স্বাধীনতার পর ৫৩ বছরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কমিশন গঠন করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রশাসন ক্যাডারের হাতে থাকায় কমিশনগুলোর মতামত ও জনকল্যাণকর সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ওপর এতটাই নির্ভরশীল হতে দেখা গেছে, তারা প্রশাসন দ্বারা প্রায় শাসিতই হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আগের নাম ছিল সংস্থাপন মন্ত্রণালয়। কিন্তু নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়! আগের সরকার কখনোই বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের লাগাম টেনে ধরার সাহস করেনি তাদের দুর্বলতার কারণে। কিন্তু ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর বর্তমান সরকার যেসব সংস্কার কমিশন গঠন করে, এর মধ্যে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এই কমিশন থেকে জনগণের প্রত্যাশা বেশি। কারণ এই কমিশন মোহমুক্তভাবে জনগণের সেবার মানের বিষয় চিন্তা করে সীমাহীন ক্ষমতার প্রশাসনকে ভারসাম্যপূর্ণ ও জনবান্ধব প্রশাসনে রূপান্তরে সংস্কার করবে, এটাই সবাই বিশ্বাস করেন। সিভিল সার্ভিসের ২৬টি অংশীজন ক্যাডার থেকে সরকারের বিশেষ পদ বা সিনিয়র সার্ভিসে মেধার ভিত্তিতে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ার এই সুযোগ আর কোনোদিন আসবে না। কারণ রাজনৈতিক সরকারের মতো এই সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার মতো কোনো বিনিময় প্রয়োজন নেই বলে সবাই বিশ্বাস করেন।

বাংলাদেশ সরকার জনগণের সেবা নিশ্চিতে সময় নির্ধারণ করে সিটিজেন চার্টার প্রস্তুত করলেও সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী কোনো সেবা কোনো দপ্তরে পাওয়া যায় না বললেই চলে। সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের জন্য শুদ্ধাচার চর্চার পুরস্কার প্রদান করা হলেও সততার জন্য এই পুরস্কার প্রদান না করে যেসব কর্মকর্তা বিভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে কাজ করতেন, তাদের এই পুরস্কারে ভূষিত করা হতো। শ্রেষ্ঠ, দক্ষ ও চৌকস অফিসার পরিচয় তাদেরই মেলে, যারা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে লিপ্ত থাকত। নথির বিষয় যা-ই হোক, ন্যায্য কিংবা অন্যায্য; নথির পেছনের ব্যক্তি ও শক্তির পর্যালোচনা করে নথি পাস হতো। নথির শম্বুকগতির কারণে নথির প্রচলন গতি বা ডিসিশন টার্নওভারের হার অসন্তোষজনক এবং যেসব নথি তিনজন কর্মকর্তার স্বাক্ষরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব, তা পাস হতে মাঠ পর্যায়ে কমপক্ষে তিনজন, অধিদপ্তর পর্যায়ে অফিস সহকারী, গবেষণা কর্মকর্তা, সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক, পরিচালক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও মহাপরিচালক পর্যায়ে স্বাক্ষর হয়ে সচিবালয়ে উপস্থাপন হতে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সিনিয়র সহকারী সচিব, উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব, সচিব বা সিনিয়র সচিব পর্যায়ে স্বাক্ষর হয়ে চিঠি হয় আবার কোনো নথি এসব ধাপ পার হয়ে উপমন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি পর্যায়ে গিয়ে নিষ্পত্তি হয়। 

এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় চলে যায় বছরের পর বছর। জনগণ দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কর্মকর্তার সারিতে ঘুরপাক খেতে থাকেন। তারা প্রত্যাশিত সেবা পান না। সেবা তাদের কাছে অধরাই রয়ে যায়। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের কারণে সরকারি সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে নিম্ন হচ্ছে। সরকারের সেবার ফি আদায় ও পরিশোধে জটিলতাও সীমাহীন। অনলাইন ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করে সহজে জটিলতা নিরসন করা গেলেও সেগুলো করা হয়নি। এ কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অতিশয় কেন্দ্রীকরণ, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতে দুর্বলতা, দৃষ্টিভঙ্গিগত অন্তরায় সৃষ্টি হয়েছে। যেমন শিক্ষা ক্যাডারের মাঠ পর্যায়ের বহু উপজেলার সরকারি কলেজের চার-পাঁচটি বিষয়ের কোনো শিক্ষক নেই; পাঠদান পর্যন্ত হয় না। আবার বিভাগের এক বিষয়ে ২০ জন আছেন। যিনি ঢাকায় আছেন, ২০ বছর ঢাকায়; যিনি উপজেলায়, তিনি সারাজীবন উপজেলায়। চাকরিতে বদলি টার্নওভার খুব কম হওয়ায় গতিশীলতা হারিয়ে যাচ্ছে। এসব বিষয় শিক্ষা ক্যাডারের আওতার বাইরে হওয়ায় সচিবালয়ে পত্র প্রেরণ করলেও কোনো সাড়া নেই। হাজারো সমস্যা জিইয়ে রাখার মূল কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং পেশাগত ক্যাডারের নিয়ন্ত্রণ পেশাগত ক্যাডারের হাতে না থাকা।

স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দক্ষতা, কার্যকারিতা, গতিশীলতা, নৈতিকতাসহ সুশাসন নিশ্চিতে জনপ্রশাসন সংস্কারে যেসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে– দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ, জনপ্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তকরণ, দুর্নীতিমুক্ত জনপ্রশাসন গঠন, অন্য দেশের মডেল অনুসরণ নয় বরং বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য সংগ্রহ করে সংস্কার, মেধাবীদের বাছাই করতে জেনারেল ক্যাডার ও পেশাগত ক্যাডারের নিয়োগ প্রক্রিয়া কোনোক্রমেই ক্ষুদ্র হওয়া উচিত নয়, জনপ্রশাসন-বেসরকারি খাত এবং একাডেমিয়ার সমন্বয়ে মনোযোগ বৃদ্ধি, সেবার মান উন্নয়নে মনোযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। জনপ্রশাসনে মেধাবী ও যোগ্যতাসম্পন্ন তরুণদের ক্যাডার হয়ে সৎভাবে কাজের সুযোগ করে দিতে হবে। কর্মকর্তাদের নেতৃত্বের গুণাবলি চর্চায় মনোযোগ দিতে হবে এবং কর্মকর্তাদের আচরণে আমূল পরিবর্তন করতে হবে। 
জনগণের সেবা সহজীকরণ করতে হলে মেধাবীদের সেবা দেওয়ার সুযোগ করে দিতে ‘ক্যাডার যার, মন্ত্রণালয় তার’ অর্থাৎ ‘কৃত্য পেশাভিত্তিক মন্ত্রণালয়’ গঠন করে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে হবে। জনপ্রশাসনের কাজের পরিধি প্রকৃতি বিবেচনায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘কর্মচারী বিষয় মন্ত্রণালয়’ ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘জেলা কর্মচারী বিষয় কার্যালয়’ রাখলে সবচেয়ে ভালো হয়। আমি মনে করি, দক্ষ, মেধাবী, দুর্নীতিমুক্ত, সেবামুখী, জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে জনপ্রশাসন সংস্কারের উপযুক্ত সময় এখনই।

মো.

আব্দুর রাজ্জাক: শিক্ষা ক্যাডারে কর্মরত
 

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: র জন ত ক ক ষমত র সরক র র জনগণ র মন ত র পর য য়

এছাড়াও পড়ুন:

সংস্কার কিংবা স্রেফ ‘ব্যালট পেপার হওয়ার’ স্বপ্ন

‘হেলিকপ্টার’ শিরোনামে কবীর সুমনের একটা গান আছে; হেলিকপ্টারে চড়ে নেতার জনগণের কাছে যাওয়ার গল্প। বিদ্রূপাত্মক ভাষা ও গায়কিতে এই যাত্রার যাবতীয় জোগাড়যন্ত্রের বর্ণনায় গানটি হয়ে ওঠে রাজনীতিবিদদের নিয়ে একটা অসাধারণ স্যাটায়ার। সাম্প্রতিক সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে গানটির শেষ অংশটা আমার খুব মনে পড়ে।

