ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানেরা যেসব সমস্যা মোকাবিলা করে
Published: 16th, January 2025 GMT
পৃথিবীতে একটি সন্তান বড় হয়ে ওঠে মা আর বাবার ভালোবাসা ও সহযোগিতায়। কিন্তু বাবা মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে গেলে তাদের সন্তান দুইজনের সঙ্গে একই বাড়িতে থাকার সুযোগ হারিয়ে ফেলে। সে যেকোন একজনের কাছে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অন্যজনের প্রতি রাগ, ক্ষোভ জমা হয় তার। `ব্রোকেন ফ্যামিলি’ শব্দটাই জানিয়ে দেয় পরিবারটা ভেঙে গেছে। এমন পরিবারের সন্তানেরা সাধারণত মানসিকভাবে বিপর্যন্ত থাকে। ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানেরা যে যে সমস্যার মুখোমুখি হয়, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন আলিয়া আজাদ, এভারকেয়ার হাসপাতালের সিনিয়র কাউন্সিলর।
তিনি বলেন, ‘‘প্রথমত যেটা বলব ব্রোকেন ফ্যামিলিরি সন্তানেরা অনিরাপত্তায় ভোগে। দেখা যাচ্ছে যে তার বাবা একদিকে তার মা অন্যদিকে। হয়তো কেউ মায়ের কাছে আছে হয়তো কেউ বাবার কাছে আছে। যেকোন একজনের কাছে যখন থাকে বাবা কিংবা মা সেও কিন্তু মানসিকভাবে সুস্থ থাকে না। সে যে সুস্থভাবে সন্তানদেরকে গড়ে তুলবে সেটাও কিন্তু সে তখন পারে না। তার যে আচরণ করেন সেটা অনেক সময় সন্তানেরা নেতিবাচকভাবে পায়। সেক্ষেত্রে সন্তানেরাও বিষন্ণতা, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারে। ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানেরা বন্ধু মহল এমনকি শিক্ষকদের কাছেও বৈষম্যের শিকার হয়। এক্ষেত্রে তাদের হীনমন্যতায় ভোগা খুব স্বাভাবিক। ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানেরা অবিশ্বাসে ভোগে। অনেক সময় তারা পৃথিবীটাকেও বিশ্বাস করা বন্ধ করে দেয়। ফলে তাদের পড়ালেখাযর ক্ষতি হয়, তারা কোনো এইম খুঁজে পায় না, আগ্রহ খুঁজে পায় না। এক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে পড়ে। অনেকে সময় দেখা যায় তারা ওই বয়সে যে যে সমস্যা মোকাবিলা করছে সেই সমস্যাগুলো মোকাবিলা করার কথা না। পরিস্থিতি তাদের মনে যে চাপ সৃষ্টি করে তা তাদের বেড়ে ওঠা ব্যাহত করে।’’
ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানদের জন্য আলিয়া আজাদের পরামর্শ—
জীবনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে হবে: ব্রোকেন ফ্যামিলি হলেই যে আমি শেষ হয়ে গেলাম বা আমার জীবন শেষ বিষয়টা কিন্তু সেরকম নয়। এই বিষয়টাকে কিন্তু পজিটিভ ভাবেও নেওয়া যেতে পারে। আমি এক্ষেত্রে আমার একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করবো আমি আমার হসপিটালে ১২ বছরের একটা বাচ্চা ছেলে রোগীকে দেখতে কেভিনে গিয়েছি। গিয়ে দেখি দুজন মহিলা ওখানে বসা ছিলেন। আমি বাচ্চাটাকে জিজ্ঞেস করলাম যে দুজন মহিলা ওরা তোমার কি হয়? বাচ্চাটা তখন আমাকে সুন্দরভাবে বলল যে, একজন আমার আসল মা আরেকজন আমার সৎ মা। সেই সময় আমি সত্যি অবাক