‘এই মুহূর্তে এমন দাবি করব না যে, অভিনয়ে আমি খুব পারদর্শী। কিন্তু এও সত্যি, যে অভিনয়ের জন্য আমি তৃষিত; সেই তৃষ্ণা পরিণত শিল্পী হয়ে ওঠার। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে আমার উপলব্ধি এটাই, অভিনয় হলো জীবনের প্রতিচ্ছবি। ঘটনাবহুল নানা অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে যে কাহিনির বিন্যাস, তা সুনিপুণ অভিনয় দিয়েই বাস্তব করে তুলতে হয়। তাই প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু শেখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কখনও অগ্রজ শিল্পী ও নির্মাতাদের কাছে, কখনও আশপাশের মানুষ ও তাদের যাপিত জীবনকে দেখে। যখন ঘর ছেড়ে বাইরে পা রাখি, চেনা-অচেনা মানুষের ভিড়ে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করি। জানতে চাই, জীবন চাকা সচল রাখতে কে কীভাবে দিনমান লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের ভাবনার জগৎ, পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, আশা-আকাঙ্ক্ষা থেকে শুরু করে যা কিছু জানা ও বুঝে নেওয়ার সুযোগ পাই, তা হাতছাড়া করি না।’
ফারিন খানের মুখে এ কথাগুলো শুনে বোঝা গেল, অভিনয়ের নেশা তাঁকে দারুণভাবে পেয়ে বসেছে। তাই পরিণত শিল্পী হয়ে ওঠার বাসনায় যতভাবে যতকিছু শিখে নেওয়া যায়, তা শেখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অভিনয়ে খুব একটা পারদর্শী না ফারিন– এ কথা যদি আমরা মেনেও নেই, তবু বলতেই হবে, তিনি এ সময়ের সম্ভাবনাময়ী তারকাদের একজন। কেন এ কথা বলছি, তার অন্যতম উদাহরণ নির্মাতা কাজল আরেফিন অমির ‘ফিমেল-থ্রি’।
এই নাটকের শেষ দৃশ্যে কিছু সময়ের জন্য ফারিন খানকে দেখা গিয়েছিল। যেখানে তার আগমন ব্যাটারি গলির নতুন ভাড়াটে হিসেবে। সহঅভিনেতাদের সঙ্গে ছিল না কোনো সংলাপ। তবু এক্সপ্রেশনের মধ্য দিয়ে দর্শক নজর কেড়ে নিয়েছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, ‘ফিমেল-থ্রি’ মুক্তির পর অনেকে তাকে ‘ব্যাটারি গলির আগুন’ বলাও শুরু করেছিলেন; যা আভাস দেয়, আগামী সময়টা হতে চলেছে ফারিন খানের।
কোনো নাটকের একটি দৃশ্যে অভিনয় করেই রাতারাতি তারকা বনে যাবেন, সে কথা বিশ্বাস করেন না ফারিন খান নিজেও। তবে কিছু কাজ থাকে যা, ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে ধরা দেয়।
‘ফিমেল-থ্রি’ হলো সেই নাটক, যাকে ক্যারিয়ারে টার্নিং পয়েন্ট হিসেবেই উল্লেখ করতে চান এই অভিনেত্রী। তার কথায়, ‘আমরা যা কিছুই করি না কেন, তার জন্য চাই একটা ব্রেক থ্রু। ‘ফিমেল-থ্রি’ হলো সেই নাটক, যা আমাকে আলাদাভাবে দর্শকের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। এও প্রমাণ করেছে, চরিত্রের ব্যাপ্তি ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়; যতটা গুরুত্বপূর্ণ তার উপস্থাপন। সে কারণে অভিনয়ে গল্প, চরিত্র ও নির্মাতাকে প্রাধান্য দিয়ে আসছি।’ ফারিনের এ কথা জানা গেল, কাজের বিষয়ে তার বাছ-বিচারটা কেমন। এখন প্রশ্ন হলো, সিনেমার মাধ্যমে যার অভিনয়ে অভিষেক, সে এখন ছোটপর্দার দিকে ঝুঁকে পড়েছে কেন?
