নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের যুবদল নেতার বিরুদ্ধে ১ কোটি টাকার মালামাল লুটের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গত ১৫ জানুয়ারি সোনারগাঁ থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

গত বুধবার সকালে উপজেলার জামপুর ইউনিয়নের জামপুর গ্রামে এ. এন.জেড টেক্সটাইল মিলসের নির্মাণ কাজের সময় এ ঘটনা ঘটে। পরে রাতে সোনারগাঁ থানায় প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেন ১ কোটি টাকার মালামাল লুটের অভিযোগ দায়ের করেন উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আশরাফ ভূইয়া, মোতালেব মেম্বার, মুসা মিয়া,দিপু মিয়া, নাঈম,আরিফ, মোক্তারসহ এক থেকে দেড়'শ জনের বিরুদ্ধে। 

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত  বিএনপি নেতা আশরাফ ভূইয়ার নেতৃত্বে উপরোক্ত আসামীরা এ.

এন.জেড ( অ ঘ ত) টেক্সটাইল মিলের নির্মাণ কাজে বাঁধা দিয়ে ২৫ লক্ষ টাকা দাবী করেন। এ চাঁদা না পেয়ে বুধবার সকালে নির্মাধীন স্থানে প্রবেশ করে আশরাফ ভূইয়াসহ ১০০-১৫০ জন সন্ত্রাসীর মাধ্যমে ঘরের টিন, গ্রিল, দরজা, জানালা, টিউবওয়েল, পানির মোটর, শ্যালো মেশিন এবং প্রায় ৩৪ টন রড, ৭০০ বস্তা সিমেন্ট, ৩০ টন আইভীম সহ মোট ১ কোটির মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। 

এ. এন. জেড টেক্সটাইল মিলসের স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেন বলেন, ৫ ই আগষ্টের পর এক দল বিএনপি নেতা আমাদের কাজের জায়গায় ২৫ লক্ষ চাঁদা না দিলে কাজ করতে দিবেনা বলে হুমকি প্রদান করে আসছিলো।

এরই ধারাবাহিকতায় আজ আমাদের নির্মাণাধীন কাজে উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আশরাফ ভূইয়ার নেতৃত্বে একদল চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীদরা দেশিয় অস্ত্র নিয়ে বাঁধা দিয়ে শ্রমিকদের মেরে ১ কোটি টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। একই সাথে তাদের জমি দাবী করে ব্যানার লাগিয়ে যায়।  এ বিষয়ে আমি ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে সোনারগাঁ থানায় অভিযোগ দায়ের করেছি। 

কোম্পানির নিরাপত্তা কর্মী বাবুল মিয়া জানান, কয়েক মাস ধরেই যুবদল নেতা আশরাফ ভূইয়া চাঁদা দাবী করে আসছিল। গতকাল সকালে তারা আমাদের কাজে বাঁধা ও ককটেল ফুটিয়ে আমার থাকার ঘরটিসহ কোটি টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায় এবং প্রাণ নাশের হুমকি প্রদান করে। 

জমি বিক্রেতা শহিদুল্লাহ ভূইয়া বলেন, আমি গত বছর আনোয়ার হোসেনের কাছে জমিটি বিক্রয় করেছি। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের দাবীকৃত চাঁদা না দিতে চাইলে তারা তাদের জমি দাবী করে সন্ত্রাসী বাহিনী মাধ্যমে নির্মাধীণ কাজের সব মালামাল লুটে নিয়ে যায়। 

স্থানীয় প্রতিবেশী আব্দুল আউয়াল সহ একাধিক ব্যক্তি জানান, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব শুরু করেছে একদল প্রভাবশালী। দীর্ঘ দিন ধরেই তারা এলাকায় বিভিন্ন কোম্পানিসহ নানা জায়গায় চাঁদাবাজি করছে। বহু বছর ধরেই আমরা দেখেছি শহিদুল্লাহ ভোগ দখল করে আসছে।

