চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে জরুরি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে গতকাল শনিবার মহানগরীর বহদ্দারহাটে বারইপাড়া খাল খনন কার্যক্রম ও আশপাশের খাল-নালার পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের তিন উপদেষ্টা। পরিদর্শনের সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজমের সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা.

শাহাদাত হোসেন।

আজ রোববার মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে জরুরি মতবিনিময় সভা করবেন উপদেষ্টারা। ওই তিন উপদেষ্টার সঙ্গে যুক্ত হবেন শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। সংকট নিরসনে একটি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করে আগামী মার্চ মাসের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য লক্ষ্য দেওয়া হবে সংস্থাগুলোকে। লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে সংস্থাগুলোকে জবাবদিহি করতে হবে।

খাল খনন কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করতে আমরা চট্টগ্রামে এসেছি। আগামী বর্ষা মৌসুমের আগে একটা দৃশ্যমান উন্নতির চেষ্টা করছি। আগামীকাল (আজ) আমরা সবার সঙ্গে সার্কিট হাউসে আলোচনায় বসব। সেখানে একটা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করব। এ কর্মপরিকল্পনা সংস্থাগুলোকে জানিয়ে দেওয়া হবে। মার্চের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য কিছু সুনির্দিষ্ট কাজ তাদের দেওয়া হবে। কোনো অজুহাত শোনা হবে না। ব্যর্থতার দায় তাদের নিতে হবে। আমরা একটা দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখতে চাই। না হলে এসব প্রকল্পের আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা, আমরা ভেবে দেখব।

উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, প্রকল্পগুলো যদি জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করতে না পারে, তাহলে সেসব প্রকল্প নিয়ে সরকার নতুনভাবে ভেবে দেখবে।
মূলত জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। খালগুলো ভরাট হওয়ার তিনটি বড় কারণ আছে। খালের জায়গায় ব্যক্তি মালিকানায় বড় ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। পাহাড় কাটার ফলে মাটি পড়ে এবং পলিথিন ও প্লাস্টিকে খাল ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) দুটি, সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। চার প্রকল্পে মোট ব্যয় প্রায় ১৪ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০১৭ সালে শুরু হওয়া ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি সবচেয়ে বড়। ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি বাস্তবায়ন করা হলেও কোনো সুফল পায়নি নগরবাসী।

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: উপদ ষ ট প রকল প ন রসন নগর র

এছাড়াও পড়ুন:

‘আগে গোপনে মেরেছি, এখন ওপেন মারব’ বলার দু’দিন পর অর্ধশত গুলি

যেন তামিল ছবির চিত্রনাট্য। ‘আগে গোপনে মেরেছি, এখন ওপেন মারব’– সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন হত্যার হুমকি ছড়িয়ে দেওয়ার দু’দিনের মাথায় সত্যি সত্যি কেড়ে নেওয়া হলো দু’জনের জীবন। গত শনিবারের চট্টগ্রামের এই জোড়া খুনের ঘটনা তৈরি করেছে দেশজুড়ে চাঞ্চল্য।

হত্যার ছক অনুযায়ী প্রথমে ১৩ সন্ত্রাসী ছয় মোটরসাইকেলে চেপে প্রাইভেটকারকে তাড়া করে। সেই গাড়িতে ছিলেন ছয় আরোহী। প্রাইভেটকারটি নগরীর বাকলিয়ার রাজাখালী ব্রিজের ওপর পৌঁছালে প্রথম দফা গুলি করা হয়। সফল না হওয়ায় সন্ত্রাসীরা প্রাইভেটকারের পিছু ছাড়েনি। নগরের চন্দনপুরা এক্সেস রোডের মুখে পৌঁছালে আরেক দফা এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে প্রাইভেটকারটি ঝাঁজরা করে দেয় সন্ত্রাসীরা। ঘটনাস্থলেই পড়ে দু’জনের লাশ। গুলিবিদ্ধ হন আরও দু’জন।

চট্টগ্রামে এই জোড়া খুনে ‘নাইন এমএম’ পিস্তল থেকে করা হয় অর্ধশতাধিক গুলি। সন্ত্রাসীদের প্রধান টার্গেট ছিল আরেক সন্ত্রাসী সারোয়ার হোসেন বাবলা। নগরের একাংশে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে বাবলার বিরোধের জেরে ঘটে এ হত্যাকাণ্ড। বিদেশে বসে সব নিয়ন্ত্রণ করে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান। পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

