Samakal:
2025-04-03@05:04:10 GMT

ঝুলে যাচ্ছে জুলাই ঘোষণা!

Published: 19th, January 2025 GMT

ঝুলে যাচ্ছে জুলাই ঘোষণা!

জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে আবারও রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠন ও শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত চেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে চিঠিও পাঠানো হচ্ছে। এ ছাড়া আগ্রহী যে কেউ সরাসরি উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মাহফুজ আলমকে যে কোনো মাধ্যমে লিখিতভাবে অভিমত জানাতে পারবেন। এ জন্য ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। 
গতকাল শনিবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে গণমাধ্যমকে এসব কথা জানিয়েছেন উপপ্রেস সচিব আজাদ মজুমদার। নতুন করে মতামত চাওয়ায় জুলাই ঘোষণা ঝুলে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেকে। গতকাল এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে এ ধরনের চিঠি পায়নি। 

১৫ জানুয়ারির মধ্যে জুলাই ঘোষণা দেওয়া হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রথমে জানানো হয়েছিল। তবে ১৫ জানুয়ারির কয়েক দিন আগেই প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, ১৬ জানুয়ারি সর্বদলীয় বৈঠকের পরই জুলাই ঘোষণার দিন-তারিখ চূড়ান্ত হবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, ৩১ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জুলাই অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র পাঠ করা হবে। এ নিয়ে তখন রাজনৈতিক অঙ্গনসহ দেশজুড়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় গত ৩০ ডিসেম্বর রাত ৮টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম জাতীয় নাগরিক কমিটির কয়েকজনকে নিয়ে বৈঠকে বসেন প্রধান উপদেষ্টা ড.

মুহাম্মদ ইউনূস। তবে কয়েকটি রাজনৈতিক দল বৈঠকে অংশ নেওয়ার বিষয়ে যথাযথভাবে আমন্ত্রণ না পাওয়ায় তারা এতে যোগ দেয়নি। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়– সরকার, নাগরিক কমিটিসহ সবাই মিলে জুলাই ঘোষণাপত্র তৈরি করবে। ওই দিনই মধ্যরাতে নাগরিক কমিটি সংবাদ সম্মেলন করে ৩১ ডিসেম্বরের ঘোষণাপত্র পাঠ থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে ওই দিন মার্চ ফর ইউনিটি নামে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দেয় নাগরিক কমিটি। এটি সফল করতে দেশব্যাপী প্রচারণা-জনসংযোগ, লিফলেট বিতরণের কর্মসূচি দেয়। পাশাপাশি নাগরিক কমিটি থেকে একটি ঘোষণাপত্রের খসড়া সরকারকে দেওয়া হয়। এর ওপর নির্ভর করে সরকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মতবিনিময় করে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ঘোষণাপত্র চূড়ান্ত করতে সর্বদলীয় বৈঠকে বসেন। কিন্তু সেখানে কিছু ইস্যুতে মতৈক্য হলেও সব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো এক হতে পারেনি বলে জানা যায়। বিশেষ করে, ঘোষণাপত্রের বিষয়ে বিএনপির দ্বিমত না থাকলেও ঘোষণাপত্রের বিষয়বস্তু সম্পর্কে পুরোপুরি একমত নয়। ঘোষণাপত্রের চেয়ে তারা এই মুহূর্তে জাতীয় নির্বাচনকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে চায়। এমন প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে আবার মতামত আহ্বান করা হলো। 

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে গত বৃহস্পতিবার সর্বদলীয় সংলাপের পরবর্তী কর্মপন্থা হিসেবে গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলসহ সব অংশীজন থেকে অভিমত নেওয়া হচ্ছে। অভিমত চিঠির মাধ্যমে উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত পাঠানো যাবে। এসব অভিমত পর্যালোচনা করে সংশোধিত ও সর্বজনগ্রাহ্য ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করা হবে এবং জনগণের উপস্থিতিতে তা অনতিবিলম্বে ঘোষিত হবে।
এ প্রসঙ্গে এবি পার্টির মহাসচিব আসাদুজ্জামান ফুয়াদ সমকালকে বলেন, অভিমত জানানোর বিষয়ে রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো চিঠি তারা পাননি। একই কথা জানিয়েছেন বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের নেতারা।


 

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: সরক র

এছাড়াও পড়ুন:

ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অবিচল

পাঠ্যপুস্তকে তাঁর জীবনী নেই। অথচ কোথায় ছিলেন না তিনি! ১৯৪৩ সালে অবিভক্ত বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের পাশে ছিলেন। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে মানবিক ও সমাজসেবামূলক কাজে অংশ নিয়েছিলেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দিরে গিয়ে অভয় দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৯ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-বিধ্বস্ত পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা অঞ্চলের সংখ্যালঘু ও উদ্বাস্তুদের আশ্বস্ত করতে এবং তাদের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে ঐতিহাসিক ‘নেহরু-লিয়াকত’ চুক্তি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ষাটের দশকে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক থাকাকালে রেড ক্রসের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি তাঁর মামা অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের সঙ্গে ১৪৪ ধারা ভেঙেছিলেন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদদের জানাজায় অংশ নিয়ে তিনি ও তাঁর মামা দু’জনেই আটক হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিধান-সংবলিত শাসনতন্ত্র প্রণয়নে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে সাহায্য করেছিলেন। ১৯৬১ সালে পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের বাধা মোকাবিলা করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। ১৯৬৬ সালে স্বাধিকার আন্দোলনে ছয় দফার চূড়ান্ত খসড়া প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৬৭ সালে  ছয় দফা আন্দোলন তুঙ্গে থাকাকালে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। মূলত মওলানা ভাসানী ও তাঁর কারণেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্তরা নিঃশর্ত মুক্তি পেয়েছিলেন।

আত্মমর্যাদাশীল বাঙালি জাতির প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৬৯ সালের গোলটেবিল সম্মেলনে তিনি ‘এক মানুষ, এক ভোট’ নীতি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছিলেন। এই নীতিতে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর সংখ্যাগরিষ্ঠতার যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৯টি আসন আদায় করেছিলেন। এভাবেই তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে বিজয়ীদের জাতীয় সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত করেছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর পরাজয় নিশ্চিত করেছিলেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানের অবৈধ সামরিক সরকারকে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। অবৈধ পাঞ্জাবি শাসক চক্রের জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। সাংবিধানিক ব্যত্যয়ে তৎকালীন হাইকোর্ট বারকে নিয়ে তিনি যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তা এত চরমে পৌঁছে যে, ১৯৭১ সালের মার্চে জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করাতে কোনো বিচারকই রাজি হননি। মুক্তিযুদ্ধের পরও তিনি থেমে যাননি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হননি। মুক্তিযুদ্ধের আগেও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথককরণের দাবি তুলেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পরেও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথককরণের দাবি জানিয়েছিলেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে সার্ক গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তিনি শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হকের যোগ্যতম উত্তরাধিকারী হিসেবে বেঁচে ছিলেন।

হাসনাত আরিয়ান খান: লেখক ও গবেষক

সম্পর্কিত নিবন্ধ