এর উত্তরে ফারিন বলেন, সিনেমায় আর কখনও অভিনয় করব না– এমন কথা জোর দিয়ে বলতে চাই না। ২০১৭ সালে আমি যখন ‘ধ্যাত্তেরিকি’ সিনেমায় অভিনয় করি, তখন বয়স অনেক কম ছিল। অভিনয়ের অনেক কিছুই আত্মস্থ করা হয়ে উঠেনি। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে অভিনয় করতে গিয়েই এই উপলব্ধি হয়েছে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, অভিনয় যতটা শেখা যায়, তা শিখেই বড়পর্দার জন্য ক্যামেরার সামনে দাঁড়ব।’ এ ভাবনা থেকেই কি থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হওয়া? ‘আসলেই তাই। যদিও এখন প্রাচ্যনাটের হয়ে মঞ্চে কাজ করা হয়ে উঠছে না, তবে নাট্যদলের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রেখেছি। তাদের কাছে কিছু না কিছু শেখার সুযোগ হচ্ছে।’ কিন্তু অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার আগেই দর্শক আপনাকে মডেল হিসেবে চিনেছে, এটা কীভাবে সম্ভব হলো?
এর জবাবে ফারিন বলেন, ‘এটা সম্ভব হয়েছে বন্ধুদের মাধ্যমেই। আমার উচ্চতা ৫ ফিট ৮ ইঞ্চি। এ জন্য বন্ধুরা প্রায়ই বলত, তোর উচিত র্যা ম্প মডেল হিসেবে কাজ করা। শুধু মুখে এ কথা বলেই ক্ষান্ত থাকেনি বন্ধুরা। ওরা জোর করে ফটোশুটও করিয়েছে। দেখিয়ে দিয়েছে মডেলিংয়ের জন্য যোগাযোগের রাস্তা। তাই অল্প-স্বল্প চেষ্টা থেকেই সুযোগ পেয়ে গেছি মডেল হিসেবে কাজ করার। কিন্তু ছয় মাসের মধ্যে রেকর্ডসংখ্যক কাজ করা হয়ে যাবে– তা কল্পনাও করিনি। বলা যায়, মডেলিং শুরুর ছয় মাসেই শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলোর বিজ্ঞাপন মডেল হওয়া থেকে শুরু করে শুভেচ্ছা দূত হওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়ে গেছে।’ ফারিনের মুখে এ কথা শুনে যে বিষয়ে কৌতূহল জাগে, তা হলো তাঁর অভিনয়ে আসা। মডেল হিসেবে যখন অনেকের নজর কেড়ে ফেলেছেন, তখন পথ বদলে ছোটপর্দায় অভিনয় করতে আসার কারণ?
