কিশোরগঞ্জের ভৈরবে পরিত্যক্ত আওয়ামী লীগের কার্যালয় থেকে শামীম মিয়া (৩৭) নামে এক পিঠা বিক্রেতার মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। আজ বুধবার স্থানীয়রা ভৈরব বাজারের হলুদপট্টি এলাকার আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের যুবলীগের কক্ষে লাশটি দেখে থানায় খবর দেন। দুপুর ২টার দিকে পুলিশ লাশটি উদ্ধার করেছে।
ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো.
আওয়ামী লীগের কার্যালয়টি ৫ আগস্ট ব্যাপক ভাঙচুরের শিকার হয়। তখন থেকে এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে বলে জানান ওসি।
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: ক শ রগঞ জ আওয় ম ল গ
এছাড়াও পড়ুন:
নিউইয়র্ক টাইমস হিমশৈলের চূড়া দেখাল কেবল
বঙ্গের পুরোনো ঐতিহ্য– ‘সাহেব’ জগৎ থেকে কিছু বলা হলে ‘নেটিভ’ জগৎ বাড়তি গুরুত্ব দেবে। ইসলামী কট্টরবাদের উত্থান নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন বাংলায় সেই সূত্রে অতিরিক্ত মনোযোগই পেল। তবে প্রতিবেদনটি ঠিক সাহেবদের তৈরি নয়। এর বিষয়বস্তুর স্থানীয় সমর্থনসূচক বাস্তবতাও খুব বেশি নাকচ করা যাচ্ছে না। যদিও প্রতিবেদনটি অস্বীকারের দুর্বল কিছু চেষ্টাও নজরে পড়ল। বাংলাদেশ যে এবারের পহেলা এপ্রিলে তাকে নিয়ে করা নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন দেখে চমকে উঠল, সেটাও বেশ কপটতায় মোড়ানো বটে।
ঢাকায় নিষিদ্ধ ধর্মীয় কট্টরপন্থিদের পোস্টার-ফেস্টুন-প্রচার খুব বিরল নয়। নিয়মিতই চোখে পড়ে। আবার এ রকম সংগঠন কেবল প্রচার আন্দোলনেই থেমে নেই।
মাত্র ক’দিন আগেই রীতিমতো সমাবেশ করে তিন-চারজন সুপরিচিত লেখকের ফাঁসি কার্যকরের হুমকি দেওয়া হয়েছে। সরকার কি হুমকিদাতাদের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে? কিংবা লাগাতার মাজার ভাঙা থামানো হয়েছে? মাত্র আট মাসে ৬০-৭০টি মাজার ধ্বংসের ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন’ বলা যায়? নাকি এসব পরিকল্পিত কর্মসূচি নির্দেশ করে? বিদেশিরা বলার আগেই এই সব বিষয়ে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিতে পারত বাংলাদেশের সমাজ ও সরকার।
একই কারণে চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর হিন্দু কিংবা আহমদিয়া মুসলমানদের বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনাও ‘বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ’ বলে চালিয়ে দেওয়া কঠিন। এ রকম একাংশ স্থাপনা আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকদের হলেও অনেক অরাজনৈতিক সংখ্যালঘু পরিবারও এ সময় আক্রান্ত হয়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠকদের দাবি ছিল। এ রকম হামলায় যে ধর্মীয় ভিন্নতা প্রধান উপাদান ছিল, সেটা কীভাবে অস্বীকার করব আমরা? ভারতীয় প্রচারমাধ্যম এসব ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করেছিল বলে আমরা তার সত্য-একাংশটুকু কেন আড়াল করব? হামলার পরপরই যদি নিজ উদ্যোগে প্রশাসন ঘটনাগুলো তদন্ত করে দোষীদের দ্রুতলয়ে শাস্তির আওতায় এনে বিচারকাজ সম্পন্ন করত, তাহলে ভারতীয় অতি প্রচারের বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন ফাঁস করা যেত, ভবিষ্যতের জন্য এ রকম ঘটনার পথও রোধ হতো। সাহেবদের চলতি ধাঁচের প্রতিবেদনেরও এখন তাহলে শক্ত জবাব দেওয়া যেত। কিন্তু সংখ্যালঘু নিপীড়নের ঘটনাবলিকে গড়ে ভারতীয় প্রচারণা বলে চালানোর অভ্যাস এসব কাজকে উৎসাহিত করেছে এবং প্রচারযুদ্ধ নিউইয়র্ক হয়ে বিশ্বময় ছড়াচ্ছে।
