রেলওয়ে শ্রমিক দলের দুই গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক এম আর মঞ্জুর ও পেয়ার আহমেদ। রেলে এখন তাদের কথাই আইন। আধিপত্য বিস্তারে নিজেদের মধ্যে কোন্দলে জড়ানোর পাশাপাশি রেলকে বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন এই দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা। এখন আর তাদের টেবিলে পাওয়া যায় না। কাজ ফেলে তারা দলবল নিয়ে এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। রীতিমতো তালিকা তৈরি করে রেলের পূর্বাঞ্চলে বদলি বাণিজ্যে নেমেছেন। কেউ বদলি কিংবা বদলি ঠেকাতে দ্বারস্থ হচ্ছেন তাদের। শুধু তারাই নন, রেলে টেন্ডার ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে মরিয়া হয়ে উঠেছেন চট্টগ্রামের দুই যুবদল নেতাসহ তাদের পরিবারের আট সদস্য।
দীর্ঘ ১৫ থেকে ১৬ বছর একটানা রেলওয়েকে নিয়ন্ত্রণ করেছে আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন শ্রমিক লীগ সমর্থিত রেলওয়ে শ্রমিক লীগ। কাউকে পরোয়া করতেন না সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। এখনকার মতো তারাও দলবল নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। টেন্ডার, নিয়োগ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, বদলি নিয়ন্ত্রণ, রেলের সম্পদ ভোগদখল– সব কিছুতেই ছিলেন তারা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই সব দাপুটে নেতা আত্মগোপনে। এখন তাদের স্থান নিয়েছে বিএনপির অঙ্গসংগঠন শ্রমিক দল সমর্থিত রেলওয়ে শ্রমিক দল। ফলে এক দখলদার গোষ্ঠীর বিদায়ের পর আরেক দখলদারের কবলে রেলওয়ে। ধীরে ধীরে শ্রমিক লীগ নেতাদের কায়দায় রেলের সেই ‘রাজত্ব’ নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছেন বিএনপি সমর্থিত নেতারা। তাদের দাপটের কাছে অসহায় রেলের বড় কর্তারা।
নিয়ন্ত্রণে মরিয়া দুই গ্রুপ
রেলে আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া রেলওয়ে শ্রমিক দলের বিবদমান দুটি গ্রুপ। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকায় এখন নিজেদের শক্তি দেখাতে চাইছেন তারা। এ নিয়ে মারামারি-কোন্দলের ঘটনাও ঘটছে। সিআরবিতে একাধিকবার গিয়ে দেখা গেছে, শ্রমিক দল নেতা এম আর মঞ্জুর ও পেয়ার আহমেদ অনুসারী নেতাকর্মীকে নিয়ে সিআরবিতে ঘোরাফেরা করছেন। তারা তো কাজ করছেন না, তাদের সঙ্গে থাকা কর্মীরাও কাজ ফেলে নেতাদের পেছনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বেপরোয়া আচরণে কর্মকর্তারাও ভয়ে থাকেন।
রেলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আগের শ্রমিক লীগ নেতাকর্মীর মতো একই কায়দায় এ কাজটি করছেন রেল শ্রমিক দলের নেতারা।
এ ব্যাপারে শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এম আর মঞ্জুর সমকালকে বলেন, রেলের শ্রমিক-কর্মচারীর সুবিধা-অসুবিধা আমাদের দেখতে হয়। এ কারণে রেলের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অফিসে আমাদের যেতে হয়।
নেপথ্যে আট ভাই
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদরদপ্তর সিআরবি এবং পাহাড়তলীতে (সিসিএস ও কারখানা) টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে দুই যুবদল নেতার বিরুদ্ধে। তারা হলেন নগরীর খুলশী থানার যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল হোসেন ওরফে পিচ্ছি হেলাল ও নগর যুবদলের সদস্য সাখাওয়াত কবির সুমন ওরফে ক্যাডি সুমন। প্রভাব খাটিয়ে তাদের অপর আট ভাই টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে এরই মধ্যে ব্যবসায়ীদের মারধর ও অফিস থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়েছেন।
