বিশ্বায়নের কালে যোগাযোগ বনাম সংযোগ
Published: 19th, January 2025 GMT
যোগাযোগ ও সংযোগ শব্দ দুটোর মধ্যে আমি একটি বিভাজন করি। ইংরেজিতে যদি বলি, তাহলে আমার কাছে যোগাযাগ মানে ‘কানেকশন’; সংযোগ মানে ‘কানেক্টেডনেস’। আমি মনে করি, তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব ও সামাজিক মাধ্যমের বিস্তারের কারণে বিশ্বায়নের কালে পৃথিবীতে নিশ্চিতভাবে যোগাযোগ বেড়েছে। একই সঙ্গে মানুষে মানুষে সংযোগ কমেছে।
জানি, আমার এ মন্তব্যে অনেকেই ভ্রু কুঁচকাবেন। যে ত্বরান্বিত গতিতে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব এবং সামাজিক মাধ্যম ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানে কী করে আমি বলি যে, পৃথিবী আগের চেয়ে আরও বেশি সংযুক্ত নয়? যুক্তি দেখানো হবে, বর্তমান বিশ্বে মোবাইল ফোন গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৯০০ কোটি, পৃথিবীতে ৪০০ কোটিরও বেশি মানুষের চৌকস ফোন তথা ‘স্মার্টফোন’ আছে এবং ৫০০ কোটিরও বেশি মানুষ আন্তর্যোগ বা ‘ইন্টারনেট’ ব্যবহার করেন।
মানব-ইতিহাসে মানুষে মানুষে কখনও কি এর চেয়ে বেশি যোগাযোগ ছিল? কথা সত্য। কিন্তু আবারও বলি, যোগাযোগ মানেই সংযোগ নয় এবং এ দুয়ের যে পার্থক্য, সেটা শুধু কথার কথা নয়
অথবা বায়বীয় কিছু নয়। পার্থক্যটি একেবারেই বাস্তব।
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, বর্তমান বিশ্বে মানুষে মানুষে যোগাযোগ অকল্পনীয় গতিতে বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির নানান পন্থা ব্যবহার করে এই গোলার্ধের এক প্রান্ত থেকে একজন মানুষ চোখের পলকে অন্য প্রান্তের আরেকজনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন। একজন আরেক জনকে লিখতে পারেন; একজন আরেক জনের সঙ্গে সংবাদ, তথ্য, ফটো, সচলচিত্র সব সহভাগ করে নিতে পারেন। তারা পরস্পর ব্যক্তিগত সংবাদ আদান-প্রদান করতে পারেন। এই যেমন তারা কী করছেন, বন্ধুবান্ধব কে কোথায় আছেন, আকর্ষণীয় কিছু ঘটছে কিনা সংস্কৃতি অঙ্গনে। কিছুক্ষণ অবয়বপত্র তথা ফেসবুক ঘুরে আসুন। বুঝতে পারবেন, আমি কী বলতে চাইছি। সবার জন্য উন্মুক্ত এমন একটা মাধ্যম নিশ্চিতভাবে মানব-যোগাযোগ বাড়িয়েছে।
সুতরাং মানব-যোগাযোগ অবশ্যই বেড়েছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানান বিষয়ের ওপরে মানুষ তাদের মতামত প্রকাশ করেন। আপনি এসব বিষয়ের ওপরে নানান মাধ্যমে কিছু লিখুন। দেখবেন, মিনিটের মধ্যে মানুষ সেখানে এসে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। হয় তারা আপনার সঙ্গে একমত হচ্ছেন অথবা ভিন্নমত পোষণ করছেন এবং এ প্রক্রিয়ায় নতুন নতুন মত, দৃষ্টিভঙ্গি, তথ্য উপস্থাপিত হচ্ছে। এর ফলে উৎসাহব্যঞ্জক ও উদ্দীপক আলাপ-আলোচনা, বিতর্ক ও মতবিনিময় শুরু হচ্ছে।
একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, সামাজিক মাধ্যম মানুষকে একত্র করেছে; তাদের কণ্ঠস্বরকে জড়ো করেছে এবং সেই সঙ্গে সামাজিক আন্দোলন প্রসারিত করেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক বছর আগের ‘আরব বসন্ত’ বিষয়ে ভাবা যেতে পারে। টুইটারে (বর্তমানে এক্স নামে পরিচিত) টুইট এবং পুনঃটুইটের মাধ্যমে আরও সংক্ষিপ্তভাবে মানুষে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। এর ফলে বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগ এক নতুন মাত্রিকতায় পৌঁছে গেছে, যেখানে সামাজিক যোগাযোগের পূরক প্রভাব অভাবনীয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, এ সব কিছু কি মানুষে