পরে শুনেছি সে একটি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। তবে আশরাফ ভূইয়ার নেতৃত্বে শতাধিক লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ককটেল ফুটিয়ে গাড়িতে করে সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে যায়। 

অভিযুক্ত উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আশরাফ ভূইয়া বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। আগেও আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছিল। কে বা কারা এসব কাজ করেছে আমি জানিনা।

অভিযুক্ত জামপুর ইউনিয়নের যুবদলের সভাপতি এমদাদুল হক দিপু বলেন, ঘটনাস্থলে আমার রেজিষ্টিকৃত জমি আছে।  সে জায়গা মেপে সীমানা নির্ধারণ করতে গেলে আমাদের উপর হামলা চালায়। থানায় আমি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছি। তবে চলে আসার পর কি ঘটেছে আমার জানা নেই। 

সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ১ কোটি  টাকার মালামাল লুটের ও জমিদখলের পৃথক দুইটি অভিযোগ পেয়েছি। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 

উৎস: Narayanganj Times

কীওয়ার্ড: য বদল ন র য়ণগঞ জ য বদল র স উপজ ল ব এনপ

এছাড়াও পড়ুন:

ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অবিচল

পাঠ্যপুস্তকে তাঁর জীবনী নেই। অথচ কোথায় ছিলেন না তিনি! ১৯৪৩ সালে অবিভক্ত বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের পাশে ছিলেন। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে মানবিক ও সমাজসেবামূলক কাজে অংশ নিয়েছিলেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দিরে গিয়ে অভয় দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৯ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-বিধ্বস্ত পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা অঞ্চলের সংখ্যালঘু ও উদ্বাস্তুদের আশ্বস্ত করতে এবং তাদের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে ঐতিহাসিক ‘নেহরু-লিয়াকত’ চুক্তি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ষাটের দশকে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক থাকাকালে রেড ক্রসের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি তাঁর মামা অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের সঙ্গে ১৪৪ ধারা ভেঙেছিলেন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদদের জানাজায় অংশ নিয়ে তিনি ও তাঁর মামা দু’জনেই আটক হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিধান-সংবলিত শাসনতন্ত্র প্রণয়নে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে সাহায্য করেছিলেন। ১৯৬১ সালে পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের বাধা মোকাবিলা করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। ১৯৬৬ সালে স্বাধিকার আন্দোলনে ছয় দফার চূড়ান্ত খসড়া প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৬৭ সালে  ছয় দফা আন্দোলন তুঙ্গে থাকাকালে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। মূলত মওলানা ভাসানী ও তাঁর কারণেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্তরা নিঃশর্ত মুক্তি পেয়েছিলেন।

আত্মমর্যাদাশীল বাঙালি জাতির প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৬৯ সালের গোলটেবিল সম্মেলনে তিনি ‘এক মানুষ, এক ভোট’ নীতি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছিলেন। এই নীতিতে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর সংখ্যাগরিষ্ঠতার যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৯টি আসন আদায় করেছিলেন। এভাবেই তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে বিজয়ীদের জাতীয় সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত করেছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর পরাজয় নিশ্চিত করেছিলেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানের অবৈধ সামরিক সরকারকে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। অবৈধ পাঞ্জাবি শাসক চক্রের জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। সাংবিধানিক ব্যত্যয়ে তৎকালীন হাইকোর্ট বারকে নিয়ে তিনি যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তা এত চরমে পৌঁছে যে, ১৯৭১ সালের মার্চে জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করাতে কোনো বিচারকই রাজি হননি। মুক্তিযুদ্ধের পরও তিনি থেমে যাননি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হননি। মুক্তিযুদ্ধের আগেও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথককরণের দাবি তুলেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পরেও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথককরণের দাবি জানিয়েছিলেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে সার্ক গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তিনি শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হকের যোগ্যতম উত্তরাধিকারী হিসেবে বেঁচে ছিলেন।

হাসনাত আরিয়ান খান: লেখক ও গবেষক

সম্পর্কিত নিবন্ধ