‘এটা ২০০ রানের উইকেট ছিল না। ১৫০ রানের উইকেট।’ - ফরচুন বরিশালের বিপক্ষে ম্যাচ হারের পর চিটাগং কিংসের অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন বলেছেন। ঢাকার পর সিলেট। সিলেটের পর বিপিএল এখন চট্টগ্রামে। একদিনের বিরতির আজ রবিবার (১৯ জানুয়ারি) আবারও ২২ গজে বল গড়ালেও রান উৎসব হয়নি। বরং ব্যাটসম্যানদের জন্য আজ ছিল কঠিন পরীক্ষার মঞ্চ।

তবে চিটাগংয়ের ওপেনার উসমান ইনিংসের প্রথম ওভারে এলোপাথাড়ি শটে ১৫ রান তুলে যেভাবে শুরু করেছিলেন মনে হচ্ছিল রান ফোয়ারা ছুটবে। কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি। ২০ বলে ৫ উইকেট হারিয়ে চিটাগং শেষ পর্যন্ত করতে পারে মাত্র ১২১ রান। ওই লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে বরিশালও হারায় ৪ উইকেট। দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ডেডিভ মালান ফিফটি তুলে দলকে বিপর্যয়ে পড়তে দেননি। জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়েন।

তবে উইকেট যে কঠিন ছিল তা বলতে দ্বিধা করেননি ম্যাচসেরার পুরস্কার পাওয়া মালান, ‘‘দিনের ম্যাচ হিসেবে সহজ ছিল না (উইকেট), ধীরগতির। ভালো দিক যে আমরা তাদেরকে ১২০ রানে আটকে দিতে পেরেছিলাম। আমাদেরকে যদি ১৪০-১৫০ রান তাড়া করতে হতো তাহলে শুরু থেকেই ঝুঁকি নিতে হতো। এজন্য বোলারদের ক্রেডিট দিতে হবে যে তারা ১২০ রানে আটকে রাখতে পেরেছিল।’’

আরো পড়ুন:

টসে জিতে ব্যাটিংয়ে খুলনা

বরিশালকে বিপদে পড়তে দেননি মালান

উইকেটে সময় দিয়ে রান তুলেছেন মালান। সতীর্থদের আসা-যাওয়ার মিছিলে যোগ না দিয়ে থিতু হয়েছেন। এরপর রান তুলেছেন অনায়েসে। ৪১ বলে ৫৬ রান করেছেন ৩ চার ও ২ ছক্কায়। দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়তে পারায় খুশি মালান, ‘‘এটা (উইকেট) নিশ্চিতভাবেই প্রবল ধীর গতির উইকেট। এবং স্কিড করছিল। আমরা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট হারিয়েছিলাম। এজন্য আমাদেরকে সময় দিতে হয়েছে এবং খেলাটাকে গভীরে নিয়ে যেতে হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামে যেখানে বাউন্ডারিগুলো ছোট নয়, এখানে ছন্দ পেলে এবং জুটি গড়ে উঠলে সেটা ভাঙা ততটা সহজ নয়।’’

জয়ের জন্য মালান কৃতিত্ব দিয়েছেন নবী ও মাহমুদউল্লাহকে। দুজনই জুটি গড়ে তার থেকে চাপ সরিয়ে নিয়েছিলেন, ‘‘হ্যাঁ, নবী চাপ কমিয়ে দিয়েছিল। শুরুতে মাহমুদউল্লাহ কয়েকটি বাউন্ডারি মেরেও আমার থেকে চাপ নিয়ে নিয়েছিল। যা আমার কাজ সহজ করেছিল। পরবর্তীতে নবী ভাই এসে একই কাজ করেছিলেন। ভালো সুযোগগুলো নিয়ে রান তুলছিলেন। যখন আমি শান্ত হয়ে ব্যাটিং করছিলাম তখন তিনি বাউন্ডারি মেরে স্কোর বোর্ডটাকে এগিয়ে নিয়ে যান।’’

