রাস্তায় ব্যাপক ভিড়, বাড়ি ফিরছেন সাড়ে ৬ লাখ ফিলিস্তিনি
Published: 28th, January 2025 GMT
শরণার্থী শিবিরে মাসের পর মাস ধরে নির্বাসিত থাকার পর উত্তর গাজায় নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন ফিলিস্তিনিরা। গতকাল সোমবার লাখ লাখ মানুষকে ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী পথ ধরে ফিরতে দেখা যায়। নতুন করে বাঁচার স্বপ্নে তারা বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলেও কার্যত পুরো উত্তর গাজাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সেখানে হাজার হাজার টন বোমা ফেলেছে ইসরায়েল, যা এক সময়ের প্রাণবন্ত গাজা সিটিকে ধূলিসাৎ করেছে। তবু ফিলিস্তিনিরা চান ধ্বংসস্তূপ নতুন করে সাজাতে।
গত ১৯ জানুয়ারি থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও কিছু শর্তে বাস্তুচ্যুতদের পথ আটকে রেখেছিল ইসরায়েল। আগামী শুক্রবারের মধ্যে আরবেল ইয়াহুদসহ তিন জিম্মির মুক্তির শর্তে অবশেষে তারা পথ (নেতজারিত করিডোর) খুলে দেয়। সিএনএনের হাতে আসা ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, গতকাল ভোরের আলো ফুটতেই উত্তর গাজার উদ্দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষের বহর এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে শিশু ও কিছু তল্পিতল্পাও রয়েছে। এ ফেরা উত্তর গাজার বাসিন্দাদের জন্য ছিল অত্যন্ত প্রতীক্ষিত, যদিও ফিরে গিয়ে অনেকেই বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপই দেখতে পাবেন।
গাজা সিটির বাসিন্দা ফাদি আল সিনওয়ার রোববার বলেন, ‘আমরা ৪৭০ দিন ধরে তাঁবুতে বাস করছিলাম। আমাদের বাড়িঘর মিস করেছি।’ আল শাতি শরণার্থী শিবিরে থাকতেন নাদিয়া কাশেম। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন আমরা এ দিনটির অপেক্ষায় ছিলাম।’ হামাস এ প্রত্যাবর্তনকে নিজেদের বিজয় বলে বর্ণনা করেছে। এক বিবৃতিতে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠনটি বলেছে, ‘এটি আমাদের জনতার বিজয় এবং দখলদার ও তাদের বাস্তুচ্যুতি পরিকল্পনার ব্যর্থতা।’
গত ১৫ মাস ধরে ইসরায়েলের হামলা চলাকালে একাধিকবার বাস্তুচ্যুতির শিকার হন গাজার বাসিন্দারা। ঘাদা নামের এক বাসিন্দা রয়টার্সকে বলেন, ‘ফেরার আনন্দে তারা আগের রাতে ঘুমোতে পারেননি। রাতেই সবকিছু প্রস্তুত করে রেখেছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘কমপক্ষে ফিরে তো যেতে পারছি। আশা করি যুদ্ধ শেষ হয়েছে এবং সবকিছু শান্ত হয়েছে।’
তিন ধাপের যুদ্ধবিরতির প্রধান ধাপে ছয় সপ্তাহ ধরে বন্ধ থাকবে লড়াই। এ সময়ে হামাস ৩৩ ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্ত করবে। এরইমধ্যে সাতজনকে মুক্ত করা হয়েছে। অপরদিকে ইসরায়েল তাদের কারাগারে থাকা হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বন্দির মধ্যে অন্তত ৩০০ জনকে মুক্তি দিয়েছে। উত্তর গাজায় যাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে, তাদের সবাই নিরস্ত্র। অপর রাস্তা সালাউদ্দিন রোড ধরে গাড়ি বা ভ্যানের মাধ্যমে প্রবেশ করছেন গাজার বাসিন্দারা। এগুলো যাচাইয়ের পর প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করছে মিসরের সামরিক বাহিনী। তারা বিস্ফোরক বা অস্ত্র আছে কিনা, যাচাই করে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত ও ২৫০ জন জিম্মি হন। পরে ইসরায়েল হামলা চালিয়ে গাজায় নজিরবিহীন নৃশংসতা চালায়। তারা ৪৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। ২৩ লাখ বাসিন্দার প্রায় সবাই বাস্তুচ্যুত হন। একাধিকবার তাদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে দুর্বিষহ এক নৃশংসতার অবসান ঘটে।
.উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: ইসর য় ল
এছাড়াও পড়ুন:
সংবিধানে সমতা ও টেকসই উন্নয়নের নীতি
যুগে যুগে, দেশে দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছে, আইনশাস্ত্রে তা প্রতিফলিত প্রিন্সিপল অব ইকুইটি বা সমতার নীতিতে। ইকুইটি বা সমতার নীতি মূলত সবার জন্য ন্যায্যতা নিশ্চিত করা এবং একটি গ্রহণযোগ্য জীবনমান বজায় রাখার অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেয়। সহজভাবে বললে, এটি ন্যায়বিচার এবং সুষ্ঠু বণ্টনের ধারণা তুলে ধরে। বিশেষ করে সমাজের অবহেলিত বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণের দিকে গুরুত্ব দেয়। এসব জনগোষ্ঠীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত না করলে অসমতা দীর্ঘস্থায়ী হয়। লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম বা আয়ের ভিত্তিতে এ ধরনের অবহেলিত গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা যায়।
