বিপ্লবী ছাত্রদের স্বপ্ন ভেঙে পড়ছে বেকারত্বে
Published: 23rd, January 2025 GMT
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা একটি স্বৈরাচারী সরকারকে উৎখাত করতে পুলিশের বন্দুকের মুখে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ৫ আগস্ট বিপ্লবের ছয় মাস পর অনেকেই বলছেন, চাকরি খুঁজে পাওয়া যেন প্রতিবাদের ব্যারিকেড সামলানোর চেয়েও কঠিন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোহাম্মদ রিজওয়ান চৌধুরীর মতো যুবকদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন এখন অনেকটা ম্লান। তিনি বলেন, শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী ড.
মূলত বেকারত্বই ছিল গত বছরের ৫ আগস্টের প্রতিবাদের প্রধান কারণ। তবে বিপ্লবের পর এই সমস্যার সমাধান হয়নি বরং আরও প্রকট হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশে চাকরিপ্রত্যাশীর সংখ্যা ২৬ লাখ ৬০ হাজারে পৌঁছেছে যা তার আগের বছরে ছিল ২৪ লাখ ৯০ হাজার। বলা চলে ,বেকারত্বের সংখ্যা ছয় শতাংশ বেড়েছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশকে সতর্ক করে বলেছিল, দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম 'গুরুতরভাবে ধীরগতিতে' চলছে, যেখানে মুদ্রাস্ফীতি দ্বিগুণের ঘরে পৌঁছেছে। তারপর ‘মরার ওপর খাড়ার ঘা’ হিসেবে তৈরি হলো সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাওয়া। পাশাপাশি ব্যয়ের চাপও দিন দিন বাড়ছে। এ অবস্থায় অনেকের কাছেই শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির উচ্ছ্বাস এখন ম্লান হতে চলেছে।
পলিটিক্যাল সায়েন্স বিভাগ থেকে স্নাতক করা রিজওয়ান বলেন, 'যদিও ড. ইউনূস তাঁর মন্ত্রিপরিষদে ছাত্রনেতাদের রেখেছেন, তবে আমি মনে করি আমাদের দাবিগুলো উপেক্ষা করা হচ্ছে। আমাদের প্রতিনিধিরা প্রশাসনে থাকলেও, আমাদের কণ্ঠস্বর তারা শুনতে পাচ্ছেন কিনা সে ব্যাপারে আমি অনিশ্চিত।'
৩১ বছর বয়সী শুক্কুর আলী সাহিত্য থেকে স্নাতক পাস করে তার বৃদ্ধ ও অসুস্থ বাবা-মাকে সাহায্য করার জন্য খণ্ডকালীন চাকরি করছেন। তিনি এএফপিকে বলেন, 'আমি কর্পোরেট চাকরি, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আবেদন করেছিলাম কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। এখন যে কাজ পাচ্ছি সেই কাজই করছি শুধুমাত্র আমার ন্যূনতম চাহিদা পূরণের জন্য'।
তিনি আরও বলেন, সংবাদপত্রে এখন তেমন কোনো চাকরির সংবাদ পাওয়া যায় না। এখন যেকোনো কাজই আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমি শুধুমাত্র একটি চাকরি চাই।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর কাছে এ দেশের পোশাক শিল্পের চাহিদা অনেকটাই এগিয়ে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করা ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পোশাক কারখানায় কাজের সুযোগ খুবই কম। এদিকে বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, বেকারদের মধ্যে শিক্ষিতদের হার ৮৭ শতাংশ।
তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলছে, তারা এই সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, কর বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই কর সংগ্রহ করে সরকার জনখাতে বিনিয়োগ করবে। এতে বিপুল সংখ্যক চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি আরও বলেন, আরও রাজস্ব সংগ্রহ নিশ্চিত করা এই সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার, কারণ আগের সরকার অর্থনীতিকে ভঙ্গুর অবস্থায় রেখে গিয়েছিল। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন 'অত্যন্ত কঠিন' যা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে নির্বাচনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে এই বছরের শেষে বা ২০২৬ সালের শুরুর দিকে। এরই মধ্যে সরকার কিছু সংস্কার করতে চাইছে যার মধ্যে রয়েছে সংবিধান ও সরকারি প্রশাসনের সংস্কার, যাতে স্বৈরতন্ত্র পুনরায় ফিরে আসার আশঙ্কা না থাকে।
অনলাইন চাকরির প্ল্যাটফর্ম বিডিজবস- এর প্রধান ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘সরকারি খাত প্রতি বছর সর্বোচ্চ ২০,০০০ থেকে ২৫,০০০ গ্রাজুয়েট নিয়োগ করতে পারে, যেখানে প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক হন। আর বেসরকারি খাত চাকরি দিতে পারে ৮৫ শতাংশ গ্রাজুয়েটকে। তবে সেখানেও আশার আলো কম। ৫ আগস্ট থেকে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে নিয়োগ ধীরগতিতে চলছে।'