হত্যার শিকার দু’জন হলেন হাটহাজারীর উত্তর বুড়িশ্চর গ্রামের মো. ইলিয়াসের ছেলে বখতেয়ার হোসেন মানিক (২৮) ও কক্সবাজারের রামুর পূর্ব ধেচুয়া গ্রামের আবদুল সালামের ছেলে আবদুল্লাহ আল রিফাত (২২)। এ ঘটনায় এরই মধ্যে পাঁচজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। ওই পাঁচজন ছাড়াও ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্নাকে আসামি করে মামলা হয়েছে। চার দিন পার হলেও পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। উদ্ধার হয়নি হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র।

শনাক্ত পাঁচজন
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের পর আসামিদের শনাক্তে ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। তাতে ছয়টি মোটরসাইকেলে ১৩ জনকে দেখা গেছে। এর মধ্যে পাঁচজনকে শনাক্ত করা গেছে। তারা হলো– বায়েজিদ বোস্তামীর শহীদনগর সোবহান কন্ট্রাক্টর বাড়ির মো. আলমের ছেলে মো. হাসান (৩৮), ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর গ্রামের মোহাম্মদ মুসার ছেলে মোবারক হোসেন ইমন (২২), রাউজানের পরীর দীঘির পাড় এলাকার আনোয়ার হোসেনের ছেলে মো. খোরশেদ (৪৫), একই থানার দক্ষিণ-পূর্ব রাউজানের বদিউল আলমের ছেলে রায়হান (৩৫) ও নগরের খুলশী সিডিএ পুনর্বাসন এলাকার খায়রুল আলমের ছেলে বোরহান (২৭)।

ঝাঁজরা করা প্রাইভেটকার থেকে গুলির খোসা জব্দ করেছে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট। খোসাতে ‘নাইন এমএম’ লেখা ছিল। গাড়ির ক্ষত দেখে অর্ধশতাধিক গুলি করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। গাড়িটির মালিক রাঙ্গুনিয়ার রোনেল তালুকদার। তিনি গাড়িটি ভাড়ায় চালান।

 গাড়িটির চালক মো. ইমন। তবে ঘটনার দিন চালকের আসনে ছিলেন বখতেয়ার হোসেন মানিক। জানতে চাইলে রোনেল তালুকদার বলেন, ‘ঘটনার সকালে গাড়িটি ভাড়া নিয়ে লোহাগাড়ায় যান চালক।
সেখান থেকে ফিরে আমাকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। তবে চালক জানান, তার ভাড়া আছে। পরে শুনেছি, আমার গাড়িতে গুলি করে দু’জনকে হত্যা করা হয়েছে। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন চালক ইমনের বন্ধু মানিক।’

ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রীর পরিকল্পনায় খুন
ঘটনার দু’দিন পর মঙ্গলবার নগরের বাকলিয়া থানায় মামলা করেছেন নিহত বখতেয়ার হোসেন মানিকের মা ফিরোজা বেগম। মামলায় ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্নাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া শনাক্ত পাঁচজনসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করে ও অচেনা ছয় থেকে সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে ফিরোজা বেগম অভিযোগ করেন, সারোয়ারের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ছিলেন মানিক এবং ব্যক্তিগত কাজ করতেন আব্দুল্লাহ। সে হিসেবে মানিকের সঙ্গে আব্দুল্লাহর সখ্য গড়ে ওঠে। রোজার সময় বাবলাসহ সবাই মিলে কর্ণফুলী সেতু এলাকায় আড্ডা দিতেন। প্রতিদিনের মতো ঘটনার দিন রাতে আড্ডা দিয়ে ফেরার পথে তাদের গাড়িতে গুলি চালানো হয়। ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী তামান্নার পরিকল্পনায় গাড়িতে গুলি করা হয়। ওই গাড়িতে থাকা মো. রবিন বলেন, ‘তার সন্দেহ ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হওয়ার পেছনে বাবলার হাত থাকতে পারে– এমন সন্দেহ থেকে তাকে খুন করতে সাজ্জাদের অনুসারীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে।’