সমতার নীতি শুধু বর্তমান সময়ের সমস্যার সমাধান নয়; এটি দুই ধরনের দৃষ্টিকোণ ধারণ করে– ‘প্রজন্মগত সমতা’ এবং ‘অন্তঃপ্রজন্মগত সমতা’। প্রজন্মগত সমতা বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে ন্যায্যতা নিশ্চিত করে; আর অন্তঃপ্রজন্মগত সমতা বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে ন্যায্যতার দিকে মনোযোগ দেয়। এই দুই দিক আবার একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্তমান সময়ে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অসমতাগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আজকের সমতা ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
টেকসই উন্নয়নের ধারণাটি সমতার নীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ১৯৮৭ সালের ব্রুন্টল্যান্ড রিপোর্টে টেকসই উন্নয়ন বলতে ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্য ব্যাহত না করে বর্তমান প্রজন্মের প্রয়োজন মেটানো’ বোঝানো হয়েছে। এতে টেকসই উন্নয়নের ধারণায় বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে উভয় ধরনের সমতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ২০১১ সালে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীতে উপরোক্ত নীতিগুলোর কিছুটা প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এই সংশোধনীতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা এবং উন্নয়নকে বাংলাদেশ সংবিধানের মূলনীতির অংশ হিসেবে যুক্ত করা হয়। এতে সরকারকে পরিবেশ রক্ষা এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশোধনীতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের কথা উল্লেখ করে প্রকারান্তরে উভয় ধরনের সমতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
যেহেতু অনেক আন্তর্জাতিক কনভেনশন এবং চুক্তির একটি পক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়নের ধারণা ও নীতিটি গ্রহণ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ; রাষ্ট্রীয় নীতির একটি মৌলিক নীতি হিসেবে টেকসই উন্নয়নের ধারণাটি যুক্ত করে নেওয়াকে তর্কাতীতভাবে সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলা যায়। এ ছাড়া, বাংলাদেশ সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদ দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং শ্রমজীবী, কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শোষণ থেকে মুক্তির দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর দিয়েছে। সংবিধানের এই নীতিগুলো আদালতে কার্যকর নয়। বাংলাদেশ সংবিধানের ৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংবিধানের মূলনীতিগুলো রাষ্ট্রের নীতি ও শাসন ব্যবস্থার জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে, কিন্তু বিচারিকভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। আদালতও এই অবস্থান সমর্থন করেছেন। যেমন কুদরাত-ই-এলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ (১৯৯২) মামলার রায়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টও উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রাখে, যেখানে আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতা, সমতা এবং ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুরক্ষিত থাকবে। যদি মূল সংবিধানের উদ্দেশ্য মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে সমতা নিশ্চিত করা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে– কেন বাংলাদেশের সংবিধানে সামাজিক-অর্থনৈতিক অধিকার এবং রাষ্ট্রনীতির মৌলিক নীতিগুলো বিচারিকভাবে কার্যকর থাকবে না। বর্তমান সময়ে যখন সংবিধানের নানাবিধ সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে চারদিকে আলোচনা চলছে, তখন প্রস্তাব করা যায়, সমতা ও টেকসই উন্নয়নের নীতিগুলো সংবিধানে আরও শক্তিশালীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এর ফলে রাষ্ট্রের যে কোনো পর্যায়ে এই নীতিগুলোর লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ নাগরিকদের আদালতের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত হবে।
সমতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সংবিধানের যে কোনো সংশোধনী কিংবা সংযুক্তি রাষ্ট্র কিংবা সরকারের জন্য এক ধরনের সাংবিধানিক দায় তৈরি করবে– এ কথা সত্যি। কিন্তু পৃথিবীতে এমনও অনেক রাষ্ট্র রয়েছে, যেখানে এই সাংবিধানিক দায় না থাকা সত্ত্বেও শুধু জনকল্যাণের দরদটুকু আমলে নিয়েও সুবিধাবঞ্চিতদের প্রতি রাষ্ট্রের যথাযথ কর্তব্য ঠিক ঠিক পালিত হয়। আর এটি সম্ভব হয় রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছার কারণে।
মাহতাব শাওন: শিক্ষক ও গবেষক, গুয়েল্ফ বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা; আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং খালেদ জামান: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট