটা হবে না। প্রতিরোধ আমাদের মর্যাদা, প্রতিরোধ আমাদের সম্মান। আমাদের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের একমাত্র রাস্তা প্রতিরোধ।
মোতাসেম আ দল্লউল গাজার মিডল ইস্ট মনিটরের সংবাদদাতা
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত