Samakal:
2025-04-03@02:16:17 GMT

কী চাইছে জামায়াত

Published: 21st, January 2025 GMT

কী চাইছে জামায়াত

ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায়, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে বিএনপির নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার চেষ্টা করছে জামায়াতে ইসলামী। শেখ হাসিনার শাসনামলে প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ না পাওয়া দলটি ৫ আগস্টের পর দেশজুড়ে কর্মী সম্মেলন, সভা-সমাবেশের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছে। 

দুই যুগের মিত্র বিএনপির চেয়ে সংস্কার এবং স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের অবস্থান ভিন্ন, যা শেখ হাসিনার পতন ঘটানো অভ্যুত্থানের সূত্রপাত করা ছাত্রনেতৃত্বের কাছাকাছি। ছাত্রনেতৃত্বের সঙ্গে জোটের কথা শোনা না গেলেও অন্য দলগুলোকে নিয়ে বিএনপির বিকল্প নির্বাচনী মোর্চা তৈরির চেষ্টা করছে জামায়াত।  

জামায়াতের নায়েবে আমির ডা.

সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সমকালকে বলেন, ‘বিএনপি আর জামায়াতের আদর্শ ও কর্মসূচি ভিন্ন। দেশের স্বার্থে, ফ্যাসিবাদ উৎখাত এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় জোট হয়েছিল। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যে যার আদর্শের রাজনীতি করছি। এর মানে এই নয়, বিএনপির শত্রু হয়ে গেছে জামায়াত।’ 

জার্মানভিত্তিক ডয়চে ভেলে ইনস্টিটিউটের লেকচারার এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারুফ মল্লিক সমকালকে বলেন, ‘বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা জামায়াতের ভুল নীতি। জামায়াত একাত্তর, ছিয়াশি, ছিয়ানব্বইয়ে ভুল রাজনীতি করেছিল। এবারও তাই করছে। জামায়াতের জনসমর্থন ৫ থেকে ১০ শতাংশ। ছোট দল হওয়ায় বিএনপির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জামায়াতেরই ক্ষতি হবে।’

দলের বিস্তার, নির্বাচনের প্রস্তুতি, জনসমর্থন দেখানো
জামায়াত নেতারা মনে করেন, আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় বিএনপির পর তারাই বড় দল। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত। অংশ নিলেও গণঅভ্যুত্থান ঘিরে হত্যাযজ্ঞ ও দুঃশাসনের কারণে নির্বাচনে সাফল্যের সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ বাস্তবতায় সংসদে সম্মানজনক আসন নিয়ে জামায়াতের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল তথা বিরোধী দল হওয়ার সুযোগ রয়েছে। 

নেতারা বলছেন, এ সুযোগ কাজে লাগাতে ভোটের মাঠে সর্বাত্মক কাজ চলছে। শুধু জাতীয় সংসদ নয়, স্থানীয় নির্বাচনে দল সমর্থিত সম্ভাব্য প্রার্থী ঠিক করে প্রচার চালাচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যপদে কারা লড়বেন, তাও ঠিক করা হচ্ছে। তৃণমূল প্রার্থীদের সামনে রেখে কর্মী-সমর্থক সংগ্রহে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। জেলা, মহানগর থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত সংগঠন বিস্তারের কাজ চলছে। গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুরের মতো জেলায়, যেখানে জামায়াতের নির্বাচনী সাফল্য নেই, সেখানেও চলছে সাংগঠনিক তোড়জোড়। 

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম সমকালকে বলেন, ‘ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের কাছে দলের আদর্শ পৌঁছানোর চেষ্টা করছে জামায়াত। এটা নির্বাচনী প্রচার নয়, দলীয় আদর্শের প্রচার।’