জয়ের জন্য বরিশালের অধিনায়ক তামিম ইকবাল বোলারদের কৃতিত্ব দিলেও উইকেট টি-টোয়েন্টির জন্য ‘যুৎসই’ ছিল না এমন কথাও বলেছেন, ‘‘আমি মনে করি প্রথমত বোলাররা অসাধারণ বোলিং করেছেন। টসের সময় কনফিউজ ছিলাম ব্যাটিং করবো নাকি বোলিং। এরপর বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেই। বোলিংয়ে বোলাররা কন্ডিশনের দারুণ ব্যবহার করেছেন।’’

উইকেট নিয়ে তামিমের মূল্যায়ন, ‘‘এটা অনেকটাই কঠিন উইকেট ছিল। আমি বলবো না যে, এটা টি-টোয়েন্টির জন্য  খুব খুব ভালো উইকেট। প্রথম ইনিংসে উইকেট ‘প্যাচি’ ছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো অবস্থায় ছিল।’’

‘‘এ ধরণের ১২০ রানের ম্যাচে আপনি যদি সুযোগগুলো নিয়ে নেন…২০-২৫ রান তুলে নেন প্রথম ৩ ওভারেই তাহলে ম্যাচটা শেষ হয়ে যায়। আমরা সেটা পারিনি। আমরা একাধিক উইকেট হারিয়েছি। তেমন রান পাইনি। এজন্য চাপে পড়েছিলাম।’’ 

আজকের ম্যাচের উইকেট নিয়ে তামিম আলোচনা করলেও, সব মিলিয়ে এবারের উইকেটে দারুণ খুশি জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক। তার মতে, অতীতের কয়েক আসরের চেয়ে এবারই সবচেয়ে ভালো উইকেটে খেলছেন তারা, ‘‘নিশ্চিতভাবেই (ব্যাটসম্যানদের পরীক্ষা হয় এসব উইকেটে)। গ্রাউন্ডসম্যান এবং কিউরেটর পুরো টুর্নামেন্টে ভালো কাজ করেছেন। এক দুইটি ম্যাচ এদিক সেদিক হবে, সেটা হতেই পারে।  আমি মনে করি, এবার যে ধরণের উইকেটে আমরা খেলছি তা শেষ কয়েক বছরের মধ্যে সেরা। তারপরও আপনি যদি নিজের পুরো সামর্থ্যকে কাজে লাগান তাহলে এ ধরণের উইকেটেও রান করা সম্ভব। আমি মনে করি আমাদের ব্যাটসম্যানরা সেটা করতে পারেনি বলে আউট হয়েছে। তবে দলটা এই মুহূর্তে ভালো অবস্থায় আছে।’’

সাত ম্যাচে পাঁচ জয়ে তামিমের বরিশাল ১০ পয়েন্ট নিয়ে প্লে’ অফের পথেই আছে। পয়েন্ট তালিকার দুইয়ে তাদের অবস্থান। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নিজেদের দলটাকে বেশ ভালোভাবেই গুছিয়ে নিয়েছেন তামিম।

চট্টগ্রাম/ইয়াসিন/আমিনুল

.

উৎস: Risingbd

কীওয়ার্ড: চ কর চ কর ব প এল র উইক ট কর ছ ন র জন য

এছাড়াও পড়ুন:

সংবিধানে সমতা ও টেকসই উন্নয়নের নীতি

যুগে যুগে, দেশে দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছে, আইনশাস্ত্রে তা প্রতিফলিত প্রিন্সিপল অব ইকুইটি বা সমতার নীতিতে। ইকুইটি বা সমতার নীতি মূলত সবার জন্য ন্যায্যতা নিশ্চিত করা এবং একটি গ্রহণযোগ্য জীবনমান বজায় রাখার অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেয়। সহজভাবে বললে, এটি ন্যায়বিচার এবং সুষ্ঠু বণ্টনের ধারণা তুলে ধরে। বিশেষ করে সমাজের অবহেলিত বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণের দিকে গুরুত্ব দেয়। এসব জনগোষ্ঠীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত না করলে অসমতা দীর্ঘস্থায়ী হয়। লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম বা আয়ের ভিত্তিতে এ ধরনের অবহেলিত গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা যায়।