শেখ হাসিনার পতন ও পালিয়ে যাওয়ার আনন্দ–উচ্ছ্বাস এখনো শেষ হয়নি নিশ্চয়ই। কিন্তু প্রতিটি দিন যায় আর কমে আসে আনন্দ–উচ্ছ্বাসের তীব্রতা। মাথাচাড়া দেয় আমাদের মধ্যে থাকা দ্বন্দ্বগুলো; মাঝেমধ্যে দেখা দেয় সংঘাতের আলামত। দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক চর্চার বহু দূরে থেকে একটা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীন বসবাস করে আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছি কীভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আমাদের মধ্যকার দ্বন্দ্বগুলো কমিয়ে, নিদেনপক্ষে মেনে নিয়ে একটা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করা যায়। সংস্কার ও নির্বাচন প্রশ্ন আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব তো বটেই, সংঘাতের ঝুঁকি নিয়ে হাজির হয়েছে।

দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর তথ্য আমার কাছে নেই, কিন্তু শিক্ষিত শহুরে জনগোষ্ঠীর কাছে ‘সংস্কার’ শব্দটি অতি আলোচিত। বেশ কিছুদিন ধরেই আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার মতো সংস্কারও একটা রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আমার ঠিক আগের কলামটিতেই লিখেছিলাম, যেকোনো বিষয়কেই যেকোনো রাজনৈতিক দল রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করতে পারে এবং এটা কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়; বরং সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হওয়া আমাদের ভবিষ্যৎ কল্যাণের জন্য দুর্দান্ত বিষয় হবে।

সংস্কার নিয়ে বিতর্কের মূল নিহিত রয়েছে শেখ হাসিনার পতন ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে দ্বিমতের মধ্যে। রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদের একটা বড় অংশ মনে করে, শুধু শেখ হাসিনার পতন ঘটানোই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য এবং এরপর একটা নির্বাচনী ব্যবস্থায় ফিরে গিয়ে ধীরে ধীরে আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে উঠব। আরেকটি অংশ মনে করে, শুধু শেখ হাসিনার পতন নয়, ফ্যাসিবাদের পুনরাগমন ঠেকানোর জন্য জরুরি সাংবিধানিক ও আইনি সংস্কার করাও ছিল এই গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের রাজনৈতিক রীতি অনুযায়ী উভয় পক্ষই তাদের এই দাবিগুলো চাপিয়ে দিতে চায় ‘জনগণ চায়’ বলে।

এখন পর্যন্ত রাজনীতির মাঠের গুরুত্বপূর্ণ দলগুলোর সব কটিই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করছে। সংস্কার নিয়ে বিতর্ক মূলত শুরু হয়েছে এর পরিমাণ এবং কার্যকর করার সময় নিয়ে। ন্যূনতম সংস্কার করে নির্বাচন এবং এরপর নির্বাচিত সরকারের অধীন আরও কিছু সংস্কার করার কথা বলছে বিএনপি। তারা মনে করে, বড় সংস্কার করার ম্যান্ডেট জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারেরই থাকে। ওদিকে অনেক সংস্কার এবং সেটা আগামী নির্বাচনের আগেই হতে হবে—এমন একটা কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে এনসিপি। শুধু তা–ই নয়, একটা নতুন সংবিধান রচনার জন্য ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের আদলে একই সঙ্গে যেন গণপরিষদ ও সংসদ নির্বাচন হয়, সেটাও তাদের দাবি। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে এনসিপির দাবির প্রতি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন দেখা গেছে। নির্বাচনের আগেই সংস্কার চাওয়ার প্রধান যুক্তি হচ্ছে বিএনপি যদি ক্ষমতায় যায়, তাহলে তারা প্রত্যাশিত সংস্কারগুলো করবে না। কেউ কেউ স্মরণ করাচ্ছেন এরশাদ পতনের পর তিন জোটের রূপরেখা বাস্তবায়িত না হওয়ার অভিজ্ঞতাকে।

