বিএনপি, অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষ
Published: 27th, January 2025 GMT
গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের তিন দিন পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। অভ্যুত্থানের পরপর বঙ্গভবনে সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকে কিংবা সরকার গঠনের সময় আমরা প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্রনেতাদের উষ্ণ সম্পর্ক দেখি। সময় গড়াতে থাকে; সরকার, বিএনপি ও ছাত্রনেতা– সকলেই যার যার অবস্থান থেকে নিজেদের সংহত করবার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করে, এর চারটি কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়, অন্যগুলোও জমা দেবে; এরপর অংশীজনের সঙ্গে সরকার সংস্কার নিয়ে চূড়ান্ত ফয়সালায় বসবে। নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করে বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানায়; ছাত্রনেতারা রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেন। রোজার আগেই দলের ঘোষণা আসতে পারে।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর শ্বেতপত্র প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করে। প্রতিবেদন জমা পড়বার দেড় মাস পরও এ বিষয়ে সরকার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি; উল্টো জাতির ঘাড়ে অযাচিত ভ্যাট বসিয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রীতিমতো উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতিতে বিএনপির সঙ্গে ছাত্রনেতাদের তৈরি হয়েছে দূরত্ব।
সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলসহ সকলে একমত হওয়ার কারণে সংস্কার কমিটির কাছে সুপারিশও জমা দিয়েছে সবাই। কাজেই বিএনপির সঙ্গে ছাত্রনেতাদের বিরোধ হলো কোথায়? কীভাবে?
২১ জানুয়ারি বিবিসি বাংলার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘যদি সরকার পূর্ণ নিরপেক্ষতা পালন করে, তাহলেই তারা নির্বাচন পরিচালনা করা পর্যন্ত থাকবে। তা না হলে নিরপেক্ষ সরকারের প্রয়োজন হবে।’ সরকার কি নিরপেক্ষ নেই? এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এখনও নিরপেক্ষই আছে। তবে ছাত্ররা রাজনৈতিক দল করছেন। সরকারে যে তিন ছাত্র প্রতিনিধি আছেন, তারা রাজনৈতিক দলে যুক্ত হলে সেই নিরপেক্ষতা থাকবে না।’
বিএনপি মহাসচিবের এই সাক্ষাৎকার ছাত্রনেতাদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। পরদিন উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘বিএনপি মহাসচিবের দাবি আরেকটি ১/১১ সরকার গঠনের ইঙ্গিত।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘রাষ্ট্রপতির পরিবর্তন, সংস্কার, নতুন সংবিধান, জুলাই ঘোষণা– সব ইস্যুতেই বিএনপি বিরুদ্ধ অবস্থান নিয়েছে। অথচ এগুলোর কোনোটাই ছাত্রদের দলীয় কোনো দাবি ছিল না। দেশের স্থিতিশীলতা, বৃহত্তর স্বার্থ এবং জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার জন্য ছাত্ররা বারবার তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। এর মানে এই নয় যে গণতন্ত্রবিরোধী ও অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাবিরোধী কোনো পরিকল্পনা হলে সেখানে আমরা বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেব।’
ছাত্রনেতাদের বিএনপিবিরোধী বক্তব্যের মধ্যেই অন্যতম শীর্ষ ছাত্রনেতা ও উপদেষ্টা মাহফুজ আলম শনিবার চাঁদপুরে ছাত্র-জনতার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে বলেন, ‘আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হবে না’ (প্রথম আলো, ২৬ জানুয়ারি ২০২৫)। তিনি আরও বলেছেন, ‘বিএনপি-জামায়াত নির্বিশেষে যত রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন আছে, শ্রমিক, নারী, আলেম-ওলামা আছেন– যারা বাংলাদেশপন্থি, সবাই বাংলাদেশে থাকবেন এবং সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তারা ইতিবাচক একটি প্রতিযোগিতার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন।’
২.
সরকারের উপদেষ্টাদের বক্তব্যে স্পষ্ট– রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন, সংস্কার, নতুন সংবিধান, জুলাই ঘোষণা– এসব ছাত্রদের দলীয় দাবি না হলেও তারা এসব দাবি নিজেদের বলেই ধারণ করেন। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার যেহেতু দাবিগুলোর পক্ষে অবস্থান নেয়নি, তার মানে– অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্রদের সব দাবির সমর্থক নয়। এ ক্ষেত্রে বলা যায়, ছাত্রদের দাবিদাওয়া পূরণের জন্য নিজেদের রাজনৈতিক দল গঠনই শ্রেয় এবং তারা সে পথেই এগোচ্ছেন। নাহিদ ইসলাম পরে বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, রাজনৈতিক দলে যোগ দিলে তারা (ছাত্রনেতারা) সরকারে থাকবেন না।
কিন্তু সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে নিজেদের আলাদা এজেন্ডা সরাসরি বলা কতটা যুক্তিসংগত, তা অবশ্যই ভেবে দেখবার মতো। বাহাত্তরের সংবিধান আমরা ছুড়ে ফেলব– মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধান সম্পর্কে এসব বক্তৃতা সমাজে কোন ধরনের বার্তা দেয়? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পুরো জাতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একটি দলকে মুখের কথায় গণহত্যার দায় থেকে মুক্ত করা যায় কীভাবে?
৩.
শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের একদলীয় শাসনে পিষ্ট তারুণ্যের প্রতি সংবেদনশীল হতেই হবে। জুলাই-আগস্টে আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন বাহিনী যে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, যেভাবে শিশু-তরুণ, ছাত্র-জনতা নির্বিচারে নিহত হয়েছেন, তার বিচারও অবশ্যই হতে হবে। নিজের দেশে আপন মানুষের বুকে বুলেট ছুড়ে দিল্লিতে আশ্রয় নিয়ে নিশ্চয়ই বিচার এড়াতে পারবেন না শেখ হাসিনা ও তাঁর অনুসারীবৃন্দ। সেটি যেমন অবশ্যগ্রাহ্য প্রসঙ্গ; তেমনি যুক্তিগ্রাহ্য আরেক প্রসঙ্গ– একাত্তরের গণহত্যার বিচার অবশ্যই হতে হবে। ছাত্রনেতাদের বিবেচনা এক পাল্লায় প্রত্যাশা করি।
বিএনপির প্রতি যে ক্ষোভ বর্তমান ছাত্রনেতাদের; সেটিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। ছাত্রনেতারা বোঝাতে চাইছেন, ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়াই বিএনপি তড়িঘড়ি নির্বাচনে অংশ নিয়ে ক্ষমতায় আসীন হতে চাইছে। যদিও বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি ও নির্বাচন সংস্কার কমিটির কাছে জমা দেওয়া ৬২ দফা সুপারিশ তা বলে না। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিএনপি নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেছে, এক ব্যক্তির স্বৈরশাসন এ দেশের ছাত্র-জনতা আর মানবে না। কাজেই দূরত্ব কমিয়ে বরং আমরা বিএনপির সঙ্গে ছাত্রনেতাদের সরাসরি বৈঠক প্রত্যাশা করি। আলোচনা মতপার্থক্য কমিয়ে সমাধানের পথ বাতলে দেয়। তবে সরকারে থেকে এসব রাজনৈতিক আলোচনা সংগত নয়; বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক সরকার নয়। ব্যক্তিগত ও দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য অবশ্যই সরকার থেকে পদত্যাগ করে রাজনৈতিক দলে যুক্ত হওয়াই যুক্তিসংগত।
যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জুলাই-আগস্টের অসামান্য গণঅভ্যুত্থান, বর্তমান সরকারও কি সেই বৈষম্যবিরোধী প্রত্যয়ে নিজেদের দৃঢ় রাখতে পারছে? ২৫ জানুয়ারি ‘শ্বেতপত্র ও অতঃপর: অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, সংস্কার ও জাতীয় বাজেট’ শীর্ষক আলোচনায় কমিটির প্রধান দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘অনেকের মতে, অর্থনীতির ক্ষেত্রে এ সরকার আগের সরকারের মতোই কাজ করছে।’ দেশে বিরাজমান আকাশপাতাল ব্যবধানের অর্থনৈতিক বৈষম্য রোধে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার যেমন প্রয়োজন; তার চেয়ে কম প্রয়োজন নয় দেশে অর্থনৈতিক সংস্কারের।
বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নিয়ে ছাত্রনেতাদের সংশয় অসংগত নয়। তাদের অতীত কার্যকলাপ তারুণ্যকে সংশয়াচ্ছন্ন করে। তবে এই অমিত সাহসী তারুণ্যের নিজের দেশের ক্ষুধামন্দায় আক্রান্ত মানুষ নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তার প্রকাশ আমরা দেখি না। গত ১৮ অক্টোবর ইউএনডিপি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৪ কোটি ১৭ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। তাদের মধ্যে ৬ দশমিক ৫ শতাংশের অবস্থা গুরুতর।
এই গুরুতর দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা মানুষগুলো রাজনীতি বোঝে না; বেঁচে থাকার ন্যূনতম উপাদান সন্ধানে তাদের জীবন যায়। দেশ গড়ার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী রাজনীতিবিদ ও ছাত্রনেতৃত্ব সকলকেই বাংলাদেশের প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
mahbubaziz01@gmail.com
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: ব এনপ পর স থ ত অবস থ ন সরক র র র জন য ন র জন ত র জন আওয় ম
এছাড়াও পড়ুন:
চুয়াডাঙ্গায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুইজনের মুত্যু
চুয়াডাঙ্গায় পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ইয়াসিন আলী (২৪) ও মাহির তাজয়ার তাজ (১৫) নামে দুইজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে।
বুধবার (২ এপ্রিল) চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ সড়কের নবিননগরে একটি ও গত ২৭ মার্চ চুয়াডাঙ্গা শহরের টাউন ফুটবল মাঠের সামনে অপর দুর্ঘটনাটি ঘটে।
নিহত মাহির তাজওয়ার তাজ আলমডাঙ্গা উপজেলার গড়চাপড়া গ্রামের ইউসুফ আলী মাস্টারের ছেলে ও ইয়াসিন আলী চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার তালতলা গ্রামের দিদার আলীর ছেলে।
চুয়াডাঙ্গা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খালিদুর রহমান, জানান, অসাবধানতা ও বেপরোয়া মোটরসাইকেল ড্রাইভ করতে যেয়ে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।
বুধবার বিকালে চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ সড়কের নবিননগরে দুটি মোটর সাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে মাহির তাজওয়ার তাজ গুরুতর আহত হয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। রাতে তার শারিরিক অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করে। পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে রাজশাহী নিয়ে যাওয়ার পথে রাত ৮ টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে মাহির মারা যায়।
অন্যদিকে গত ২৭ মার্চ চুয়াডাঙ্গা শহরের টাউন ফুটবল মাঠের সামনে ইয়াসিন আলী মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দ্রুতগামী ট্রাকের নিচে পড়ে যায়। এসময় তার দুই পা ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে গুঁড়িয়ে যায়। তাকে প্রথমে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত ৬ দিনের মাথায় বুধবার (২ এপ্রিল) রাত ১১টার দিকে ইয়াসিন মারা যায়।
দুটি দুর্ঘটনায় কোনো পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ দায়ের না করায় সুরতহাল রিপোর্ট শেষে স্ব স্ব পরিবারের কাছে তাদের মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।
ঢাকা/মামুন/টিপু