হয়েছি এবং সেই ১২ বছর বয়সী ছেলেটার কাছে আমি প্রথম শিখলাম যে ব্রোকেন ফ্যামিলিও পজিটিভ ভাবে গ্রহণ করা যেতে পারে। এরপর আমি যখন ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলাম এই যে তোমাদের ব্রোকেন ফ্যামিলি তোমাদের খারাপ লাগে ন? বাচ্চাটা তখন আমাকে হেসে বলেছিল যে এটা তো খুব একটা সাধারণ বিষয় আমার অনেক ফ্রেন্ডেরই এমন ফ্যামিলি রয়েছে। তারমানে বিষয়টাকে ও পজেটিভ ভাবে একসেপ্ট করেছে।
পরিস্থিতি মেনে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে: ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানদের মাঝে দেখা যায় যে বিয়ের প্রতি একটি অনীহাও কিন্তু কাজ করে। তারা তো বিয়ের সম্পর্কটাকে সুন্দরভাবে দেখেনি। তারা কিছুটা অবহেলা নিয়ে নিজেদের মতো করে বড় হয়। যদি একের অধিক ভাই বোন থাকে তাহলে হয়তো একজন অন্যজনের কষ্টটা শেয়ার করতে পারে। কিন্তু সে যদি একক সন্তান হয় তার কিন্তু শেয়ারিং এর জায়গাটা আর থাকে না। যারা ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তান আছো, তোমাদের উদ্দেশ্যে আমি বলব তোমরা কিন্তু সুন্দরভাবে বড় হতে পারো এবং তোমরাও সুন্দরভাবে পৃথিবীটাকে দেখতে পারো। মাইন্ড সেটটাকে যদি চেঞ্জ করা যায় তাহলে দেখবে যে তোমরাই ভালো রয়েছো। প্রথমত আমি যে বিষয়টাকে বলতে চাই সেটা হল যে সিচুয়েশনটাকে মেনে নেওয়া। এই যে ১২ বছরের বাচ্চার যে উদাহরণটা আমি দিলাম ও ঠিক যেভাবে মেনে নিয়েছে। তোমরা যদি ঠিক সেইভাবে মেনে নিতে পারো দেখবে যে তোমাদের মনের ভার ওইখানেই অনেকটা কমে গিয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাবা-মা কারো প্রতি আমরা যেন কোন রাগ ধরে না রাখি। বিশেষ একজনের প্রতি রাগ ধরে না রাখাটাই ভালো। এতে তোমার মনের প্রশান্তি বাড়বে এবং তুমি ভেতর থেকে হয়তো কিছুটা হালকা অনুভব করবে। কারণ আমরা যখন রাগ, অভিমান, ঘৃণা ধরে রাখি মোটকথা এটা আমাদের নিজেদেরকে শাস্তি দেওয়া হয়। আমরা যেন নিজেদেরকে শাস্তি না দেই।
কষ্ট পুষে না রেখে শেয়ার করুন: ব্রোকেন ফ্যামিলিতে হয়তো আমরা অনেক সময় অনেক কিছু পাব না। কিন্তু আমরা যা পাচ্ছি না সেদিকে নজর না দিয়ে আমরা কি কি পেয়েছি সেদিকে নজর দেওয়া ভালো । এর চেয়েও তো খারাপ হতে পারতাম আমাদের লাইফে । আমরা যা যা পেয়েছি যদি সেটার ওপর ফোকাস দিই তাহলে আমাদের পজিটিভিটি বাড়বে এবং আমার একটা গোল সেট করতে পারবো। আমরা বিষন্ণতার দিকে নিজেদেরকে ঠেলে দেবো না। যেমন, ছোটবেলা থেকে একাধিক ভাইবোন যদি না থাকে তার কিন্তু বন্ধু মহল বা ভালো আত্মীয় থাকতে পারে। সে যদি তার মনের ভাব বা ইমোশন লুকিয়ে না রেখে শেয়ার করে তাহলে দেখা যাবে যে মনের ভেতরে তার কষ্টগুলো জমে থাকবে না। আবার এটাকে বেন্টিলেশনও বলে থাকি যে তার ভেতর থেকে কষ্টগুলো বের হয়ে যাবে। সবারই কিন্তু কেউ না কেউ একজন ওয়েল উইশার থাকে তো এই বিষয়টার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। কেউ যদি তার মনের কষ্টটাকে কারো সাথে প্রকাশ করে তাহলে কিন্তু তার মনের কষ্টটা প্রকাশের সঙ্গে বের হয়ে যায়। এতে সে হালকা অনুভব করবে।