মানুষে সংযোগের বিকল্প হতে পারে? আমি মনে করি, মানব-সংযোগ শুধু সামাজিক মাধ্যম বা তথ্যপ্রযুক্তির যোগাযোগ নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। মানব যোগাযোগের ক্ষেত্রে কখনও কখনও মানুষ দূর থেকে যোগাযোগ রক্ষা করে। কখনও কখনও অজ্ঞাতনামা হয়ে থাকেন, কখনও পরস্পর চাক্ষুষ দেখাও হয় না। এ রকম যোগাযোগ কখনও কখনও অস্পষ্ট, যান্ত্রিক এবং দুঃখজনকভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয় না। প্রায়ই মানুষে মানুষে যোগাযোগ করার এক পন্থা হয়ে দাঁড়ায় অর্থহীন এক ‘পছন্দ’ চিহ্ন, এবং কখনও কখনও অসংগত প্রতিক্রিয়া। যেমন– আমি দেখেছি যে, কারও প্রদত্ত পিতা-মাতার মৃত্যু সংবাদে অনেকেই প্রতিক্রিয়া জানান ‘পছন্দ’ চিহ্ন দিয়ে। এ যোগাযোগ সত্যিকার অর্থে কোনো যোগাযোগই নয় এবং এগুলো মানুষজনের অসংবেদনশীলতারই পরাকাষ্ঠা।
মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ একদম অন্য জিনিস। সংযোগের জন্য প্রয়োজন সশরীরে উপস্থিত হওয়া; সামনাসামনি কথাবার্তা, চাক্ষুষ যোগাযোগ। মানুষকে স্পর্শ করার মতো ব্যাপার মানব-সংযোগের জন্য অপরিহার্য, যেমন প্রয়োজন সশরীরে উপস্থিতি। এসবের মাধ্যমে আমরা অন্যের হৃদয়কে স্পর্শ করি; একটা আত্মিক সম্পর্ক তৈরি করি ও সত্যিকারভাবে একে অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত হই। কোনো এক সহকর্মীকে একটি ই-বার্তা পাঠানো এক কথা; কিন্তু তাঁর ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করা– তিনি আপনার সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে যাবেন কিনা, সে একেবারে অন্য কথা। এতে সময় বেশি লাগে? সম্ভবত। কিন্তু মানব-সংযোগের জন্য সময় এক অপরিহার্য উপকরণ। কারণ, চূড়ান্ত বিচারে আমরা একে অন্যের সময়টুকুই চাই এবং আমরাও একে অন্যকে সময়ই দিতে পারি।
আধুনিক যুগে একই বাড়িতে এক ছাদের নিচে বসবাস করেও মানুষ বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, কিন্তু ঘরের মানুষের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে না। একটি বাড়িতে প্রায়ই দেখা যায়, সন্ধ্যার পরে বাবা টিভিতে খবর দেখছেন; যুক্ত তিনি বহির্বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে; মা পাশের বাড়ির মহিলার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলছেন। তিনিও যুক্ত বহির্জগতের একজনের সঙ্গে। বাড়ির ছেলেটি তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কোনো খেলা খেলছে। যুক্ত সে একটি যন্ত্রের সঙ্গে এবং বাড়ির মেয়েটি অবয়বপত্রে বার্তা চালাচালি করছে তার বন্ধুদের সঙ্গে। সেও যুক্ত বন্ধুদের সঙ্গে। পরিবারের প্রত্যেকেরই বাইরের জগতের কারও না কারও সঙ্গে যোগাযোগ আছে। কিন্তু বাড়ির কারও সঙ্গে কারও সংযুক্তি নেই। একসঙ্গে একই টেবিলে বসে খাবার খাওয়ার রীতি আজকের দুনিয়ায় বড়ই বিরল।
চূড়ান্ত বিচারে মানব সংযোগের জন্য মানব-যোগাযোগ একটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত হতে পারে, কিন্তু পর্যাপ্ত শর্ত নয় কোনোমতেই। যোগাযোগ সংযোগকে ত্বরান্বিত করতে পারে, কিন্তু যোগাযোগ সংযোগের বিকল্প নয়। সেই সঙ্গে ‘প্রয়োজনীয়’ এবং ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ধারণার মধ্যেও ভেদরেখা টানা দরকার। যেমন– যোগাযোগ প্রয়োজনীয় কিন্তু সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ। একটা রূপক ব্যবহার করি। সংযোগ হচ্ছে একটি ‘ঘর’, যোগাযোগ হচ্ছে সেই ঘরের ‘দরজা’। দরজাকে ঘর ভাবলে বড় ভুল করা হবে এবং একইভাবে ভুল করা হবে যদি আমরা দরজাতেই থেমে যাই, ঘরে প্রবেশ না করি।
সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং
দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, যুক্তরাষ্ট্র
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: স য গ র জন য কখনও কখনও কখনও ক
এছাড়াও পড়ুন:
সব কাজ সামলে নিজেদের স্বাস্থ্যের জন্য সময় বের করা কঠিন, মুটিয়ে যাওয়ার সমস্যায় অনেক নারী
প্রথম সন্তান জন্মের পর ওজন বেড়ে যায় ৩২ বছর বয়সী গৃহিণী শাহানার (ছদ্মনাম)। ভেবেছিলেন, বাড়তি ওজন আবার কমিয়ে ফেলবেন। চেষ্টাও করেছেন অনেক। নানাজনের পরামর্শে ডায়েটসহ নানা পদক্ষেপ নেন, কিন্তু ওজন কমেনি।
শেষে শাহানা একজন পুষ্টিবিদের শরণাপন্ন হন। পুষ্টিবিদ বলেন, নারীদের মুটিয়ে যাওয়ার পেছনে অনেকগুলো বিষয় একসঙ্গে কাজ করে। মূল কারণ কী খাচ্ছেন ও কতটুকু খাচ্ছেন, সেটার ভারসাম্য না থাকা। আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে, যতটুকু খাওয়া হচ্ছে, তা বার্ন (কায়িকশ্রম বা শরীরচর্চার মাধ্যমে ঝরানো) না করা।
ওজন কমানোর জন্য শাহানাকে একটি সুষম খাদ্যতালিকা (ডায়েট চার্ট) মেনে চলার পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম এবং দৈনিক অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটার পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদ।
তবে কিছুদিন নিয়ম মেনে চলার পর হাল ছেড়ে দেন শাহানা। এর কারণ হিসেবে তিনি বললেন, পরিবারের সবার খাবারের ব্যবস্থা করাসহ অন্যান্য কাজ শেষে নিজের জন্য কিছু করার সময় তাঁর হয় না। তা ছাড়া খাদ্যতালিকা অনুযায়ী বেলায় বেলায় নানা রকম দামি বাদাম, ফলমূল কেনাও সব সময় সম্ভব হয় না।
ব্যায়াম ও হাঁটার কথা তুলতেই শাহানা বললেন, ‘সব সামলে সময় হয় না। আবার বাইরে একা যেতেও ভয় লাগে। জিম যে করব, তাতেও তো অনেক খরচ।’
নানা কারণে মুটিয়ে যাওয়ার পর শাহানার মতো ওজন কমাতে পারছেন না অনেক নারী। গৃহিণী থেকে কর্মজীবী—কোনো শ্রেণি–পেশার নারীই এই সমস্যার বাইরে নন। ওজন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেও তাঁরা নানা প্রতিবন্ধকতায় রণে ভঙ্গ দিচ্ছেন। এর পেছনে মূলত তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ব্যবস্থাপনা দায়ী। এর বাইরে আছে আরও কিছু কারণ।
রাজধানীর রায়েরবাজার এলাকায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন ফিরোজা। আগে তিনি দিনে দুটি বাসায় কাজ করতেন। মুটিয়ে যাওয়ায় এখন কাজ করেন একটি বাসায়। ফিরোজার কাছে খাবার মানে অন্তত দুবেলা ভাত। তিন বেলা হলেও ক্ষতি নেই। তিনি বলেন, ‘ভাত ছাড়া আর কী দিয়া পেট ভরামু?’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ ১ হাজার ১২৯ দশমিক ৮১ গ্রাম। ২০১৬ সালে তা ছিল দৈনিক ৯৭৫ দশমিক ৫ গ্রাম। খাদ্য গ্রহণের তালিকার ১০০ ভাগের ৩০ দশমিক ৫৪ শতাংশই ভাত।
বেলায় বেলায় মূলত নিম্নবিত্তের খিদে ভাতেই মেটে। তবে মধ্যবিত্তেরও ভাতের প্রতি টান কম নয়। রাজধানীর নাখালপাড়া এলাকার একজন গৃহিণী জানান, স্থূলতা কমানোর জন্য তিনি পুষ্টিবিদের কাছে গিয়েছিলেন। তাঁকে একটি ডায়েটচার্ট দেওয়া হয়। কয়েক দিন কষ্ট করে সেটা মেনেও চলেন। কিন্তু পরিবারের সবার প্রতিদিনের খাবার নিশ্চিত করে নিজের জন্য আলাদাভাবে সালাদ বা ডায়েট ফুড তৈরি করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাই এখন আবার আগের মতোই ভাত খাচ্ছেন।
দেশের মানুষের দৈনিক প্রয়োজনীয় শর্করারন বেশির ভাগ মেলে ভাত থেকে। তাই ওজন বেড়ে গেলেও ভাত খাওয়া বন্ধ করতে বারণ করেন পুষ্টিবিদেরা। তবে পরিমাণ কমিয়ে আনার পরামর্ম দেন তাঁরা।
বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, গত এক দশকে দেশের মানুষের ভাত খাওয়ার পরিমাণ কিছুটা কমলেও চিনি আগের চেয়ে তিন গুণ বেশি খাচ্ছেন। চিনি বা চিনিযুক্ত যেকোনো খাবারকে স্থূলতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের ভাষ্য, প্রয়োজনের অতিরিক্ত চিনি খেলে যেকোনো বয়সেই স্থূলতা বেড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া ডায়বেটিস, কিনডিতে পাথর, এমনকি ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। তাই চিনি একেবারে বাদ দিতে পারলে ভালো। না হলে নারীদের দৈনিক ৬ চা–চামচের (২৫ গ্রাম বা ১০০ ক্যালোরি) বেশি চিনি খাওয়া উচিত নয়।
বাইরের খাবারে ঝোঁক
রেস্তোরাঁর খাবারের প্রতি আসক্তির কথা জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী। তিনি কাজ করেন গুলশানের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। তাঁর কর্মস্থলে খাবারের ব্যবস্থা নেই। তাই দুপুরের খাবার প্রায় প্রতিদিনই একটি অনলাইন ফুড ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে বাইরে থেকে আনিয়ে খান তিনি। প্রথম দিকে একটি ক্যাটারিং সার্ভিস থেকে ভাত–তরকারি খেলেও ধীরে ধীরে ফাস্টফুডের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন তিনি। এতে তিনি দ্রুতই মুটিয়ে যান। ওই নারী বললেন, আয়ের একটা বড় অংশই বাইরের খাবারের পেছনে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এমন অভ্যাস হয়েছে যে ছাড়তেও পারছি না।
বিবিএসের ২০২২ সালের জরিপে দেখা যায়, গত এক দশকে মানুষের সামগ্রিকভাবে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে বাইরের খাবার খাওয়ার প্রবণতা। সঙ্গে বেড়েছে ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণও। যেখানে ২৬ থেকে ৫০ বছর বয়সী মাঝারিভাবে সক্রিয় নারীদের দৈনিক ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ক্যালোরি প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে দৈনিক মাথাপিছু (নারী–পুরুষ) ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ ২ হাজার ৩৯৩, যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি।
ব্যায়ামের উপকরণ ও ব্যায়ামাগার ব্যয়বহুল
বেসরকারি চাকরিজীবী সুমাইয়া বিনতের (৩৬) ছোট সন্তানের জন্ম হয় ২০২২ সালের প্রথম দিকে। সে সময় তিনি অনেকটাই মুটিয়ে গিয়েছিলেন। অতিরিক্ত ওজন ছিল ১৮ থেকে ২০ কেজির মতো। ওজন কমাতে প্রসবের ৮ মাস পর তিনি ভর্তি হন ধানমন্ডি এলাকার নারীদের একটি জিমে।
ছয় মাসের প্যাকেজে সপ্তাহে চার দিন দেড় ঘণ্টা নিয়মমাফিক ব্যায়াম ছাড়াও জুম্বা নাচ, ইয়োগা করতে শুরু করেন সুমাইয়া। জিমের পুষ্টিবিদের কাছ থেকে একটি খাদ্যতালিকাও সংগ্রহ করেন তিনি। ছয় মাসেই লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখতে পান সুমাইয়া। এখনো জিমের নিয়মিত সদস্য তিনি।
সুমাইয়া বলেন, শুরুতে ওজন কমানো উদ্দেশ্য হলেও এখন এটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। শরীর–স্বাস্থ্যও ভালো থাকছে। কিন্তু ছয় মাস পরপর খরচের একটা বড় ধাক্কা থাকছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সুমাইয়ার মতো অনেক নারী নিয়মিত জিম করছেন, অথবা করার কথা ভাবছেন। অনেকে কিছুদিন জিম করে মাঝপথে ছেড়েও দিচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজধানীর মিরপুর এলাকার একটি জিমের একজন কর্মী জানান, একটু ভালো মানের জিমগুলোয় খরচ তুলনামূলক বেশি। সে জন্য অনেকে জিমে এসেও কিছুদিন পর ছেড়ে দেন। এ ছাড়া যেগুলোয় খরচ কম, সেগুলো নারীদের জন্য ততটা সাচ্ছন্দদায়ক হয় না। সাধারণত ছেলে–মেয়ের একসঙ্গে জিমের ব্যবস্থা থাকে। নিরাপত্তার প্রশ্নও থেকে যায়।