সংস্কার কমিশনগুলো তাদের প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ দিয়েছে, সেগুলোকে মোটাদাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের কিছু সংস্কার (সংবিধান সংস্কার কমিশনের পুরোটাই) করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। তাই সেটা এই সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু অনেকগুলো সংস্কার আছে, যেগুলো আইন, বিধিবিধান সংশোধন এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমেই করা সম্ভব। সেগুলো এই সরকার অনায়াসেই করতে পারে। কিন্তু এ ধরনের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কার যে শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকে না, তার প্রমাণ হলো এক-এগারোর সময় জারি হওয়া অধ্যাদেশগুলোর মাত্র এক-তৃতীয়াংশ (এর মধ্যে অনেকগুলোয় আবার সংশোধনীসহ) আইনে পরিণত করেছিল পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ। বোধ করি, এই অভিজ্ঞতার স্মরণেই সংস্কার প্রশ্নে প্রধান উপদেষ্টা বরাবরই বলেছেন, প্রধান প্রধান অংশীজনের মতৈক্য ছাড়া কোনো সংস্কার তিনি করবেন না।

আমাদের অনেকেই ইদানীং মনে করেন, শুধু একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারব না। তাই আগামী নির্বাচনের আগেই সংবিধান, আইন—সবকিছুর সংস্কার করে গণতন্ত্র রক্ষার একটা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে আমাদের নির্বাচনে যেতে হবে। এই যে গণতন্ত্রের জন্মভূমি ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে উগ্র ডানপন্থী ও ফ্যাসিস্ট দল বা ব্যক্তি ক্ষমতায় যাচ্ছে অথবা ক্রমাগত শক্তিশালী হয়ে উঠছে কিংবা ২০০৬ সালের পর থেকে পৃথিবীতে কার্যকর গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা আজ পর্যন্ত প্রতিবছর কমেছে, সেটা কি তাহলে তাদের সংবিধান ও আইনে সমস্যা ছিল বলে? সেসব দেশে তো তাহলে সংবিধান ও আইন সংস্কার নিয়ে ক্রমাগত আলাপ হওয়ার কথা; করছে কী তারা? নাকি আলাপ চলছে রাজনৈতিকভাবে সেগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা যায় সেটা নিয়ে? একটু খোঁজ নিলেই উত্তর পেয়ে যাবেন যে কেউ।

সংস্কার নিয়ে বিদ্যমান সংঘাতময় অবস্থায় একটা সমাধান হতে পারে এমন—যাঁরা মনে করছেন গণ-অভ্যুত্থানে জনগণ নেমে এসেছিল শেখ হাসিনার পতন ও ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসা ঠেকানোর লক্ষ্যে সংস্কার করার জন্য, তারা সংস্কারকেই নির্বাচনী ইশতেহারের প্রধান বিষয় করে তুলুক। কোন কোন সংস্কার হলে জনগণের কোন কোন উপকার হবে, সেটা জনগণের সামনে নিয়ে যাক তারা। কারা, কোনো সংস্কার না করে কীভাবে জনগণের ক্ষতি করছে, তাদেরও রাজনীতির মাঠে আক্রমণ করুক। এভাবে তাঁরা যদি ম্যান্ডেট পেয়ে সরকার গঠন করেন, তাহলে তাঁরা তাঁদের কাম্য সংস্কার করে ফেলতে পারবেন। তাঁদের ভাষ্যমতে, জনগণ যেহেতু সংস্কার চায়, তাই নির্বাচনে তাঁদের জিতে যাওয়ার কথা। আর যদি সেটা না–ও পারেন, ক্ষমতায় যদি কম সংস্কার করতে চাওয়া বিএনপি যায়, তারা বিরোধী দলে থেকে ক্রমাগত সংস্কার নিয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে যাবে। জনগণের কাছে যথেষ্ট পরিমাণ চাহিদা তৈরি করা গেলে বিএনপিকেই অনেক সংস্কার মেনে নিতে হবে, যেগুলো তারা শুরুতে মানতে চায়নি। আর যদি বিএনপি সেটা না মানে, পরবর্তী নির্বাচনে তাদের পরাজিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে। একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এভাবেই কাজ করে।