জামায়াত সংসদ, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র পদে দলীয় রুকন (সদস্য) না হলে প্রার্থী করে না। দলের বিস্তার এবং আগামী সংসদে এমপি বৃদ্ধি করতে বহু বছরের এ নিয়ম বদলাতে পারে। দলের বাইরে থেকে প্রার্থী করতে পারে। ডিসেম্বরে এক সাক্ষাৎকারে সমকালকে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান এই ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ নেতা সমকালকে বলেন, স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও গ্রহণযোগ্যতা আছে, এমন ব্যক্তি আগ্রহী হলে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। 

৫ আগস্টের পর গত শনিবার পর্যন্ত ২৮ জেলায় সমাবেশ, কর্মী সম্মেলন, পথসভা করেছেন জামায়াতের আমির। এ মাসে অনুষ্ঠিতব্য বরিশাল, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর ও জয়পুরহাটের সমাবেশেও থাকবেন তিনি। সব সমাবেশে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি ঘটাচ্ছে জামায়াত। এই উপস্থিতি দেখিয়ে দলটি জনসমর্থন প্রমাণের চেষ্টা করছে। 

বিএনপি-আওয়ামী লীগকে অভিন্ন দেখানোর কৌশল 
৫ আগস্টের পর বিএনপি নেতারা একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য জামায়াতের সমালোচনা করছেন। বিপরীতে চাঁদাবাজি-দখলবাজির জন্য বিএনপিকে দায়ী করে সমালোচনা করছে জামায়াত। জনসমর্থন ও নির্বাচনী সাফল্য পেতে বিএনপিকে আওয়ামী লীগের মতো লুটপাটকারী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। এতে বিএনপির জনসমর্থন কমিয়ে নিজেদের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টায় জামায়াতের সুবিধা হবে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা।

১৯৯৯ সালে জোট করেছিল বিএনপি ও জামায়াত। ২০০১ সাল থেকে পরের পাঁচ বছর খালেদা জিয়া সরকারের শরিক ছিল জামায়াত। ২০০৮ ও ২০১৮ সালে জোটবদ্ধ নির্বাচন করে এবং ২০১৪ ও ২০২৪ সালে একই সঙ্গে নির্বাচন বর্জনও করে। আওয়ামী লীগ দল দুটিকে ‘এক সত্তা’ হিসেবে দেখাতে চাইত। ২০২২ সালে সমাঝোতার ভিত্তিতে জোট ভাঙলেও ৫ আগস্ট পর্যন্ত অধিকাংশ ইস্যুতে একই অবস্থানে ছিল দল দুটি। 

তবে এখন পরস্পরের বিরুদ্ধে চলছে। গেল শনিবারও রাজশাহীতে চাঁদাবাজি-দখলবাজির জন্য বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘৫ আগষ্টের পর আশা করি, রাজশাহীতে কোনো চাঁদাবাজি হয়নি। এখানকার মানুষ ভদ্র, বিনয়ী, সৎ; কেউ চাঁদাবাজি করে না। ঠিক না?’ তাঁর বক্তব্যের জবাবে কর্মীরা বলে ওঠেন– ‘করে করে, চাঁদাবাজি করে।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘এখানেও চাঁদাবাজি হয়? ফুটপাত, হাটবাজার, বালুমহাল, জলমহাল, বিভিন্ন যানবাহনের স্ট্যান্ড– সব ক’টিতে দখলদারি হয়? তাহলে আমাদের শহীদের রক্তের প্রতি এটা কী ধরনের ভালোবাসা, সম্মান?’