ঢাকা চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, তরুণ চাকরিপ্রত্যাশীদের সহায়তায় বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে সরকারকে। এতে তরুণদের ব্যবসা শুরুর জন্য ঋণ প্রকল্প থাকতে হবে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগ ছিল মাত্র ১৭৭ মিলিয়ন ডলার। এটি আগের বছরের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশেরও কম। আগের শেখ হাসিনার শাসনামলে বিনিয়োগ ছিল ৬১৪ মিলিয়ন ডলার।
৩১ বছর বয়সী সুবীর রায় অর্থনীতিতে স্নাতক শেষ করে একটি সরকারি চাকরির পরীক্ষায় টিকেছিলেন কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে তা বাতিল হয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘আমার বাবা আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর জন্য একটি জমি বিক্রি করেছিলেন আর এখন আমি ফাঁকা হাতে বাড়ি ফিরছি। এরপর আমি বাবার সঙ্গে ধানক্ষেতে কাজ করব।’
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: র জন য চ কর র বছর র সরক র
এছাড়াও পড়ুন:
প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা না কমালে কিসের সংস্কার
সম্প্রতি সংস্কারবিষয়ক পাঁচটি কমিশনের সুপারিশ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত জানতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পাঠানো স্প্রেডশিটের জবাবে মতামত জানিয়েছে বিএনপি, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। নিজেদের দেওয়া মতামতে বিএনপি পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে, তারা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর পক্ষে নয়। অথচ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকে সৃষ্ট প্রায় সব সংকটের গোড়ায় রয়েছে এই প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র এবং জবাবদিহিহীন ক্ষমতাকাঠামো!
বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও রাজনীতি নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেছেন, যেমন আকবর আলি খান, তাঁরা দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের সংবিধান প্রধানমন্ত্রীর হাতে অস্বাভাবিক ক্ষমতা তুলে দিয়েছে। এমনকি সেটা বহু স্বৈরাচারের চেয়ে বেশি সাংবিধানিক ক্ষমতা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভোগ করে থাকেন।
এক দশক ধরে বাংলাদেশের গণপরিসরের বহুজন সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করে দেখিয়েছেন, কীভাবে সংবিধানের নানা অলিগলি দিয়ে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে পৌঁছায়। কীভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্র আদতে সাংবিধানিকভাবে একটা ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা এক পদে বা এক ব্যক্তির কাছে জবাবদিহিহীনভাবে পুঞ্জিভূত করাকেই বলা হচ্ছে সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র। এই সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রকে ব্যবহার করেই কিংবা এর বাইপ্রোডাক্ট হিসেবেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সব সংকট আবির্ভূত হয়েছে।
এই যে হাসিনার ভয়াবহ স্বৈরাচার বা ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠা এবং এর পরিণতিতে চব্বিশের জুলাই-আগস্ট মাসে হাজার দেড়েক নাগরিকের প্রাণহানির ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে, এমন এক সাংবিধানিক কাঠামো, যেখানে এক ব্যক্তির আঙুলের নির্দেশে সব হয়ে যেত। এই ফেনোমেনোনকে কিছুদিন আগেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ বলেছেন, ‘ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র’ এবং এই স্বৈরতন্ত্রের যাবতীয় উপাদান ’৭২–এর সংবিধানের মধ্য দিয়েই প্রবর্তন করা হয়।
আরও পড়ুনকোন কোন উপদেষ্টাকে সরাতে বলেছেন মির্জা ফখরুল০২ এপ্রিল ২০২৫যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের ক্ষমতাচর্চার জায়গাগুলো হচ্ছে, জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁদের প্রতিনিধি নিয়োগ দিতে পারবেন, নিয়োগকৃত প্রতিনিধিদের সব কাজের তদারকি করতে পারবেন, প্রতিনিধিরা কাজ করতে গিয়ে কোনো অন্যায়-অপকর্ম করলে তাঁদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারবেন এবং প্রয়োজনে মেয়াদ শেষে বা শেষ হওয়ার আগেই প্রতিনিধিকে শান্তিপূর্ণ পথে প্রত্যাহার করতে পারবেন।
এই আলোকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে এর তিন বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রের একদম ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সব জায়গায় জবাবদিহি থাকা, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত যে কাউকে অপসারণ করার শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থা থাকা ইত্যাদি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রে একদম শুরু থেকেই এগুলো অনুপস্থিত। তাই বারবার একই রকমের সংকট ঘুরেফিরে আসে। আর সংকটের সবচেয়ে উৎকট রূপ দেখা যায় ক্ষমতার পালাবদলের সময়।
রাষ্ট্রের প্রধান তিন বিভাগদুনিয়ার যেকোনো আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশে এইটা এখন প্রায় কাণ্ডজ্ঞানের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে রাষ্ট্রের প্রধান তিন বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য থাকতে হবে। নির্বাহী প্রধান তো নয়ই, এমনকি বিভাগকেও অন্য দুই বিভাগের ওপর কর্তৃত্ব করতে দেওয়া যাবে না।
কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী ৭০ অনুচ্ছেদ বলে, কোনো একজন সংসদ সদস্য যতই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টে যান না কেন, যদি উনি দলের নমিনেশনে ভোটে দাঁড়িয়ে থাকেন, তাহলে উনি দলের (আসলে দলের প্রধানের) সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে ভোট দিতে পারবেন না, তা সেই পার্লামেন্টে যত বড় গণবিরোধী আইনই পাস হোক না কেন!
এ জন্যই প্রতিবছর বাজেটসহ লুট-মহালুটের আইন পাস হয়, সেগুলো নিয়ে কথা বলা বন্ধ করতে সেসব আইনে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়। সেসব আইনের রাজনৈতিক বিরোধিতা বন্ধ করতে কথা দমন-জুলুমের আইন বানানো হয়। আর প্রতিনিয়ত জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার বন্দোবস্ত করার পরও সরকারি দলের কোনো এমপিকে ৫০ বছরে দলের বিরোধিতা করতে দেখা যায়নি।
আরও পড়ুনসংবিধান সংস্কারের বৈধতা দেওয়ার পথ কী ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫নির্বাহী বিভাগের অবস্থা দেখতে গেলে পাওয়া যায়, সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী যাঁকে ইচ্ছা মন্ত্রিসভায় নিয়োগ দেবেন, নিয়োগ বাতিল করবেন এবং নির্বাহী ক্ষমতা তাঁর একক কর্তৃত্বে প্রযুক্ত হবে। কিন্তু সংসদের কাছে ‘যৌথভাবে’ দায়ী থাকবে মন্ত্রিসভা। অথচ সংসদের প্রধানও থাকেন প্রধানমন্ত্রী এবং ৭০ অনুচ্ছেদবলে মেজরিটি সদস্য থাকেন তাঁর আজ্ঞাবহ কর্মচারীর মতো প্রায়।
আবার সরকারের সব নির্বাহী ব্যবস্থা রাষ্ট্রপতির নামে গৃহীত হবে, কিন্তু রাষ্ট্রপতি তাঁর সব কাজ করবেন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮/৩ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর ‘পরামর্শে’। কিন্তু কী সেই পরামর্শ, তা নিয়ে কোথাও প্রশ্ন করা যাবে না। আবার রাষ্ট্রপতি নিয়োগ হচ্ছে সংসদের মেজরিটি সদস্যের (মানে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায়) ভোটে এবং তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও থাকে সেই ৭০ অনুচ্ছেদের সংসদের কাছে। তাই অতীতে দেখা গেছে, ‘পরামর্শ’ ইগনোর করা তো দূরের কথা, এমনকি কবর জিয়ারতের অনুমতিও থাকে না রাষ্ট্রপতির।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এত প্রাণহানির পর বাংলাদেশ কোনোভাবেই আর এমন কোনো জায়গায় ফিরে যেতে পারে না, যেখানে আরেক হাসিনা বা আরেক আওয়ামী লীগের জন্ম হতে পারে! যে গণতন্ত্রের জন্য সুদীর্ঘকাল ধরে লড়াইয়ে লিপ্ত রয়েছে এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠী, এত রক্ত ঝরিয়েছে, তাদের আত্মদানের প্রতি এর চেয়ে বড় বেইমানি আর হতে পারে না, যদি আবারও হাসিনা তৈরির পথ রেখে দেওয়া হয়।এ তো গেল আইন ও নির্বাহী বিভাগের কথা। এদিকে বিচার বিভাগের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি, যিনি তাঁর সব কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে (পড়ুন নির্দেশে) করতে সাংবিধানিকভাবে বাধ্য। আবার বিচারক নিয়োগ দেবেন প্রধান বিচারপতির পরামর্শে, কিন্তু সেখানেও প্রধানমন্ত্রীর ‘নির্দেশ’!