সুন্দর জীবন যাপনের চেষ্টা ধরে রাখতে হবে: আমরা যখন কোনো ডিপ্রেশনে বা কষ্টে থাকি সেক্ষেত্রে আমি বলব দুটি কথা। কেউ আমরা ধ্বংস হয়ে যাই হয়তো আমরা কেউ প্রোডাক্টিভ হই। সো আমার রিকোয়েস্ট হবে তোমরা ধ্বংস হবে না তোমরা প্রোডাক্টিভ হবে। এতে তোমার দুইটা উপকার এতে তোমার নিজের একটা পরিচয় হবে এবং তুমি তোমার কষ্টটাকে জয় করে আজকের দিনটাকে ভালোভাবে কাটাতে পারবে এবং নিজের প্রতি বিশ্বাস ধরে রাখতে হবে এবং নিজেকে ব্যাডলাক এই শব্দটা কখনোই বলা যাবে না। এই প্রকৃতিতে অনেক কিছুই ঘটে থাকে যার সব কিছুর জন্য আমরা দায়ী নই, আমরা পরিস্থিতির শিকার। সেই পরিস্থিতিটাকে কন্ট্রোল আনার ক্ষমতা কিন্তু মানুষেরই আছে। তোমার মাঝেও সেই ক্ষমতা আছে তুমি যদি একটু চেষ্টা করো তাহলে সেই পরিস্থিতিটাকে কন্ট্রোল করে এই পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে একদিন তুমি দাঁড়াতে পারবে কিন্তু চেষ্টাটাকে জারি রাখতে হবে।
হীনমন্যতা দূর করতে হবে: আলাদা করে ভাবার দরকার নেই যে তুমি ভিন্ন কোনো সংসারে আছো। কোন একটা কারণে তোমাদের বাবা-মা একসঙ্গে থাকতে পারেনি। কিন্তু তুমি একটা পরিবারে আছো। তুমি আট দশজন মানুষের মত স্বাভাবিকভাবে বড় হওয়ার অধিকার রাখো এবং স্বাভাবিকভাবে বড় হওয়ার ক্ষমতাও রাখো। তুমি যদি তোমার ক্ষমতাটাকে জানো তাহলে দেখবে যে তুমি নিজেকে স্বাভাবিক ভাবছো এবং হীনমন্যতায় ভুগছো না এবং তুমি তোমার লাইফটাকে সাধারণভাবে চালিয়ে নিয়ে একটা সুন্দর জীবন যাপন করতে পারছো।
ঢাকা/লিপি
.উৎস: Risingbd
কীওয়ার্ড: চ কর চ কর পর স থ ত ক ষমত সমস য র একট
এছাড়াও পড়ুন:
সব কাজ সামলে নিজেদের স্বাস্থ্যের জন্য সময় বের করা কঠিন, মুটিয়ে যাওয়ার সমস্যায় অনেক নারী
প্রথম সন্তান জন্মের পর ওজন বেড়ে যায় ৩২ বছর বয়সী গৃহিণী শাহানার (ছদ্মনাম)। ভেবেছিলেন, বাড়তি ওজন আবার কমিয়ে ফেলবেন। চেষ্টাও করেছেন অনেক। নানাজনের পরামর্শে ডায়েটসহ নানা পদক্ষেপ নেন, কিন্তু ওজন কমেনি।
শেষে শাহানা একজন পুষ্টিবিদের শরণাপন্ন হন। পুষ্টিবিদ বলেন, নারীদের মুটিয়ে যাওয়ার পেছনে অনেকগুলো বিষয় একসঙ্গে কাজ করে। মূল কারণ কী খাচ্ছেন ও কতটুকু খাচ্ছেন, সেটার ভারসাম্য না থাকা। আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে, যতটুকু খাওয়া হচ্ছে, তা বার্ন (কায়িকশ্রম বা শরীরচর্চার মাধ্যমে ঝরানো) না করা।
ওজন কমানোর জন্য শাহানাকে একটি সুষম খাদ্যতালিকা (ডায়েট চার্ট) মেনে চলার পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম এবং দৈনিক অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটার পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদ।
তবে কিছুদিন নিয়ম মেনে চলার পর হাল ছেড়ে দেন শাহানা। এর কারণ হিসেবে তিনি বললেন, পরিবারের সবার খাবারের ব্যবস্থা করাসহ অন্যান্য কাজ শেষে নিজের জন্য কিছু করার সময় তাঁর হয় না। তা ছাড়া খাদ্যতালিকা অনুযায়ী বেলায় বেলায় নানা রকম দামি বাদাম, ফলমূল কেনাও সব সময় সম্ভব হয় না।