আওয়ামী লীগ শাসনামলে জামায়াত নেতাকর্মীর ওপর ব্যাপক ধরপাকড় চলে। সে সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দু’দলের নেতাকর্মীর মধ্যে সহানুভূতি দেখা যেত। তবে আগস্টের জামায়াতের কর্মী-সমর্থকরা সামাজিক মাধ্যমে বিএনপিকে ট্রল করে ‘টেম্পুস্ট্যান্ড’ ডাকছে। বাঁশেরকেল্লার টেলিগ্রাম ও ফেসবুকে প্রতিদিন কয়েক লাখ মানুষের কাছে ‘টেম্পুস্ট্যান্ডের আজকের যত আমলনামা’ শিরোনামে বার্তা পৌঁছানো হচ্ছে। এতে প্রতিদিন বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে যেসব চাঁদাবাজি, দখলসহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ ওঠে, তার তথ্য থাকে। বিএনপির কোন্দলে সংঘর্ষ এবং হতাহতের খবরও থাকে। 
২৪ ডিসেম্বর জামায়াত আমির শফিকুর রহমান তাঁর দল এবং সেনাবাহিনীকে ‘পরীক্ষিত দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দেন। এ বক্তব্যের সমালোচনা করে জামায়াতকে ‘রগকাটা এবং ব্যাংক দখলকারী’ আখ্যা দেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম সম্প্রতি একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতের সমালোচনা করেন। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘জামায়াতের কর্মকাণ্ড ও কিছু বক্তব্যে বিএনপি মনঃক্ষুণ্ন।’
ডা. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সমকালকে বলেন, ‘বিএনপি নয়, চাঁদাবাজি-দখলবাজির বিরুদ্ধে বলছে জামায়াত। বিএনপিও নিশ্চয় এসব অপকর্মের বিপক্ষে।’ 

আগামী নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ
জামায়াত নেতারা মনে করেন, গত কয়েক মাসে প্রশাসন ও পুলিশ পুরোপুরি বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাচনী কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন। 

জামায়াতের একাধিক নেতা সমকালকে বলেন, এ পরিস্থিতি উদ্বেগের। নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনায় আমলা, পুলিশ সরকারের চেয়ে বিএনপির প্রতি বেশি আনুগত্য দেখাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন দুষ্কর। প্রশাসন বিএনপির পক্ষে থাকলে অন্যদের নির্বাচনের মাঠে টেকা কঠিন হবে। ২০০৮ সালে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতা যাওয়ার আগেই দলটির জয়ের সম্ভাবনায় প্রশাসন সেদিকে হেলে পড়েছিল। এতে বিএনপি ও জামায়াত নির্বাচনের মাঠে ভুগেছে। মূল্য দিয়েছে নির্বাচনে। এ উদ্বেগ সরকারকে জানিয়েছে জামায়াত।

ভোটের আগে সংস্কার
বিএনপি দ্রুত নির্বাচন চাইলেও জামায়াত জোর দিচ্ছে সংস্কারে। দলটির নেতারা বলছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনে বিএনপির জয় প্রায় নিশ্চিত। দলটি ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোসহ কাঙ্ক্ষিত সংস্কার করবে কিনা, তা অনিশ্চিত। তাই জামায়াত ভোটের আগে সংস্কার চায়। চরমোনাইয়ের পীরের ইসলামী আন্দোলন, ছাত্রনেতৃত্বের সংগঠন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটিরও একই অবস্থান। 

ডা. তাহের সমকালকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে কিছু সংস্কার যে লাগবে, এ নিয়ে বিএনপির সঙ্গে দ্বিমত নেই। বিএনপিও ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রধানমন্ত্রীর পদ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ করার বিষয়ে একমত। এগুলো নির্বাচনের আগে হলে সমস্যা নেই। নইলে আবার স্বৈরশাসন আসতে পারে, যা কেউ চায় না।’ 
জামায়াত ভোটের আনুপাতিক পদ্ধতির সংসদ নির্বাচনে পক্ষে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে সংসদের উচ্চকক্ষে আনুপাতিক এবং নিম্নকক্ষে বিদ্যমান পদ্ধতিতে নির্বাচনের সুপারিশ করেছে। ডা. তাহের বলেন, ‘এ বিষয়ে জামায়াত অনড় অবস্থানে নেই। রাজনৈতিক ঐকমত্যে সমাধান সম্ভব। বিএনপি আগামী জুলাই-আগস্টে নির্বাচন চায়। জামায়াত ২০২৫ সালে নির্বাচন চায়। খুব বেশি তো পার্থক্য নেই।’ 