বাকলিয়া থানার ওসি ইখতিয়ার উদ্দিন সমকালকে বলেন, ‘আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তাদের গ্রেপ্তার করতে পারলে হত্যার কারণ ও কারা জড়িত ছিল তা জানা যাবে। এখন পর্যন্ত আমরা আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে গুরুত্ব দিচ্ছি।’ 

হুমকির দু’দিনের মধ্যে জোড়া খুন
নগরের বায়েজিদ, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ ও হাটহাজারী এলাকার আধিপত্য নিয়ে লড়াই চলছে ছোট সাজ্জাদ ও বাবলার মধ্যে। এই বিরোধের জেরে গত ৫ আগস্টের পর থেকে তিনজন খুন হয়েছেন। এর পর থেকে পুলিশ ছোট সাজ্জাদকে গ্রেপ্তারে তৎপর হয়ে ওঠে। তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারের ঘোষণাও আসে। গত ১৫ মার্চ রাতে রাজধানীর বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না ফেসবুকে ভিডিও আপলোড করে প্রকাশ্য হুমকি দেন, ‘যারা এ ঘটনা ঘটাইছে, তাদেরকে ছাড় দেওয়া হবে না। মাথায় রাইখো। এতদিন আমরা পলাতক ছিলাম। এখন তোমাদের পলাতক থাকার পালা।’ এর পর গত ২৬ মার্চ সাজ্জাদের নানি রেহেনা বেগমের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। তাতে তিনি বলেন, ‘আগে গোপনে মেরেছি। এখন ওপেন মারব।’ সেই ভিডিও ছড়ানোর দু’দিনের মধ্যে ফিল্মি কায়দায় দু’জনকে গুলি চালিয়ে  হত্যা করা হয়।

ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না বিভিন্ন সময় অভিযোগ করেছেন, তাদের পেছনে পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছে বাবলা। সাজ্জাদকে গ্রেপ্তারেও বাবলার হাত রয়েছে। গত ১৫ জানুয়ারি বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসিসহ ছয়জনকে আসামি করে আদালতে মামলার আবেদন করে তামান্না। সেই মামলায়ও বাবলাকে আসামি করা হয়। তখন তামান্না অভিযোগ করেছিলেন, সাজ্জাদকে ধরতে যখন পুলিশ অভিযানে আসে তখন সঙ্গে বাবলাও ছিল।   

বিদেশে বসে কলকাঠি নাড়ছে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামের এক সময়ের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান। আলোচিত এইট মার্ডার মামলার দণ্ডিত এ আসামি ২০০০ সালে একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হন। ২০০৪ সালে জামিনে বেরিয়ে তিনি বিদেশে পালিয়ে যান। নগরের বায়েজিদ, পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও ও হাটহাজারী এলাকায় এখনও কেউ নতুন বাড়ি নির্মাণ, ব্যবসা-বাণিজ্য, জমি বেচাকেনা করলেই ফোন আসে সাজ্জাদের। চাঁদা দিতে গড়িমসি করলে শিষ্যদের দিয়ে হামলা করেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে এভাবেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন সাজ্জাদ। ঘনিষ্ঠ সহযোগীর মধ্যে নুরুন্নবী ম্যাক্সন ভারতে গিয়ে মারা গেছেন।

একাধিকবার গ্রেপ্তারের পর দলছুট ঢাকাইয়া আকবর। বাবলা গ্রুপ ছেড়ে বাহিনী গড়েছেন। ফলে হাটহাজারীর শিকারপুর গ্রামের সোনা মিয়া সওদাগর বাড়ির জামালের ছেলে ছোট সাজ্জাদকে শিষ্য হিসেবে গড়ে তোলেন বড় সাজ্জাদ। তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠে ছোট সাজ্জাদ। তাকে গ্রেপ্তারের পর বিদেশে বসে তার শিষ্যদের সাজ্জাদ আলী খান ও হাবিব খান আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ২০ মার্চ চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় এক নারী নিরাপত্তা চেয়ে থানায় মামলা করেছেন। তাঁর দাবি, ছোট সাজ্জাদকে ধরিয়ে দিতে তিনি পুলিশকে সহায়তা করেছিলেন। মামলায় ওই নারী জানিয়েছেন, তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান, হাবিব খান, ছোট সাজ্জাদের স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্নাসহ ১১ জনকে আসামি করেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