একাধিক ঠিকাদার জানিয়েছেন, ক্যাডি সুমনের ভাই এনায়েত কবির বাংলাদেশ রেলওয়ে স্পেয়ার্স অ্যান্ড সাপ্লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি। তাঁর ভাই আহসানুল কবির নোমান, এনামুল নোটন ও জিএম মোর্শেদ সুজনও রেলের ঠিকাদার ব্যবসায়ী। এ ছাড়া পিচ্ছি হেলালসহ চার ভাই মোক্তার হোসাইন, মাসুদ হোসাইন ও মোহাম্মদ শাহিন ঠিকাদার ব্যবসায়ী। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে চুপিসারে ব্যবসা করলেও এখন রাতারাতি স্বরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। দুই পরিবারের আট ভাইয়ের হুমকি-ধমকিতে আতঙ্কে থাকেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেলওয়ের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদা ও দখলবাজিতে নেমেছেন খুলশী থানা যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল হোসেন ও ক্যাডি সুমনের অনুসারীরা। কিছুদিন আগে হেলালের অনুসারী ছাত্রদল কর্মী আলী হায়দার রেলের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক প্রকৌশল বিভাগের অফিসে ব্যবসায়ীদের হুমকি দিয়ে আসেন। কয়েকজনকে প্রকাশ্যে মারধর করেন। তাদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন একাধিক ব্যবসায়ী। তাদের কে কতদিন রেলে আসতে পারবে না, তাও বলে দেন তারা। এই সময়ের মধ্যে দেখা গেলে ফল ভালো হবে না বলেও হুমকি দেন। এতে অনেক ঠিকাদার ভয়ে রেলে যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে যুবদল নেতার ভাই এনায়েত কবির সমকালকে বলেন, আমরা সাংগঠনিকভাবে কিংবা ব্যক্তিগতভাবে কাউকে কোনো ধরনের হুমকি দিইনি। রাজনৈতিক কারণে কেউ হয়তো এটা করেছে। অভিযোগ অস্বীকার করেন যুবদল নেতা হেলালও।
তবে হুমকি পাওয়া রেলের প্রকৌশল বিভাগের ব্যবসায়ী ও পণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহম্মদ বলেন, বিএনপির অঙ্গসংগঠনের অনেক নেতাকর্মী আওয়ামী লীগ আমলে নির্বিঘ্নে রেলে ঠিকাদারি ব্যবসা করেছেন। এখন দেশের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পছন্দের ঠিকাদার ছাড়া অন্যদের রেলে যেতে দিচ্ছেন না। তারা আমাকে ছয় মাস রেল অঙ্গনে যেতে নিষেধ করেছেন। তাই এখন রেলে যাচ্ছি না। একইভাবে অন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও এমন আচরণ করছেন তারা।
বদলি বাণিজ্যে নেতারা
রেলে সংগঠনটির দুটি গ্রুপ থাকলেও মঞ্জুর গ্রুপটি শক্তিশালী। নিজেদের কমিটিকে বৈধ বলে দাবি করেন এই সংগঠনের নেতারা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বদলি বাণিজ্যে মেতে উঠেছেন রেল শ্রমিক দলের নেতারা। প্রায় এক হাজার কর্মচারীর একটি তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে থাকা কর্মচারীদের সরিয়ে বিএনপি-শ্রমিক দল সমর্থক নেতাকর্মীকে সেসব পদে পদায়ন করা হচ্ছে। এতে হয়রানিমূলক বদলি হয়ে অনেক সাধারণ কর্মচারীকে চলে যেতে হচ্ছে দূর-দূরান্তে। বদলি ঠেকাতে অনেকে টাকা নিয়ে দৌড়াচ্ছেন নেতাদের কাছে।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে রেলের পূর্বাঞ্চলের সদরদপ্তর সিআরবির বিভিন্ন শাখায় কর্মরত একাধিক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, বঞ্চিতদের পদোন্নতি ও পছন্দের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়ে আসার নামে বদলি বাণিজ্য করছেন শ্রমিক দল নেতারা। পছন্দের জায়গায় যেতে এবং বদলি ঠেকাতে গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ।