আগে স্থানীয় নির্বাচনের পক্ষে
জামায়াত চাইছে স্থানীয় নির্বাচন আগে হোক। ভালো ফল করলে জাতীয় নির্বাচনে শক্তি জোগাবে। আবার প্রতিটি সংসদীয় আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীর ছড়াছড়ি। সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীরা অবস্থান শক্তিশালী করতে স্থানীয় নির্বাচনে নিজের পছন্দের নেতাকে জেতাতে চেষ্টা করবেন। এতে অন্তর্কলহ বাড়বে বিএনপিতে। দলীয় এমপি না থাকা, নির্দলীয় পদ্ধতির স্থানীয় নির্বাচনে দলের পক্ষে প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। 

এতে জামায়াতের ভালো ফলের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন দলটির উত্তরাঞ্চলের এক নেতা। তিনি সমকালকে বলেন, ২০১৪ সালে বগুড়ার ১২ উপজেলায় পাঁচটিতে চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছিলেন জামায়াত সমর্থিতরা। বিএনপি প্রার্থীর ছড়াছড়িতে জামায়াতের ২০১৪ সালের চেয়ে ভালো ফলের সম্ভাবনা রয়েছে। বিএনপির ঘাঁটি বগুড়ায় তা করতে পারলে জাতীয় নির্বাচনের আগে জামায়াতের শক্তির বার্তা যাবে। 

জোটের সম্ভাবনা ও ছাত্রদের সঙ্গে বন্ধুভাব
ছাত্রনেতৃত্ব সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনার পতন ঘটানো অভ্যুত্থানের নীতি-কৌশল নির্ধারণে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের সহযোগিতা এবং কর্মসূচি সফলে সমর্থনের কথা বলছে। বিএনপি, ছাত্রদলের কথা বলছে না। ছাত্রনেতৃত্ব ও জামায়াতের মধ্যে প্রকাশ্য বন্ধুভাব দেখা যাচ্ছে। আবার রাষ্ট্রপতি, সংবিধান, সংস্কার ও নির্বাচন প্রশ্নে ছাত্রনেতৃত্বের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব তৈরি হয়েছে। অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিয়েও আছে বিরোধ। ডা. তাহের বলেন, ‘জামায়াত ও শিবিরের অভ্যুত্থানে অবদান আছে বলেই ছাত্রনেতৃত্ব বলছে।’  

বিশ্লেষক মারুফ মল্লিক বলেন, ‘জামায়াত চব্বিশের ভূমিকা দিয়ে একাত্তরের ভূমিকা মোছার চেষ্টা করছে। কিন্তু একাত্তরের ভূমিকার জন্য বিএনপি যেভাবে জামায়াতকে ছেড়েছে, একই কারণে ছাত্রনেতৃত্ব দল গঠন করলেও জোট করতে পারবে না। করলে তাদের ক্ষতি হবে।’ 

ছাত্রনেতৃত্বের সম্ভাব্য দলের সঙ্গে জোটের সম্ভাবনা প্রশ্নে ডা. তাহের বলেন, ‘আগে তো দল হোক। আদর্শ ও কর্মসূচি দেখার পর বলা যাবে, জোট হবে কিনা। আর চব্বিশ দিয়ে একাত্তরকে মোছার চেষ্টা নেই জামায়াতের। দুটিই সম্মান ও শ্রদ্ধার।’ 
ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে বসেছিল। এর পর আর প্রকাশ্য আলোচনা হয়নি। ডা. তাহের বলেন, ‘জোট হবে কিনা, তা নির্বাচনের আবহ সৃষ্টির পর বলা যাবে।’   

 

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: ন ত কর ম র ব এনপ র প পর স থ ত অবস থ ন ৫ আগস ট আগস ট র র জন য র জন ত ট র পর দলট র সরক র সমর থ আওয় ম আদর শ সদস য

এছাড়াও পড়ুন:

