এমন ম্যাচ একা, নিজের হাতে জেতাতে পারা স্বপ্নের মতো: এনামুল
Published: 20th, January 2025 GMT
সাধ্যের সব চেষ্টা করেও পারেননি এনামুল হক বিজয়। ৪১১ রানের ম্যাচ শেষ পর্যন্ত তাকে হারতে হয়েছে ৭ রানে। নিজে সেঞ্চুরি করেছেন। কিন্তু দল হেরেছে। তাইতো পুরো আকাশটাই যেন ভেঙে পড়েছে মাথায়।
শেষ ওভারে ৬ বলে ১৭ রানের সমীকরণ এনামুল মেলাতে পারেননি। ২১০ রানের লক্ষ্য তাড়ায় ম্যাচের পঞ্চম ওভারে ক্রিজে আসেন এনামুল। খুলনা টাইগার্সের বিপক্ষে দুর্বার রাজশাহীর স্কোরবোর্ডে তখন রান ১ উইকেটে ৪৭। সেখান থেকে ইনিংসের শেষ বল পর্যন্ত টিকে ছিলেন। শেষ বলে এক রান নিয়ে পেয়েছেন সেঞ্চুরি। ৫৭ বলে বিপিএলের প্রথম সেঞ্চুরি করেছেন ৯ চার ও ৫ ছক্কায়। ইনিংস জুড়েই অসাধারণ ব্যাটিং করেছেন। দলকে লড়াইয়ে রেখেছেন। ম্যাচটা নিয়ে গেছেন গভীরে।
কিন্তু শেষ হাসিটা হাসতে পারেননি। ম্যাচের পর মাঠে হতাশ এনামুলকে দেখা যায়। বিমর্ষ, বিষন্ন এনামুলের চোখে ছিল পানি। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে হতাশার চাদরে মুড়ে রইলেন এনামুল।
‘‘আসলে আমার ইনিংস নিয়ে বিশেষ করে বলার কিছু নেই। স্কোরবোর্ডে দেখছিলাম ম্যাচটা কতটুকু গভীরে নিয়ে যাওয়া যায়। রানরেট কত চলছে। ব্যাটিংয়ে ভেবেছি উইকেটে থাকি বল অনুযায়ী খেলতে থাকি।’’
‘‘আফিফের একটা ক্যাচ ছিল। ৬-৭ জন আউট হয়ে যেতে পারতাম। তবুও আল্লাহ হয়ত দিয়েছে (জীবন)। তাই এত বড় রান হয়েছে। ম্যাচ জেতাতে পারলে আলাদা শান্তি লাগত। এমন ম্যাচ জেতাতে পারা কিন্তু ব্যাটসম্যানের জন্য স্বপ্নের মত ব্যাপার। সবার আশা থাকে ক্যারিয়ারে এমন ৫-৬টা ম্যাচ সে জেতাবে। একা নিজের হাতে। তখন নিজের ইনিংসটা মূল্যায়ন করতে পারতাম। একটা সংখ্যা (সেঞ্চুরি) ভালো সংখ্যা সুন্দর সংখ্যা। আফসোস থেকে যাবে।’’
শেষ দিকে দুইটি ফুলটস মিস করার আক্ষেপে পুড়ছেন এই সেঞ্চুরিয়ান, ‘‘আমি দুইটা বল স্লটে ছিল মিস হয়ে গেছে। একটা এই পাশ থেকে যে (আরশাদ) করলো, একটা হাসানের বলে। দুইটা আমি মিস করেছি।’’
ম্যাচে বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন শট খেলেছেন এনামুল। পুল শটে ছক্কা পেয়েছেন। রিভার্স সুইপ করে করে পেয়েছেন চার-ছক্কা। ঝুঁকি নিয়ে রিভার্স সুইপ করে বাউন্ডারি পাওয়ার পেছনে নিরলস পরিশ্রম এবং বেশ কিছু মানুষের অবদানের কথা বললেন এনামুল,
‘‘আমরা যেসব ইনিংস দেখি এর পেছনে বল বয়, কোচ, থ্রোয়ার, যারা কাছের মানুষ আছে তাদের আসলে ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করা যাবে না। সেই সকাল থেকে যে অনুশীলন করি এটা ৩৬০ ডিগ্রি বলেন বা আন অর্থোডক্স শট বলেন, এগুলো সম্ভব তাদের জন্য। সেঞ্চুরির জন্য আমার কোচ এবং একটা বন্ধুকে ধন্যবাদ দিতে চাই। সবসময় আমার পাশে থাকে, আমার অনুপ্রেরণা দেয়। খুব ইতিবাচক থাকে। আমার খুব পছন্দের এবং কাছের মানুষ বিপ্লব ভাই এবং বন্ধু মাসুদ এই দুইজনকে উৎসর্গ করতে চাই।’’
ঢাকা/ইয়াসিন
.উৎস: Risingbd
এছাড়াও পড়ুন:
সংস্কার আসতে পারে ভোটারের বয়সেও
ভোট দেওয়ার ন্যূনতম বয়স দীর্ঘ সময় ধরে ১৮ থাকলেও সম্প্রতি এটি কমানোর কথা উঠছে। এ বছরের জানুয়ারিতে প্রধান উপদেষ্টা যখন এটি ১৭ বছর করা উচিত বলে মন্তব্য করেন, তখন থেকেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সম্প্রতি ভোটার হওয়ার বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ করার প্রস্তাব করেছে। একই সঙ্গে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ন্যূনতম বয়স ২৫ থেকে কমিয়ে ২৩ করারও প্রস্তাব দিয়েছে এনসিপি। দলটির যুক্তি, ভোটার হওয়ার বয়স কমালে গণঅভ্যুত্থান প্রধানত যাদের ভূমিকায় সফল হয়েছে, ভোটের মাঠেও সেই জেন-জিদের অংশগ্রহণ থাকবে।
এটা সত্য যে, আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই ভোট দেওয়ার প্রাথমিক বয়স ১৮ বছর। তবে ১৭ বছর, এমনকি কোথাও ১৬ বছর বয়সেও ভোট দেওয়া যায়। লাতিন আমেরিকা, অস্ট্রিয়া এমনকি জার্মানিতেও ১৬ বছর বয়সে নাগরিকরা ভোট দিয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, দুই বছর না কমিয়ে ভোটার হওয়ার বয়স ১৭ করা যেতে পারে। এতেও গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের বড় একটা অংশ চলে আসবে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যাদের বয়স ১৬ বছর ছিল, তারা তো বটেই, এমনকি যাদের ১৫ বছর পাঁচ-ছয় মাস ছিল; ডিসেম্বরে বা এর পর নির্বাচন হলে ১৭ বছর বয়সে তারাও ভোট দিতে পারবে। অবশ্য তাদের ভোটার করতে হলে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে নতুন করে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার প্রয়োজন হবে। আমরা জানি, জানুয়ারিতে এ তালিকা ইতোমধ্যে হালনাগাদ করা হয়েছে ১৮ বছর হিসাব করেই।