আবার নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘সুপ্রিম কোর্টে অন্যূন ১০ বৎসরকাল অ্যাডভোকেট না থাকিয়া থাকিলেই’ নিয়োগের জন্য “যোগ্য” হয়ে যাবেন?’ সব পদে নিয়োগের জন্য কত কত পরীক্ষা–নিরীক্ষা সাক্ষাৎকার; কিন্তু বিচারক নিয়োগের জন্য সামান্য সাক্ষাৎকারেরও দরকার নেই! এতে পরিষ্কারভাবেই বোঝা যায়, দলীয় আনুগত্যই সর্বোচ্চ আদালতে বিচারক হিসেবে এবং বিচারক থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ পাওয়ার অন্যতম প্রধান যোগ্যতা। আর একদম ওপরই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে নিচের দিকের অবস্থা কেমন আর ৫০ বছরে আমরা কে কতটুকু ন্যায়বিচার পেয়েছি, সেটা তো সবার জানাই আছে। তার জন্য আর বিশদ ব্যাখ্যা না করলেও চলে।
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহআরেকটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হচ্ছে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠাগুলো কীভাবে ফাংশন করছে। প্রধান প্রধান সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, যেমন নির্বাচন কমিশন, অ্যাটর্নি জেনারেল, মহাহিসাব নিরীক্ষকসহ যেসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে ‘গলা ফাটানো’ হয়, সেগুলোর নিয়োগ, অপসারণ, কাজের শর্তাবলি প্রায় একই রকম। সবখানেই দায়িত্ব দেওয়া আছে রাষ্ট্রপতিকে এবং ‘অনুচ্ছেদ ৪৮/৩’–এর বলে ক্ষমতা সব প্রধানমন্ত্রীর হাতে। আর তাঁর হাতে ক্ষমতা থাকায় এসব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ গত ৫০ বছরে কতটুকু মানুষের পক্ষে ছিল, তা আমাদের অভিজ্ঞতায় পরিষ্কার।
আরও পড়ুনপুলিশ সংস্কার কি আদৌ হবে, কতটুকু হবে২৯ মার্চ ২০২৫বাংলাদেশের সংবিধানের সবচেয়ে বড় ওকালতি চাতুরি হচ্ছে, এই সংবিধানে রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে গোটা একটা পরিচ্ছেদ আছে এবং সেখানে রাষ্ট্রপতি পদের জন্যই আলাদা সাতটা অনুচ্ছেদ আছে, যেখানে ওই পদের সব দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করা, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী পদের দায়দায়িত্বের জন্য আলাদা কোনো পরিচ্ছদ তো দূরে থাকুক, একটা পুরো অনুচ্ছেদই নেই। অথচ বিভিন্ন পরিচ্ছদ-অনুচ্ছেদে জায়গায় জায়গায় রাষ্ট্রের সব বিভাগ ও সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে। আর কার্যক্ষেত্রে বাস্তবতা কী, সেটা আমাদের চোখের সামনে।
আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, সব পদের পদধারীদেরই সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা থাকলেও প্রধানমন্ত্রীকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয় না। কারণ, ক্ষমতার বিন্যাসটাই এমন, যিনিই প্রধানমন্ত্রী, তিনিই সংসদনেতা আর তিনিই দলীয়প্রধান থাকেন। তাই রাষ্ট্রের, সরকারের ও দলের সব ক্ষমতা তাঁর পায়ে গিয়ে লুটিয়ে পড়ে।
শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরবাংলাদেশ রাষ্ট্রের যত সংকট, তার বেশির ভাগই হচ্ছে ক্ষমতা হস্তান্তরের শান্তিপূর্ণ কোনো পথ শুরু থেকেই তৈরি করতে না পারা। তাই ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নে যখন সরকারি দলের অধীনে নির্বাচন হয়েছে, তাকে হারানো যায়নি আবার যখন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে, আগের সরকার ক্ষমতায় আসতে পারেনি।