সারাদিন কাঠফাটা রোদ, রাতে কাঁথামোড়া শীত

চৈত্র মাসে কাঠফাটা রোদই স্বাভাবিক। দিনের বেলায় হচ্ছেও তাই। কিন্তু রাত নামছে ভিন্ন আয়োজনে। যেন পৌষের শীত! সকালে তার রেশ থাকে কুয়াশা হয়ে। এই চিত্র কেবল উত্তরের জেলা দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারীতে নয়; দক্ষিণের খুলনা, দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা কুষ্টিয়া, চূয়াডাঙ্গা; সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার হাওরবেষ্টিত উপজেলাগুলোর চিত্রও তাই।

বিভিন্ন স্থান থেকে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে দেখা যায়, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এসব এলাকায় রাতে শীতের আবহ বিরাজ করছে। সকাল ঢেকে থাকছে কুয়াশায়। গতকাল বুধবার ঠাকুরগাঁওয়ে সকাল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত সূর্যের মুখ দেখা যায়নি।

ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে  ঠাকুরগাঁও বেড়াতে গেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ। তিনি সমকালকে বলেন, ঢাকায় ফ্যান ছাড়া ঘুমাতে পারি না। আর গ্রামে এসে কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুমাতে হচ্ছে। ফজরের নামাজের পর কুয়াশা পড়ে। এর আগে এই সময়ে এমন ঘন কুয়াশা খুব একটা দেখা যায়নি। দিনে আবার উল্টো চিত্র; কাঠফাটা গরম।

ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক আব্দুস সালাম  বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে উত্তরাঞ্চলে কুয়াশার প্রভাব বেশি যাচ্ছে। এর প্রভাবে ঠাকুরগাঁও ও  পঞ্চগড় জেলায় রাতে কনকনে শীতের ভাব থাকে। তবে দিনে তাপমাত্রা বেশি থাকে। এ অঞ্চলে প্রথমবারের মতো বসন্তে শীতের কুয়াশা পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে চৈত্রের এই রূপ। কোথাও বেশি, কোথাও কম। আবার অসময়ে তাপপ্রবাহও শুরু হচ্ছে। এটিকে তারা ঋতু পরিবর্তনের ধারায় পরিবর্তন বলছেন। তাদের ভাষ্য, জলবায়ু বদলের কারণেই এমনটি হচ্ছে। এই বিরূপ প্রকৃতি উদ্বেগেরও। কারণ এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে গাছগাছালির। বাড়বে ফসলের রোগবালাই।

গতকাল সকালে পঞ্চগড়ের পথঘাটও ঘন কুয়াশায় ঢাকা ছিল। স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক বছরে এমন কুয়াশা তারা দেখেননি। এলাকায় জ্বর, সর্দিসহ নানা রোগের কথাও জানালেন কেউ কেউ। 

আবহাওয়া অফিস জানায়, পঞ্চগড়ে গতকাল সকাল ৯টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে মঙ্গলবার দিনে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ বলেন, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আকাশে জমা মেঘ কুয়াশা হয়ে ঝরছে। আবার বাতাসে ধূলিকণা বেশি ও আর্দ্রতা কম থাকছে। আরও কয়েক দিন এমন অবস্থা চলতে পারে বলে জানান তিনি।

দিনাজপুরে কয়েক দিন ধরে দিনের বেলায় রোদে গা পুড়ে যাচ্ছে। গভীর রাতে বাড়ে ঠান্ডা। নীলফামারীতে দিনের আবহাওয়া অনেকটা স্বাভাবিক থাকলেও শেষ রাতে তাপমাত্রা অর্ধেকে নেমে আসে। 

রাজশাহীর গ্রামাঞ্চল কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ছে। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক উম্মে ছালমা বলেন, এমন কুয়াশা রাজশাহীর আমের মুকুল ও গুটির জন্য ক্ষতিকর। আমের মুকুলে ‘পাউডারি মিলডিউ’ নামে এক ধরনের রোগ দেখা দিচ্ছে। এতে মুকুল ঝরে পড়ছে।