এ প্রশ্নে ফারিন বলেন, ‘মডেল হিসেবে অনেকের নজরে পড়েছি ঠিকই, কিন্তু অভিনয়ের তৃষ্ণা তো থেকেই গেছে। ঠিক যেমন নাচের দুর্বলতা তেমনি অভিনয়ের প্রতি। দেশ-বিদেশের অনেক মঞ্চে পারফর্ম করেছি। সেই সুবাদে যে আনন্দ ও মানসিক শান্তি পেয়েছি, তা কখনও ভুলে যাওয়ার নয়। যদিও নাচের আগের মতো সময় দিতে পারছি না, তারপরও নাচ থেকে দূরে সরে যাওয়ার আদৌ কোনো ইচ্ছা নেই। একইভাবে অভিনয় ধরে রাখতে চাই। মানছি, আমার অভিনীত কাজের তালিকাটা ছোট। তারপরও ‘মনের মাঝে তুমি’, ‘ঠিকানা’, ‘পাবো কি তারে’, ‘ফিমেল-৩’, ‘প্রথম প্রেমের গল্প’, ‘কালো ছেলে’ নাটকগুলোর পাশাপাশি ওয়েব সিনেমা ‘ত্রিভুজ’সহ যে ক’টি কাজ করেছি, সেগুলো আমার লালিত স্বপ্ন পূরণের ভিত গড়ে দিয়েছে। তাই খ্যাতির মোহে নয়, শিল্পী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে একটু একটু করে পথ পাড়ি দিচ্ছি।’
উৎস: Samakal
এছাড়াও পড়ুন:
দিলীপ-সাধনার মরদেহের অপেক্ষায় স্বজনরা
বাড়ির বাইরে অপেক্ষা করছে এলাকাবাসী ও তার কিছু স্বজন। ভিতরে ঘরগুলোতে তালাবদ্ধ করে রাখা। অপেক্ষারত সকলেই নিহত দিলীপ কুমার ও তার স্ত্রীর মৃত্যুতে শোকাহত, কেউ কেউ খোঁজ নিচ্ছেন কখন পৌঁছাবে মরদেহ আর কেমন আছে চিকিৎসাধীন তাদের একমাত্র মেয়ে আরাধ্যা।
তবে বসতভিটায় দিলীপের বাবা-মা ও বোনরা না থাকায় চোখের জল ফেলার মতো ছিল না কেউ। বুধবার বিকেলে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা বোয়ালিয়া গ্রামে দিলীপ কুমারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এমন চিত্র।
একমাত্র মেয়ে আরাধ্যা, স্ত্রী সাধনা রানীসহ কয়েকজন নিকটা আত্মীয়কে নিয়ে কক্সবাজার যাচ্ছিলেন দিলীপ কুমার (৪২)। বুধবার ভোরে টঙ্গী থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেও আনন্দের সেই যাত্রা থমকে যায় চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা চুনতি জাঙ্গালিয়া এলাকায়। সেখানে নিয়ন্ত্রণ হারানো একটি বাসের সঙ্গে তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে মৃত্যু হয় দিলীপ কুমার, তার স্ত্রী সাধনা রানীসহ ১০ জনের।
তবে এ ঘটনায় প্রাণ বেচে যায় দিলীপ-সাধনার একমাত্র মেয়ে আরাধ্যা (৬)। বর্তমানে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত দিলীপ কুমার ও সাধনা রানী ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কাচেরকোল ইউনিয়নের বড়-বোয়ালিয়া গ্রামের বাসিন্দা। এর মধ্যে দিলীপ ওই গ্রামের দুলাল বিশ্বাসের ছেলে।
বাবা-মা'র একমাত্র ছেলে দিলীপ কুমার। অন্য তিন বোন বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতে থাকেন। ১৫ বছর ধরে গাজীপুর জেলার টঙ্গী এলাকার একটি বাইয়িং হাউজে চাকরি করতেন। কয়েক বছর পর নিজেই ছোট পরিসরে বাইয়িং হাউজ গড়ে তোলেন বলে জানায় এলাকাবাসী।
দিলীপের কাকাতো ভাই পলাশ কুমার বলেন, দিলীপ তার পরিবার নিয়ে প্রায়ই এলাকায় আসত। তার বাবা-মা কখনও ছেলের বাসায় আবার কখনও মেয়ের বাসায় থাকেন। তারা গ্রামে কম থাকেন। আমরা আনুমানিক ১১টার দিকে দুর্ঘটনার কথা শুনে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি দিলীপ ও তার স্ত্রী মারা গেছেন। তাদের মেয়ে আরাধ্যা চিকিৎসা নিচ্ছে চট্টগ্রাম মেডিকেলে।
দিলীপের বন্ধু শোভন কুমার কাজল বলেন, তাদের মরদেহ আনার কার্যক্রম চলছে। শুনেছি লোহাগাড়া থানা থেকে মরদেহ নিয়ে রওনা হয়েছে। ছোট্ট আরাধ্যার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।