একালে দুনিয়া একটা গ্রামের মতো। করাচি বা কাশ্মীরের ঘটনা যেমন বাংলাদেশে মনোযোগ কাড়ে, তেমনি এখানকার সবকিছু সবার নজরে আছে। সুতরাং প্রতিবেদনকে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হাস্যকর। বরং নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনটি অসম্পূর্ণ ও অপূর্ণাঙ্গ। এতে হিমশৈলের চূড়াও প্রকৃত চেহারায় আসেনি। বাংলাদেশের সমাজ জীবন ও শাসন কাঠামোতে ধর্মীয় প্রভাবের ব্যাপকতা সামান্যই ছুঁতে পেরেছেন দুই প্রতিবেদক।
গত জানুয়ারিতে এনসিটিবি যাওয়ার পথে ঢাকার রাস্তায় পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মিছিলে যেভাবে বর্বর হামলা চালানো হলো, তার উল্লেখও নেই প্রতিবেদনে। এই ঘটনাস্থল ছিল দেশের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকার খুব কাছে। বাংলাদেশে ধর্মীয় কট্টরপন্থার সঙ্গে জাতিবাদেরও যে মিশ্রণ ঘটেছে– এই হামলা তার মোটাদাগের প্রমাণ। যথারীতি এ ঘটনারও বিচার হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে তেমন কিছু পাওয়া যায় না। গণঅভ্যুত্থানের পরপর পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া ‘দাঙ্গা’য় নিহত পাহাড়িদের পরিবার সুবিচার পেয়েছে কিনা– সেটাও অনুসন্ধানের বিষয়।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনটি শহরকেন্দ্রিকও বটে। দেশের প্রান্তিক সমাজে ধর্মীয় মুরব্বিদের বিকল্প শাসন কাঠামো এখন সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতা। এই বাস্তবতা ক্রমে গ্রামের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে ঢাকায় আসছে। হয়তো সে কারণে নিউইয়র্ক টাইমস শহরবাসীদের চমকে দিতে পেরেছে।
আলোচ্য প্রতিবেদনে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়ার কথা তোলা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা নামের মহার্ঘ বস্তুটি এতদিন যে ছিল, সেও সামান্যই অনুসরণ হয়েছে এখানকার প্রশাসন ও সমাজে। এখন সেটা বাদ দিয়ে যে ‘বহুত্ববাদ’ যুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে, সেও সমাজের দিকে তাকালে বেখাপ্পা ঠেকে। একটা ছোট উদাহরণ দিচ্ছি: ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান শহরে রমজানে দিনের বেলায় ইদানীং আর অমুসলমান শ্রমজীবী-কর্মজীবীদের খাওয়াদাওয়ার স্বাভাবিক সুযোগ থাকে না বললেই চলে। এসব নিশ্চয় বহুত্ববাদী সমাজের লক্ষণ নয়। ফলে অতীতের ধর্মনিরপেক্ষতার মতোই বহুত্ববাদও আগামীতে অধরা মাধুরী হয়ে থাকবে বলে মনে হয়।
ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে জানি, সংবিধান সংস্কার কমিটিতে একটি বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম রাখার ব্যাপারে তিনজন ভিন্নমতাবলম্বী বাদে বাকিরা শেষ পর্যন্ত রাজি হন। যারা এই কমিশনের সদস্য হলেন, রাজনৈতিক-সামাজিক বিশ্বাস জেনেবুঝেই তো নির্বাহী বিভাগ ও আন্দোলনের নেতারা তাদের সদস্য করেছেন। এই কমিশনে কোনো অমুসলমানকে যুক্ত করা হয়নি। যে অভ্যুত্থান অন্তর্ভুক্তীকরণ এবং বহুত্ববাদের আওয়াজ দিয়ে রাষ্ট্র বদলের কথা বলে সংবিধান সংস্কারে নামল, সেখানে এ রকম একটি কমিশনে একজন অমুসলমান বা অবাঙালির অন্তর্ভুক্তি কি প্রাসঙ্গিক ছিল না?