রেলওয়ে শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক এম আর মঞ্জুর বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে আমাদের দুই হাজারেরও বেশি কর্মচারীকে দফায় দফায় হয়রানিমূলক বদলি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে এখন এক হাজার কর্মচারী অবসরে চলে গেছেন। হয়রানির শিকার কর্মরত হাজারখানেক কর্মচারীর তালিকা আমরা তৈরি করেছি। এখন তাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ফলে কাউকে বসাতে গেলে, কাউকে তো সরাতেই হবে। তবে কারও কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।
বড় স্থাপনায় নৈরাজ্য
রেলের সবচেয়ে বড় স্থাপনা হচ্ছে চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড (সিজিপিওয়াই)। নগরীর হালিশহর এলাকায় অবস্থিত বিশাল-বিস্তৃত কেপিআই অন্তর্ভুক্ত সিজিপিওয়াই শাখার শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন জিয়াউল হাসান। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকে হঠাৎ করেই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এই নেতা। অভিযোগ উঠেছে, স্টোরকিপারের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার সুযোগে রেলের মূল্যবান মালপত্র হরিলুট শুরু করেছেন তিনি। অনেকটা প্রকাশ্যেই পাচার করেন মালপত্র। এসব দেখেও না দেখার ভান করে যাচ্ছেন রেলের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সিজিপিওয়াইর সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আরএনবি সদস্য জানিয়েছেন, যে স্টোর থেকে মালপত্র বের করা হয়েছে, সেটি তালা লাগানো অবস্থায় পাওয়া গেছে। তালার চাবি থাকে জিয়াউলের কাছে। তালা না ভেঙে মালপত্র নিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো তিনিই এসব বের করে দিয়েছেন। এভাবে ওই কর্মচারী মালপত্র বের করে নিয়ে যান। এবার নৌবাহিনীর একটি টিমের হাতে ধরা পড়ায় কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে জিয়াউল হাসান বলেন, ওই ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িত নই। শ্রমিক দল সিজিপিওয়াই ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক হলেও ক্ষমতা খাটাই না।
এ ব্যাপারে অপর গ্রুপের নেতা পেয়ার আহমেদের অফিসে গেলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: য বদল ন ত ল গ সরক র ন ত কর ম ব যবস য় কর ম র এক ধ ক ব র কর র কর ন ক র কর দল ন ত ক কর ম স আরব স গঠন ব এনপ সদস য আওয় ম করছ ন র লওয় সমর থ র আহম
এছাড়াও পড়ুন:
মির্জাপুরের ‘গোড়ান-সাটিয়াচড়া প্রতিরোধ যুদ্ধ দিবস’ আজ
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের ‘গোড়ান-সাটিয়াচড়া প্রতিরোধ যুদ্ধ দিবস’ আজ। ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে টাঙ্গাইল যাওয়ার পথে মির্জাপুরের অদূরে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। এর নেতৃত্ব দেন ৭০ এর নির্বাচনে মির্জাপুর থেকে নির্বাচিত বয়োকনিষ্ঠ এমএলএ ফজলুর রহমান খান ফারুক।
সেদিন পাকহানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে আকাশ থেকে আক্রমণ করতে বাধ্য হয়েছিল। এতে ওই এলাকায় বিপুলসংখ্যক এলকাবাসী শহীদ হন। সেই সঙ্গে আশপাশের অনেকগুলো গ্রাম আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছিল। সেদিনের বীর শহীদদের স্মরণে প্রতি বছর মির্জাপুর গোড়ান-সাটিয়াচড়া প্রতিরোধ যুদ্ধ দিবস পালন করা হয়।
৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা পেয়ে টাঙ্গাইল জেলাবাসীও পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রস্তুতি শুরু করে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে ঢাকায় ভয়াবহ গণহত্যা চালায়। রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা, ইপিআর সদর দপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ করে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।
পরের দিন ২৬ মার্চ রাতে টাঙ্গাইল থেকে কয়েকটি জিপ ও কার যোগে টাঙ্গাইলের ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা মির্জাপুর সদরের ব্রিজে কয়েকটি ককটেল ফাটিয়ে ব্রিজ ধ্বংস করার চেষ্টা করে। কিন্তু ব্রিজের পাশের বাইমহাটি গ্রামবাসীরা তাদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ব্রিজ ধ্বংস থেকে তাদের বিরত করে। এভাবেই চলে যায় কয়েক দিন। এর মাঝে মধ্যেই হানাদার বাহিনী টাঙ্গাইল রওয়ানা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছিল। অবশেষে তারা ৩ এপ্রিল টাঙ্গাইলের দিকে রওয়ানা দেয়। বিশাল বহর নিয়ে জয়দেবপুর চৌরাস্তা , কালিয়াকৈর হয়ে মির্জাপুরে ঢোকে। এই পথ পরিক্রমায় তারা তেমন কোন বাঁধার মুখে না পড়লেও গোড়ান ব্রিজের কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে ফজলুর রহমান ফারুকের বন্দুক থেকে প্রথম গুলি ছোঁড়ার মাধ্যমে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথমে ধল্যা বাস স্টেশনের কাছে বাঙ্কার খুঁড়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হলেও জনবসতিপূর্ণ এলাকা বলে সেখান থেকে সরে গোড়ান ব্রিজের কাছে প্রতিরোধ বলয় তৈরি করা হয়।
হানাদার বাহিনী ধল্যা বাস স্টেশনে পৌঁছার পর সেখানে বাঙ্কারের অস্তিত্ব পেয়ে কিছু সময় যাত্রা থামিয়ে দিয়ে চারদিকে গুলি ছোঁড়া শুরু করে। এভাবে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তারা আবার যাত্রা শুরু করে। সেখান থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে গোড়ান পৌঁছানোর পরেই প্রতিরোধ যোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখোমুখি হয় হানাদার বাহিনী। টাঙ্গাইলবাসী জানতে পারে, যেকোনো সময় পাকবাহিনী টাঙ্গাইলে প্রবেশ করবে। এজন্য মির্জাপুর থানার গোড়ান-সাটিয়াচড়ায় ছাত্র-জনতা ও ইপিআর সদস্যদের সমন্বয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়।
সে সময় টাঙ্গাইল সার্কিট হাউসে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি অবস্থান করছিল। ২৭ মার্চ ভোরে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ছাত্র যুবসমাজ তাদেরকে ঘিরে ফেলে। ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনারা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে বেরিয়ে আসে। কোম্পানি কমান্ডার মেজর কাজেম কামালসহ পাকিস্তানি ২ জন অফিসারকে আটক করা হয়। মার্চ মাসের শেষের দিকে মেজর শফি উল্লাহর নেতৃত্বে জয়দেবপুর থেকে বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনারা অস্ত্র গোলাবারুদ ও সামরিক যানসহ টাঙ্গাইলে আসেন। পরে তারা ময়মনসিংহ এর দিকে চলে যান।
এ বিষয়ে সেদিনের প্রতিরোধ যোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এসএম আব্দুল মতিন ফাক্কন বলেন, “৩ এপ্রিল পাকবাহিনী মির্জাপুর সদর অতিক্রম করে ধল্লা পৌঁছানোর আগে সেখানে অবস্থান নিয়েছিলেন ফজলুর রহমান খান ফারুকের নেতৃত্বে একটি দল। সেখানেই ফজলুর রহমান খান ফারুক তার সঙ্গে থাকা দোনলা বন্দুকের গুলি ছুঁড়ে পাকহানাদার বাহিনীকে প্রথম চ্যালেঞ্জ জানান।”