ব্যায়াম ও হাঁটার কথা তুলতেই শাহানা বললেন, ‘সব সামলে সময় হয় না। আবার বাইরে একা যেতেও ভয় লাগে। জিম যে করব, তাতেও তো অনেক খরচ।’
নানা কারণে মুটিয়ে যাওয়ার পর শাহানার মতো ওজন কমাতে পারছেন না অনেক নারী। গৃহিণী থেকে কর্মজীবী—কোনো শ্রেণি–পেশার নারীই এই সমস্যার বাইরে নন। ওজন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেও তাঁরা নানা প্রতিবন্ধকতায় রণে ভঙ্গ দিচ্ছেন। এর পেছনে মূলত তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ব্যবস্থাপনা দায়ী। এর বাইরে আছে আরও কিছু কারণ।
রাজধানীর রায়েরবাজার এলাকায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন ফিরোজা। আগে তিনি দিনে দুটি বাসায় কাজ করতেন। মুটিয়ে যাওয়ায় এখন কাজ করেন একটি বাসায়। ফিরোজার কাছে খাবার মানে অন্তত দুবেলা ভাত। তিন বেলা হলেও ক্ষতি নেই। তিনি বলেন, ‘ভাত ছাড়া আর কী দিয়া পেট ভরামু?’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ ১ হাজার ১২৯ দশমিক ৮১ গ্রাম। ২০১৬ সালে তা ছিল দৈনিক ৯৭৫ দশমিক ৫ গ্রাম। খাদ্য গ্রহণের তালিকার ১০০ ভাগের ৩০ দশমিক ৫৪ শতাংশই ভাত।
বেলায় বেলায় মূলত নিম্নবিত্তের খিদে ভাতেই মেটে। তবে মধ্যবিত্তেরও ভাতের প্রতি টান কম নয়। রাজধানীর নাখালপাড়া এলাকার একজন গৃহিণী জানান, স্থূলতা কমানোর জন্য তিনি পুষ্টিবিদের কাছে গিয়েছিলেন। তাঁকে একটি ডায়েটচার্ট দেওয়া হয়। কয়েক দিন কষ্ট করে সেটা মেনেও চলেন। কিন্তু পরিবারের সবার প্রতিদিনের খাবার নিশ্চিত করে নিজের জন্য আলাদাভাবে সালাদ বা ডায়েট ফুড তৈরি করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাই এখন আবার আগের মতোই ভাত খাচ্ছেন।
দেশের মানুষের দৈনিক প্রয়োজনীয় শর্করারন বেশির ভাগ মেলে ভাত থেকে। তাই ওজন বেড়ে গেলেও ভাত খাওয়া বন্ধ করতে বারণ করেন পুষ্টিবিদেরা। তবে পরিমাণ কমিয়ে আনার পরামর্ম দেন তাঁরা।
বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, গত এক দশকে দেশের মানুষের ভাত খাওয়ার পরিমাণ কিছুটা কমলেও চিনি আগের চেয়ে তিন গুণ বেশি খাচ্ছেন। চিনি বা চিনিযুক্ত যেকোনো খাবারকে স্থূলতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের ভাষ্য, প্রয়োজনের অতিরিক্ত চিনি খেলে যেকোনো বয়সেই স্থূলতা বেড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া ডায়বেটিস, কিনডিতে পাথর, এমনকি ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। তাই চিনি একেবারে বাদ দিতে পারলে ভালো। না হলে নারীদের দৈনিক ৬ চা–চামচের (২৫ গ্রাম বা ১০০ ক্যালোরি) বেশি চিনি খাওয়া উচিত নয়।
বাইরের খাবারে ঝোঁক