সমতার নীতি শুধু বর্তমান সময়ের সমস্যার সমাধান নয়; এটি দুই ধরনের দৃষ্টিকোণ ধারণ করে– ‘প্রজন্মগত সমতা’ এবং ‘অন্তঃপ্রজন্মগত সমতা’। প্রজন্মগত সমতা বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে ন্যায্যতা নিশ্চিত করে; আর অন্তঃপ্রজন্মগত সমতা বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে ন্যায্যতার দিকে মনোযোগ দেয়। এই দুই দিক আবার একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্তমান সময়ে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অসমতাগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আজকের সমতা ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

টেকসই উন্নয়নের ধারণাটি সমতার নীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ১৯৮৭ সালের ব্রুন্টল্যান্ড রিপোর্টে টেকসই উন্নয়ন বলতে ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্য ব্যাহত না করে বর্তমান প্রজন্মের প্রয়োজন মেটানো’ বোঝানো হয়েছে। এতে টেকসই উন্নয়নের ধারণায় বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে উভয় ধরনের সমতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ২০১১ সালে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীতে উপরোক্ত নীতিগুলোর কিছুটা প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এই সংশোধনীতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা এবং উন্নয়নকে বাংলাদেশ সংবিধানের মূলনীতির অংশ হিসেবে যুক্ত করা হয়। এতে সরকারকে পরিবেশ রক্ষা এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশোধনীতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের কথা উল্লেখ করে প্রকারান্তরে উভয় ধরনের সমতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

যেহেতু অনেক আন্তর্জাতিক কনভেনশন এবং চুক্তির একটি পক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়নের ধারণা ও নীতিটি গ্রহণ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ; রাষ্ট্রীয় নীতির একটি মৌলিক নীতি হিসেবে টেকসই উন্নয়নের ধারণাটি যুক্ত করে নেওয়াকে তর্কাতীতভাবে সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলা যায়। এ ছাড়া, বাংলাদেশ সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদ দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং শ্রমজীবী, কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শোষণ থেকে মুক্তির দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর দিয়েছে। সংবিধানের এই নীতিগুলো আদালতে কার্যকর নয়। বাংলাদেশ সংবিধানের ৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংবিধানের মূলনীতিগুলো রাষ্ট্রের নীতি ও শাসন ব্যবস্থার জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে, কিন্তু বিচারিকভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। আদালতও এই অবস্থান সমর্থন করেছেন। যেমন কুদরাত-ই-এলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ (১৯৯২) মামলার রায়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টও উল্লেখ করেছেন।

বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রাখে, যেখানে আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতা, সমতা এবং ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুরক্ষিত থাকবে। যদি মূল সংবিধানের উদ্দেশ্য মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে সমতা নিশ্চিত করা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে– কেন বাংলাদেশের সংবিধানে সামাজিক-অর্থনৈতিক অধিকার এবং রাষ্ট্রনীতির মৌলিক নীতিগুলো বিচারিকভাবে কার্যকর থাকবে না। বর্তমান সময়ে যখন সংবিধানের নানাবিধ সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে চারদিকে আলোচনা চলছে, তখন প্রস্তাব করা যায়, সমতা ও টেকসই উন্নয়নের নীতিগুলো সংবিধানে আরও শক্তিশালীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এর ফলে রাষ্ট্রের যে কোনো পর্যায়ে এই নীতিগুলোর লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ নাগরিকদের আদালতের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত হবে।

সমতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সংবিধানের যে কোনো সংশোধনী কিংবা সংযুক্তি রাষ্ট্র কিংবা সরকারের জন‍্য এক ধরনের সাংবিধানিক দায় তৈরি করবে– এ কথা সত‍্যি। কিন্তু পৃথিবীতে এমনও অনেক রাষ্ট্র রয়েছে, যেখানে এই সাংবিধানিক দায় না থাকা সত্ত্বেও শুধু জনকল‍্যাণের দরদটুকু আমলে নিয়েও সুবিধাবঞ্চিতদের প্রতি রাষ্ট্রের যথাযথ কর্তব‍্য ঠিক ঠিক পালিত হয়। আর এটি সম্ভব হয় রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছার কারণে।

মাহতাব শাওন: শিক্ষক ও গবেষক, গুয়েল্ফ বিশ্ববিদ‍্যালয়, কানাডা; আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং খালেদ জামান: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

সম্পর্কিত নিবন্ধ