ভোটের মাধ্যমে নাগরিকরা তাদের রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করেন। এ মত দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তির বয়স ও পরিপক্বতা গুরুত্বপূর্ণ। ভোট দেওয়ার জন্য ১৮ বছর বয়স নির্ধারণের যুক্তি হলো, এ বয়সে মানুষের বিচার-বুদ্ধির ক্ষমতা থাকে। অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। এখানে শিক্ষাও জরুরি বিষয়। ঝরে না পড়লে ১৮ বছরের মধ্যেই উচ্চ মাধ্যমিকের পড়াশোনা শেষ হয়ে যায়। যেসব যুক্তিতে ভোটার হওয়ার বয়স ১৮ করা হয়েছে, সেই যুক্তিতে এখন তা ১৭ বছর করা যেতে পারে। অর্থাৎ আগে ১৮ বছরে ব্যক্তির মধ্যে নানা কারণে যে পরিপক্বতা আসত; এখন ১৭ বছরেই তা সম্ভব হচ্ছে। ইন্টারনেট-প্রযুক্তির কারণে ব্যক্তির চোখ-কান আগেই খুলে যায়। পারিপার্শ্বিকতা ও শিক্ষার হার বৃদ্ধির ফলে ১৬-১৭ বছরেই ব্যক্তির মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা জন্মে। সে জন্য ভোটার হওয়ার বয়স ১৭ বছর করা যেতেই পারে। ১৭ বছর হলে কী প্রভাব পড়তে পারে আগামী নির্বাচনে? ভোটার বাড়তে পারে ৫ শতাংশ। তাতে অর্ধকোটি নতুন ভোটার যুক্ত হবে। খসড়া ভোটার তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে দেশের ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৩৬ লাখ। দেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ বলে এক বছর কমালেই তা বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে যে জনশুমারি হয়েছিল, তাতে দেখা যায়, মোট জনসংখ্যার ৫৭ শতাংশই তরুণ। এর মধ্যে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সীর সংখ্যা বেশি। তবে এই বয়স ১৭ করার ক্ষেত্রে সামান্য যে জটিলতা আছে, তার সমাধান আগে করতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে শিশুর সর্বোচ্চ বয়স ধরা হয় ১৮ বছর। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ীও ১৮ বছর পর্যন্ত শিশু। শিশুর এ বয়স কমাতে হবে। ২০২২ সাল থেকেই শিশুর বয়স কমানোর পরিকল্পনা চলছে। সরকারের আইনশৃঙ্খলা-বিষয়ক কমিটি এ বয়স কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল, ১৪-১৫ বছরেই অনেককে গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। তার মানে, ১৮ পর্যন্ত সবাই শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্ক কিংবা অপরিপক্ব থাকছে না। অবশ্য বিতর্কের মুখে সে প্রস্তাব তখন গৃহীত হয়নি।
ভোটারের বয়স নির্ধারণ যেহেতু নির্বাচন-সংক্রান্ত কাজ, সেহেতু নির্বাচন কমিশনই এ সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন। জানুয়ারিতে এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের পর যে আলোচনা হয়েছে, তাতে দেখা গেছে, বিএনপি বয়স কমানোর বিষয়টি নাকচ করেছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এর পক্ষে বক্তব্য দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত সংস্কার কমিশন অবশ্য ভোট দেওয়ার বয়স কমানোর সুপারিশ করেনি। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বয়স ন্যূনতম ২১ বছর করার সুপারিশ করলে বিএনপি তা ২৫ বছরেই রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি ২৩ বছর করার পরামর্শ দিয়েছে।
বাস্তবতার আলোকে এবং সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তনই প্রকৃতির নিয়ম। ভোট দেওয়ার বয়স ন্যূনতম ১৮ বছর সাধারণ নিয়ম দাঁড়িয়েছে বটে, কিন্তু এখানেও সংস্কার আসতে পারে। পরিবর্তন আসতে পারে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বয়সেও। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে বলে তা-ই আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে– এমন নয়। আমাদের তরুণরা অল্প বয়সেও অনেক সাফল্য এনেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের গল্পও তারুণ্যের। তারা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে তাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের বিষয়টিও রাষ্ট্রীয়ভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
mahfuz.manik@gmail.com