কেউ কেউ বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসে যদি আবার শেখ হাসিনার মতো নির্বাচনী কারসাজির মাধ্যমে ক্ষমতায় থেকে যেতে চায়, সেই লক্ষ্যে সব কটি বিষয়ে সংস্কার করা জরুরি। একটা সরকার যদি সিদ্ধান্ত নেয় সে সঠিকভাবে নির্বাচন করবে না, তাহলে কোনো আইন বা সংবিধান সেটা ঠেকাতে পারে না। এর উদাহরণ পৃথিবীর নানা স্থানে, এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশেই আছে।

কবীর সুমনের ‘হেলিকপ্টার’ গানটির শেষ অংশটা এ রকম, ‘ভোট দিয়েছি, ভোট দিয়েছিস, ভোট দিয়েছ, ভোট দিয়েছেন, ভোট...মানুষের মুখে ব্যালট পেপার দেখছেন, নেতা দেখছেন।’ জন্মের পর থেকেই নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে পারা রাষ্ট্র ভারতের নাগরিক সুমন রাজনীতিবিদদের মানুষকে শুধু একটা ব্যালট হিসেবে দেখার মধ্যে মানুষের অবমাননা দেখতে পেয়েছেন। এটা স্বাভাবিক। শেখ হাসিনার পতনের পর আমার বারবার মনে হচ্ছিল আমাদের অন্তত ব্যালট পেপার হিসেবেও তো দেখা হয়নি বহুকাল। তাই মনে হয়, এ যাত্রায় অন্তত ব্যালট পেপার তো হয়ে উঠি। প্রতি পাঁচ বছর পরপর রাজনীতিবিদেরা মানুষের ‘মুখে ব্যালট পেপার’ দেখা নিশ্চিত হলে যেসব সংস্কার করে আমরা উন্নত গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যেতে পারব, সেগুলো হয়ে যাবে।

আগেই যেমনটা বলেছিলাম, উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় পোক্ত ভালো সংবিধান-আইন, গণতান্ত্রিক কাঠামো ও প্রতিষ্ঠান থাকার পরও গণতন্ত্রের পশ্চাৎ–যাত্রা চলছে এবং এই যাত্রার গতি অনেক ক্ষেত্রে বাড়ছেও। সেসব দেশের মানুষদের সামনে আবারও গণতন্ত্রকে রক্ষা করার লড়াই এসে হাজির হয়েছে। অর্থাৎ এই লড়াই চিরন্তন। আপাতত রাজনৈতিক দলগুলো যত বেশি সংস্কারে একমত হয়ে তা কার্যকর করবে, সেটা ভালো। কিন্তু কোনো দলই কিংবা নাগরিকেরা যেন এই আত্মতুষ্টিতে না ভোগেন যে একবার চমৎকারভাবে সবকিছু সংবিধান ও আইনে লিখে ফেললে নিশ্ছিদ্র, নির্ভেজাল, ঝুঁকিহীন একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমরা পেয়ে যাব।

জাহেদ উর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • রাজনৈতিক দলে সংস্কার যে কারণে জরুরি
  • ‘‘মিডিয়া ট্রায়াল বন্ধ করে দেন, জনগণ আস্ত একটা মিডিয়া’’
  • চলতি মাসেই কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছে বিএনপি
  • শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইল ঢাকা, দিল্লি চুপ
  • স্বাধীনতা কি তবে ছিনতাই হয়ে গেছে
  • বিএনপি নেত্রীকে ডিসির হুমকির অভিযোগ
  • ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত এনসিপি: সারজিস আলম
  • সবার কল্যাণে একযোগে কাজ করার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার
  • সংস্কার কিংবা স্রেফ ‘ব্যালট পেপার হওয়ার’ স্বপ্ন
  • এখনই রপ্তানিতে ধস নামবে মনে করছি না