রেস্তোরাঁর খাবারের প্রতি আসক্তির কথা জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী। তিনি কাজ করেন গুলশানের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। তাঁর কর্মস্থলে খাবারের ব্যবস্থা নেই। তাই দুপুরের খাবার প্রায় প্রতিদিনই একটি অনলাইন ফুড ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে বাইরে থেকে আনিয়ে খান তিনি। প্রথম দিকে একটি ক্যাটারিং সার্ভিস থেকে ভাত–তরকারি খেলেও ধীরে ধীরে ফাস্টফুডের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন তিনি। এতে তিনি দ্রুতই মুটিয়ে যান। ওই নারী বললেন, আয়ের একটা বড় অংশই বাইরের খাবারের পেছনে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এমন অভ্যাস হয়েছে যে ছাড়তেও পারছি না।
বিবিএসের ২০২২ সালের জরিপে দেখা যায়, গত এক দশকে মানুষের সামগ্রিকভাবে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে বাইরের খাবার খাওয়ার প্রবণতা। সঙ্গে বেড়েছে ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণও। যেখানে ২৬ থেকে ৫০ বছর বয়সী মাঝারিভাবে সক্রিয় নারীদের দৈনিক ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ক্যালোরি প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে দৈনিক মাথাপিছু (নারী–পুরুষ) ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ ২ হাজার ৩৯৩, যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি।
ব্যায়ামের উপকরণ ও ব্যায়ামাগার ব্যয়বহুল
বেসরকারি চাকরিজীবী সুমাইয়া বিনতের (৩৬) ছোট সন্তানের জন্ম হয় ২০২২ সালের প্রথম দিকে। সে সময় তিনি অনেকটাই মুটিয়ে গিয়েছিলেন। অতিরিক্ত ওজন ছিল ১৮ থেকে ২০ কেজির মতো। ওজন কমাতে প্রসবের ৮ মাস পর তিনি ভর্তি হন ধানমন্ডি এলাকার নারীদের একটি জিমে।
ছয় মাসের প্যাকেজে সপ্তাহে চার দিন দেড় ঘণ্টা নিয়মমাফিক ব্যায়াম ছাড়াও জুম্বা নাচ, ইয়োগা করতে শুরু করেন সুমাইয়া। জিমের পুষ্টিবিদের কাছ থেকে একটি খাদ্যতালিকাও সংগ্রহ করেন তিনি। ছয় মাসেই লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখতে পান সুমাইয়া। এখনো জিমের নিয়মিত সদস্য তিনি।
সুমাইয়া বলেন, শুরুতে ওজন কমানো উদ্দেশ্য হলেও এখন এটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। শরীর–স্বাস্থ্যও ভালো থাকছে। কিন্তু ছয় মাস পরপর খরচের একটা বড় ধাক্কা থাকছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সুমাইয়ার মতো অনেক নারী নিয়মিত জিম করছেন, অথবা করার কথা ভাবছেন। অনেকে কিছুদিন জিম করে মাঝপথে ছেড়েও দিচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজধানীর মিরপুর এলাকার একটি জিমের একজন কর্মী জানান, একটু ভালো মানের জিমগুলোয় খরচ তুলনামূলক বেশি। সে জন্য অনেকে জিমে এসেও কিছুদিন পর ছেড়ে দেন। এ ছাড়া যেগুলোয় খরচ কম, সেগুলো নারীদের জন্য ততটা সাচ্ছন্দদায়ক হয় না। সাধারণত ছেলে–মেয়ের একসঙ্গে জিমের ব্যবস্থা থাকে। নিরাপত্তার প্রশ্নও থেকে যায়।
রাজধানীর গুলশান, ধানমন্ডি, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শান্তিনগর, উত্তরা, বনশ্রী এলাকার কয়েকটি জিমে খোঁজ নিয়ে নানা রকম প্যাকেজের কথা জানা যায়। এক মাস থেকে শুরু করে তিন মাস, ছয় মাস, এমনকি পুরো বছরের জন্য জিমের সদস্যপদ নেওয়া যায়। জিমভেদে ন্যূনতম মাসিক ব্যয় ২ হাজার টাকা, সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।
