Samakal:
2025-04-03@05:04:08 GMT

হায়রে কপাল মন্দ!

Published: 14th, January 2025 GMT

হায়রে কপাল মন্দ!

প্রশাসনিক কার্যক্রমের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়েরই যেইখানে অধিকাংশ সিসি ক্যামেরা বন্ধ তখন ‘হায়রে কপাল মন্দ’ ব্যতীত কী আর রহিয়াছে বলিবার! মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে উঠিয়া আসা চিত্র আমাদের স্মরণ করাইয়া দিতেছে গীতিকার আমজাদ হোসেনের বহুল জনপ্রিয় সংগীতের সেই চরণ- ‘হায়রে কপাল মন্দ/ চোখ থাকিতে অন্ধ’! নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরা যেইখানে ‘চক্ষু’রূপে ব্যবহৃত হইতেছে, সেই ক্যামেরা বন্ধ থাকিবার বিষয়ে আলোচ্য সংগীতের ন্যায় আক্ষেপ প্রকাশ ব্যতীত আমরা আর কী করিতে পারি? আক্ষেপের অন্তরালে অবশ্য এই প্রশ্ন ঢাকা পড়িয়া যায় না– সচিবালয়ে গতিবিধি পর্যবেক্ষণে স্থাপিত সোয়া ছয়শত ক্যামেরার প্রায় ছয়শতই এত শীঘ্র বিনষ্ট হইল কী প্রকারে? খোদ সচিবালয়েই যখন নিরাপত্তার এই হাল তখন অপরাপর সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয়। 

বস্তুত বিদায়ী বৎসরের শেষ সপ্তাহে সচিবালয়ে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের অব্যবহিত পরই প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা লইয়া বিস্তর প্রশ্ন উঠিয়াছিল। যদিও বর্তমানে সচিবালয়ে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হইয়াছে; আমরা মনে করি, প্রথমেই ইহার ‘চক্ষু’ সংস্কার করিতে হইবে। সচিবালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের বরাতে সমকালের প্রতিবেদন হইতে জানা যাইতেছে, গত বৎসরও সচিবালয়ের নিরাপত্তার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকার ক্যামেরাসহ আরও কতিপয় সরঞ্জাম ক্রয়ের উদ্যোগ লওয়া হইলেও প্রথম যাত্রায় উহা সফল হয় নাই। অতঃপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের উপসচিবকে আহ্বায়ক করিয়া যেই কমিটি গঠন করা হয়, ১৫ ডিসেম্বর সেই কমিটির প্রতিবেদনে সচিবালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্যামেরা স্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হইয়াছে।  
সচিবালয়ের নিরাপত্তার স্বার্থে কমিটির পরামর্শ নিশ্চয় গ্রহণ করিতে হইবে। কিন্তু এত দিবস-রজনী কী প্রকারে এমন ‘অন্ধ’ ছিল রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠান? একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক সিসি ক্যামেরাই বা কেন দ্রুত অকার্যকর হইল এবং নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্টরা কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করে নাই? সেই বিষয়গুলিও কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ জরুরি ছিল। বিশেষ করিয়া যেইখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন হইতে বিপুল অর্থ ব্যয় করিয়া উন্নত এই সকল ক্যামেরা ক্রয় করা হইল, সেইগুলি অকার্যকর হইবার কারণ কী? উহা কি অব্যবস্থাপনা, নাকি মানগত– অন্তর্নিহিত কারণ জানাও গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে সম্প্রতি নূতন করিয়া সরঞ্জাম ক্রয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে পত্র দেওয়া হইয়াছে, সেই অর্থ ছাড় করিলে ক্যামেরাসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব হইবে।
সচিবালয়ের নিরাপত্তার জন্য কমিটির প্রতিবেদনে ব্যাগেজ স্ক্যানার স্থাপনের পরামর্শও দেওয়া হইয়াছে। অথচ সমকালের প্রতিবেদনে প্রকাশ, ২০২২ সালে একটি ব্যাগেজ স্ক্যানার জার্মানি হইতে আমদানি করা হইয়াছিল এবং একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো সচিবালয়ের চারটি ফটকে গাড়ি স্ক্যানারও স্থাপন করা হইয়াছিল। উহার সকলই এখন অকার্যকর। যুক্তরাষ্ট্র হইতে ক্রয় করা এই সকল স্ক্যানার এত অল্প সময়ের ব্যবধানে কেন বিকল হইল– সেই প্রশ্নও উঠিয়াছে। আমরা মনে করি, মেয়াদ থাকিবার পূর্বেই যেই সকল সিসি ক্যামেরা ও স্ক্যানার বিকল হইয়াছে, সেইগুলির ব্যাপারে ব্যবস্থা লওয়া দরকার। সেইগুলি মেরামতযোগ্য হইলে তাহা সম্পাদনকরত পুনরায় কার্যকর করিতে হইবে এবং যেই সকল কোম্পানির মাধ্যমে ক্রয় করা হইয়াছে, তাহাদের জবাবদিহির আওতায় আনিতে হইবে। 

টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে আমরা চাহি, সচিবালয়ের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তার যন্ত্রপাতি ক্রয় করিবার পূর্বে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ পরামর্শ লওয়া উচিত। ক্রয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি যদ্রূপ গুরুত্বপূর্ণ, তৎসহিত ভবিষ্যতে এই সকল যন্ত্রপাতি অকার্যকর হইলে তৎক্ষণাৎ মেরামতের ব্যবস্থাও থাকা চাই। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়কে এইভাবে অরক্ষিত রাখা যাইবে না। 
 

.

উৎস: Samakal

এছাড়াও পড়ুন:

ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অবিচল

পাঠ্যপুস্তকে তাঁর জীবনী নেই। অথচ কোথায় ছিলেন না তিনি! ১৯৪৩ সালে অবিভক্ত বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের পাশে ছিলেন। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে মানবিক ও সমাজসেবামূলক কাজে অংশ নিয়েছিলেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দিরে গিয়ে অভয় দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৯ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-বিধ্বস্ত পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা অঞ্চলের সংখ্যালঘু ও উদ্বাস্তুদের আশ্বস্ত করতে এবং তাদের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে ঐতিহাসিক ‘নেহরু-লিয়াকত’ চুক্তি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ষাটের দশকে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক থাকাকালে রেড ক্রসের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি তাঁর মামা অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের সঙ্গে ১৪৪ ধারা ভেঙেছিলেন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদদের জানাজায় অংশ নিয়ে তিনি ও তাঁর মামা দু’জনেই আটক হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিধান-সংবলিত শাসনতন্ত্র প্রণয়নে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে সাহায্য করেছিলেন। ১৯৬১ সালে পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের বাধা মোকাবিলা করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। ১৯৬৬ সালে স্বাধিকার আন্দোলনে ছয় দফার চূড়ান্ত খসড়া প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৬৭ সালে  ছয় দফা আন্দোলন তুঙ্গে থাকাকালে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। মূলত মওলানা ভাসানী ও তাঁর কারণেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্তরা নিঃশর্ত মুক্তি পেয়েছিলেন।

আত্মমর্যাদাশীল বাঙালি জাতির প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৬৯ সালের গোলটেবিল সম্মেলনে তিনি ‘এক মানুষ, এক ভোট’ নীতি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছিলেন। এই নীতিতে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর সংখ্যাগরিষ্ঠতার যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৯টি আসন আদায় করেছিলেন। এভাবেই তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে বিজয়ীদের জাতীয় সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত করেছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর পরাজয় নিশ্চিত করেছিলেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানের অবৈধ সামরিক সরকারকে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। অবৈধ পাঞ্জাবি শাসক চক্রের জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। সাংবিধানিক ব্যত্যয়ে তৎকালীন হাইকোর্ট বারকে নিয়ে তিনি যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তা এত চরমে পৌঁছে যে, ১৯৭১ সালের মার্চে জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করাতে কোনো বিচারকই রাজি হননি। মুক্তিযুদ্ধের পরও তিনি থেমে যাননি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হননি। মুক্তিযুদ্ধের আগেও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথককরণের দাবি তুলেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পরেও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথককরণের দাবি জানিয়েছিলেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে সার্ক গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তিনি শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হকের যোগ্যতম উত্তরাধিকারী হিসেবে বেঁচে ছিলেন।

হাসনাত আরিয়ান খান: লেখক ও গবেষক

সম্পর্কিত নিবন্ধ