রাজধানীর গুলশান, ধানমন্ডি, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শান্তিনগর, উত্তরা, বনশ্রী এলাকার কয়েকটি জিমে খোঁজ নিয়ে নানা রকম প্যাকেজের কথা জানা যায়। এক মাস থেকে শুরু করে তিন মাস, ছয় মাস, এমনকি পুরো বছরের জন্য জিমের সদস্যপদ নেওয়া যায়। জিমভেদে ন্যূনতম মাসিক ব্যয় ২ হাজার টাকা, সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।
নাখালপাড়ার একজন নারী জানান, তাঁকে চিকিৎসক দৈনিক ৫ কিলোমিটার দৌড়াতে বলেছেন। তাই মাস তিনেক আগে একটি জিমে তিন মাসের প্যাকেজে সদস্য হন তিনি। সেখানকার ট্রেডমিলে দৌড়াতেন। প্যাকেজ শেষ হওয়ার পর জিমে যাওয়া বন্ধ করেছেন। এখন সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন রাতে স্বামীর সঙ্গে বিজয় সরণির রাস্তায় এক ঘণ্টা দৌড়ান তিনি।
ওই নারী বলেন, মেয়েরা ব্যায়াম করতে বা হাঁটতে বের হলে কিছু মানুষ অদ্ভুদ দৃষ্টিতে তাকায়। তা ছাড়া দৌড়ানোর উপযোগী পোশাক পরে বের হওয়া যায় না। তাই ট্রেডমিল কেনার কথা ভাবছেন তিনি।
ঘরে রেখে নিজে নিজে ব্যবহার করা যায়—এমন কয়েক ধরনের ব্যায়ামের যন্ত্র রয়েছে। হালকা গড়নের একটি ম্যানুয়াল ট্রেডমিলের দাম ১৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু। ভালো মানের একটির দাম পড়ে ৩০ হাজার থেকে শুরু করে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। সঙ্গে একটি সাইকেলিং যন্ত্র চাইলে গুনতে হবে আরও ১০ হাজার টাকা। মান অনুযায়ী দাম বাড়বে। হাতের ব্যায়ামের জন্য ছোট ডামবেলগুলোর দাম ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে।
নিজেকেই উদ্যোগী হতে হবে
রাজধানীর বারডেম হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ ও বিভাগীয় প্রধান শামসুন্নাহার নাহিদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খেলে স্বাভাবিকভাবেই মুটিয়ে যায়। সেটা নারী হোক কিংবা পুরুষ। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, তেল–মসলা বেশি দিয়ে পরিবারের সবার জন্য অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত যে খাদ্য নারীরা প্রস্তুত করেন, সেগুলো খেয়ে পরিবারের অন্যদের ওজন না বাড়লেও নারীদের ওজন বেড়ে যায়। কেননা, অন্যরা যা খাচ্ছে, তা বাইরে যাওয়া ও হাঁটাচলার কারণে চর্বিতে রূপ নেয় না। কিন্তু কর্মজীবী নারীরা দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে কাজ করার কারণে মুটিয়ে যান।
শামসুন্নাহার নাহিদ আরও বলেন, খাওয়ার পরিমাণ শুধু কমালেই হবে না, কী খাচ্ছেন তা বুঝে খেতে হবে। ভাত ও চিনি খেতে হবে পরিমাণমতো। বাইরের খাবার যত এড়িয়ে চলা যায়, ততই মঙ্গল। আর নিয়মিত খুব সামান্য হলেও শরীরচর্চা করতেই হবে।
বাড়ির বাইরে গিয়ে হাঁটার সুযোগ না থাকলে ছাদে বা ঘরের ভেতর হাঁটাহাটি করার পরামর্শ দিয়ে এই পুষ্টিবিদ বলেন, নিয়ম করে জিমে গেলে সেটা স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনে। সেটি সম্ভব না হলে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে হাত–পা ছুড়ে আধা ঘণ্টা ব্যায়াম করে নিলেও তা মেদ জমতে বাধা দেয়। মোট কথা, মুটিয়ে যাওয়ার সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে নিজেকেই উদ্যোগী হয়ে নিজেকে সাহায্য করতে হবে।