নাখালপাড়ার একজন নারী জানান, তাঁকে চিকিৎসক দৈনিক ৫ কিলোমিটার দৌড়াতে বলেছেন। তাই মাস তিনেক আগে একটি জিমে তিন মাসের প্যাকেজে সদস্য হন তিনি। সেখানকার ট্রেডমিলে দৌড়াতেন। প্যাকেজ শেষ হওয়ার পর জিমে যাওয়া বন্ধ করেছেন। এখন সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন রাতে স্বামীর সঙ্গে বিজয় সরণির রাস্তায় এক ঘণ্টা দৌড়ান তিনি।
ওই নারী বলেন, মেয়েরা ব্যায়াম করতে বা হাঁটতে বের হলে কিছু মানুষ অদ্ভুদ দৃষ্টিতে তাকায়। তা ছাড়া দৌড়ানোর উপযোগী পোশাক পরে বের হওয়া যায় না। তাই ট্রেডমিল কেনার কথা ভাবছেন তিনি।
ঘরে রেখে নিজে নিজে ব্যবহার করা যায়—এমন কয়েক ধরনের ব্যায়ামের যন্ত্র রয়েছে। হালকা গড়নের একটি ম্যানুয়াল ট্রেডমিলের দাম ১৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু। ভালো মানের একটির দাম পড়ে ৩০ হাজার থেকে শুরু করে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। সঙ্গে একটি সাইকেলিং যন্ত্র চাইলে গুনতে হবে আরও ১০ হাজার টাকা। মান অনুযায়ী দাম বাড়বে। হাতের ব্যায়ামের জন্য ছোট ডামবেলগুলোর দাম ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে।
নিজেকেই উদ্যোগী হতে হবে
রাজধানীর বারডেম হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ ও বিভাগীয় প্রধান শামসুন্নাহার নাহিদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খেলে স্বাভাবিকভাবেই মুটিয়ে যায়। সেটা নারী হোক কিংবা পুরুষ। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, তেল–মসলা বেশি দিয়ে পরিবারের সবার জন্য অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত যে খাদ্য নারীরা প্রস্তুত করেন, সেগুলো খেয়ে পরিবারের অন্যদের ওজন না বাড়লেও নারীদের ওজন বেড়ে যায়। কেননা, অন্যরা যা খাচ্ছে, তা বাইরে যাওয়া ও হাঁটাচলার কারণে চর্বিতে রূপ নেয় না। কিন্তু কর্মজীবী নারীরা দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে কাজ করার কারণে মুটিয়ে যান।
শামসুন্নাহার নাহিদ আরও বলেন, খাওয়ার পরিমাণ শুধু কমালেই হবে না, কী খাচ্ছেন তা বুঝে খেতে হবে। ভাত ও চিনি খেতে হবে পরিমাণমতো। বাইরের খাবার যত এড়িয়ে চলা যায়, ততই মঙ্গল। আর নিয়মিত খুব সামান্য হলেও শরীরচর্চা করতেই হবে।
বাড়ির বাইরে গিয়ে হাঁটার সুযোগ না থাকলে ছাদে বা ঘরের ভেতর হাঁটাহাটি করার পরামর্শ দিয়ে এই পুষ্টিবিদ বলেন, নিয়ম করে জিমে গেলে সেটা স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনে। সেটি সম্ভব না হলে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে হাত–পা ছুড়ে আধা ঘণ্টা ব্যায়াম করে নিলেও তা মেদ জমতে বাধা দেয়। মোট কথা, মুটিয়ে যাওয়ার সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে নিজেকেই উদ্যোগী হয়ে নিজেকে সাহায্য করতে হবে।