অনূর্ধ্ব-১৯ নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে দুর্দান্ত জয়ের পর দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় ছিনিয়ে আনতে পারেনি বাংলাদেশের জুনিয়র টাইগ্রেসরা। লো-স্কোরিং ম্যাচে শেষ ওভারে উত্তেজনা তৈরি হলেও শেষমেশ ২ উইকেটে হারতে হয় তাদের।  

সোমবার মালয়েশিয়ার ইউকেএম ক্রিকেট ওভালে টস জিতে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠায় অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক লুসি হ্যামিলটন। ব্যাটিংয়ে নেমে বাংলাদেশের মেয়েরা চ্যালেঞ্জিং স্কোর গড়তে ব্যর্থ হয়। লোয়ার মিডল অর্ডারে আফিয়া আসিমার ৩৪ বলে ২৯ রানের কার্যকরী ইনিংস ছাড়া আর কেউই উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেনি। ২০ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে স্কোরবোর্ডে মাত্র ৯১ রান যোগ করতে সক্ষম হয় তারা।  

ছোট লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে দুর্দান্ত শুরু করে অস্ট্রেলিয়া। উদ্বোধনী জুটিতে ৩ ওভারেই ২৬ রান তোলে তারা। দ্বিতীয় উইকেটে অধিনায়ক লুসি হ্যামিলটন এবং ওপেনার কেইট পেলে যোগ করেন আরও ৫০ রান। তবে ৬৭ রানে লুসি আউট হওয়ার পর থেকেই ম্যাচের মোড় ঘুরতে শুরু করে।  

বাংলাদেশি বোলাররা দুর্দান্ত স্পেল উপহার দিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে চাপে ফেলেন। মাত্র ১৭ রানের ব্যবধানে অস্ট্রেলিয়া হারায় ৫ উইকেট। বিশেষ করে জান্নাতুল মাওয়ার দুর্দান্ত বোলিং (৩ উইকেট) এবং নিশিতা আক্তার, হাবিবা ইসলাম, আনিসা আক্তারের নিয়ন্ত্রিত বোলিং প্রতিপক্ষকে বিপদে ফেলে দেয়।  

শেষ ওভারে অস্ট্রেলিয়ার দরকার ছিল ১ রান, আর বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ২ উইকেট। কিন্তু দ্বিতীয় বলেই লেগবাই থেকে জয়সূচক রান তুলে নেয় অস্ট্রেলিয়া। এতে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় ম্যাচে ৪ বল বাকি থাকতে ২ উইকেটে হেরে যায় বাংলাদেশ। তবে লড়াইয়ের মানসিকতা এবং বোলারদের পারফরম্যান্স আশার আলো দেখিয়েছে। তবুও ব্যাটিং ব্যর্থতাই মূলত ভুগিয়েছে দলকে। 

‘ডি’ গ্রুপে বাংলাদেশের তৃতীয় ও শেষ ম্যাচ বুধবার স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। প্রথম ম্যাচে নেপালকে ৫ উইকেটে হারিয়েছিল সুমাইয়া আক্তারের দল।

.

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: উইক ট

এছাড়াও পড়ুন:

ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অবিচল

পাঠ্যপুস্তকে তাঁর জীবনী নেই। অথচ কোথায় ছিলেন না তিনি! ১৯৪৩ সালে অবিভক্ত বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের পাশে ছিলেন। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে মানবিক ও সমাজসেবামূলক কাজে অংশ নিয়েছিলেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দিরে গিয়ে অভয় দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৯ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-বিধ্বস্ত পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা অঞ্চলের সংখ্যালঘু ও উদ্বাস্তুদের আশ্বস্ত করতে এবং তাদের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে ঐতিহাসিক ‘নেহরু-লিয়াকত’ চুক্তি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ষাটের দশকে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক থাকাকালে রেড ক্রসের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি তাঁর মামা অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের সঙ্গে ১৪৪ ধারা ভেঙেছিলেন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদদের জানাজায় অংশ নিয়ে তিনি ও তাঁর মামা দু’জনেই আটক হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিধান-সংবলিত শাসনতন্ত্র প্রণয়নে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে সাহায্য করেছিলেন। ১৯৬১ সালে পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের বাধা মোকাবিলা করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। ১৯৬৬ সালে স্বাধিকার আন্দোলনে ছয় দফার চূড়ান্ত খসড়া প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৬৭ সালে  ছয় দফা আন্দোলন তুঙ্গে থাকাকালে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। মূলত মওলানা ভাসানী ও তাঁর কারণেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্তরা নিঃশর্ত মুক্তি পেয়েছিলেন।

আত্মমর্যাদাশীল বাঙালি জাতির প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৬৯ সালের গোলটেবিল সম্মেলনে তিনি ‘এক মানুষ, এক ভোট’ নীতি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছিলেন। এই নীতিতে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর সংখ্যাগরিষ্ঠতার যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৯টি আসন আদায় করেছিলেন। এভাবেই তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে বিজয়ীদের জাতীয় সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত করেছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর পরাজয় নিশ্চিত করেছিলেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানের অবৈধ সামরিক সরকারকে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। অবৈধ পাঞ্জাবি শাসক চক্রের জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। সাংবিধানিক ব্যত্যয়ে তৎকালীন হাইকোর্ট বারকে নিয়ে তিনি যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তা এত চরমে পৌঁছে যে, ১৯৭১ সালের মার্চে জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করাতে কোনো বিচারকই রাজি হননি। মুক্তিযুদ্ধের পরও তিনি থেমে যাননি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হননি। মুক্তিযুদ্ধের আগেও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথককরণের দাবি তুলেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পরেও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথককরণের দাবি জানিয়েছিলেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে সার্ক গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তিনি শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হকের যোগ্যতম উত্তরাধিকারী হিসেবে বেঁচে ছিলেন।

হাসনাত আরিয়ান খান: লেখক ও গবেষক

সম্পর্কিত নিবন্ধ