গত সোমবার নোয়াখালীর সুবর্ণচর হঠাৎ কুয়াশায় ঢাকা পড়ে বলে জানান স্থানীয় লোকজন। মাঝারি ও ঘন কুয়াশায় সামান্য দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছিল না। চৈত্র মাসে এমন ঘন কুয়াশায় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন বোরো চাষিরা। নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চাষি মাহফুজুল হক বলেন, এবার চার একর জমিতে বোরো ধান চাষ করেছি। বেশির ভাগ গাছে শীষ বের হয়েছে। হঠাৎ ঘন কুয়াশার কারণে চিন্তায় পড়েছি।

স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছাইফুল আলম জানান, বিভিন্ন এলাকায় এক সপ্তাহ ধরে কুয়াশা পড়ার খবর পাচ্ছি। কুয়াশা দীর্ঘ সময় ধরে পড়লে বোরো ফসল ব্লাস্টে আক্রান্তের আশঙ্কা আছে।

কুয়াশা দেখে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। তারা বলছে, বায়ুমণ্ডলে তাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় দিনে ভূপৃষ্ঠ উত্তপ্ত থাকে, ভোরের দিকে শীতল হয়। ওই সময়টায় বাতাস জলীয় বাষ্প ধারণ করতে না পারায় তা কুয়াশা আকারে ভেসে বেড়ায়।

আবহাওয়াবিদরা জানান, কেবল চলতি বছর নয়, গত ১০-১২ বছর মার্চ মাসজুড়েই এমন কুয়াশা থাকছে এবং অসময়ে তাপপ্রবাহ শুরু হচ্ছে। এটিকে তারা ‘সিজনাল প্যাটার্ন চেঞ্জ’ (ঋতু পরিবর্তনের ধারায় পরিবর্তন) বলছেন। এই পরিবর্তনটাকে তারা ‘অস্বাভাবিক আচরণ’ বলে মনে করছেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল জলবায়ু : আবহাওয়ার পর্যবেক্ষণে ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের প্রবণতা এবং পরিবর্তন’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও নরওয়ের পাঁচজন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ গত ৪৩ বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে গবেষণাটি করেন। এতে দেখা যায়, প্রতি ঋতুতে তাপমাত্রা আগের তুলনায় বাড়ছে। পাশাপাশি মৌসুমি বায়ু দেরিতে প্রবেশ করায় স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বর্ষাকাল পিছিয়ে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় মার্চের শেষ সপ্তাহেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কুয়াশা দেখা যাচ্ছে, শীত অনুভূত হচ্ছে। এর মূল কারণ হিসেবে দূষণকে চিহ্নিত করেন আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মমিনুল ইসলাম বলেন, এই কুয়াশা তৈরির পেছনে বাতাসের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার পার্থক্য দায়ী। এবার রাতে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার আগেই কুয়াশা তৈরি হয়ে যাচ্ছে। আর বাতাস কম থাকায় কুয়াশা সরে যেতে পারছে না। তিনি জানান, এ সময় ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং চীনেও কুয়াশা তৈরি হচ্ছে।

কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক পিএইচডি গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, এক সপ্তাহ আগে রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টি হয়েছিল। ফলে ওইসব জেলার মাটিতে কিছুটা আর্দ্রতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হওয়ায় ভূপৃষ্ঠ কয়েক ডিগ্রি সেলসিয়াস ঠান্ডা হয়েছে। এর মধ্যে হঠাৎ এসব জেলার ঊর্ধ্ব আকাশ দিয়ে গরম বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। শীতকালে যেমন মানুষের মুখ ও নাক থেকে বের হওয়া গরম বাতাস বাইরের শীতল বাতাসের সঙ্গে মিশে ধোঁয়ার সৃষ্টি করে, ঠিক একইভাবে এখন শীতকালের মতো কুয়াশা সৃষ্টি হচ্ছে।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও নীলফামারী প্রতিনিধি)

সম্পর্কিত নিবন্ধ