আমরা নিজেরা যদি আমাদের কাজে ধর্মবাদী ও জাতিবাদী প্রাধান্য নিয়ে হাজির থাকি তাহলে অন্যে সেই দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলে চমকে ওঠার অধিকার থাকে না আসলে।
বলা বাহুল্য, চলতি কট্টরকালের গোড়াপত্তন শেখ হাসিনার আমলের গণতন্ত্রহীনতার মাঝে। নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংসে একের পর এক পদক্ষেপের কারণে সমাজে দক্ষিণ পন্থার পালে হাওয়া লেগেছিল। ভিন্নমতাবলম্বীদের তখন ‘জামায়াত-শিবির’ ট্যাগ লাগিয়ে মুখ বন্ধ করা হতো। এ রকম সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশ পদ্ধতিগতভাবে সব ধরনের কট্টর মতাদর্শের জন্য উর্বর হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ যে এখন ধর্মীয় উগ্রবাদের নিয়ন্ত্রণে যেতে চলেছে, এর দায় যে অতীত সরকারের ওপরেও বর্তায়– সে বিষয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন সামান্যই তথ্য-উপাত্ত যোগ করেছে। তবে এও সত্য, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সরকারের দায়দায়িত্ব ছিল পুরোনো বাস্তবতা বদলের। তখন ছাত্র-তরুণরা প্রতীকীভাবে বলছিলেন, আমরা দ্বিতীয়বারের মতো ‘রিপাবলিক’ গঠনের পথে হাঁটছি।
বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, একাত্তরে প্রথম রিপাবলিক গঠনের সুযোগ আমরা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারিনি একদলীয় শাসন চেষ্টার প্রলোভনে। এবার দ্বিতীয়বার রিপাবলিক গড়ার আওয়াজ হাঁটা শুরু করল জাতিবাদ ও ধর্মীয় উগ্রতার দিকে। এমনকি কখনও কখনও বাংলাদেশের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি একাত্তরকে গালমন্দের কাজটিও অনেক রাজনৈতিক দলের কর্মী প্রকাশ্যেই করছেন। হাসিনা পরিবারের দুঃশাসনের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে কৌশলে মুক্তিযুদ্ধের নানা প্রতীক গুঁড়িয়ে দেওয়ার কার্যক্রম তো থামানো হয়েছে বলে দেখা যায়নি।
পাঁচ দশকের ব্যবধানে এ রকম সংকটে পড়ল বাংলাদেশ দু’বার। এর প্রধান কারণ গণতান্ত্রিক রাজনীতির শূন্যতা। একাত্তরে বিজয়ের পর জাসদ, ন্যাপ, সিপিবি ছিল বিরোধী দল। সে সময় এসব দলকে নিয়ে যদি জাতীয় সরকার হতো বা ১৯৭৩-এর নির্বাচনে এসব দলকে যদি স্বাভাবিকভাবে অংশ নিতে দেওয়া হতো এবং বহুদলীয় রাজনীতি যদি কাজ করত তাহলে বাংলাদেশ সামরিক শাসনের দীর্ঘ অধ্যায়ে প্রবেশ করত না।
ঠিক একইভাবে এবারও প্রয়োজন ছিল দ্রুতলয়ে নির্বাচনে যাওয়া। নতুন সংবিধান ও ‘নতুন বন্দোবস্ত’র জন্য গণপরিষদ নির্বাচন হতে পারত। সেটা না হলে দ্রুত জাতীয় নির্বাচন এবং স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো হওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু কথিত ‘সংস্কার’কে নির্বাচনের বিপরীতে স্থাপন করে সমাজজুড়ে কট্টরপন্থাকে কাজের অবারিত সুযোগ করে দেওয়া হলো।
১৯৭৫-এর আগে দেখা গেছে সমাজতন্ত্রের নামে বহুদলীয় ব্যবস্থাকে অবজ্ঞা করতে। ফলে এত অনাচার হয়েছে যে, সমাজতন্ত্রের মতো একটা মহান ব্যবস্থাই অপ্রয়োজনীয়ভাবে এ দেশে কলঙ্কিত হলো। আবার এখন সংস্কার নামীয় জরুরি কাজগুলো এত বেশি নির্বাচন পেছানোর কাজে ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, ক্রমে মানুষের ন্যূনতম চাওয়া নির্বাচনও অনিশ্চয়তার বিষয় হচ্ছে। বিপরীতে ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্রের জন্য সমাজকে প্রস্তুতের খবর নিউইয়র্ক পর্যন্ত পৌঁছেছে।
নিউয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন আসলে হিমশৈলের সামান্য চূড়া মাত্র। দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে বাঁচাতে হলে চূড়ার বদলে হিমশৈলের ‘নিমজ্জিত অংশে’র দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত সবার; বিশেষ করে যারা মনে করেন, বাংলাদেশের বিপুল অর্জন রয়েছে গত পাঁচ দশকে এবং একাত্তর ও চব্বিশকে যুগপৎ ধারণ করে এখানে প্রয়োজন বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোগত রূপান্তর।
আলতাফ পারভেজ: গবেষক, লেখক