কারণ, ’৭২ সালের সংবিধান অনুযায়ী, এমপি সাহেবরা এমপি থাকা অবস্থায় ডিসি-এসপিদের প্রোটোকলসহ যত রকম সরকারি/ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, সেগুলোসহই ইলেকশন করবেন আর তাঁদের বিরুদ্ধে যাঁরা ইলেকশন করবেন, তাঁরা সাধারণ মানুষের মতো ইলেকশন করবেন। স্থানীয় প্রশাসন-পুলিশ এমপির নির্দেশে (সরকারের নির্দেশে) কাজ করতে বাধ্য থাকে। আর সে জন্যই সরকারে রেখে বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো সরকারি দলকে হারানো যায়নি।
তারপরও যদি নির্বাচনে কোনো এমপি সাহেব হেরে যান, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগপর্যন্ত তিনিই এমপি থাকবেন। আর পুরো সরকারই যদি হেরে যায়, তাহলেও তাঁরা সরকারে থাকবেন; কারণ মেয়াদ শেষ হয়নি। এই অবস্থায় সেই সরকারি দলের কাছে পার্লামেন্টে যদি দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে, তাহলে তাঁরা চাইলে সেই সময়ে, এমনকি সংবিধান সংশোধনও করে ফেলতে পারেন। আর সংবিধান অনুযায়ী তাঁদের সেই কর্মকাণ্ড ‘বৈধ’ও বটে।
প্রধানমন্ত্রীর স্বৈরতান্ত্রিক সাংবিধানিক ক্ষমতা কমানোতে বিএনপির একমত না হওয়া আদতে প্রমাণ করে, বিএনপি সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রধান সংকটটা চিহ্নিতই করতে পারেনি। বিগত ১৫ বছরের রেজিমকে কেবল আওয়ামী লীগ/ হাসিনার উপস্থিতিই সংকট হিসেবে বিবেচিত হয়েছে তাদের কাছে। এটা খুব দুঃখজনক, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল, যারা বিগত রেজিমে সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত, দীর্ঘদিন ধরে যারা গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে, তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সংকটকে আমলে নিতে পারছে না।
ঐকমত্য কমিশনে দেওয়া মতামতের পর সংস্কার কোথায় হবে (গণপরিষদে নাকি সংসদে), তর্কটা আদৌ আর সেখানে নেই; বরং বিএনপির মতো গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করা দল এই মুহূর্তে সুসংহত গণতান্ত্রিক বন্দোবস্ত নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার চায় কি না, সেই প্রশ্নে তাদের আন্তরিকতা মারাত্মক প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিএনপির নেতৃস্থানীয়রা আজকাল ‘সংস্কার’ নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বক্তব্য দিচ্ছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এত প্রাণহানির পর বাংলাদেশ কোনোভাবেই আর এমন কোনো জায়গায় ফিরে যেতে পারে না, যেখানে আরেক হাসিনা বা আরেক আওয়ামী লীগের জন্ম হতে পারে! যে গণতন্ত্রের জন্য সুদীর্ঘকাল ধরে লড়াইয়ে লিপ্ত রয়েছে এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠী, এত রক্ত ঝরিয়েছে, তাদের আত্মদানের প্রতি এর চেয়ে বড় বেইমানি আর হতে পারে না, যদি আবারও হাসিনা তৈরির পথ রেখে দেওয়া হয়।
ফরিদুল হক যুগ্ম সদস্যসচিব জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)