তিনি বলেন, “সংখ্যায় কম থাকায় তারা পিছু হটতে বাধ্য হন। পাক হানাদার বাহিনী পার্শ্ববর্তী বানিয়াড়া গ্রামের দিকে ঢুকতে গিয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে আবার টাঙ্গাইলের দিকে রওয়ানা হয়। অল্প কিছু দূর যাওয়ার পর তারা গোড়ান গ্রামে অবস্থান নেওয়া ছাত্র-যুবক ও ইপিআর এর তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে। সে প্রতিরোধ ভেঙে পাকহানাদার বাহিনী সাটিয়াচড়া নামক স্থানে এসে পৌঁছলে সেখানেও তুমুল প্রতিরোধের মুখে পড়ে। কয়েক ঘণ্টা যুদ্ধের পর ছাত্র যুবক ও ইপিআরের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। ৬ জন ইপিআর ও ছাত্রলীগ নেতা জুমারতসহ ৩৩৭ জনকে সেখানে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকবাহিনী। একই সঙ্গে গ্রামদুটো পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।”
আব্দুল মতিন ফাক্কন বলেন, “আমার সঙ্গে ছিলেন ইপিআর সদস্য আব্দুল আজিজ নামের একজন সিপাহী। তার সঙ্গে থাকা এলএমজি থেকে অনবরত গুলি করে পাকহানাদার বাহিনীকে ঠেকানোর চেষ্টা করেন তিনি। এ সময় হঠাৎ করে এলএমজির গুলির চেইন আটকে যায়। হানাদার বাহিনীর গুলির মুখে টিকতে না পেরে আমরা গ্রামের ভেতর ঢুকে যাই। সেখানে অনেক চেষ্টা করে তার চেইন ঠিক করা হয়। ততক্ষণে হানাদার বাহিনী আমাদের কাছাকাছি চলে এসেছে।”
সেদিনের কথা বর্ণনাকালে আব্দুল মতিন ফাক্কনের গলা ধরে আসে। তিনি কথা বলতে পারছিলেন না। নিজেকে সংবরণ করে আবার বলেন, “আজিজ ভাই আমাকে বললেন তুমি চলে যাও। আমি এখানে আছি। কিন্তু তাকে আমি ছেড়ে যেতে চাইছিলাম না। তিনি আমাকে সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করলেন। একটি গাব গাছ দেখিয়ে বললেন, গাছটিতে অনেক পাতা। এই গাছে উঠে আমি ওদের দিকে নজর রাখবো। বলেই তিনি গাছে উঠে যান। আমি দূর থেকে দেখছিলাম হানাদার বাহিনী গুলি করতে করতে গাব গাছটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরেই আজিজ ভাইয়ের এলএমজির গুলি বন্ধ হয়ে যায়।”
তিনি বলেন, “পুরো গ্রামে আগুন আর গ্রামবাসীদের যাকে সামনে পেয়েছে তাকেই নির্মমভাবে হত্যা করেছে ওরা। পরে জানতে পারি গাব গাছ থেকে যে ব্যক্তি গুলি করছিলেন তার পুরো শরীর গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে গাছের নিচে পড়েছিল। পরে তাকে অন্যান্য গ্রামবাসীর সঙ্গে গোড়ান গণকবরে সমাহিত করা হয়। আমি শুধু তার নামটাই জানতে পেরেছিলাম। তার বাড়ি কোথায় ছিল কিছুই জানার সময় পাইনি। গোড়ান গণকবরে আজিজ ভাইসহ অনেক বীরের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছিল। এছাড়াও হাবিলদার আব্দুল খালেক, হাবিলদার খলিলুর, আব্দুল গফুর, মকবুল হোসেন, করটিয়া সরকারি সা’দত কলেজ শাখার ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জুমারত আলীসহ অনেকেই সেদিন শহীদ হন। পাকবাহিনী সেদিনই পথে পথে নারকীয় হত্যা চালিয়ে বিকেলের দিকে টাঙ্গাইলে প্রবেশ করে।”
গোড়ান প্রতিরোধ যুদ্ধে শহীদদের স্মরণে মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৪৯ বছর পর সেখানে স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ প্রকল্পের অধীনে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর স্মৃতি সৌধটি নির্মাণ করেছে।
ঢাকা/টিপু