‘হামার তিস্তার চরে এবার আলু নয়, সোনা ফলছে। সেই সোনা দেখে খুশি হইছুনু। কিন্তু এখন আলু হামাগোর গলার কাঁটা হইছে। লোনের চাপে পানির দামে বিক্রি করবার নাগছি। তাতে অর্ধেক লোকসান হইবে। এখন কী করমো, কী খামো সে চিন্তায় আইতোত (রাতে) নিন্দ (ঘুম) আইসে না।’
আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন উলিপুরের অর্জুনেরচরের কৃষক নজরুল ইসলাম। তিন একর জমিতে আলু আবাদ করতে ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিতে হয়েছে তাঁকে। প্রতি একরে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। ফলন ভালো হলেও দাম পাচ্ছেন না। উৎপাদন খরচ নিয়ে প্রতি কেজি আলুর দাম ২০ টাকা পড়লেও, বিক্রি করতে হচ্ছে ১২-১৩ টাকায়।
ক্ষোভ প্রকাশ করে গোড়াই পিয়ার চরের আলুচাষি চাঁদ মিয়া বলেন, ‘আড়তদারের কাছে অগ্রিম টাকা নিয়া চড়া দামে সার-বীজ ও জমি ভাড়া করে ৮ একর জমিত আলুর আবাদ করছি। এখন ১০০ টাকার আলু ১৩ টাকায় বিক্রি করছি। যুদ্ধ করে আবাদ করে আমার কী হয়। কৃষককে দেখার কেউ নেই।’
কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি মৌসুমে উপজেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক হাজার ১০০ হেক্টর। এর মধ্যে তিস্তার দুই পারে উপজেলার চারটি ইউনিয়নের ২১টি চরেই ৬০০ হেক্টরে আলুর চাষ হয়েছে। বাম্পার ফলন হলেও, ভালো বাজার দাম না পেয়ে কৃষক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। শত শত বিঘা জমির আলু ক্ষেতেই পড়ে আছে। আড়তদারের ঋণের চাপ সামলাতে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন ইঁদুর মারার চরের হামজা শেখ ও চর নাটসালার নুর ইসলামের মতো অনেক কৃষক।
তাদের স্বজনরা জানান, দাম কমে যাওয়ায় আলু ক্ষেতেই পড়ে আছে। তুলতে গেলে শ্রমিকের খরচসহ আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাবে। ঋণ শোধ করা সম্ভব হবে না। আলু চাষ করে এবার তারা ফকির হয়ে গেছেন।
কিশোরপুর চরের কৃষক সাইদুর রহমান জানান, এলাকায় হিমাগার নেই। আলু সংরক্ষণের জন্য কুড়িগ্রাম শহরে যেতে হয়। সব কৃষক আবার এ সুযোগ পান না। দালালরা আগে থেকেই হিমাগার বুকিং দিয়ে রাখে। তাদের কারণে সবাই হিমাগারে সাশ্রয়ী মূল্যে আলু রাখার সুযোগ পান না। তাতে খুব একটা লাভ পান না কৃষক। আলু সংরক্ষণে তারা উলিপুরে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে হিমাগার নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
হিমাগার অগ্রিম বুকিংয়ের বিষয়ে কথা বলতে উলিপুরে বিক্রয় প্রতিনিধি মতিয়ার রহমান ও রফিকুলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কোনো মন্তব্য করেননি তারা।
থেতরাই ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বলেন, কৃষকরা আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় চড়া সুদে ঋণ নিয়ে আবাদ করেন। সেই আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেন। এ কারণে ভালো ফলন হলেও দাম না পেয়ে তাদের ভাগ্য ফেরে না। আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলে এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবেন তারা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন বলেন, সংকট নিরসনে উপজেলা পর্যায়ে হিমাগার নির্মাণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আলু ও সবজি সংরক্ষণে স্থানীয় পর্যায়ে হিমাগার নির্মাণের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু হবে। তখন কৃষক ঝুঁকি থেকে মুক্তি পাবেন।
.উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: উপজ ল
এছাড়াও পড়ুন:
দেশে বছরে দেড় লাখের বেশি শিশুর মৃত্যু
বছরে দেড় লাখের বেশি শিশুর মৃত্যুতে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশ গুরুতর চ্যালেঞ্জে পড়েছে বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ এবং ডব্লিউএইচও। বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। ইউনাইটেড নেশন্স ইন্টার-এজেন্সি গ্রুপ ফর চাইল্ড মরটালিটি এস্টিমেশনের ২০২৪ সালের দুটি প্রতিবেদনের একটিতে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ১ লাখের বেশি শিশু তাদের পঞ্চম জন্মদিন পূর্ণ করার আগে মারা গেছে। তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের মৃত্যু হয়েছে আবার বয়স ২৮ দিনের মধ্যে। দ্বিতীয় প্রতিবেদনে ওই বছর ৬৩ হাজারের বেশি মৃত শিশু প্রসবের তথ্য রয়েছে। প্রতিবেদন দুটির হিসাবে প্রতি ৪১ শিশু জন্মের ক্ষেত্রে একটি মৃত সন্তান প্রসবের ঘটনা ঘটছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।
ইউনিসেফ এবং ডব্লিউএইচও বলেছে, ১৯৯০ সাল থেকে মা ও শিশু স্বাস্থ্যে বাংলাদেশের অর্জন প্রশংসনীয়। তবে দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত যত্নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মা ও শিশুর প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমাতে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার তাগিদ দিয়েছে তারা। এসডিজির লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশকে প্রতিবছর বাড়তি ২৮ হাজার নবজাতককে বাঁচাতে হবে। এ জন্য প্রসূতি ও নবজাতকের উন্নত যত্ন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দক্ষ সেবাদাতার উপস্থিতিতে প্রসব, গর্ভধারণ, প্রসবকালীন ও প্রসবোত্তর সেবার মান উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থা দুটি।
বাংলাদেশে ইউনিসেফের ওআইসি রিপ্রেজেন্টেটিভস ফারুক আদ্রিয়ান দুমুন বলেন, ‘অপরিণত জন্ম, সেপসিস ও নিউমোনিয়া সংক্রমণের মতো প্রসব জটিলতায় বাংলাদেশে প্রতিবছর এক লাখের বেশি নবজাতক মারা যায়। অথচ এসব জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগে অগ্রাধিকার, সব পর্যায়ে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী বিশেষ করে ধাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি ও সঠিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা গেলে লাখ লাখ শিশু ও মাকে বাঁচানো সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে ইউনিসেফ প্রসূতি ও শিশুর মৃত্যুরোধে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং অংশীজনের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
বাংলাদেশে ডব্লিউএইচও প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশিদ মোহামেদ বলেন, বিগত দশকগুলোতে প্রসূতি ও শিশু স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। শিশু মৃত্যু ও মৃত শিশুর জন্ম প্রতিরোধে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।